কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

<<<< সম্পাদকীয় >>>>

 

 

 

কালিমাটি অনলাইন / ১৪৫ / চতুর্দশ বর্ষ : ষষ্ঠ সংখ্যা

 


বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আমরা যেসব সাহিত্যরথীর নাম এবং তাঁদের সাহিত্যকৃতি সম্পর্কে অবহিত হই, বিশেষত তাঁদের লেখনীতে বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় পাই, রবীন্দ্রনাথকে সেই তালিকার বাইরে রাখলে, যে নামটি সবার আগে উঠে আসে, তিনি এক এবং অদ্বিতীয় রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম। ১৮৮০ থেকে

১৯৬০ এই সুদীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনকালে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন, তা অবিস্মরণীয়। তিনি একাধারে  ছিলেন কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, বাংলাবানান বিশেষজ্ঞ, বাংলা অভিধান রচয়িতা, অনুবাদক, রামায়ণ-মহাভারত-গীতা ইত্যাদির সারানুবাদক, বিজ্ঞান-লেখক, রসায়নবিদ এবং স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালের পরিচালন দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। বিস্ময়ের ব্যাপার  হচ্ছে, তিনি একইসঙ্গে রসায়নশাস্ত্র ও রসসাহিত্যের চর্চা করেছেন এবং দুই ক্ষেত্রেই তিনি  ছিলেন অত্যন্ত কৃতিপুরুষ।

তবে একথা ঠিক যে, সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর যোগদান একটু দেরিতেই হয়েছিল। আপনারা জানেন, তিনি তাঁর রসসাহিত্যের প্রথম গল্পটি লেখেন ১৯২২ সালে। ‘শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড’। সেইসময় তিনি বসবাস করতেন পার্শিবাগানের পৈত্রিক বাড়িতে। সেখানে তাঁর বাড়িতে একটি আড্ডার আসর বসত উৎকেন্দ্র সমিতিনামে। সেই আড্ডায় আসতেন জলধর সেন, কেদার বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রভাত মুখোপাধ্যায়, শিল্পী যতীন্দ্রকুমার সেন ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর আরও তিনভাই শশীশেখর, কৃষ্ণশেখর এবং গিরীন্দ্রশেখরও থাকতেন। সেই আড্ডাতেই রাজশেখর বসু পড়েছিলেন তাঁর লেখা  প্রথম গল্প। গল্পটি শুনে  উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁরা গল্পটি পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করলেন। কিন্তু রাজশেখরের আপত্তি ছিল গল্প প্রকাশে, বিশেষত স্বনামে। তখন ‘ভারতবর্ষ পত্রিকার সম্পাদক জলধর সেন একপ্রকার জোর করেই সেই গল্পটি নিয়েছিলেন এবং তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ভারতবর্ষ’তে প্রকাশ  করেছিলেন। জলধর সেন সেদিন যদি জোর করে গল্পটি প্রকাশ না করতেন, তাহলে বাংলাসাহিত্যে রাজশেখর বসু তথা পরশুরামের কবে আগমন ঘটত, তা আমাদের জানা নেই।

আরও একটা তথ্য উল্লেখ করতেই হয়, অনেকেই হয়তো জানেন না, রাজশেখর বসু বিজ্ঞানচর্চা এবং সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি অত্যন্ত গোপনে জড়িত ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপে অর্থাৎ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে। দেশ স্বাধীন হবার পরে তিনি তাঁর দৌহিত্রীকে জানিয়েছিলেন যে, বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ এবং বারীন ঘোষকে তিনি বোমা তৈরির ফর্মুলা ও মশলা সরবরাহ করেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, আলিপুর বোমা মামলা বা মানিকতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৮ সালে মুজাফফরপুরে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য বোমা হামলা করেছিলেন ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি।। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার অভিযান চালায় মানিকতলার মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে। ধরা পড়েন অরবিন্দ ঘোষ, বারীণ ঘোষ এবং অনুশীলন সমিতির ৩৭ জন তরুণ বিপ্লবী। আদালতে মামলা  চলেছিল ১৯০৮ সালের মে মাস থেকে ১৯০৯ সালের মে মাস পর্যন্ত। অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। বলা বাহুল্য, এই হামলার জন্যই রাজশেখর বসু বোমা তৈরির ফর্মুলা ও মশলা সরবরাহ করেছিলেন অরবিন্দ ঘোষ এবং বারীণ ঘোষকে। এবং এই সরবরাহ হয়েছিল রাজশেখর বসুর বাসস্থান ১৪ নম্বর পার্শিবাগান লেন থেকে। এই প্রসঙ্গে আরও একটি তথ্য পাওয়া যায়, বিপ্লবী পুলিনবিহারি দাসের সঙ্গে রাজশেখর বসু ঢাকায় অনুশীলন সমিতির সভায় গেছিলেন এবং সেইসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরিতে অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের বোমা তৈরির মশলা ও পদ্ধতি সম্পর্কে ওয়ার্কশপ করেছিলেন।

আগামী ২০৩০ সালে রাজশেখর বসুর জন্মের দেড়শ বছর পূর্ণ হবে। অথচ এখনও পর্যন্ত এই উচ্চতার এক অনন্য ব্যক্তিত্বের কতটুকুই বা আমরা জেনেছি, কতটাই বা মূল্যায়ন করেছি, যথাযথ সম্মান কতটা দিতে পেরেছি! আমাদের এই অক্ষমতা আমাদেরই পীড়িত করে।

সবাইকে জানাই আমাদের আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা এবং শ্রদ্ধা।

আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :

kajalsen1952@gmail.com

দূরভাষ যোগাযোগ : 9835544675

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন