‘হু গাছ - একান্তে নিজের সিন্ধু’
(অধুনান্তিক ব্যাখ্যায় আলী আফজাল খানের দীর্ঘ কবিতা ‘হু গাছ - একান্তে নিজের সিন্ধু’র বিশ্লেষণ)
ÔWhen the waves of life come at you, you make a choice to sink or swim, Destiny is nothing but the choices you make in life.’
জানে ও জাহানে সকালবেলা, দুপুরবেলা, বিকেলবেলা, সন্ধ্যেবেলা
ছিল আঙুলের কথা নরমে গভীরে বেলান্তর
হাওয়া, যাওয়া অলিন্দ-নিলয়ে পাতা শয্যায়
রবি শস্যের উৎসবে যেন খিলখিল শরীর বিহু বিহু
ভুবনের ডাঙ্গা দানা দানা বেদানা বেদানা নৃত্য লাবণ্যে মনসাতলা
তাপ্পর খুলে নিলে চোখের রেটিনা, অন্ধ তোমার ঠোঁট খুঁজে
শ্বাস কাটে পাঁকের আওয়াজ, রব রব সৈন্যদল
দমে দমে কালাম বুকের হাপরে, তবু তছনছ শস্যের মাঠ
পক্ষাঘাতে চুপ স্নায়ুছেড়া দু’কূল
রক্তের নক্ষত্রবেগ, শরীর বেকাবু
ভালোবাসা নাকি এনেস্থিসিয়া?
তন্দ্রা আঙুলে চন্দ্রাবলী, বুড়ি বলে রূপকথা
অথচ দিন রাত বাতাসে রক্তপাত, চাঁদ না চাকু?
প্রতিশ্বাসে যে থাকে তাকে কি বলবো স্পন্দনের কথা?
পৃথিবীর এখনতম মস্তিষ্ক তাপ্পর ধূ ধূ একা হয়ে যাচ্ছে
লোকহীন গম গম করছে দরদালান...
র গড়তে গেলে রগড় ঘটে যাচ্ছে খালি, বরাত নিয়ে রীতিমতো লীলাঠাকুরণ আমা হতে গলিয়ে ফেলছেন আকার|
চাঁদহারানোর আরবার|
রে আহ নিয়ে গলা বাড়িয়ে ধরে না কোনো উত্তরের অধিকার|
সেই থেকে সেই
না-বালিকার কোঁচড়ময় ফুটে উঠছে অজস্র বাবা আদমের গাছবিচার, খই খই রবে|
সূচিমুখে সুতার আঁটসাঁট টিকে না
বাতাসের রক্তপাত বোবা, ফুটফুটে ফুলন্ত পলাশ
মদিরার পেয়ালায় যে জোছনা বিভ্রম
লতার শাড়ি খুলে দেখেছি গো লীলাবতি
পটে আঁকা মিথোজীবি জীবন
তোমার গন্ধ কবিতার মতো যেন এক ছাতিম শরীর
ডিয়ার বউন-ক্রাশার কুইন, ঘুঘুঠোঁটে সিংহ রে তুমি বাবু বলে ডেকো
শঙ্খপুষ্পী হে আমি হইবো তোমার আদরের শিশু
আমার রক্তেই তোমার আলতা হোক বায়োমেট্রিক
ভালবাসায় যদি সব কিছুর মতো শব্দ হয় নাড়ী থেকে নারী
তোমার শরীরে আছে লীনতাপের গোপন ভাষা
আলোর উজাড় ঠেলে মাঠঘাটবনে কঁকিয়ে উঠছে লণ্ঠনের প্রভূতবর্ণেরা
তুমি কি অনুভব কর তা বল, বল নড়ন ও চড়ন- নাজুক ও নাজাকত
না হয় এই নীরবতা তোমার সারা জীবন কোলাহল করবে
এমন দিনে যখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়
চুলগুলো| বিছানা শব্দগুলো| হৃদয়| পিরান এবং জীবন
আশা আর ফুঁ আছে, দুধ আর বাটি নেই
যা মাতাল করে তোলে তা চিন্তা করার মতো মিষ্টি আর কিছু নেই
মাতলামী আসে মদ থেকে, আর মদ আসে খোঁজ থেকে
এবং তোমার হৃদয়ের লুকানো মদ আমার মুখে ফেলে দাও
যা চলে যাচ্ছে তাই আমাদের জগৎকারু
গোলাপের সুগন্ধির মতো, দূর থেকেই উপলব্ধি করা যায়
সবসময়, সবসময় বিকেল দূরে চলে যায়
যেখানে গোধূলি চলে মূর্তি মুছে ঈষৎ ঈষৎ
দিন গত হলে সবারই সন্ধ্যা এক;
তারারন্ধ্রে খুব ঘষে আসে তাবৎ ভাষাবিদের মুনশিয়ানা
এমন দিনে যখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়
তোমাকে জ্যান্ত শঙ্খের কথা বলতে
টেবিলের উপর রেখেছি রূপজলশাঁস, বা তাস এবং হৃদয়
বিকেল ধূপ খেলে যায় এজল আর সেজল
এবং আমি সন্ধ্যার উপর বাজি ধরে বলতে পারি
আমার সময় এবং আমার অনিশ্চয়তার
কোনো নাম নেই, কোনো দিকনির্দেশনা বা অর্থ নেই ভালবাসা ছাড়া
আশা আর ফুঁ আছে, দুধ আর বাটি নেই
শুধুমাত্র এড্রিনাল সঙ্গীতের মতো জবজবে
খনির অন্ধকারের কালিতে ঘরের ঘনত্ব
মাটির নীরবতা, বাতাসের পানি এবং আকাশের বজ্রপাত
মুহুর্মুহু জন্মমৃত্যু জন্মমৃত্যু পালাগান গায়
কিসের দমফাটা আকুতি যেন ঘনিয়ে আসে শিরাস্নায়ু কাঁপিয়ে
কি যেন একটা অধরা রয়ে যায়-
সারা জীবনের কোলাহল, মহুলের সরগরম
এমন দিনে যখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়
জানি অন্য পথে হাটলেই আনন্দ হয়তো পাওয়া যাবে
কিন্তু প্রেম আর পাওয়া যাবে না, পার আছে ওপারের মধ্যে
কোরকের বৃন্ত যদি কেটে যায়
ডাঁটে ফোটে কুহকাবলী...
পৃথিবীর যাবতীয় মাস্তানি সব তখন অন্য পথের পানসি,
এ পথে দিক থেকে দিকান্তর কুবলয়, মায়া, সন্তাপ এবং সন্ততি
চিরায়তের গন্ধে পূতি হয়ে ওঠে গর্ভবান
এবং কমল হেঁটে যান কিছু হৃদি...
শ্লোক নামে বরণীয় হও হে সখী,
ইন্দ্রিয়েরা গল্পধাবমান আসঙ্গ তৃষ্ণায়...
প্রখর প্রখর নাব্যে জলাঞ্জলি ঘটে যায়|
দিবা কিবা শর্বরী
কিছু বর্গ ছিঁড়বে ভেবে টলন্ত রাস্তা ভেঙে যদি ভিনু হয়ে আসে দুই পা, পিয়া পরছাই...
বিগত কৌতুকে লস্করী হয়ে আসে পুরানো গলিমহল্লা...
এবং দিকাদিক তোমার বুকের ডালিমের কেয়া গন্ধ ওঠে,
সবুজের নাম নিয়ে জলঘেঁষা কিছু
ভেপসে ওঠা রঙ্গ রঙ্গ ধুলোর পাশে...
কবুতর মগজের ইজারা বুঝে থিরিথিরি কাঁপে...
যতেক গুমের সময় হল বুঝি বা এবার হে, লিলিথ লিলিথ!
শীতনিশার নিশুতিতে লাভা বল্কে দুনিয়া দোলা
আর, আর নীরবের প্রতি অনন্ত গুটরগু...
মাটির হিয়ান্ত জুড়ে দেবী ˆতরি হতে থাকে রোজ ত্রিপলজীবন-
মৃত্যু, কবিতা এবং ভালোবাসা
আর এ শহরের বুকে হান্স জেগে ওঠে কেউ,
আগলে কাদাটে দুর্গ ভারী...!
কাদা এন্তার ভাগাভাগি হয়ে যায়|
কে ভাঙবে আগে, হাঁটু ভেঙে
দেবী নাকি কাদার প্রাকার...
শহর ভাঙুক ভেবে কাদাটে নাবিক ঝগড়ালো হয়
মৃন্ময়লোভী দু’এক নিমেষের ঘাটে...
বিসর্জন বড়ো অবয়বী|
চাঁদের জন্ম ছিঁড়ে কন্ঠী নিল হাড়ে, জলজ শিশু দুটি চোখ
আমি কবিতা লিখি না, কবিতা আমাকে লিখছে
মায়ার নগরে প্রতিরাতে ক্রংকিটের দালান উঠে
রডের ভিতর মানুষ লিখে রাখে বাঁচার হায়ারোগ্লিফিক
মখমল চাদরে মুখ দিয়ে দেখি ছায়াধরা ফাঁদ
লিগামেন্ট টান টান, দোফালি টেটায় সময় বিষাদ
মরনের পিক্সেল ঘন হয়ে আসে
ওই| পেথোড্রিন হয়ে শিরায়-প্লাজমায়
বিষ বিষাদ হল চারপাই
ঘুণ কেড়ে খাবে ঘুম তার দাঁড়ে
এলিয়ে এলো এলাচ, কুসুম, ঠোঁটের দেয়ালে লালা|
বোধন এভাগে, প্রাচী ন হন্যতেরা
নিশ্চুপ দেখে প্রাগজ্যোতিষে ফড়িঙের কাঁপে আলো
নিভে গেল দপ; যেই লাল গড়ালো মাটি
অকস্মাৎ বেহুলা জন্মান্তরে আংরেজী নদী নিল ঘাড়ে|
নদী, প্রকৃতই বেগবান, মৃত্যুপূর্বী সমস্ত ফেননিভে
যেকোনো ঘটে যাওয়া শেষে কায়েমি খুচরো নেড়েচেড়ে বোদা হয়ে আসে ঈষৎ—এর সংলাপ, বুঝে দারোয়ানি খিল এঁটে যান দুপুররাতের চাপান উতোর| তবু চাঁপাকলি অঙ্গুরীয় সাঁতরায় আললাট ভিড়শ্মশান যার প্রত্যন্তে বাঁশপাতি ফলায় শুয়ে আছে অঙ্গরাখ| আকাচা বাঁশমুখে নয়াচর ঠেলে তীব্র ঠোঁটে এগিয়ে যাচ্ছে শাখারঙ ডানার পাখি| প্রস্তাব, প্রকৃত অপ্রাকৃত সমস্ত ইস্তাহারের মতো এ-ফোর কাগজে ত্রিধা হয়ে উড়ে যায়| সুতো খুঁজে নিয়ে আঙুলের মধ্যেকার ঘুড়ি ভেবে যেটুকু হামেহাল উড়ায় অঘোরী বালক সেটুকুই তার অন্তর্জলি ফোটন| মৃত্যু ঘটুক না ঘটুক অত:পর চোখ বুজিয়ে যাবেই যে কারো তুলসীঘ্রাণে
সখী হে, বিশুদ্ধ ˆধবতে কেঁপে মরে বাঁশির পরান
কিছু বা কলাকুশল জানে এই রাত, জলের জাহাজ
পাতার ভেতর উল্টানো ঢেউ মুড়ে গুটিয়ে আসা সঙ্গীহারা জোনাক
নিজের মাংসের উপর দাঁত, চোখের ভেতর করাত
আগুনের অনুভব সারারাত, সারা রাত
নফসের ডানা মোমের বলে অপূর্ব আগুন, গলে গলে সমুদ্রবাস
দাবানলে মুগ্ধ হয় কেউ কেউ, যখন তা কোয়াসার মিছিল
ধরনটা গাথা কাথা, অ গুলো আত্মার নিউরোট্রান্সমিটার
মোমের ডানা তো, আদিত্য তাপ সইছে না,
তাই এই গুড়া গুড়া গলন, আছর থেকে আছার
আমার নীরবতা শুনো এবং তার আকুলতা উপশম করো খোয়াজ খিজির
সাকিন কৃষ্ণ-রূপ, ধলেশ্বরীর গ্রাম, মেঘের মন্দির|
রোহিণীকালে কিছু কল্পতারা ছিঁড়ে লালে লাল ফুল জারায়ুজ
মেহফিলে গ্রহান্তর কিছু কানাত নেমে এসেছিল মর্মমন্দিরে,
বাকি জাজিম তার নিজ গ্রীবাগরবিণী,
আর যা সমস্ত হয়, বিপরীত প্রিজমে লবণনন্দিনী
নক্ষত্র আধো ভেঙে অর্ধস্ফুট অর্ধপ্রণবম
অল্প ফুঁড়ে অস্তিত্বে অর্ধরমণ সেরে আধেক রমণী বসে আছে...
ভরা সে বিকট সংসারে হবু পৃথুল পৃথুলিনীর
অচ্যুতম রে মোহনিয়া, আবে হায়াত
নিক্কণে শিশু তুমি অলকায় সুরসুন্দর অলকে-চিকুরে নিভাঁজ আমিই;
রোজ নেমে এসো তুলোটে ধুলোটে, কেমন?
গাছে গাছে সিপাহি বুলবুল আর শীষ দেয়া তিতির
সেইক্ষণ পারে অনন্ত প্রেমে থাকলাম আমি অনন্ত রভসে,
এ জনমের মতো তোমাকে পেড়ে না ফেলে শান্তি নেই আমার
রাইমরমে রাইঔরসে কেশব মোর অভিসার|
ছায়া নীরব হয়ে গেলে নীরবতা অনন্ত হয়ে যায়
জলের তীরতূর্ণী থেকে রিদম তুলে নিয়ে বিলকুল জ্বর গুণে পিছলবর্গের গাঁথাকাব্য
মনে রাখার অনুশীলন খুব খারাপ অনুশীলন আর ভুলে যাওয়া মানে মারা যাওয়া
চারপাতার ওষ্ঠে যখন একখানি চুপ
শূণ্য ছুঁড়ে দিলে গোলাকার উত্তরে আসে চৌখুপি
ভালোবাসা মূলত: সাহস নিজেকে হারাবার|
ত্রস্তে ত্যক্তে নগ্ন কাটাকুটি শরীর খেঁকুড়ে
অর্ধদাগ শুয়ে আছে পিকাসোর বারদুয়ার
তবু তোমার আসমানি বারুদ উবু হলে, আমি উবুতর|
প্রল¤ি^ত প্রতীক্ষায় কুবোপাখির গলায় ডুবো কেন ডাকে?
যেকোনো সন্ধ্যা চাই না, তোমার সন্ধ্যা চাই শুধু
যুগল-ভজনে কৃষ্ণ-¯^রূপ আর রাই-¯^রূপিনী একাকীকরণে মহোল্লাসময়
ভালোবাসা ছাড়া আর কে থাকে সারা রাত তোমার প্রার্থণায়?
দ্য এক্লিপস অফ বিউটি- দীর্ঘ এবং বিষন্ন রাতেরও ভোর আছে ডিটক্স
স্তব্ধতায় থেমে থাকে পা, পরানের শিকলে হা হা, কি বলো শুন্যতা?
হুহুরা এখানে হাহাকার করছে ঠোঁটে ঠোঁটে কাঁদবে বলে
যে আবেগ বর্তমান এড়িয়ে চলে তা ধীরে ধীরে মারা যায়
হারাশশী বেচে ফেলনা লোহাভাঙ্গা দরে
দিনের কুসুমে আলোর রক্তগুলি জলের জঙ্গল
বিকেল মরে লাল আঙুলে, ও ডালিম ফুল
ভিজতে আকুল ঠোঁট,
‘তোমার জন্য জানালা কবুল রেখে ডাকছি, এসো...” [কবিতার বই: কালাচাঁন]
বিশ্লেষণ:
এই কবিতার শুরুতেই “হু গাছ — একান্তে নিজের সিন্ধু” এক ধরনের আত্ম-নিবিষ্ট অস্তিত্বের ইশারা দেয়| এখানে “গাছ” শুধু প্রকৃতির বস্তু নয়, বরং একাকী সত্তা—যার শিকড় নিজের ভেতরে, আর সিন্ধু মানে অসীম গভীরতা| অর্থাৎ, কবিতার সূচনায়ই আমরা বুঝতে পারি—এটি বাইরের জগতের নয়, ভেতরের এক বিশাল মানস-ভূগোলের ভ্রমণ।
এরপর যে ইংরেজি উক্তিটি আসে—জীবনের ঢেউ, ডোবা না ভেসে থাকা—এটি মূলত নিয়তি বনাম সিদ্ধান্তের দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। কিন্তু কবি এটাকে সরল মোটিভেশনাল বাক্য হিসেবে রাখেন না; বরং এর পরের অংশে সেই ধারণাটাকেই ভেঙে দেন| কারণ, “জানে ও জাহানে সকালবেলা, দুপুরবেলা...” —এই সময়ের পুনরাবৃত্তি জীবনের ধারাবাহিকতা নয়, বরং একঘেয়ে চক্রবৎ অস্তিত্বকে নির্দেশ করে|
“আঙুলের কথা নরমে গভীরে বেলান্তর”—এখানে স্পর্শ হয়ে ওঠে ভাষা| শরীরের অভিজ্ঞতা ভাষার জায়গা নিচ্ছে| অর্থাৎ, ভাষা আর কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ নয়; তা হয়ে উঠছে অনুভবের এক দেহী রূপ| “হাওয়া, যাওয়া অলিন্দ-নিলয়ে পাতা শয্যায়”—এই লাইনগুলোতে চলাচল, আশ্রয়, আর শরীরের বিশ্রাম—সব একাকার হয়ে যায়| যেন ভেতরের ঘর আর বাইরের প্রকৃতি আলাদা নেই|
“রবি শস্যের উৎসবে যেন খিলখিল শরীর”—এখানে সূর্য, ফসল, শরীর—সব মিলিয়ে এক উর্বরতার চিত্র ˆতরি হয়| কিন্তু এই উর্বরতা শুধু কৃষিজ নয়, কামনা ও জীবনেরও| “বেদানা বেদানা নৃত্য”—দানা দানা বেদানা মানে ছড়িয়ে থাকা রক্তবিন্দু, আবার বীজও—যা জন্মের সম্ভাবনা বহন করে| এখানে জীবন ও রক্ত, উল্লাস ও সহিংসতা—একই চিত্রে মিশে গেছে।
এই পুরো অংশটায় একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কবি বাস্তবতা ও ইন্দ্রিয়ের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা রাখছেন না| সময়, শরীর, প্রকৃতি—সব এক ধরনের প্রবাহমান সত্তায় পরিণত হচ্ছে| ফলে, পাঠকও স্থির কোনো অর্থে দাঁড়াতে পারে না; তাকে এই প্রবাহের ভেতর দিয়েই অর্থ অনুভব করতে হয়|
এই প্রথম ভাগে তাই আমরা দেখি—এখানে একদিকে আত্ম-নিবিষ্টতা, অন্যদিকে ইন্দ্রিয়-উল্লাস; একদিকে অস্তিত্বের গভীরতা, অন্যদিকে তার ছড়িয়ে পড়া| কিন্তু এই ভারসাম্য বেশিক্ষণ থাকে না—এর ভেতরেই একটা অস্থিরতা জমতে থাকে, যা পরের অংশে বিস্ফোরিত হবে|
দ্বিতীয় অংশ-
“তাপ্পর খুলে নিলে চোখের রেটিনা”—এই লাইন থেকেই হঠাৎ এক সহিংস অন্তর্দৃষ্টি শুরু হয়| যেন দেখা আর দেখা-যাওয়ার মাঝখানের আবরণ খুলে গেলে যা থাকে তা আর ¯^স্তিদায়ক নয়| “অন্ধ তোমার ঠোঁট খুঁজে”—দৃষ্টি হারিয়ে গিয়ে স্পর্শই হয়ে ওঠে শেষ আশ্রয়| এখানে ইন্দ্রিয়গুলো একে অপরের জায়গা নিচ্ছে—দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ঠোঁট খুঁজছে; অর্থাৎ প্রেমও এখানে নিশ্চিত নয়, অন্ধ অনুসন্ধান|
“শ্বাস কাটে পাঁকের আওয়াজ”—শ্বাস, যা জীবনচিহ্ন, সেটাও এখানে কাদা-মাটির মতো ভারী ও আটকে থাকা| “রব রব ˆসন্যদল”—এই শব্দচিত্রে ভেতরের অস্থিরতা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো| শরীর আর মন—দুটোই যুদ্ধের জায়গা হয়ে উঠছে| “কালাম বুকের হাপরে”—বুক যেন এক কামারশালা, যেখানে শব্দ, শ্বাস, অস্তিত্ব—সবই গরম লোহা হয়ে পেটানো হচ্ছে|
“তবু তছনছ শস্যের মাঠ”—আগের অংশের উর্বরতা এখানে ধ্বংসে রূপ নিচ্ছে| শস্যক্ষেত্র, যা জীবন ও উৎপাদনের প্রতীক ছিল, এখন ছিন্নভিন্ন| এই পরিবর্তনটা গুরুত্বপূর্ণ—কবি দেখাচ্ছেন, উর্বরতার ভেতরেই ধ্বংসের বীজ থাকে|
“পক্ষাঘাতে চুপ স্নায়ুছেড়া দু’কূল”—এখানে শরীর ভেঙে পড়ছে| শুধু মানসিক নয়, স্নায়বিক স্তরেও এক ধরনের ভাঙন| “রক্তের নক্ষত্রবেগ”—রক্ত আর মহাকাশের গতি এক হয়ে যায়—অর্থাৎ শরীরের ভেতরেও এক মহাজাগতিক অস্থিরতা চলছে|
তারপর আসে এক চমৎকার প্রশ্ন—“ভালোবাসা নাকি এনেস্থিসিয়া?”| এখানে প্রেমকে আর পবিত্র বা মুক্তিদায়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং তা কি কেবল অসাড় করে দেওয়ার এক প্রক্রিয়া? অর্থাৎ, ভালোবাসা কি সত্যিই অনুভব বাড়ায়, নাকি যন্ত্রণা ঢেকে রাখে?
“তন্দ্রা আঙুলে চন্দ্রাবলী, বুড়ি বলে রূপকথা”—এখানে বাস্তব ও কল্পনা একাকার| তন্দ্রা, চাঁদ, রূপকথা—সব মিলিয়ে এক হ্যালুসিনেশন ˆতরি হচ্ছে| কিন্তু এই ¯^প্নময়তার মাঝেও “দিন রাত বাতাসে রক্তপাত”—অর্থাৎ সহিংসতা থামে না|
“চাঁদ না চাকু?”—এই দ্বিধা খুব গুরুত্বপূর্ণ| চাঁদ সাধারণত সৌন্দর্যের প্রতীক, কিন্তু এখানে তা চাকু হয়ে উঠতে পারে| অর্থাৎ, সৌন্দর্যও ক্ষত ˆতরি করতে পারে| এই কবিতায় কোনো প্রতীকই স্থির নয়—সবই দ্ব্যর্থক|
শেষে—“প্রতি শ্বাসে যে থাকে তাকে কি বলবো স্পন্দনের কথা?”—এখানে এক গভীর অস্তিত্ব সংকট| যে সত্তা প্রতিটি শ্বাসে উপস্থিত, তাকে কী নামে ডাকা যায়? প্রেম? জীবন? ঈশ্বর? না কি নিছক বেঁচে থাকা? এই প্রশ্নের উত্তর নেই—আর এই অনির্ধারিত অবস্থাই কবিতার শক্তি|
এই অংশে মূলত আমরা দেখি—প্রথম ভাগের উর্বরতা ও ইন্দ্রিয়-উল্লাস ভেঙে গিয়ে এক সহিংস, অস্থির, স্নায়বিক জগৎ ˆতরি হয়েছে| ভালোবাসা, শরীর, অনুভব—সবকিছুই সন্দেহের মুখে|
তৃতীয় ভাগে ঢুকি—
“পৃথিবীর এখনতম মস্তিষ্ক তাপ্পর ধূ ধূ একা হয়ে যাচ্ছে”—এখানে কবি যেন সমগ্র মানবচেতনার এক শূন্যতার দিকে ইঙ্গিত করছেন| “এখনতম মস্তিষ্ক” মানে কেবল ব্যক্তিগত নয়, সমকালীন চেতনা—যা ক্রমশ জনশূন্য হয়ে পড়ছে| “ধূ ধূ একা”—এই শব্দবন্ধে মরুভূমির মতো এক মানসিক বিস্তার, যেখানে কোনো আশ্রয় নেই|
“লোকহীন গম গম করছে ¯^রদালান”—এখানে এক চমৎকার বিপরীততা| লোক নেই, তবু শব্দের প্রতিধ্বনি আছে| অর্থাৎ, ভাষা আছে কিন্তু বক্তা নেই; উচ্চারণ আছে, কিন্তু অর্থের কেন্দ্র হারিয়ে গেছে| ভাষা নিজেই নিজের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে|
“র গড়তে গেলে রগড় ঘটে যাচ্ছে”—এই খেলাটা ভাষার স্তরে| শব্দ গড়ার চেষ্টাতেই বিকৃতি ˆতরি হচ্ছে| যেন ভাষা আর ¯^চ্ছ মাধ্যম নয়; বরং তা নিজেই প্রতিবন্ধক| “লীলাঠাকুরণ আমা হতে গলিয়ে ফেলছেন আকার”—এখানে একধরনের দেহ-ভাষার ভাঙন—আকার, পরিচয়, সত্তা—সব গলে যাচ্ছে|
“চাঁদহারানোর আরবার”—চাঁদ, যা বারবার এসেছে সৌন্দর্য বা কামনার প্রতীক হিসেবে, এখন হারানোর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে| পুনরাবৃত্তি আছে, কিন্তু প্রত্যাবর্তন নেই—শুধু ক্ষয়|
“¯^রে আহ নিয়ে গলা বাড়িয়ে ধরে না কোনো উত্তরের অধিকার”—এখানে ভাষা আর মুক্তির পথ নয়| আর্তনাদ আছে, কিন্তু কোনো উত্তর নেই| প্রশ্ন করার অধিকারটুকুও যেন হারিয়ে গেছে|
“সেই থেকে সেই”—এই পুনরুক্তি সময়কে ভেঙে দেয়| অতীত-বর্তমান আলাদা নয়; এক অবিরাম স্থবিরতা| যেন কিছুই বদলায় না, অথচ সবকিছু ভেঙে পড়ছে|
“না-বালিকার কোঁচড়ময় ফুটে উঠছে অজস্র বাবা আদমের গাছবিচার”—এই অংশে জন্ম ও উৎপত্তির এক জটিল চিত্র আসে| “না-বালিকা”—অপরিণত, অথচ তার কোঁচড় থেকে জন্ম নিচ্ছে “বাবা আদমের গাছবিচার”—অর্থাৎ আদিম মানব, উৎপত্তি, বংশবিস্তার—সব এক অদ্ভুত, প্রায় গ্রোটেস্ক রূপে|
“খই খই রবে”—এটা বিস্ফোরণের শব্দও হতে পারে, আবার উৎসবেরও| জন্ম এখানে উৎসব না সহিংসতা—এই দ্বিধা থেকেই যায়|
এই তৃতীয় অংশে মূলত ভাষা, সত্তা ও উৎপত্তি—এই তিনটি স্তম্ভ ভেঙে পড়ছে| ভাষা আর অর্থ বহন করতে পারছে না, সত্তা গলে যাচ্ছে, আর জন্ম নিজেই হয়ে উঠছে এক অস্থির, অনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া|
প্রথম ভাগে ছিল উর্বরতা, দ্বিতীয়তে ধ্বংস, আর এখানে এসে—অর্থের পতন| এই পতনই পরের অংশে আরও দেহী ও কামনাময় রূপ নেবে, কিন্তু সেই কামনাও আর স্থির থাকবে না|
চতুর্থ ভাগে আসি—
“সূচিমুখে সুতার আঁটসাঁট টিকে না”—এই লাইনেই এক ধরনের সংযোগ-অক্ষমতার কথা উঠে আসে| সূচ আর সুতা—যা জোড়া লাগানোর প্রতীক—সেটাই এখানে কাজ করছে না| অর্থাৎ, ভাঙা জিনিস আর জোড়া লাগছে না; সম্পর্ক, ভাষা, শরীর—সব বিচ্ছিন্ন|
“বাতাসের রক্তপাত বোবা”—এখানে সহিংসতা আছে, কিন্তু তা উচ্চারণহীন| যেন চারপাশে ক্ষয়, আঘাত, রক্তপাত—সবই ঘটছে, কিন্তু তার কোনো ভাষা নেই| “ফুটফুটে ফুলন্ত পলাশ”—এই সৌন্দর্যও তাই নির্দোষ নয়; পলাশের লাল রঙ আবার রক্তেরই প্রতিধ্বনি|
“মদিরার পেয়ালায় যে জোছনা বিভ্রম”—এখানে চাঁদের আলোও আর ¯^চ্ছ নয়, তা নেশার মতো| বাস্তব আর বিভ্রম এক হয়ে যাচ্ছে| “লতার শাড়ি খুলে দেখেছি গো লীলাবতি”—এই লাইনগুলোতে কামনা সরাসরি শরীরী হয়ে ওঠে, কিন্তু সেটাও স্থিত নয়—এ যেন উন্মোচনের মধ্যেই এক ধরনের অস্থিরতা|
“পটে আঁকা মিথোজীবি জীবন”—এখানে সম্পর্ক বা সহাবস্থানও কৃত্রিম হয়ে ওঠে, যেন আঁকা ছবি—বাস্তব নয়, এক নির্মিত বাস্তবতা|
“তোমার গন্ধ কবিতার মতো যেন এক ছাতিম শরীর”—এখানে আবার ইন্দ্রিয়ের মিশ্রণ—গন্ধ হয়ে উঠছে কবিতা, শরীর হয়ে উঠছে গাছ| অর্থাৎ, সত্তাগুলো পরস্পরের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে—কোনোটাই আলাদা নয়|
তারপর ভাষা হঠাৎ বদলে যায়—“ডিয়ার বউন-ক্রাশার কুইন”—এখানে আধুনিক, প্রায় পপ-সংস্কৃতির টোন ঢুকে পড়ে| উচ্চকবিতার ভেতর এই ভাঙন খুব গুরুত্বপূর্ণ—কবি ইচ্ছাকৃতভাবে রেজিস্টার বদলাচ্ছেন, যাতে কোনো একক ভাষা আধিপত্য করতে না পারে|
“ঘুঘুঠোঁটে সিংহ রে তুমি বাবু বলে ডেকো”—এখানে স্নেহ, কামনা, হিংস্রতা—সব একসাথে| ঘুঘু (নরম), সিংহ (হিংস্র)—এই ˆদ্বততা কবিতার ভিতরকার টানাপোড়েনকে তীব্র করে|
“শঙ্খপুষ্পী হে আমি হইবো তোমার আদরের শিশু”—এখানে আবার আত্মসমর্পণ, শিশুত্ব, নির্ভরতা—কিন্তু তা নিখাদ নয়; কারণ তার পরেই আসে—“আমার রক্তেই তোমার আলতা হোক বায়োমেট্রিক”—এখানে প্রেম সরাসরি রক্ত, শরীর, প্রযুক্তি—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়| “বায়োমেট্রিক” শব্দটি কবিতাকে হঠাৎ সমকালীন, এমনকি ডিজিটাল বাস্তবতায় টেনে আনে|
শেষে—“ভালবাসায় যদি সব কিছুর মতো শব্দ হয় নাড়ী থেকে নারী”—এখানে ভাষার উৎপত্তি শরীরের ভেতর থেকে| “নাড়ী” থেকে “নারী”—এই ধ্বনিগত রূপান্তর দেখায়, শব্দ আর শরীর আলাদা নয়; ভাষা নিজেই দেহের সম্প্রসারণ|
“তোমার শরীরে আছে লীনতাপের গোপন ভাষা”—এই লাইনে এসে প্রেম আর ভাষা এক গোপন, অভ্যন্তরীণ তাপে পরিণত হয়—যা বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়|
এই অংশে কবিতা এক জটিল জায়গায় দাঁড়ায়—কামনা, ভাষা, প্রযুক্তি, শরীর—সব একসাথে জড়িয়ে যায়| কিন্তু এই জড়িয়ে পড়া কোনো ঐক্য ˆতরি করে না; বরং আরও অস্থির, আরও ভাঙাচোরা এক অভিজ্ঞতা ˆতরি করে|
পঞ্চম ভাগে ঢুকি—
“আলোর উজাড় ঠেলে মাঠঘাটবনে কঁকিয়ে উঠছে লণ্ঠনের প্রভূতবর্ণেরা”—এখানে আলো আর অন্ধকারের সম্পর্কটা উল্টে যায়| আলো আর ¯^চ্ছতার প্রতীক নয়; বরং তা “উজাড় ঠেলে” আসে—এক ধরনের আক্রমণ| আর লণ্ঠন, যা সাধারণত আলোর ক্ষুদ্র উৎস, সেটাই “কঁকিয়ে ওঠে”—অর্থাৎ আলোও এখানে যন্ত্রণার ভাষা বহন করছে|
“তুমি কি অনুভব কর তা বল”—এই আহ্বানটা সরাসরি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তা জটিল হয়ে যায়—“নড়ন ও চড়ন- নাজুক ও নাজাকত”—এখানে শরীরের ক্ষুদ্রতম আন্দোলনও অর্থবহ| কিন্তু সেই অর্থ উচ্চারণযোগ্য কি না, সেটাই প্রশ্ন|
“না হয় এই নীরবতা তোমার সারা জীবন কোলাহল করবে”—এখানে এক বিপরীততা—নীরবতাই কোলাহল হয়ে ওঠে| অর্থাৎ, না-বলা কথাগুলোই সবচেয়ে জোরে বাজে|
তারপর বারবার ফিরে আসে—“এমন দিনে যখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়”—এই পুনরাবৃত্তি কবিতার ভেতরে এক মানসিক আবহ ˆতরি করে| এলোমেলো হওয়া এখানে কেবল বাহ্যিক নয়—“চুলগুলো| বিছানা| শব্দগুলো| হৃদয়| পিরান এবং জীবন”—অর্থাৎ ব্যক্তিগত, ভাষিক, মানসিক—সব স্তরে বিশৃঙ্খলা|
“আশা আর ফুঁ আছে, দুধ আর বাটি নেই”—এই লাইনটি গভীর সংকেত দেয়| সম্ভাবনা আছে (“ফুঁ”), আকাঙ্ক্ষা আছে (“আশা”), কিন্তু তা ধারণ করার উপায় নেই (“দুধ আর বাটি নেই”)| অর্থাৎ, অস্তিত্বে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা—যেখানে উপাদান আছে, কিন্তু কাঠামো নেই|
“যা মাতাল করে তোলে তা চিন্তা করার মতো মিষ্টি আর কিছু নেই”—এখানে চিন্তাই নেশা| কিন্তু এই নেশা আসে “খোঁজ” থেকে—“মাতলামী আসে মদ থেকে, আর মদ আসে খোঁজ থেকে”—অর্থাৎ অনুসন্ধানই শেষ পর্যন্ত নিজেকে হারানোর দিকে নিয়ে যায়|
“তোমার হৃদয়ের লুকানো মদ আমার মুখে ফেলে দাও”—এই লাইনটি কামনা, প্রেম, আত্মসমর্পণ—সবকিছুকে একসাথে ধরে| কিন্তু এটি একমুখী নয়; এখানে অন্যের ভেতরের অন্ধকারও গ্রহণ করার ইচ্ছা আছে|
“যা চলে যাচ্ছে তাই আমাদের জগৎকারু”—এখানে ক্ষয়ই সৃষ্টির উৎস| যা হারিয়ে যাচ্ছে, সেটাই আমাদের জগত ˆতরি করছে| “গোলাপের সুগন্ধির মতো”—দূর থেকেই অনুভব করা যায়—অর্থাৎ উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিই বেশি তীব্র|
“সবসময় বিকেল দূরে চলে যায়”—বিকেল এখানে এক অন্তর্বর্তী সময়—দিন আর রাতের মাঝখানে| এই চলে যাওয়া মানে স্থিরতা নেই; সবকিছুই সরে যাচ্ছে|
“দিন গত হলে সবারই সন্ধ্যা এক”—এখানে এক সার্বজনীনতা আসে—সব পার্থক্য শেষে মুছে যায়| কিন্তু সেই ঐক্যও শান্ত নয়— “তারারন্ধ্রে খুব ঘষে আসে তাবৎ ভাষাবিদের মুনশিয়ানা”—অর্থাৎ ভাষা আবার ঢুকে পড়ে, ব্যাখ্যার চেষ্টা করে, কিন্তু সেই ব্যাখ্যাও এক ধরনের ঘর্ষণ|
“টেবিলের উপর রেখেছি রূপজলশাঁস, বা তাস এবং হৃদয়”—এখানে জীবন এক খেলার মতো—তাস, বাজি, হৃদয়—সব একসাথে| বাস্তবতা, প্রতীক, খেলা—সব মিলেমিশে যায়|
“আমার সময় এবং আমার অনিশ্চয়তার কোনো নাম নেই”—এই ¯^ীকারোক্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ| পরিচয়, সময়, অনুভব—সবই নামহীন হয়ে যাচ্ছে| শুধু “ভালবাসা” একমাত্র সম্ভাব্য অর্থ হিসেবে থেকে যায়—কিন্তু সেটাও স্থির নয়|
“খনির অন্ধকারের কালিতে ঘরের ঘনত্ব”—এই লাইনটি ভিতরের অন্ধকারকে বাহ্যিক স্থানে টেনে আনে| ঘর, যা নিরাপত্তার প্রতীক, সেটাও খনির মতো অন্ধকারে ভরা|
শেষে—“মুহুর্মুহু জন্মমৃত্যু জন্মমৃত্যু পালাগান গায়”—এখানে জীবন আর মৃত্যু আলাদা নয়; এক ধারাবাহিক পুনরাবৃত্তি| আর “কি যেন একটা অধরা রয়ে যায়”—এই অধরাই কবিতার কেন্দ্র| সবকিছু বলা হচ্ছে, কিন্তু কিছুই সম্পূর্ণ ধরা পড়ছে না|
এই পঞ্চম অংশে বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা, আর অনুপস্থিতির ভেতর দিয়ে কবি এক গভীর অস্তিত্বগত সংকট ˆতরি করেন—যেখানে প্রেম, সময়, ভাষা—সবই ভাঙা, তবু সেই ভাঙনের মধ্যেই অর্থ খোঁজার চেষ্টা চলছে|
ষষ্ঠ ভাগে যাই—
“এমন দিনে যখন সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়”—এই পুনরাবৃত্তি আবার ফিরে আসে, কিন্তু এবার তা আরও গভীর, প্রায় নিয়তিগত| যেন বিশৃঙ্খলাটাই ¯^াভাবিক অবস্থা, আর শৃঙ্খলা কেবল ক্ষণিকের ভ্রম|
“জানি অন্য পথে হাঁটলেই আনন্দ হয়তো পাওয়া যাবে / কিন্তু প্রেম আর পাওয়া যাবে না”—এই ¯^ীকারোক্তি কবিতার এক কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্বকে সামনে আনে| আনন্দ আর প্রেম এক নয়; আনন্দ বিকল্পে পাওয়া যায়, কিন্তু প্রেম একমাত্রিক, অপরিবর্তনীয়| অর্থাৎ, প্রেমের পথ একবার হারালে তা আর ফিরে আসে না|
“পার আছে ওপারের মধ্যে”—এখানে সীমারেখা ভেঙে যায়| এই পার আর ওপার—দুটো আলাদা নয়; একে অপরের মধ্যে নিহিত| বাস্তব-অবাস্তব, জীবন-মৃত্যু—সব সীমা ঝাপসা হয়ে যায়|
“কোরকের বৃন্ত যদি কেটে যায় / ডাঁটে ফোটে কুহকাবলী”—এই চিত্রে জন্মের ¯^াভাবিক প্রক্রিয়া ভেঙে যায়| ফুল ফোটার নিয়ম বদলে যায়—অর্থাৎ প্রকৃতির নিয়মও আর নির্ভরযোগ্য নয়| “কুহকাবলী”— মায়া, বিভ্রম—সেটাই হয়ে ওঠে নতুন বাস্তব|
“পৃথিবীর যাবতীয় মাস্তানি সব তখন অন্য পথের পানসি”—এখানে এক ধরনের তাচ্ছিল্য আছে| দম্ভ, ক্ষমতা, আধিপত্য—সবই অন্য পথের জিনিস; এই পথে তার কোনো মূল্য নেই|
“এ পথে দিক থেকে দিকান্তর কুবলয়, মায়া, সন্তাপ এবং সন্ততি”—এই পথটা এক জটিল চক্র—মায়া, দুঃখ, জন্ম—সব মিলিয়ে এক অবিরাম প্রবাহ| মুক্তি নেই, শুধু ঘূর্ণন|
“চিরায়তের গন্ধে পূতি হয়ে ওঠে গর্ভবান”—এখানে ঐতিহ্য বা চিরায়তও পচে যায়, কিন্তু সেই পচন থেকেই জন্ম হয়| অর্থাৎ, ক্ষয় আর সৃষ্টির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য|
“এবং কমল হেঁটে যান কিছু হৃদি”—এই লাইনটা প্রায় ধাঁধার মতো| “কমল”—নরম, পবিত্র—সে হেঁটে যায় “হৃদি”র ভেতর দিয়ে| যেন হৃদয় নিজেই এক পথ, আর সেই পথে চলাচল করছে অনুভব|
“শ্লোক নামে বরণীয় হও হে সখী”—এখানে ভাষা আবার আচার-অনুষ্ঠানের দিকে যায়| প্রেমিকা যেন এক দেবী, আর তাকে বরণ করার জন্য শ্লোক| কিন্তু এই আচারও স্থির নয়; তা ভেঙে যায় পরের লাইনেই|
“ইন্দ্রিয়েরা গল্পধাবমান আসঙ্গ তৃষ্ণায়”—ইন্দ্রিয়গুলো স্থির নয়; তারা গল্পের মতো ছুটছে| তৃষ্ণা এখানে শুধু শরীরী নয়, অস্তিত্বগত— সবকিছুকে ছুঁতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা|
“প্রখর প্রখর নাব্যে জলাঞ্জলি ঘটে যায়”—এখানে এক বিসর্জনের অনুভব| প্রবল স্রোতে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে—ধরে রাখার কিছু নেই|
“দিবা কিবা শর্বরী”—দিন-রাতের ভেদ মুছে যায়| সময় আর বিভাজিত নয়; এক অবিরাম প্রবাহ|
“টলন্ত রাস্তা ভেঙে যদি ভিনু হয়ে আসে দুই পা”—এখানে চলার পথই অনিশ্চিত| রাস্তা স্থির নয়, ভেঙে যাচ্ছে| তবু সেই ভাঙনের মধ্যেই আসতে পারে “পিয়া পরছাই”—প্রেমের ছায়া|
এই ষষ্ঠ অংশে কবিতা এক গভীর দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যায়—যেখানে প্রেম, পথ, সময়, জন্ম—সবই অনিশ্চিত, তবু সবকিছু একে অপরের ভেতর মিশে আছে| এখানে কোনো স্থির সত্য নেই; আছে শুধু প্রবাহ, ভাঙন, আর সেই ভাঙনের ভেতর দিয়ে চলার চেষ্টা|
সপ্তম ভাগে যাই—
“বিগত কৌতুকে লস্করী হয়ে আসে পুরানো গলিমহল্লা”—এখানে স্মৃতি হঠাৎ ব্যক্তিগত থাকে না, বরং “লস্করী”—এক সামরিক, আক্রমণাত্মক রূপ নেয়| অতীত আর কোমল নস্টালজিয়া নয়; তা দলে দলে ফিরে এসে বর্তমানকে দখল করে নেয়|
“দিকাদিক তোমার বুকের ডালিমের কেয়া গন্ধ ওঠে”—এখানে শরীর আবার ফিরে আসে, কিন্তু তা আর সরল কামনা নয়; “ডালিম” আবার রক্ত, বীজ, উর্বরতা—সবকিছুর মিলিত প্রতীক| “কেয়া গন্ধ”— একধরনের তীব্রতা, যা মুগ্ধও করে, আবার ভারীও লাগে|
“সবুজের নাম নিয়ে জলঘেঁষা কিছু / ভেপসে ওঠা রঙ্গ রঙ্গ ধুলোর পাশে”—এই লাইনগুলোতে প্রকৃতি আর শহুরে ক্ষয়ের মিশ্রণ| সবুজের দাবি আছে, কিন্তু বাস্তবে তা ধুলোর ভেতর ভেপসে ওঠা—অর্থাৎ জীবন আর নিস্তেজতার মাঝামাঝি এক অবস্থা|
“কবুতর মগজের ইজারা বুঝে থিরিথিরি কাঁপে”—এখানে মগজ যেন ভাড়ায় দেওয়া, নিজের নয়| চিন্তা নিজ¯^ নয়; নিয়ন্ত্রিত, দখলীকৃত| “থিরিথিরি কাঁপে”—এই কাঁপন এক ধরনের অনিশ্চয়তা, ভয়, বা অস্থিরতা|
“যতেক গুমের সময় হল বুঝি বা এবার হে”—এখানে “গুম” শব্দটি দ্ব্যর্থক—ঘুমও হতে পারে, আবার অদৃশ্য হয়ে যাওয়াও| সময় এসেছে—কিসের? বিলুপ্তির, না কি বিশ্রামের?
“লিলিথ লিলিথ!”—এই আহ্বান খুব গুরুত্বপূর্ণ| লিলিথ—এক প্রাচীন, বিদ্রোহী নারী-প্রতীক| তাকে ডাকা মানে প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এক আহ্বান| কামনা, বিদ্রোহ, ¯^াধীনতা—সব মিলিয়ে এক শক্তি|
“শীতনিশার নিশুতিতে লাভা বল্কে দুনিয়া দোলা”—এখানে চূড়ান্ত ˆবপরীত্য—শীতের রাত, অথচ লাভা ফুটছে| ঠান্ডা আর উত্তাপ একসাথে| এই ˆদ্বততা পুরো কবিতারই মূল সুর—কোনো অনুভব একরৈখিক নয়|
“আর, আর নীরবের প্রতি অনন্ত গুটরগু”—এই শেষ লাইনে এসে শব্দ আর নীরবতার অদ্ভুত সম্পর্ক ˆতরি হয়| “গুটরগু”—পাখির ডাক, প্রেমের ইঙ্গিত—কিন্তু তা “নীরবের প্রতি”—অর্থাৎ যে নীরব, তার দিকেই এই ডাক|
এই অংশে স্মৃতি, শরীর, শহর, আর বিদ্রোহ—সব একসাথে মিশে যায়| অতীত আক্রমণাত্মক, বর্তমান অনিশ্চিত, আর ভেতরে জমে ওঠে এক আগ্নেয় শক্তি—যা কখনো বিস্ফোরিত হয়, কখনো নীরব থাকে|
এখানে কবিতা যেন নিজের ভেতরের অন্ধকার আর বাহ্যিক বাস্তব—দুটোকেই একসাথে ধরে রাখতে চাইছে, কিন্তু কোনো একটাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না|
অষ্টম ভাগে যাই—
“মাটির হিয়ান্ত জুড়ে দেবী ˆতরি হতে থাকে রোজ ত্রিপলজীবন— / মৃত্যু, কবিতা এবং ভালোবাসা”—এখানে কবিতার এক কেন্দ্রীয় ত্রয়ী স্পষ্ট হয়ে ওঠে| মাটি—অর্থাৎ মৌল উপাদান, তার ভেতর থেকেই প্রতিদিন ˆতরি হচ্ছে এক “দেবী”, কিন্তু সে কোনো একক সত্তা নয়; সে গঠিত মৃত্যু, কবিতা আর ভালোবাসার মিলনে| অর্থাৎ সৃষ্টি নিজেই এই তিনের সমবায়ে—ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টি নেই, ভাষা ছাড়া অনুভব নেই, আর ভালোবাসা ছাড়া কোনো অর্থ নেই|
“এ শহরের বুকে হান্স জেগে ওঠে কেউ”—এই “হান্স” শব্দটা অদ্ভুত, প্রায় বিচ্ছিন্ন| যেন শহরের ভেতরে হঠাৎ কোনো বিদেশি বা অপরিচিত চেতনা জেগে ওঠে| শহর আর নিজের থাকে না; তা অন্য কারও দ্বারা অধিষ্ঠিত|
“আগলে কাদাটে দুর্গ ভারী...! / কাদা এন্তার ভাগাভাগি হয়ে যায়”—এখানে সভ্যতা এক কাদার দুর্গ—অস্থায়ী, ভঙ্গুর| আর সেই কাদা ভাগ হয়ে যাচ্ছে—অর্থাৎ মালিকানা, দখল, বিভাজন—সবই কৃত্রিম|
“কে ভাঙবে আগে, হাঁটু ভেঙে / দেবী নাকি কাদার প্রাকার”—এই দ্বন্দ্বটা গভীর| সৃষ্টি (দেবী) আর বস্তু (কাদা)—কোনটা আগে ভাঙবে? অর্থাৎ, আদর্শ আগে ভাঙে, না বাস্তব কাঠামো?
“শহর ভাঙুক ভেবে কাদাটে নাবিক ঝগড়ালো হয়”—এখানে এক ধরনের আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা| শহর—সভ্যতা—ভেঙে যাক, এই কামনা| কিন্তু যে ভাঙতে চায়, সে নিজেও কাদাটে—অর্থাৎ সে নিজেও সেই ভাঙনের অংশ|
“মৃন্ময়লোভী দু’এক নিমেষের ঘাটে...”—এই লাইনটা সময়ের ক্ষণস্থায়িত্ব আর বস্তু-লোভের দিকে ইঙ্গিত করে| “মৃন্ময়”—মাটি—যা স্থায়ী নয়, তবু তার প্রতিই আকর্ষণ|
“বিসর্জন বড়ো অবয়বী”—এই লাইনটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ| বিসর্জন এখানে শুধু কোনো আচার নয়; তা এক বিশাল, প্রায় মহাকাব্যিক ঘটনা| অর্থাৎ ত্যাগই সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করে|
এরপর হঠাৎ এক অন্তর্মুখী বাঁক—
“চাঁদের জন্ম ছিঁড়ে কণ্ঠী নিল হাড়ে, জলজ শিশু দুটি চোখ”—এই চিত্র প্রায় অতিলৌকিক| চাঁদ, হাড়, জল—সব মিলে এক জন্ম-দৃশ্য, কিন্তু তা ¯^াভাবিক নয়; বরং বিকৃত, ভাঙা|
“আমি কবিতা লিখি না, কবিতা আমাকে লিখছে”—এখানে সৃষ্টির ধারণা উল্টে যায়| কবি আর নিয়ন্ত্রক নয়; বরং মাধ্যম| ভাষা নিজেই নিজেকে লিখছে কবির শরীর ব্যবহার করে|
“মায়ার নগরে প্রতিরাতে ক্রংকিটের দালান উঠে”—এখানে আধুনিক শহর—কংক্রিট—মায়ার অংশ হয়ে যায়| বাস্তব আর মায়া আলাদা নয়; শহর নিজেই এক বিভ্রম|
“রডের ভিতর মানুষ লিখে রাখে বাঁচার হায়ারোগ্লিফিক”—এই লাইনটি অসাধারণ| কংক্রিটের কাঠামোর ভেতরে মানুষ তার বেঁচে থাকার চিহ্ন রেখে যায়—প্রাচীন হায়ারোগ্লিফিকের মতো| অর্থাৎ, আধুনিকতাও শেষ পর্যন্ত এক প্রাচীন চিহ্ন-লিখনের ধারাবাহিকতা|
“মখমল চাদরে মুখ দিয়ে দেখি ছায়াধরা ফাঁদ”—এখানে আরাম, বিলাস—সবই ফাঁদ| “ছায়াধরা”—অর্থাৎ যা ধরা পড়ে, তা আসলে ছায়া—বাস্তব নয়|
“লিগামেন্ট টান টান, দোফালি টেটায় সময় বিষাদ”—এই লাইনগুলোতে শরীরের টান, সময়ের চাপ, আর বিষাদ—সব একসাথে জড়িত| সময় যেন শরীরকে ছিঁড়ে ফেলছে|
এই অষ্টম অংশে কবিতা এক জটিল মিলনস্থলে পৌঁছায়—সৃষ্টি ও ধ্বংস, শহর ও মায়া, শরীর ও ভাষা—সব একে অপরের মধ্যে ঢুকে যায়| কবি নিজেও আর আলাদা সত্তা নন; তিনি হয়ে ওঠেন এক প্রবাহ—যার ভেতর দিয়ে কবিতা নিজেই নিজেকে রচনা করে|
নবম ভাগে যাই—
“মরনের পিক্সেল ঘন হয়ে আসে”—এই লাইনেই সমকালীনতার এক তীব্র প্রবেশ| মৃত্যু আর বিমূর্ত নয়; তা “পিক্সেল”—ডিজিটাল, দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য| অর্থাৎ, মৃত্যুও এখন স্ক্রিনের মতো, খণ্ডিত অথচ ঘন|
“পেথোড্রিন হয়ে শিরায়-প্লাজমায়”—এখানে শরীর সরাসরি রাসায়নিকের অধীন| অনুভব, যন্ত্রণা, বেঁচে থাকা—সবই যেন ওষুধের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত| মানবিকতা এখানে বায়োকেমিক্যাল প্রতিক্রিয়ায় নেমে আসে|
“বিষ বিষাদ হল চারপাই”—বিষ আর বিষাদ এক হয়ে যায়, আর তা হয়ে ওঠে বিশ্রামের জায়গা—চারপাই| অর্থাৎ, যন্ত্রণাই আশ্রয়|
“ঘুণ কেড়ে খাবে ঘুম তার দাঁড়ে”—এখানে ক্ষয় খুব ধীর, কিন্তু নিশ্চিত| ঘুম—যা বিশ্রাম—সেটাকেও খেয়ে ফেলছে সময়ের ঘুণ|
“এলিয়ে এলো এলাচ, কুসুম, ঠোঁটের দেয়ালে লালা”—এই লাইনগুলোতে আবার শরীরী, প্রায় কামনাময় এক গন্ধময়তা ফিরে আসে| কিন্তু তা আর নির্মল নয়; এক ধরনের অবসন্ন, এলিয়ে পড়া অনুভব।
“বোধন এভাগে, প্রাচী ন হন্যতেরা”—এখানে আচার, ইতিহাস, প্রাচীনতা—সব ভাঙা ভাষায় ফিরে আসে। যেন স্মৃতি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত।
“নিশ্চুপ দেখে প্রাগজ্যোতিষে ফড়িঙের কাঁপে আলো”—এই চিত্রে সময়ের গভীরতা—প্রাগৈতিহাসিকতা—আর ক্ষুদ্রতা—ফড়িং—একসাথে| আলোও স্থির নয়; কাঁপছে|
“নিভে গেল দপ; যেই লাল গড়ালো মাটি”—এখানে জীবন এক মুহূর্তে নিভে যায়| “লাল”—রক্ত, সূর্যাস্ত, জীবন—সব গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।
“অকস্মাৎ বেহুলা জন্মান্তরে আংরেজী নদী নিল ঘাড়ে”—এই লাইনটি সাংস্কৃতিক স্তরগুলোর সংঘর্ষ| বেহুলা—লোককথা, আর “আংরেজী নদী”—ঔপনিবেশিক আধুনিকতা| দুটো একসাথে এসে এক অদ্ভুত, প্রায় ব্যঙ্গাত্মক চিত্র ˆতরি করে।
“নদী, প্রকৃতই বেগবান, মৃত্যুপূর্বী সমস্ত ফেননিভে”—এখানে নদী সময়ের প্রতীক—চলমান, বেগবান| আর মৃত্যুর আগে সব ফেন—সব উত্তেজনা, উচ্ছ্বাস—নিভে যায়।
এরপর আসে এক দীর্ঘ, ঘন অংশ—
“যেকোনো ঘটে যাওয়া শেষে কায়েমি খুচরো নেড়েচেড়ে বোদা হয়ে আসে”—এখানে বড় ঘটনার পর যা থাকে তা তুচ্ছ, খুচরো, প্রায় অর্থহীন| মানুষের প্রতিক্রিয়াও তাই—বোকা, অসহায়।
“দারোয়ানি খিল এঁটে যান দুপুররাতের চাপান উতোর”—এখানে সময় নিজেই বন্ধ হয়ে যায়| দিন-রাত, প্রশ্ন-উত্তর—সব এক বন্ধ দরজার ভেতর আটকে।
“তবু চাঁপাকলি অঙ্গুরীয় সাঁতরায়”—এই অন্ধকারের মধ্যেও কিছু কোমলতা বেঁচে থাকে| কিন্তু তা স্থির নয়; সাঁতরে বেড়ায়—অস্থির, অনিশ্চিত।
“ভিড়শ্মশান যার প্রত্যন্তে বাঁশপাতি ফলায় শুয়ে আছে অঙ্গরাখ”—এখানে জীবন ও মৃত্যু এক জায়গায়। শ্মশান, ভিড়, অঙ্গরাখ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জীবন্ত-মৃত অবস্থা।
“আকাচা বাঁশমুখে নয়াচর ঠেলে”—এই চিত্রে চলাচল আছে, কিন্তু তা অনিশ্চিত, প্রায় বিপজ্জনক।
“শাখারঙ ডানার পাখি”—এই পাখি উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার রং শাখার মতো—অর্থাৎ প্রকৃতি আর উড়ান একাকার।
“প্রস্তাব... এ-ফোর কাগজে ত্রিধা হয়ে উড়ে যায়”—এখানে সব ইস্তাহার, সব ঘোষণা—শেষ পর্যন্ত কাগজে ভেঙে যায়, উড়ে যায়| কোনো স্থায়িত্ব নেই|
“সুতো খুঁজে নিয়ে আঙুলের মধ্যেকার ঘুড়ি”—এখানে আবার ˆশশব, খেলা—কিন্তু তা “অঘোরী বালক”—এক অদ্ভুত, প্রায় তান্ত্রিক সত্তা দ্বারা পরিচালিত| খেলা আর নিষ্পাপ ন। |
“মৃত্যু ঘটুক না ঘটুক... চোখ বুজিয়ে যাবেই”—শেষে এসে এক ¯^ীকারোক্তি—মৃত্যু অনিবার্য কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়; চোখ বন্ধ করাই অনিবার্য| আর সেই বন্ধের মধ্যে “তুলসীঘ্রাণ”—এক আচার, এক শান্তির ইঙ্গিত।
এই নবম অংশে কবিতা প্রায় সর্বোচ্চ ঘনত্বে পৌঁছে যায়—ডিজিটাল মৃত্যু, রাসায়নিক শরীর, লোককথা, আধুনিকতা, শ্মশান, ˆশশব—সব একসাথে| এখানে কোনো কেন্দ্র নেই; সবকিছু ভেঙে গিয়ে এক বহুকেন্দ্রিক, ছড়িয়ে থাকা বাস্তব ˆতরি হয়।
দশম (শেষ) ভাগ—
শেষ ভাগে এসে কবিতাটা আর কোনো একক রেখা ধরে চলে না—বরং এক ধরনের অস্তিত্ব-উন্মোচনের ভেতরে ঢুকে যায়, যেখানে ভাষা নিজেই ভেঙে পড়ে আবার গড়ে ওঠে।
“সখী হে, বিশুদ্ধ ˆধবতে কেঁপে মরে বাঁশির পরান”—এখানে “বাঁশি” যেটা সাধারণত সুরের প্রতীক, সেটাই কেঁপে মরে যাচ্ছে| অর্থাৎ, সুরের ভিতরেও মৃত্যু আছে। বিশুদ্ধতা এখানে আর শান্ত নয়; তা কাঁপন ও ভাঙনের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।
“কিছু বা কলাকুশল জানে এই রাত, জলের জাহাজ”—রাত এখানে শুধু সময় নয়, এক জ্ঞানী সত্তা| “জলের জাহাজ”—অসম্ভবের ভেতর সম্ভবের ইঙ্গিত| অর্থাৎ বাস্তব আর কল্পনা একসাথে ভাসছে।
“পাতার ভেতর উল্টানো ঢেউ”—এখানে প্রকৃতি আর উল্টে যায়; পাতার ভেতর ঢেউ—অর্থাৎ ক্ষুদ্রের মধ্যে বিশালতা| ভিতরে বাইরে উল্টে গেছে।
“মোমের ডানা তো, আদিত্য তাপ সইছে না”—এখানে ইকারাসের মতো এক পতনের ইঙ্গিত আছে| উড়তে চাওয়া কিন্তু সূর্যের তাপে গলে যাওয়া—অর্থাৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষার ভাঙন।
“আমার নীরবতা শুনো”—এই আহ্বান খুব গুরুত্বপূর্ণ| নীরবতাও এখানে ভাষা| কথা নয়, বরং না-বলার ভেতরেই সত্য লুকানো।
“সাকিন কৃষ্ণরূপ, ধলেশ্বরীর গ্রাম, মেঘের মন্দির”—এখানে স্থানগুলো আর ভৌগোলিক থাকে না; তারা হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক মানচিত্র| নদী, গ্রাম, মেঘ—সবই এক ধরনের অন্তর্জগত।
এরপর কবিতা আরও ছড়িয়ে যায়—
“রোহিণীকালে কিছু ¯^ল্পতারা ছিঁড়ে লালে লাল ফুল জারায়ুজ”—এখানে জন্ম আর আকাশ একসাথে| তারারা ছিঁড়ে পড়ে ফুল হয়ে যায়—অর্থাৎ মহাবিশ্বই জন্মের শরীর।
“আমি কবিতা লিখি না, কবিতা আমাকে লিখছে”—এখানে কবির আত্মপরিচয় সম্পূর্ণ ভেঙে যায়| সৃষ্টিকর্তা আর সৃষ্টি আলাদা নয়| ভাষাই নিয়ন্ত্রক।
“মায়ার নগরে প্রতিরাতে ক্রংকিটের দালান উঠে”—আবার শহর, আবার মায়া| বাস্তব আর কল্পনা একই কাঠামোতে আটকে।
“রডের ভিতর মানুষ লিখে রাখে বাঁচার হায়ারোগ্লিফিক”—মানুষ তার অস্তিত্বকে নির্মাণের ভিতরে লিখে রাখে| জীবন নিজেই এক প্রত্নলিপি।
“মখমল চাদরে মুখ দিয়ে দেখি ছায়াধরা ফাঁদ”—এখানে আরামও ফাঁদ, সৌন্দর্যও বিভ্রম।
“মরনের পিক্সেল ঘন হয়ে আসে”—মৃত্যু আবার ফিরে আসে ডিজিটাল রূপে—চূড়ান্ত নয়, বরং ছড়িয়ে থাকা এক উপস্থিতি।
শেষ দিকে কবিতা এক ধরনের অস্তিত্বগত ঘূর্ণিতে পৌঁছে যায়—
“যে আবেগ বর্তমান এড়িয়ে চলে তা ধীরে ধীরে মারা যায়”—এখানে সময় ও অনুভবের সম্পর্ক স্পষ্ট| যে অনুভব বর্তমানকে ছুঁতে পারে না, তা বিলুপ্ত হয়।
“দিনের কুসুমে আলোর রক্তগুলি জলের জঙ্গল”—এখানে আলো নিজেই রক্তাক্ত, জীবন নিজেই জটিল বন|
“ভালোবাসা মূলত: সাহস নিজেকে হারাবার”—এটাই কবিতার এক দার্শনিক চূড়ান্ত বাক্য| ভালোবাসা মানে পাওয়া নয়; বরং নিজেকে হারিয়ে অন্যের ভেতরে বিলীন হওয়া।
শেষে—
“‘তোমার জন্য জানালা কবুল রেখে ডাকছি, এসো’...”—এখানে কবিতা শেষ হয় না, বরং ডাকের ভেতরে স্থগিত থাকে| জানালা খোলা, আহ্বান চলমান—অর্থাৎ সমাপ্তি নেই, কেবল অপেক্ষা।
সমগ্র কবিতার ভেতর যে বড় কাঠামোটা দাঁড়ায় তা হলো— জন্ম → ভাঙন → ভাষার পতন → শরীর-প্রযুক্তি-মায়ার মিশ্রণ → মৃত্যু → আবার আহ্বান
কিন্তু এই চক্র কখনো বন্ধ হয় না| কবিতা নিজেই বলে দেয়—আমি লিখছি না, আমাকে লেখা হচ্ছে| তাই শেষও আসলে শেষ নয়, বরং আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা।
এখানে “বহুভাষীকতা ও কোড-সুইচিং” কীভাবে কাজ করছে।
এই কবিতার ভেতরে বহুভাষীকতা আর কোড-সুইচিং কোনো আলাদা অলংকার হিসেবে আসে না; বরং এটা কবিতার চিন্তা-প্রক্রিয়ারই অংশ হয়ে যায়| বহুভাষীকতা শুধু ইংরেজি-বাংলা মিশ্রণ নয়; বরং এটা এক ধরনের সাংস্কৃতিক ও চেতনার কোড-ভাঙা কৌশল।
প্রথমেই ইংরেজি উদ্ধৃতি (“ডযবহ ঃযব ধিাবং ড়ভ ষরভব...”) শুধু অনুবাদযোগ্য তথ্য না—এটা এক ধরনের গ্লোবাল মোটিভেশনাল ডিসকোর্স, যা বাংলা কবিতার ভিতরে ঢুকে তার অর্থ-ভরকে বাইরের পৃথিবীর সাথে টেনে নেয়| ফলে কবিতার “লোকাল শরীর” আর “গ্লোবাল ভাষা” একসাথে সংঘর্ষে যায়| ইংরেজি বাক্যটা শুরুতেই যে ভাবে ঢুকে পড়ে, সেটা শুধু “উক্তি” না, বরং একটা বাইরের বিশ্ব-চেতনার অনুপ্রবেশ, যেখানে জীবনকে দেখার একটা গ্লোবাল, প্রায় সেলফ-হেল্প ধরনের ভাষা বাংলা কবিতার ভেতরে ঢুকে তার ¯^াভাবিক সুরটা একটু নড়বড়ে করে দেয়।
এরপর “উবধৎ”, “ছঁববহ”, “নরড়সবঃৎরপ”, “ঢ়রীবষ”, “ধফৎবহধষ”, “ফবঃড়ী”, “যড়ষড়মৎধঢ়যরপ” — এই শব্দগুলো শুধু বিদেশি শব্দ নয়| এগুলো হলো সমকালীন প্রযুক্তি-জীবন ও পপ-কালচারের কোড| এগুলো ঢুকে পড়ার ফলে কবিতার ভাষা আর বিশুদ্ধ থাকে না; বরং এক হাইব্রিড রেজিস্টারে চলে যায়| একই লাইনের ভেতর লোককথার ছায়া, শরীরতত্ত্বের ভাষা, ডিজিটাল টার্ম, আর ˆদনন্দিন বাংলার কথ্য ভঙ্গি একসাথে চলতে থাকে।
এখানে কোড-সুইচিং দুইভাবে কাজ করে— একটা হলো সরাসরি ভাষা বদল (বাংলা থেকে ইংরেজি), আরেকটা হলো ডিসকোর্স শিফট— একই বাক্যে কবিতা কখনো লোককথা, কখনো বায়োকেমিস্ট্রি, কখনো ডিজিটাল ভাষায় চলে যায়| এই কোড-সুইচিং শুধু ভাষা বদল নয়, বরং চিন্তার স্তর বদল| কখনো কবিতা একেবারে শারীরিক, রক্ত-স্নায়ু-শ্বাসের জগতে থাকে, আবার হঠাৎ সেটা চলে যায় মহাজাগতিক বা পুরাণের জগতে, আবার পরক্ষণেই ঢুকে পড়ে কংক্রিট, রড, পিক্সেল, বায়োমেট্রিক পরিচয়ের ভেতরে| এই ওঠানামার ফলে কোনো একক অর্থ দাঁড়াতে পারে না; বরং অর্থ নিজেই এক ধরনের চলমান প্রক্রিয়া হয়ে যায়|
যেমন: “রক্তের নক্ষত্রবেগ” হচ্ছে মহাকাব্যিক-জ্যোতির্বিজ্ঞানী ভাষা, “পেথোড্রিন হয়ে শিরায়-প্লাজমায়” হচ্ছে মেডিক্যাল/ফার্মাসিউটিক্যাল কোড, “মরণের পিক্সেল” হচ্ছে ডিজিটাল ইমেজ-টেক ভাষা এবং “হায়ারোগ্লিফিক” হচ্ছে প্রাচীন প্রত্নলিপি কোড। অর্থাৎ এখানে বহুভাষা মানে শুধু ভাষা নয়—বহু জ্ঞানব্যবস্থার সহাবস্থান।
এখানে “বহুভাষা” মানে শুধু বাংলা-ইংরেজি মিশ্রণ না, বরং একসাথে অনেকগুলো জ্ঞানের ভাষা—পুরাণের ভাষা, বিজ্ঞান ও চিকিৎসার ভাষা, শহরের নির্মাণভাষা, শরীরের ইন্দ্রিয়ভাষা, আবার প্রযুক্তির ডিজিটাল ভাষা—সব একসাথে ঢুকে পড়া| এই মিশ্রণ কবিতাকে একটা স্থির কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দেয় এবং তাকে এক ধরনের ছড়িয়ে থাকা নেটওয়ার্কে পরিণত করে।
এইভাবে পুরো কবিতাটা একরৈখিকভাবে এগোয় না, বরং ভাষা নিজেই বারবার কোড বদলায়, নিজের ভেতরেই অনুবাদ হতে থাকে, আবার ভেঙে পড়ে| ফলে পাঠকও কোনো একটি ভাষার মধ্যে স্থির থাকতে পারে না; তাকে বারবার অর্থের জায়গা বদলাতে হয়।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন