| সমকালীন ছোটগল্প |
হকার
দোকান খোলার আগে দিলু ঝুপড়ি দোকানটার দিকে একবার ভাল করে দেখল। আশপাশ, আনাচ কানাচ। আর কদিন এই দোকান থাকবে কে জানে! সেই ১৯৯৫ থেকে, দেখতে দেখতে ৩১ বছর হয়ে গেল। তখন দিলু সুরেন্দ্রনাথ থেকে পাস করে বসে আছে, বন্ধুদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ঝাড়গ্রাম যায়, ওখানকার ছেলে মেয়েদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে হাঁড়িয়া গুড়কি খেয়ে আসে, শালের জঙ্গলে অনেক ভেতরে ঢুকে বনমোরগের পোড়া মাংস খেতে খেতে কীভাবে বড়লোকগুলোকে একদম খতম করে দেওয়া যায়, সেই আলোচনা করে, আবার কলকাতা ফেরত চলে আসে। ওর চারজন বন্ধু ওখানে থেকে গেছে, নকশালদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য। দিলুরা কয়েকজন তখনও মনস্থির করে উঠতে পারেনি। একদিন ওর বাবা ওকে এই নিয়ে প্রচুর কথা শোনায়।
-- চাকরি অনেকেই পায় না। সে নিজের ব্যবসা করে, দরকার পড়লে হকারি করে। ঝাড়গ্রাম গিয়ে কেউ নকশাল করে না। যারা করে, পুলিশ তাদের গুলি করে মেরে ডেডবডিগুলো কুকুরের মত ভাগাড়ে ফেলে দেয়। তুই কি সেটাই চাস?
দিলু কিছু বলে না। চুপচাপ শোনে।
-- কাল সকালে আমার সঙ্গে যাবি, যেখানে নিয়ে যাব। তোর ব্যবস্থা করেই তবে আমি মরব।
পরেরদিন সকাল সাড়ে ১১টায় সোজা রাইটার্স। দিলুদের পাড়ার নেতা তখন মন্ত্রী। গিয়ে ওর বাবা হাত জোড় করে পাক্কা ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে রইল। কাজ শেষ করে উনি হাতের ইশারায় ডেকে নিলেন।
-- কী গো ভজাদা, তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছো? পাশে কি ছেলে?
-- হ্যাঁ স্যার।
-- কী নাম?
-- দিলীপ দাস। ডাকনাম দিলু। ওকে একটা কিছু করে দিন স্যার। সুরেন্দ্রনাথ থেকে পাস করে একবছর বসে আছে।
-- তোমার বাড়ি তো দুর্গানগর স্টেশনের কাছে? স্টেশনে আমরা খুব শিগগির ২০টা কাঁচা দোকান বসাব। টেম্পোরারি। রেলকে বলে দেব ওরা যাতে ঝামেলা না করে। তোমার ছেলেকেও একটা দোকান দিতে পারি। কিন্তু আমার কাছে খবর আছে তোমার ছেলে আর ওর বন্ধুরা মাঝে মাঝে ঝাড়গ্রাম যায়।
-- স্যার, আমি কথা দিচ্ছি ও ওখানে আর জীবনে পা দেবে না। ওকে শুধু দোকানটা দিন স্যার, আমি খুব শিগগির ওর বিয়ে দিয়ে ওকে সংসারী করে দেব।
মন্ত্রী একটু মুচকি হাসলেন।
-- আচ্ছা, কাল সকালে ওর মাধ্যমিকের অ্যাডমিট সমেত ওকে নিয়ে এসো। রেলের অফিসার কাল আসবে, কাল পাকা করিয়ে দিচ্ছি।
পরেরদিন আবার, এক সময়ে।
-- দিলু, এই নাও তোমার দোকানের কাগজ। আমরা সবাইকে কি কি দোকান হবে, সেটা ভাগ করে দিচ্ছি। তুমি ওখানে ঝালমুড়ির দোকান দেবে। আর মাথায় রাখবে, প্ল্যাটফর্মের পাশে যে একফুট উঁচু পাঁচিল আছে, তার ছ'ইঞ্চি ওদিকে দোকান দেবে। যাতে লোকেরা পাঁচিলে এসে বসতে পারে, তোমার দোকানে যেন ধাক্কা না খায়। কেউ যেন না বলতে পারে, দোকানের জন্য প্যাসেঞ্জারের অসুবিধে হচ্ছে। কাল দুপুরে দুর্গানগর স্টেশনে RPF আসবে, ওরা বুঝিয়ে দেবে কোথায় কিভাবে কিরকম দোকান দেবে। ওদের শুধু এই কাগজটা দেখিয়ে দিও। আর হ্যাঁ, দোকান দেওয়ার পর আমাদের মজদুর ইউনিয়নের সদস্য হতে হবে কিন্তু, সেটা মাথায় রেখো।
সেই শুরু। পরেরদিন RPF দেখিয়ে দিল, আপ প্ল্যাটফর্মের পেছনদিকে কোথায় ওর দোকান হবে। মাস গেলে ওকে দুশো টাকা রেলের জন্য আর দুশো টাকা পার্টি ফান্ডে মজদুর ইউনিয়নের অফিসে জমা দিয়ে দিতে হবে। সেটা বাড়তে বাড়তে আজ তিন হাজার টাকা।
৯৫ সালে দোকান খুলে জমিয়ে বসে ২০০০ সালে বিয়ে, ২০০৩ সালে মেয়ের জন্ম, ২০০৫ সালে বাবার চলে যাওয়া, ২০১০ সালে ছেলের জন্ম। বাবার বানানো একটা ছোট্ট বাড়ি, স্টেশন থেকে ১০ মিনিট দূরে, রেল লাইনের পাশেই, নজরুল সরণি শীতলা মন্দির, সেই বাড়ি সারিয়ে সুরিয়ে, একটা ছোটঘর পাশেই বানিয়ে নিয়ে, একটা ঘরে ওর মা, আরেক ঘরে দিলু আর ওর বউ, আরেকটা ছোট ঘরে ওর দু'ছেলেমেয়ে। একটু দূরেই বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ের ব্রীজ, রাত্তিরে লরি গেলে গুম গুম শব্দে কেঁপে ওঠে। এভাবেই এত বছর। ওর মেয়ে এ'বছর দমদম মতিঝিল কলেজ থেকে পাস করল। ছেলে এবার মাধ্যমিক দেবে।
দিলু দোকানের গায়ে হাত রাখে। এই দোকান নিয়ে আর সংসার নিয়েই ও ৩১ বছর কাটিয়ে দিয়েছে। চুল পেকে গেছে, বাঁচোখে আর ঠিকঠাক দেখতে পায় না। কিন্তু স্টেশনে দিলুদার মুড়ির আজ প্রচুর কদর। রোজ সকাল ১০টায় দোকান খোলে। দুপুর ২টো অবধি। তারপর বাড়ি গিয়ে খেয়ে একটু ঘুম লাগিয়ে আবার ৪টের সময় চলে আসে, সেই রাত্তির সাড়ে ১০টা অবধি। বনগাঁ লোকাল চলে যাওয়ার পর আর যাত্রী থাকে না, তখন বন্ধ করে চলে আসে। কিন্তু শুক্র শনি রবি, একটু অন্য রুটিন। এই ৩ দিন কলেজের প্রচুর বাচ্চা ছেলেমেয়েরা দুপুর ৩টের মাঝেরহাট লোকাল ধরে প্রেম করতে যায়, বাগবাজার, বিবাদী বাগ, ইডেন গার্ডেন, প্রিনসেপ ঘাট। ফলে এই তিনদিন ৩টের লোকালটা না যাওয়া অবধি ওর দোকানে ভীড় থাকে। লোকালটা যাওয়ার পর দোকান বন্ধ করে পাঁচটা অবধি রেস্ট নেয়, তারপর আবার এসে দোকান খোলে। আজ অবধি এই রুটিনের বাইরে দিলু যায়নি। যেতে পারেনি। ওর যা ইনকাম, এর বাইরে গিয়ে পাঁচজনের সংসার কিভাবে চালাতে হয়, ও জানে না।
-- দিলুদা, ১০০ টাকা দাও, কাল সন্ধেবেলা প্রোগ্রাম আছে, কাল এখান থেকে মিছিল বেরিয়ে ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন অবধি যাবে। সেটাই ঠিক হয়েছে।
-- কিছু হবে? কি মনে হয়? এযাত্রা রক্ষা পাব আমরা?
তালা খুলতে খুলতে দিলু প্রশ্ন করে।
-- কিছুই বলা যায় না। হাইকোর্ট স্টে অর্ডার দিয়েছে, তা সত্ত্বেও দেখলে তো কাল কিভাবে মাঝ রাত্তিরে ঢাকুরিয়া স্টেশনে সব গুঁড়িয়ে দিল।
-- হ্যাঁ দেখলাম। এরা এত হারামী, রেললাইনে স্পেশাল লরি চাপিয়ে বুলডোজার আনছে, ওখানেই দোকান ভাঙছে, ওখানেই মালগাড়ি চাপিয়ে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
-- চিন্তা কোরো না, এখানে এই কীর্তি করতে গেলে কয়েকটা লাশ পড়বে, এত সহজে আমরা ছেড়ে দেব না। দরকার পড়লে আমরাও আর্মস আনাব।
টাকাটা হাতে নিয়ে যেতে যেতে বিশু বলে যায়।
দিলু দোকানে বসে ৯৫ সালের কথা ভাবে। যখন ওরা ঝাড়গ্রামের জঙ্গলে বসে বড়লোক শ্রেণীশত্রুদের পিস্তল দিয়ে পুরো খালাস করে দেওয়ার কথা ভাবত। এই ২০২৬ সাল, সরকার বদলের পর, মে মাস থেকে একে একে স্টেশনে স্টেশনে রেলের হামলা, পুলিশ দাঁড় করিয়ে হকারদের অস্থায়ী দোকান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে অসভ্যতা, কোর্টের নির্দেশ না মানা। দিলু ভাবে, ও যদি ৯৫ থেকে নকশালদের সাথী হত! নাহ, ২৩ বছরের মেয়ে টুনার মুখটা ভেসে ওঠে। চাকরির চেষ্টা করছে। সৎভাবে বেঁচে থাকার। হয়ত কয়েক বছরের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। আর ছেলে নিমু? এই তো সবে ১৬ বছর, সারাজীবন পড়ে আছে। দিলু চায় না ওর ছেলে হকার হোক। পড়াশোনা শেষ করে বাইরের রাজ্যে গিয়ে যা খুশি করুক।
-- শুনেছ দিলুদা, আজ রাত্তিরে নাকি রেল আমাদের স্টেশনে বুলডোজার আনতে পারে, ভেতরের খবর।
পাশের চপের দোকান খুলতে খুলতে হারুর বউ বলল। হারু হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পর শেষ ৫ বছর ওর বউ দোকান চালাচ্ছে। দিলুর ভেতরটা কেঁপে উঠল। মুখে কিছু বলল না।
রাত্তিরে দোকান বন্ধ করে যাওয়ার সময় দিলু বিশুকে ধরল।
-- হ্যাঁ রে বিশু, হারুর বউ বলছিল আজ রাত্তিরে নাকি অ্যাকশন হতে পারে? কই, তুই কিছু বললি না তো? দোকানের মধ্যে প্রচুর মাল রাখা আছে। যদি সব সমেত উঠিয়ে নিয়ে যায়?
-- তোমায় তো বললাম, চিন্তা কোরো না। আমাদের টিম আছে, রোজ রাত্তিরে ৫ জন করে জাগছে। কিছু দেখলেই ওরা আমাদের খবর করবে, আমরা দৌড়ে আসব। তোমাকেও ফোন করে দেব, তুমিও চলে এসো। যাও যাও, এত ভেবো না।
দিলুর সারারাত ঘুম আসে না। ফোনটা মাথার কাছে। মাসে ইনকাম ৩০ হাজার টাকা। সংসার খরচ ২০ হাজার। ইউনিয়নকে দিতে হয় ৩ হাজার। মেয়ের বিয়ের জন্য জমায় ৭ হাজার। এখনো অবধি মাত্র দু'লাখ জমেছে। ওই টাকায় কি বিয়ে হয়? সত্যি যদি দোকান ভেঙে দেয়? জমানো টাকায় মাত্র দশমাস চলবে, তার মধ্যে ওকে অন্য কিছু করতে হবে। কী করবে?
ভোরবেলা দিলু উঠে বসে, ঘুম আসছে না। অনুভব করে ওর কাঁধে বউয়ের সংসার ঠেলা শক্ত হাত। পিঠে হাত বোলাতে থাকে।
-- এত ভেঙে পড়ছ কেন? ঠিক কোন একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে, দেখো!
দিলু বুঝতে পারে ওর যে চোখটা ভাল আছে, সেই চোখটাও পুরো ঝাপসা হয়ে এসেছে।
দোকান খুলতে এসে ও দ্যাখে, সব দোকানই ঠিকঠাক আছে। কিছুই হয়নি। যাক। কিন্তু কদ্দিন? কদ্দিন? তালাটা পাশে রেখে ডালা তুলতে গিয়ে পায়ের নিচে হঠাৎ একটা মোটা পেরেকের খোঁচা!
-- ওরেশ শালা রে...
পেরেকটা দেখতে পেয়ে দিলু ডালা ছেড়ে পেরেকে এক লাথি মারে, সজোরে।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন