কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

সন্দীপন দাশ

 

আনকোরা শহর অথবা পতঙ্গভুকের সূত্র

 

উপন্যাসিকা

(শেষ পর্ব)

আমরা কাগজের হরিণ বানিয়েছিলাম, তাদের শব্দে ঢেকে দিয়েছিলাম, কারণ আমরা চেয়েছিলাম তারা জানুক তারা কে। তাই, তাদের গল্পে মুড়ে দিয়েছিলাম আমরা, এবং তারা পরস্পরকে রাতের বেলা পড়ে শোনাত সেই গল্পগুলো, এবং তারা বুঝত যে তারা হচ্ছে “হরিণ, কারণ “হরিণ শব্দটা লেখা ছিল তাদের পাছায়, তাদের কাঁধে, তাদের খুরে। এবং সেখানে সর্বত্র বরফে ঢাকা ছিল, তাই তারা সহজে ছদ্মবেশ নিতে পারত, তাদের সাদা কাগজে তৈরি শরীর আর সাদা বরফ সহজেই মিশে যেত, এবং তারা এইভাবে সুরক্ষিত থাকতে পারত।

আমরা সব সময় তাদের সুরক্ষিত রাখতে চাইতাম, আর সেই জন্যই তাদের বানিয়েছিলাম। সেই জন্যই তাদের ওরকম একটা সুন্দর জায়গায় রেখেছিলাম, যাতে তারা আর সেই জায়গা পরস্পরের উন্নতিতে সাহায্য করতে পারে। তাদের চারপাশ ঘেরা ছিল বরফ আর পাহাড়ে এবং ছিল অশেষ ফাঁকা জায়গা, যেখানে তারা অবাধে নিজের ইচ্ছা মতন ঘুরে বেড়াত।

একদিন অবশ্য তারা বলল, এতকিছু থাকার পরেও তারা একটা জিনিস খুবই মিস করে, তা হলো তাদের নাক ও নাসারন্ধ্র।

আমরা আমাদের এই শরীরের জন্য আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ তারা বলল, “কিন্তু আমাদের ইচ্ছা করে এই পৃথিবীর গন্ধ শুঁকতে। আমরা শুধু পড়তে পড়তে ক্লান্ত। আমরা ক্লান্ত কোনো গন্ধ, স্বাদ অনুভব করতে না পারার জন্য। আমাদের কোনো কিছুকেই উপলব্ধি করতে পারি না যতক্ষণ না আমরা সেই জিনিসটাকে সব দিক থেকে অনুভব করি। আশা করি তোমরা আমাদের কথা বুঝতে পারছ?”

আমরা বললাম, “হ্যাঁ, আমরা বুঝতে পারছি। আমরা সব কিছুর ঘ্রাণ নিতে পারি, তাই আমরা জানি তোমরা কী বলতে চাইছ। পাইনের গন্ধ ছাড়া পাইন গাছের কি কোনো অস্তিত্ব আছে?”

কিন্তু, সবচেয়ে পড়াশুনা করা হরিণটা বলল, “একটা গোলাপকে যদি অন্য কোনো নাম দেওয়া হয় – তাহলেও কি তার পরিচয় গন্ধের ওপর নির্ভর করবে না? নামকরণেই কি একটা জিনিসের পরিচয় না তার স্বাদ-গন্ধ-আকারে তার পরিচয়? একটা বস্তু কীসের ভিত্তিতে সেই বস্তু রূপে পরিচিত হয়?”

এবং আমরা বললাম, “এবার তো আমরা ঘাবড়ে যাচ্ছি! তোমরা তো রীতিমতো দর্শনের আলোচনা শুরু করে দিলে। আমরা তোমাদের আন্ডারএস্টিমেট করেছিলাম। আমরা তোমাদের উচ্ছ্বাস আনন্দকে শিশুর খেলা হিসেবেই নিয়েছিলাম। কিন্তু সবটাই নিছক ছেলেখেলা ছিল না। তোমরা জ্ঞানের গভীর সমুদ্রেই ডুব দিয়েছ দেখছি।

এবং হরিণেরা একটু মাথা দোলালো, একটু বাঁকা হাসি দিল এবং তাদের মুখ দেখে মনে হল তারা গর্বিত নয়, বরং আঘাত পেয়েছে।

সে তো বটেই, বলল তরুণ হরিণ, আর খুব আস্তে, চাপা কণ্ঠস্বরে বলল, “মাথামোটার দল, যদিও আমরা শুনতে পেলাম, কিন্তু গুরুত্ব দিলাম না। কারণ, আমরা একটা ভুলই করেছি এবং তাদের উপেক্ষা করেছি – নাক দিতে ভুলেছি, ভুলেছি গন্ধ শোঁকার ক্ষমতা দিতে। পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের দুটো ইন্দ্রিয় থেকে তারা বঞ্চিত – স্বাদ ও ঘ্রাণ। অর্থাৎ তারা এই পৃথিবীকে পুরোপুরি ভাবে পায় না। তারা সম্পূর্ণ নিরাপদও নয়। বরফের নীচে খাবার খোঁজার জন্যও তাদের ঘ্রাণশক্তির প্রয়োজন। রাতের অন্ধকারে নেকড়েদের গায়ের গন্ধ না পেলে তারা নেকড়েদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করবে কী করে!

সুতরাং, আমরা আলোচনায় বসলাম, বিরাট কনফারেন্স রুমে আধা আলোয়, আধা অন্ধকারে (ফ্লুরোসেন্ট বাতি আমাদের কারোরই পছন্দ নয়, তবু এনার্জির পিছনে খরচ বাঁচাবার জন্য এগুলোই আমাদের এখন ব্যবহার করতে হবে), এবং মসৃণ উপবৃত্তাকার বিরাট টেবিল ঘিরে বসলাম আমরা ও আলোচনা চলল কীভাবে নাক নির্মাণ করা যায়।

শৌভিক বলল, “কাগজে দুটো ফুটো করে দিলেই তো হয়ে যায়; অহনা বলল, “না, সেটা আর সম্ভব নয়। ওদের শরীর এখন নিছক শুধু কাগজের আর নেই। আরো কিছু হয়ে উঠেছে। ওদের শরীরে সঙ্গে ওদের সত্তা এখন যুক্ত হয়ে আছে। আমাদের কাদার তাল থেকে কিছু বানাতে হবে এবং ওদের শরীরে কোনো ভাবে সেটা যুক্ত করে দিতে হবে

আঠা দিয়ে, অভীক কথাগুলো জোরে বলে ফেলেছিল; আমরা সবাই অভীকের দিকে তাকালাম; অভীকের বেঁটে চেহারার সঙ্গে ঐ বেমানান লম্বা আঙুলগুলো দেখে আমরা বারবার অবাক হয়েছি। যদিও সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি কখনও, কারণ সেটা অভদ্রতা হয়ে যায়।

অবশেষে সুমনা কথা বলল, “আমার মনে হয় ওরা নিজেরাই ওদের নাক বানিয়ে নিক। ওরাই ঠিক করুক কীরকম নাক ওরা চায় এবং কীভাবে তা বানাতে চায়। ঠিক কিনা?”

আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে সম্মতিসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম এবং বললাম, “ঠিকই তো, ওরা যখন তত্ত্ব কথা আলোচনা করতে পারে, তখন একটা নকশা বানানো ওদের কাছে ব্যাপার নয়

এবার আমরা উঠে পড়লাম এবং ঘরের আলো নিভিয়ে বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। ঘর অন্ধকারে ডুবে গেল। আমরা যে যার বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালাম এবং হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলাম রাতে কী খাবার বানানো যায়। আমাদের পেট ততক্ষণে গুড়গুড় করতে শুরু করেছে।

××××

পরের দিন আমরা হরিণদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তারা কিছু ভেবেছে কিনা এই ব্যাপারটা নিয়ে। এই প্রশ্ন শুনে তারা কিছুক্ষণ গম্ভীর ভঙ্গিতে তাদের শিং আর মাথাটা দোলালো, তাদের কানগুলো নাড়াতে লাগল এবং শেষে সবচেয়ে খুদে তরুণতম হরিণটা বলল, “হ্যাঁ, কাল রাতেই আমরা এই সমস্যার উপায় বার করে ফেলেছি

আমরা বললাম, “দারুণ! বলো তাহলে

তারা বলল, “আমরা তোমাদের নাকগুলো কেটে নেবো আর আমাদের সেগুলো গ্রাফট করব। এটাই একমাত্র রাস্তা; আমাদের শরীরের স্নায়ু, চামড়া এবং আমাদের মাথার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য এইভাবে ছাড়া আর কোনো ভাবে করার উপায় নেই। এখন তোমাদের কী মত, বলো

আমাদের পেট আবার গুড়গুড় করতে লাগল, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও বোধহয় এত অবাক হতাম না; আমরা থপ করে বসে পড়লাম এবং একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলাম আর বুঝলাম আমরা হরিণদের বুদ্ধির কাছে হেরে গেছি আর আমাদের ‘না বলবারও কোনো উপায় নেই, যেহেতু তাদের এই নাকহীন অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। এই নাকহীন অবস্থাতেই তারা বছরের পর বছরের কাটিয়ে গেছে এবং কোনো অভিযোগও করেনি যতক্ষণ না তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে এই ব্যাপারে।

বাল করবি তোরা, সুমনা বলে উঠল, “তোরা সব বাল বাল বাল

শৌভিক বলল, “কোনো দিন না। নরকে গেলেও না

অভীক তার লম্বা আঙুলগুলো মটকাতে মটকাতে বলল, “ওরাই কিন্তু ঠিক

সেটা আমরাও জানি, তবু সেটা আমরা মেনে নিতে পারছিলাম না।

তোমরা নাকগুলো কবে নিতে চাও? আজকেই?” আমরা জিজ্ঞাসা করলাম।

হরিণরা বলল, “না। আজ থেকে তিন দিন বাদে

আমরা বললাম, “আচ্ছা

যদিও হরিণদের আমরাই নির্মাণ করেছি কিন্তু এখন থেকে হরিণরাই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে। এটাই নিয়ম। যে কোনো রোবোটকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।

আমরা ঠিক করলাম এই তিন দিন আমাদের সবকিছু ভোগ করতে হবে, যত স্বাদ যত গন্ধ চারিপাশে আছে সব ভোগ করতে হবে। নিয়ে এলাম যত দামি সুস্বাদু মদ, সুস্বাদু সব খাবার, যত সুগন্ধী ফুল, প্রিয়জনের চুল আর শরীর। বৃষ্টি, রোদ, ধুলো, কাদা, পিঠে-পুলি, কাবার-কর্মা – সবকিছুর গন্ধ প্রাণ ভরে নিলাম। ডিমের গন্ধ, টাটকা আপেলের গন্ধ, গরম ভাতের গন্ধ, পোড়া দুধের গন্ধ, রাতের গন্ধ। দুনিয়ায় যা কিছু আছে, যা কিছু হাতের কাছে পেলাম প্রাণ ভরে তার গন্ধ শুঁকলাম এবং এতটাই আকুল ভাবে সে গন্ধ শুঁকলাম যে তা আমাদের অজান্তে আমাদের মাথার মধ্যে গিয়ে নিউরনের ছোট ছোট কণার মধ্যে ঢুকে তৈরি করল নানা রকমের খোপ – “শিউলি ফুলের খোপ, “পিঠে-পুলির খোপ, “পিয়ালির শরীরের গন্ধের খোপ, “তমালের মোজার গন্ধের খোপ। আমরা বুঝলাম দুর্গন্ধগুলোও আমরা মিস করব। তাই দুর্গন্ধ খুঁজতে শুরু করলাম। পচা ডিমের গন্ধ, পচে যাওয়া সব্জির গন্ধ, গোবরমাখা খড়ের গন্ধ, গুয়ের গন্ধ, পেচ্ছাপের গন্ধ, নর্দমায় জমা পাঁকের গন্ধ, দুঃস্বপ্নের গন্ধ – যত রকমের গন্ধ, সব, সব, ঘাসের গন্ধ, ভোরের গন্ধ, আবর্জনার গন্ধ, নিজেদের পায়ের গন্ধ

××××

আমি সবই জানি। কিন্তু আমার আর কিছু এসে যায় না। আমিও এখন ভান করতে শিখে গেছি। নিমেষই এই ব্যাপারে আমার শিক্ষক। বা বলা ভালো অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা বলে কিছু নেই আর। কারোকে আর কৈফিয়ত দেওয়ারও নেই। দিতে ইচ্ছাও করে না। এসব ভালো লাগে না কোনো দিনই। মিথ্যা সংকট তৈরির চেষ্টা। সব কিছুর মধ্যেই বিপন্নতাকে খুঁজে বেরানো। কবিতাকে, এই আরেকটা কারণ, যে জন্য আমার ভালো লাগে না। ভাবছি স্মৃতিকথা লেখা শুরু করব। কিন্তু তোমার তো কোনো স্মৃতিই নেই। কোনো স্মৃতি তুমি রক্ষা করে রাখোনি। অবশ্য এ ব্যাপারে কবিতার সাহায্য নেওয়া যায়। কবিতার স্মরণশক্তির খুব ধার। এখন রাজি হলে হয়। নিমরাজি হলেও চলবে। নিম হয়ে আছে আকাশের মেঘগুলো। নিমে নেমে আসছে সব কণ্ঠস্বর। সারাটা দিন ধরে ভ্যাপসা গরম। মেঘগুলো আবার এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে। কী এক নিমের অপেক্ষায়! বা নিমঝড়ের অপেক্ষায়! সোনার দোকানের ক্যাশিয়ারের কাজ করতে হয়। আমাকে নয়। তোমাকে নয়। নিমেষকে। তুমি আসলে পার্থক্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কাঠঠোকরার কথা ভাবো। কিংবা হেঁটে চলেছ। একটা ফাঁকা ব্রিজ। শুনশান। ঠং ঠং শব্দ, দূর থেকে ভেসে আসছে। কীসের শব্দ সে নিয়ে তোমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। মাথার ব্যথা আমার শুধু বেড়ে চলেছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। ঠায়। দূরে, দূরে দূরে…… দিগন্ত রেখায় ভাসমান পাওয়ার গ্রিডগুলো ক্রমশ তোমার চোখের দিকে এগিয়ে আসে। যেহেতু তুমি যা নও তাই শুধু বলতে পেরেছি আবার প্রথম থেকে শুরু করা উচিত উপন্যাসটা। কিন্তু মাঝ পথ থেকে সেই আবার প্রথমেই ফিরে আসতে হবে। অর্থহীন পরিশ্রম। প্রত্যেকটা পরিচ্ছেদ অন্য পরিচ্ছেদের দ্বারা পরিত্যক্ত। অর্থহীনতা বেকারত্বের কাছে নিয়ে যায়। নাকি বেকারত্ব অর্থহীনতার কাছে নিয়ে যায়। একটা হালকা কোনো কিছুর ওপর বসে আছি। ভীষণ হালকা। কেউ যেন একটানা হেসে চলেছে। হেসেই চলেছে। কোনো শব্দ নেই। কিন্তু আশ্চর্য উজ্জ্বল এক হাসি। কোনো ক্লান্তি নেই। কোনো দুঃখ নেই। কোনো ক্ষোভ নেই। সব যুগই আরেক যুগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণযুগ। স্বর্ণালি বিজ্ঞাপন। তুমি এসব নিয়ে ভাবো না। শুধু সবুজের দিকে তাকিয়ে থাকো। বোতলটা সবুজ না তোমার দেখাটা সবুজ? রঙ ব্যাপারটা তোমার কোনো দিন ভালো লাগে না। রঙের থেকে তুমি আকারের প্রতি বেশি আস্থা রাখতে চাও। যদিও তুমি বর্ণান্ধ নও। কিংবা বর্ণান্ধ না হওয়ার অভিনয় করছ। জেগে থাকাটা কল্পনা না ঘুমানো? আমাকে উপন্যাসটা শেষ করতেই হবে। উপন্যাসটা শুরু হয়ছে কি? যত সব ফালতু কথা। রঙের কথার মতনই অবান্তর কথা। কিন্তু আমার সব কথাই তো অবান্তর। এই যেমন ভাবছি কথার কি কোনো রঙ বা আকার থাকে? কিন্তু কথার মধ্যে সন্দেহ থাকে। আর সেই সন্দেহ প্রাণ ভরে টেনে নেয় ব্রিজের নীচে দাঁড়ানো মাগিটা। মাগিটার মুখে ধ্যাবড়ানো লিপস্টিক, মুখে কালো সূর্যাস্ত। আমি আর নিমেষ তখন বিড়ি আর বাংলায় মগ্ন। তুমি তখনও হেঁটে চলেছ। ব্রিজটা পরাবৃত্তকার। ব্রিজটার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যোজনগন্ধা। তুমি এখন সময়ের কথা ভাববে। (তোমার সব ভাবনার কথা কী করে জেনে যাচ্ছি আমি? এখানেও একটা দুনম্বরি ব্যাপার আছে মনে হচ্ছে যেন।) কোন সময় কোন কাজটা করতে হবে, ভাবছ তুমি। সময়ের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক নিয়ে খেলা করাটা তোমার একটা শখ। এই শখে কাজের চেয়ে সময়টা বেশি গুরুত্ব পায়। তাই বাক্যও অর্থ হারিয়ে, শুধু সময়ের দাসত্ব করে। বাক্য শুরু করা থেকে শেষ করা পর্যন্ত যে সময় তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাও তুমি। সব বাক্য বলবার সময় আগে থেকে নির্দিষ্ট করে দাও। এই বাক্যটা ১০ সেকেন্ডের মধ্যে বলতে হবে। ঐ বাক্যটা ৪৪ সেকেন্ড ধরে বলতে হবে। সব কিছু নির্দিষ্ট করে দিতে চাও। যতি। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। এইসব লিখতে লিখতেই অস্বীকার করি লেখাগুলোকে। শূন্যকে কি অস্বীকার করা যায়? কিন্তু তোমাকে অস্বীকার করলেই ভালো হত। আমার কোনো মন্ত্র জানা নেই। সেই প্রাচীন, আদিম যুগে যদি ফেরা যেত। নরবলীর রক্ত দেবতাকে নিবেদন করে, হৃৎপিণ্ড আকাশের দিকে তুলে সেই পবিত্র, না-জানা ভাষায় মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে যদি শুনতে পেতাম মহাকালের ডাক! আসলে স্মৃতির ওপর নির্ভর করাটাই ভুল। যতটা ভুল নগ্নতার মুখোমুখি হওয়া। তুমি যে এক পাতা থেকে আরেক পাতায়। এক ডাল থেকে আরেক ডালে। ও আচ্ছা, বইয়ের এক পাতা থেকে আরেক পাতায়। পৃষ্ঠা বললেই হত। এসব তোমার গাজোয়ারি। তুমি কোনো দিন স্বপ্নের পিছলে পড়ায় বিশ্বাস করতে করতে না এক বর্গের হাতে পড়ল। অথচ এই যা কিছু লিখছি, সবই অতীত থেকে টোকা। সে অতীত আমার না তোমার? আমি হয়তো আমার কোনো পুরাতন লেখা বের করে সেখান থেকে টুকছি। এটা একটা নিশ্চয়তা দিচ্ছে। একটা নিশ্চিন্ত ভাব মনের মধ্যে জাগছে। তুমি স্মৃতিতে বিশ্বাস করো না। সময়কে সময় দিলে যে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে, সেটাও তোমার কাছে শূন্য। সময়ের অভিমুখটাই তো এক বিরাট বড় প্রশ্নচিহ্নের মুখে। উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করতে হবে। তোমার কিছুতেই কিছু না আসার মধ্যে তারা খসার অপেক্ষায় সারা রাত জেগে। টিকটিকির কথা তুমি বহুদিন আগে থেকে লেখা শুরু করেছ। এখনও লেখা শেষ হয়নি। মাথায় থেকে গেছে আমার না-জানা অন্ধকার, আলো-ছায়া, হালকা হলুদ আলো আর মোজাইকের ওপর বসে থাকা টিকটিকি। তার ছায়া। অত্যন্ত বেশি রকমের স্পষ্ট। এতটাই স্পষ্ট, যা প্রায় অর্থহীনতার কাছাকাছি। তোমার কিছু এসে না যাওয়া, আমার মধ্যে ইলেকট্রনের প্রবাহ সৃষ্টি করছে। এরই মধ্যে ঘনত্ব বাড়তে থাকে। শীতলতা বাড়তে থাকে। নীরবতা বাড়তে থাকে। কিছু না ভাবার নমনীয়তা বাড়তে থাকে। আমার জীবন কবিতার কাছে রয়ে গেল। কিন্তু এটা আমি কোনো দিনই মেনে নিতে পারব না। কবিতা, এমন এক মহিলা, যে শুধু গুছিয়ে নিতে জানে। আমার সব কিছু অগোছালো হয়ে গেছে বারবার। কোথাও কি একটা প্রতীক থাকতে পারে না? কোনো খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন ছিল না; হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত। দিবাস্বপ্ন কোনো উপমা নয়। একটার সঙ্গে আরেকটা মিলিয়ে দেখা নয়। বরং ভাবনার মধ্যেই রয়েছে “দিবাস্বপ্নের মতন। উচ্চারণের মধ্যেই রয়েছে “দিবাস্বপ্নের মতন। লেখার মধ্যেই রয়েছে “দিবাস্বপ্নের মতন। এইভাবে বিস্তার লাভ করে নিছক দুটো শব্দ। পাতার পর পাতা ছড়িয়ে পড়ে নিছক দুটো শব্দ। (আবার ডালের পর ডাল বলো না! এটাও বইয়ের পাতা।) কোনো রূপক নয়। কোনো প্রতীক নয়। কোনো উপমা নয়। হাওয়ায় পৃষ্ঠাগুলো উড়ে যাচ্ছে। “দিবাস্বপ্নের মতন পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আষ্টেপৃষ্ঠে। পৃষ্ঠা জুড়ে দুপুর ফুটে উঠছে। দুপুর ঘন হয়ে উঠছে। খাওয়া-দাওয়া না করে দিব্যি লিখে চলেছি। অবশ্য জলখাবারটা ভালোই হয়েছে। এটা কি দিনলিপি? দিনের লিপি। একেকটা দিন, একেকটা লিপি। লিপির উদয়, লিপির অস্ত। লিপির সকাল। লিপির রাত। লিপির ব্যক্তিজীবন। লিপির ঘরসংসার। লিপি নিজের মতন করে তার জীবন সাজিয়ে নিতে চায়। আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত যেমন চায় আরকি। লিপির বাড়ি থেকে কিছুটা হেঁটে গেলেই গঙ্গা। গঙ্গার পাশেই শশ্মান। শশ্মানের প্রেক্ষাপটে নিস্তব্ধ পরিবেশই মাথায় আসে কিন্তু এই শশ্মানের পাশেই বড় রাস্তা। তাই গাড়ি ও নিত্যযাত্রীর কোলাহল। লিপির বাড়ির পাশেই একটা বিরাট বড় মাঠ। সে মাঠে নাকি এক সময় শিয়ালরা থাকত। সন্ধ্যে হলেই শোনা যেত তাদের সমবেত কণ্ঠস্বর। এখন আর কোনো শিয়াল নেই। কোথায় চলে গেছে তারা! শেষ পর্যন্ত সেই বাস্তবের কাছে ফিরে যেতে হয়। বা স্মৃতির কাছে। কিন্তু বাস্তব আর স্মৃতি তো এক নয়। অবশ্য কিছুটা মিল আছে। নিমেষের সঙ্গে লিপির বিয়ের পর গেছিলাম ওদের নতুন পাতা সংসার দেখতে। এ শুধু সেই স্মৃতিরই রোমন্থন। নিমেষের উদাসীনতা রোগ গেল না। লিপির প্রতিও সে উদাসীনই থেকে গেল। লিপি তার নিজের মনের মতন করে সংসার পেল না। লিপি চলে যাবে সারসদের সঙ্গে। লিপি পথের জন্য সামান্য কিছু জিনিস গুছিয়ে নিচ্ছে। লিপি সারসদের সঙ্গে ডানা মেলে দেবে নতুন দেশে যাওয়ার জন্য।

××××

তিনদিন বাদে আমরা দাঁড়িয়ে আছি হরিণদের সামনে। হরিণদের মুখে সার্জিকাল মাস্ক। তারা সার্জারি রুম ভালো করে পরিশুদ্ধ করে রেখেছে।

আমরা বললাম, “দাঁড়াও, তোমাদের খুর দিয়ে কী করে অপারেশন করবে!”

প্রবীণতম হরিণটি শান্ত ভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “কোনো চিন্তা করো না। তোমরা কিছু বুঝতে পারবে না। কোনো কিছু অনুভবের আগেই কাজ হয়ে যাবে।

তারপর ওরা আমাদের মুখে মাস্ক পরিয়ে দিল আর আমরা জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমাদের নাক, মুখ সবই যেমন ছিল তেমনই আছে। আমরা ভাবলাম, তারা হয়তো আমাদের ওপর করুণা করে আমাদের ছেড়ে দিয়েছে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমরা জানলা দিয়ে বাইরে তাকালাম আর হরিণেরা বাইরে আনন্দে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, গাছের ডাল, গাছের নীচে পড়ে থাকা ফল, নেকড়ের গু, বাদামের খোসা শুঁকে শুঁকে দেখছে। আমরা বুঝলাম তারা আমাদের ঘ্রাণশক্তি নিয়ে নিয়েছে এবং আমাদের বাকি জীবনটা এক গন্ধহীন পৃথিবীতে কাটাতে হবে। আমরা আমাদের নাকের ব্যান্ডেজে হাত বোলালাম আর ভাবতে লাগলাম কখন আমরা বুঝব আমাদের আর কোনো ঘ্রাণশক্তি নেই। সাদা অ্যাপ্রন পরা একজন মহিলা হরিণ এসে আমাদের হাতে আইস প্যাক দিল, যদিও আমরা কোনো যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম না।

সে বলল, “এটা তোমাদের মানসিক ভাবে আরাম দেবে

সুমনা বলল, “ব্যান্ডেজ কত দিন বাদে খুলতে পারব? আর আমরা জানি তোমরা আমাদের ঘ্রাণশক্তি নিয়ে নিয়েছ

হরিণীটি বলল, “একদিন বাদে

তারপর সে করুণ চোখে আমাদের দিকে তাকাল আর জানলা দিয়ে দেখল বাইরে বরফের মধ্যে হরিণদের উচ্ছ্বাস। তারপর খুর দিয়ে মেঝেতে ঠকঠক আওয়াজ তুলে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ বাদে বাইরে তাকে দেখতে পেলাম এবং সে অন্য হরিণদের চলে যেতে বলল। অন্য হরিণরা আমাদের দিকে তাকাল এবং বুঝতে পারল ব্যাপারটা। তারপর বরফের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে গেল।

পরের দিন আমরা ব্যান্ডেজ খুলে ফেললাম। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমরা মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছিলাম, কারণ আমাদের ভয় করছিল এই ভেবে যে যখন বুঝতে আমরা আর কোনো গন্ধ পাচ্ছি না, আমাদের মন তখন কতটা ভেঙে পড়বে। আমরা বুঝতে পারছিলাম গন্ধ ছাড়া, স্বাদ ছাড়া আমাদের জীবন কতটা ফাঁকা হয়ে যাবে। নিজেদের বোঝাতে লাগলাম, “এটাই হয়তো হওয়ার ছিল। এই জীবনই আমাদের মেনে নিতে হবে কিন্তু কোনো লাভ হলো না। আমরা ক্রমশ হতাশায় ভেঙে পড়ছিলাম।

হাসপাতাল থেকে বেরনোর পর অবশেষে শৌভিকই সাহস করে নাক দিয়ে জোরে নিঃশ্বাস টানল। আমাদের দিকে তাকালো সে। আমরা ভেবেছিলাম সে কান্নায় ভেঙে পড়বে। কিন্তু সে চোখ গোল গোল করে বলল, “নিঃশ্বাস নিয়ে দেখো একবার

আমরা তাই করলাম। জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলাম নাক দিয়ে। কিছুক্ষণের অপেক্ষা। তারপর পরস্পরের দিকে বিস্ময়ের সঙ্গে তাকাতে লাগলাম। এটা কী করে সম্ভব! আবার একবার জোরে নিঃশ্বাস নিলাম। আমরা কি কল্পনা করছি? যে গন্ধ পাচ্ছি সেটা কি শুধু মাথার মধ্যে রয়েছে? না, এই তো বরফের গন্ধ, পাইনের গন্ধ, আমাদের গায়ের ঘামের, ভয়ের আর আনন্দের গন্ধ। আমরা বুঝতে পারছি সবকিছুর গন্ধ আছে, কোনো বস্তুকে তার গন্ধ, রঙ বা আকার থেকে আলাদা করা যাবে না। তাই আমাদের প্রতিটা ইন্দ্রিয় দিয়ে আমরা এই জগতকে, নিজেদেরকে এবং পরস্পরকে অনুভব করতে পারি। আমরা আনন্দে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলাম এবং আমরা আমাদের গা থেকে যে আনন্দের সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তা দেখতে পেলাম।

××××

সারাদিন আপনি শ্রী ‘র-এর সন্ধান করে আনকোরা শহর চষে ফেললেন। এখন রাত হয়ে গেছে। আপনি ফিরে আসছেন হোটেলে। সেখানে আপনি একটা ঘর ভাড়া নিয়েছেন। সেই ঘরের চাবি হাতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই আপনি দেখলেন একটা অন্ধকার মহাসমুদ্রে একটা নৌকায় আপনি বসে আছেন একা। সেই নৌকায় কোনো পাল নেই, দাঁড় নেই। নৌকা শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ে দুলে চলেছে। কোথায়, কোন দিকে চলেছে তাও আপনি জানেন না। আপনি শুধু বসে আছেন এই অজানার মধ্যে। আপনার মনে ভয় আর বিস্ময়। তার সঙ্গে আনন্দও যোগ হয়েছে। কারণ আপনি বুঝতে পারছেন এবার শ্রী ‘র-কে খুঁজে পাবেন। চায়ের দোকানের ছেলেটি এসে বলল, “স্যার, ডিমটোস্ট খাবেন? ডবল ডিমের টোস্ট করে আনি? বড় বড় ডিম আছে, স্যার। আপনি ‘হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লেন আর “সঙ্গে চাও এনো বলে দিলেন। ডিমটোস্ট খেয়ে যখন তৃপ্তির সঙ্গে চায়ে চুমুক দিলেন শ্রীমতি ‘ট আপনার পাশে এসে বসলেন। তারপর সারসটা পাশে এসে বসল। কিছু পরে লিপি এসে বসল পাশে। পাশাপাশি বসলেই গরম ভাতের মতন গল্পের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। হাঁড়ি থেকে গল্পের ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। “আপনি গোয়েন্দা তো তাই রহস্যের গন্ধ খোঁজেন।, শ্রীমতি ‘ট বলতে থাকেন, “তারপর ট্রেনটা যখন হুইসল বাজিয়ে যাত্রা শুরু করল আপনি জানলার কাচের ওপর হাত দিয়ে হাঁটতে থাকলেন যতক্ষণ না প্ল্যাটফর্ম শেষ হয়।

কিন্তু আপনি তো কিছুই বুঝলেন না। কিছু কী অনুভব করেছিলেন?”

যত দূর মনে পড়ে না, তেমন কোনো অনুভূতি আমার ছিল না।

যত দূরেই যাই আপনি আর আপনার এই আনকোরা শহর আমার পিছু ছাড়ে না

স্মৃতি যে লবণাক্ত, তা কি সহজে বোঝা যায়?”

নিজের ভিতরে যদি তাকাও দেখবে একটা পালক আছে, একটা হরিণ আছে

তারচেয়ে বরং নিজেকে দ্বীপ করে তুলি। দ্বীপের বালিতে আঁক কাটবে হরিণেরা। হরিণদের সঙ্গে তুমি খেলা করবে। হরিণদের মধ্যে তুমি বেঁচে থাকবে

কল্পনাকে স্মৃতির সঙ্গে মেখে ফ্রিজের মধ্যে রেখে দাও। কিন্তু মনে রেখো প্রোপাগান্ডাও ঐ মিশ্রণের মধ্যে তৈরি হচ্ছে

শ্রী ‘র সম্পর্কে কিছু খবর পেলেন? সে কি এই আনকোরা শহর ছেড়ে আর যাবে না কোথাও?”

শ্রী ‘র এখন শিউলিতলায় থাকেন। কিন্তু শিউলিতলায় কেউ থাকে না। সম্পূর্ণ ফাঁকা। অথছ শ্রী ‘র-কে যারা এখানে চিনত তারা বলছে শ্রী ‘র শিউলিতলাতেই থাকেন

অন্যেরা যখন যায় শিউলিতলায় মানুষের ভিড়। আপনি গেলেই শিউলিতলা শূন্যপুরী

শিউলিতলায় যাওয়ার কোনো রাস্তা কি কোনো দিন ছিল? নাকি আপনি শুধু দ্বীপের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে দিচ্ছেন?”

আকাশ যখন একটা বিন্দু হয়ে রয়েছে সেই সময় আপনি শ্রী ‘র-কে খুঁজতে বের হন। একটা হরিণ শুনতে পাবেন।

ইঁদুরগুলো এই নৌকাতেও চলে এসেছে। লিপির সঙ্গে খেলা করছে। লিপি নিমেষদের থেকে দূরে এসে ভালো আছে। লিপি আকাশে লিখে রেখে এসেছে তার হাওয়াশরীরের কথা। সারসের আর কোনো খবর নেয়নি লিপি। হয়তো সারস নিমেষদের ওখানেই চলে গেছে আবার। লিপি আর শ্রীমতি ‘ট উঠে দাঁড়াল। তারপর দুজনে পাশাপাশি রাস্তার ডানদিকের ফুটপাত ধরে চলতে শুরু করল। একজন পরেছে হলুদ রঙের শাড়ি, আরেকজন কমলা রঙের সালোয়ারকামিজ। আপনি দেখলেন সাপ আর সন্দর্ভ। ইঁদুররা সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলেছে তাদের মাটির তলার শহরে যাবে বলে। লিপি আর শ্রীমতি ‘ট-এর পায়ের ছাপে কৃত্রিমতা তৈরি হচ্ছে। তারাও আজ থেকে ঐ মাটির তলার শহরেই থাকবে। আপনি দেখলেন শ্রীমতি ‘ট সসপ্যান উনুনে বসিয়ে তেল ছড়িয়ে দিল। শ্রীমতি ‘ট কপালের ঘাম একটা রুমাল দিয়ে মুছে একটা ডিম ফাটিয়ে ঢেলে দিল প্যানে। কিছুক্ষণের মধ্যে গরম গরম কাঁচা পোঁচ রেডি করে আপনার মুখের সামনে ধরল। আপনিও তৃপ্তি করে খেলেন গরম সেই পোঁচ। এখনও মুখে লেগে রয়েছে পোঁচের টুকরো। জল দিয়ে মুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়লেন নতুন বইয়ের সন্ধানে।

××××

আমি প্রতিস্মৃতিকথা লিখতে বসেছি। কারণ আমার কোনো স্মৃতি নেই। আমি একজন চরিত্র। আমি কোনো রক্তমাংসের মানুষ নই। আমি এই লেখা লিখছিও না। আমার স্রষ্টা এই লেখা লিখছেন। স্রষ্টা বোঝাতে চাইছেন চরিত্ররা স্রষ্টা সম্পর্কে সচেতন। বা এটাও হতে পারে, স্রষ্টা হয়তো তার সৃষ্টির সঙ্গে তথা চরিত্রের সঙ্গে অর্থাৎ আমার সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু যে স্মৃতিহীন সে কি কথা বলতে পারে? স্রষ্টা যেমন ভাবে আমার অতীত নির্মাণ করেন সেটাই আমার স্মৃতি। স্রষ্টা ভাবলেন আমি একজন দেহব্যবসায়ী। দেহ বিক্রি করে খাই। বিবাহিত পুরুষদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক তৈরি করাই আমার ব্যবসার প্রধান অঙ্গ। আমার একজন স্বামী আছে। এবং সে সেটা জানে ও উৎসাহ দেয়। অথবা স্রষ্টা ভাবলেন আমি এক স্বাধীনচেতা নারী, যে সমাজকে দুয়ো দিয়ে বেপরোয়া জীবনযাপন করে। যে নারী কাহিনীর প্রথম ভাগ জুড়ে সতীত্বকে ভেংচি কাটে, শরীরের জয়গান করে, তারপর মধ্যভাগে বৈবাহিক প্রতিষ্ঠানে নিজের আশ্রয় খুঁজে পায়, স্বামীর প্রেমে নিজেকে সঁপে দেয়। শেষে সেই চরিত্রবান স্বামীর রহস্যমৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে হয়ে উঠতে হয় অতিমানবী। কিন্তু আমি যদি এই দুই চরিত্রের কোনোটাই না হতে চাই। হাস্যকর! ভুলে যাই যে আমার নাম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাটুকুও নেই। স্রষ্টা আমার নাম রেখেছেন শ্রীমতি ‘ট। অথচ আমার নাম হতে পারত পরমা বা রিয়া। কিংবা অভীক (চরিত্রের লিঙ্গটাও তো স্রষ্টাই ঠিক করে দেন)। এবং চরিত্রের ব্যক্তিগত জীবনের সমস্ত গোপন কথা প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন স্রষ্টা। পাঠক, আপনারাও, সেইসব কেচ্ছা চেটেপুটে খান। আমরা চরিত্ররা লাঞ্ছিত হই, অপমানিত হই স্রষ্টার হাতে আর পাঠক সেটাই উপভোগ করেন পরম তৃপ্তিতে।

এবার ঠিক করেছি আমি একদিন গোয়েন্দা ‘প হব, আরেকদিন হরিণ হব। হরিণ হয়ে জঙ্গলে হারিয়ে যাব। স্রষ্টা আমাকে খুঁজে খুঁজে মরবে। অবশ্য এটা কথার কথা। স্রষ্টা কখনও মরেন না, মরতে পারেন না। কিন্তু স্রষ্টা যতবার তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে, আমি হরিণ হয়ে হারিয়ে যাব। এই হরিণের জন্ম নেই, শৈশব নেই, কৈশোর নেই, যৌবন নেই, কোনো বেড়ে ওঠার গল্প নেই। শুধু আছে হরিণ আর তার ঘাসের সঙ্গে খাদ্য-খাদকের সম্পর্ক। হরিণ যেমন ঘাস খায়, ঘাসও তেমনি হরিণ খায়। এইভাবে হরিণ আর ঘাস এক হয়ে যায়। খাদ্য আর খাদক এক হয়ে যায়। আর গোয়েন্দা ‘প কলকাতার একটা ছোট গোয়েন্দা এজেন্সিতে সামান্য মাইনের কাজ করেন। হাতে কিছু টাকা আর ছুটি জমেছে বলে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের ঘুরতে যায়। সেই ঘোরার দিনলিপি দিলাম নীচে।

২৪ জুন, ২০১৫, বুধবার

আজ আলিপুরদুয়ার পৌঁছলাম। কিন্তু পৌঁছে যে খবরটা শুনলাম তাতে মনটা খারাপ হয়ে গেল। BTR, বক্সা দুর্গ, জয়ন্তী পাহাড়ে আর যাওয়া যাচ্ছে না। ১৫ তারিখ থেকে বন্ধ। মন খারাপ নিয়েই স্নান-খাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিয়ে রাজাভাখাওয়ার মিউজিয়াম দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ মনস্কাম। মিউজিয়াম চারটেতে বন্ধ হয়। যখন মিউজিয়াম পৌঁছলাম তখন সোয়া চারটে। এখানেও কপালটা খারাপ।

আলিপুরদুয়ার আর রাজাভাতখাওয়ার সংযোগকারী যে রাস্তা তার দুপাশে ঘন জঙ্গল। যদিও জঙ্গল শুনলে যে অ্যাডভেঞ্চারের কথা মাথায় আসে তা এখানে নেই। বরং একঘেয়েমির ক্লান্তিই আছে শুধু। যাই হোক, ফিরে এসে শহরটাই ঘুরে দেখলাম। দুর্গাবাড়ি, ১১ হাত কালীবাড়ি, ছিন্নমস্তার মন্দির। কোনোটাই দেখে তৃপ্তি হলো না। কোথাও কোনো সৌন্দর্য নেই। সৌন্দর্যবোধ নেই। ১১ হাত কালীবাড়ির গর্ভমন্দির শূন্য। পুজোর সময় ১১ হাত কালী তৈরি করে পুজো করা হয়। যদিও বুঝতে পারলাম না ভাসানের সময় ঠাকুরকে ওখান থেকে বার করে কী করে! তবে অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে বিরাট অথচ শূন্য গর্ভমন্দিরটা দেখে একটা অন্য রকম ভাব মনে ফুটে উঠল। ভাবটাকে বলা যায় ভয়মিশ্রিত বিস্ময়। আরেকটা মন্দির দেখলাম, মন্দিরটা সাদামাটা কিন্তু নামটা ভারি অদ্ভুত। ভাঙাফুল মন্দির!

২৫ জুন, ২০১৫, বৃহস্পতিবার

আজ ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম আকাশের মুখ ভার। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। তারমধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম। আজ যাব জয়গাঁও। আলিপুরদুয়ার থেকেই বাস পাওয়া যায়। হোটেলে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করতেই বাসস্ট্যান্ডের ডিরেকশন দিয়ে দিল। বাসস্ট্যান্ডে যেতেই বাস পেয়ে গেলাম। লক্ষ্য করলাম স্থানীয় লোকেরা ‘জয়গাঁ বলছে। জয়গাঁও শহরটা বিচ্ছিরি রকমের নোংরা একটা শহর। বৃষ্টি হওয়াতে কাদা আর নর্দমার পাঁকে একাকার হয়ে গেছে রাস্তাঘাট। অথচ শহরটাকে ঘিরে রয়েছে সবুজ পাহাড়ের শ্রেণি। আমি প্রকৃতিপ্রেমী-টেমি নই, শুধু বৈপরীত্যটা বোঝানোর জন্য এটা উল্লেখ করলাম।

বাসস্ট্যান্ডেই একটু জলযোগ করে নিলাম। এবার ফুনটসেলিং যেতে হবে। সেইজন্যই আসা। কোনো আই কার্ড নিয়ে আসতে ভুলে গেছি। কাস্টমসের অফিসে গেলাম ফুনটসেলিং যেতে গেলে সীমান্তে কোনো পরিচয়পত্র লাগবে নাকি। কারণ ফুনটসেলিং অন্য দেশে, ভুটানে। কাস্টমস অফিস বললাম, কিন্তু আসলে রাস্তার ধারে একটা ছোট ঘর। সেই ঘরের সামনে একজন বসেছিলেন তাঁকেই জিজ্ঞেস করলাম। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানলেন, আমি কলকাতার লোক। খাতির বেড়ে গেল। কারণ তিনিও কলকাতার আদি বাসিন্দা। যদিও বর্তমানে তাঁর পরিবার দুর্গাপুরে থাকেন (কিন্তু সেটা কেন তা আর জিজ্ঞেস করলাম না। এই ধরনের ব্যক্তিগত প্রশ্ন আমার ভালো লাগে না)। উনিই একটা গাড়ি ঠিক করে দিলেন। ফুনটসেলিং ঘুরিয়ে একদম এখানে ছেড়ে দিয়ে যাবে। দেখবার কী কী আছে তাও বলে দিলেন। ড্রাইভারকেও সেই জায়গাগুলোতে নিয়ে যেতে বললেন।

বিদেশে যে ঢুকে পড়েছি তা রাস্তা দেখেই বোঝা হয়ে গেল। নোংরা, গা ঘিনঘিনে, এবড়োখেবড়ো রাস্তার পরিবর্তে ঝাঁ চকচকে, আয়নার মতো পরিষ্কার রাস্তা। শহরটাও আশ্চর্য রকমের পরিষ্কার আর সাজানো। সত্যিই দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। কথা মত গুম্ফা, কুমিরউদ্যান ঘুরিয়ে দেখাল। তোর্সার ধারে নিয়ে যেতে পারবে না বলল। ওখানে কাজ চলছে, তাই রাস্তা বন্ধ। শহরের আদালতটাও দেখাল।

ফুনটসেলিং শহরটা পাহাড়ের গায়ে। আর জয়গাঁও পাহাড়ের পাদদেশে। গুম্ফা থেকে তাই জয়গাঁও শহরটার সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। সব দেখিয়ে-টেকিয়ে সীমান্তের ধারে একটা মার্কেটে নামিয়ে ড্রাইভার ব্যাটা পালাল। অগত্যা মার্কেটটা একটু ঘুরে সীমান্ত পেরিয়ে অটো ধরে বাসস্ট্যান্ডে আসতে হল।

২৬ জুন, ২০১৫, শুক্রবার

আজকের গন্তব্য রসিকবিল। একটা পাখিরালয় জাতীয় জায়গা। এই রসিকবিল আবার কোচবিহারে। এখানে যাওয়ারও বাস আছে। বাসস্ট্যান্ড থেকেই ছাড়ে। ওয়াচটাওয়ারে উঠে দেখলাম বিলটা বেশ বড়। স্থানীয়রা বলল শীতকালে প্রচুর পাখি আসে। কিছু হরিণ এক জায়গায় ঘেরা রয়েছে। নিশ্চিন্তে ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। একটা বাঘও সংরক্ষণ করা আছে। কিন্তু তিনি এই রোদের মধ্যে বাইরে বেরোবেন না। এইটুকুই দেখা। বাসে করে ফিরে এলাম। যাতায়াতেই সময় চলে গেল। কাল রাজাভাতখাওয়ার মিউজিয়ামটা দেখে বাড়ির ছেলে বাড়িতে।

২৭ জুন, ২০১৫, শনিবার

রাজাভাতখাওয়া মিউজিয়ামে বিভিন্ন জন্তুজানোয়ারের স্টাফড নিদর্শন রাখা আছে। কিছু প্রাণীর ভ্রূণও সংরক্ষণ করা আছে। মিউজিয়ামের পিছনে অর্কিডের বাগান আছে একটা। বেশ সুন্দর সুন্দর অর্কিড হয়ে আছে। চারপাশটা ঘুরে দেখলাম। চারিদিক জঙ্গলে ঘেরা। নিস্তব্ধ। শুধু ঝিঁঝিঁর ডাক শোনা যায়। ঘুরতে ঘুরতেই হঠাৎ চোখে পড়ল একটা হরিণ। বন্য। গাছের পাতা খাচ্ছে। হরিণটাও একা একা ঘুরছে। স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। তাকিয়ে রইলাম হরিণটার দিকে। হরিণটাও আমার দিকে তাকালো। মনে পড়ল একটু আগে মিউজিয়ামে একটা হরিণের সংরক্ষিত ভ্রূণ দেখেছি। মনে পড়ল আজ রাতের ট্রেনে বাড়ি ফিরে যাওয়া। মনে হল হরিণেরও হয়তো ঘর আছে। হরিণও রাত হলে ঘরে ফিরে যাবে। হরিণটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে, নাকি আমি হরিণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি? কিছু বুঝতে পারছি না। শুধু বুঝতে পারছি আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমার ট্রেন মিস হয়ে যাবে। কিংবা এই জঙ্গলই আমার ঘরে ফেরার রাস্তা। জোনাকি দেখতে পাচ্ছি। একটা ছোট ঝর্ণা দেখতে পাচ্ছি। অনেক রাত হয়ে গেল। একটা সোঁদা গন্ধে ভরে আছে চারিদিক। তারার আলোয় পথটা ভরে গেছে। এখনও চলেছি পথ ধরে। হে পথ কথা বলো।

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন