কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

চিরশ্রী দেবনাথ

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

পাখিরা এখন চোরাগলিতে

আপনি কি পার্থিব চৌধুরী?

ইয়েস

আপনাকে একটু থানায় আসতে হবে।

মানে বুঝলাম না, আমি কী কারণে থানায় আসব? আমার এখন খুব জরুরী মিটিং আছে।

আপনার মেয়েকে থানায় ধরে আনা হয়েছে। 

ফালতু বকবেন না! আপনি আমাকে ডিজিটাল এরেস্টের জুজু দেখাচ্ছেন?

স্যার আপনি কাইন্ডলি থানায় আসুন। এটা ডিজিটাল এরেস্ট ফেরেস্ট নয়। একটি বিশ্রি ঘটনায় আমরা আপনার মেয়ে সহ আরো কয়েকজনকে থানায় ধরে এনেছি। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসুন!

এখন বিকেল সাড়ে তিনটে। লাঞ্চের পর এই মিটিংটা সেরে আজ বিকেলে একটি দারুণ আড্ডার প্ল্যানে ছিলেন পার্থিব চৌধুরী। নানা ভালো কারণে মেজাজটা খুব ফুরফুরে লাগছে, তাছাড়া প্রচণ্ড গরমের পর এক পশলা বৃষ্টিতে রোদের পারদ এখন অনেকটাই নিচের দিকে, সব মিলিয়ে বর্ষাকাল এনজয় করার একদম আদর্শ দিন।

গাড়ি যত ধর্মনগর থানার দিকে এগোচ্ছে পার্থিব চৌধুরী তত ঘামছেন। থানায় যে কখনো আসেননি তা নয়। কিন্তু তমন্নাকে পুলিশ ধরে আনার মতো কী কেইস হতে পারে আকাশ পাতাল ভেবেও চিন্তা করতে পারছেন না।

মোমের মতো মেয়ে তার, মাখনের মতো স্কিন, অপূর্ব সুন্দর মুখখানা, বড় বড় দুটো চোখ, লম্বাও হয়েছে পার্থিব চৌধুরীর মতোই। খুব ইচ্ছে ছিল মেডিকেল পড়াবেন। তোড়জোরের অভাব ছিল না। টাকাও ঢালতে রাজি ছিলেন, কিন্তু নিট কোয়ালিফায়িং মার্কসটাই তুলতে পারল না মেয়ে। এখন হায়দ্রাবাদের একটি প্রাইভেট কলেজে মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে ভর্তি করিয়েছেন। সামার ভ্যাকেশনে বাড়িতে এসেছে। নেক্সট উইকেই তো মেয়েকে পৌঁছে দিতে তার ও শ্রেয়সীর হায়দ্রাবাদ যাওয়ার কথা, সঙ্গে একটা ছোট ট্যুর। অবশ্য  তমন্নার বন্ধু সার্কলটা বেশ বড়। ধর্মনগরে এলে সারাক্ষণ আড্ডা আর ঘোরাঘুরি,  রেস্টুরেন্টে খাওয়া দাওয়া এসবেই মেতে থাকে। আদরের মেয়েকে শ্রেয়সী আর পার্থিব বেশি কিছু বলতে পারেন না। তাই বলে সোজা থানায় আটক হবে মেয়ে!

ড্রাইভার পার্থিব চৌধুরীর পেছন পেছন থানায় ঢুকছিল। ধমকে দিলেন।

তোমাকে কে আসতে বলেছে? এক্ষুণি আসছি আমি। পাঁচমিনিটের ব্যাপার।

তিনি চাইছিলেন ওনার মেয়ে থানায় বসে আছে এ দৃশ্য ড্রাইভার না দেখুক। উপায় আছে তাহলে!

চারদিকে বলে বেড়াবে।

তবে এখন রাত দশটা। ব্যাপারটা পাঁচ মিনিটের নয়। পার্থিব চৌধুরী এখনো থানায় বসে আছেন। শ্রেয়সী দত্ত চৌধুরীও এসেছেন। তমন্না সহ ওর আরো তিনজন মেয়ে বন্ধু থানার লকআপে।

কয়েকজন ছেলে রয়েছে তমন্নাদের সঙ্গে। তারাও আপাতত লক আপে। গার্জিয়ানরাও রয়েছেন, ছেলে মেয়েকে উদ্ধার করতে এসেছেন। গনগনে কথাবার্তা চলছে। মেয়ের মা-বাপদের মুখগুলো ছাইয়ের মতো। ছেলের মা-বাপদের মুখগুলো ততটা হোপলেস নয়।

কারা যেন এসে পার্থিব চৌধুরীকে ধমকে গেল, আপনি তমন্নার বাবা? আপনার মেয়ের পাল্লায় পড়েই আজ আমাদের মেয়েদের এই দশা।

পার্থিব চৌধুরী তাদের চেনেন না। ধরা পড়া ছেলেগুলোকেও ভালো ঘরের বলেই মনে হচ্ছে। পার্থিব চৌধুরী ভেবেছিলেন গোপনে টাকা দিয়ে মেয়েকে চুপচাপ ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন।

কিন্তু আপাতত পার্থিব চৌধুরীর চোখ দুটো গভীর শূন্যতায় ভরা। শহরের যত রকমের দু’টাকার নিউজ চ্যানেল আছে, সেগুলোর ঠিকমতো শব্দ উচ্চারণ করতে না পারা ছোকরা সাংবাদিকরা চিল্লিয়ে বলে যাচ্ছেন,  দেখুন দিনের আলোয় কিভাবে  অভিজাত এলাকায় চলছে দেহ ব্যবসার রমরমা। বড়ো ঘরের ছেলেমেয়েরাও জড়িয়ে আছে তাতে।

শ্রেয়সী দু হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। পার্থিব চৌধুরী দুহাতে মুখ ঢাকতে পারছেন না, কারণ তাকে ফোন করতে হচ্ছে। ফোন করতে হচ্ছে চেনাশোনা প্রত্যেক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে। তিনি যেমন করেই হোক মেয়েকে ছাড়িয়ে নিতে চান আজ রাতের মধ্যে।

কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। কাল নাকি প্রত্যেককে কোর্টে তোলা হবে, তারপর দেখা যাবে কী করা যায়। আজ রাত থানার মহিলা সেলেই থাকতে হবে তমন্নাকে।

শ্রেয়সী ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। কী করে মুখ দেখাবেন, আত্মীয়স্বজন, কলিগদের! যাবতীয় স্ট্যাটাস ধুলোয় মিটিয়ে দিল মেয়েটা!

—এখন কেঁদে কি হবে? সারাদিন মেয়েটা কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে মেশে, খেয়াল রাখো? মা হয়ে মেয়েকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছো দিনের পর দিন!

দাঁতে দাঁত চেপে আস্তে করে শ্রেয়সীকে কথাগুলো বললেন পার্থিব চৌধুরী।

—আর বাবা হিসেবে বুঝি তোমার কোন দায়িত্ব নেই? সারাদিন শুধু অফিস আর বন্ধুবান্ধবী নিয়েই আছো।

—টাকাটা তোমাদের ভালো রাখার জন্য জোগাড় করতে হয়, বুঝেছো! আর এই হলো ভালোর নমুনা! বাড়ি বিক্রি করে এখন এ রাজ্য থেকে চলে যেতে হবে আমাদের। রাস্তায় বেরোবার উপায় রাখল না মেয়েটি। ছিঃ ছিঃ! হিসহিসানির সঙ্গে একটা অসহায় কন্ঠস্বর বেরুলো পার্থিব চৌধুরীর গলা দিয়ে।

আর মানুষগুলোর কি কোন কাজ নেই? হুমড়ি খেয়ে পড়েছে সব থানায়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ঝলকে ঝলকে উঠছে শুধু। কয়েকবার মুখটা সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন পার্থিববাবু। কিন্তু ঝড়ের বেগে পরিচিতজনের ফোন আসা থেকে অনুমান করলেন আজকের ঘটনা শহরের আগামী কয়েকদিনের হট টপিক সবাই মজা পাচ্ছে, ভিডিও ক্লিপিংস শেয়ার হচ্ছে অসম্ভব দ্রুততায়। এখন আর পার্থিব মুখ লুকোচ্ছেন না। তিনি সিগারেট খাচ্ছেন।

—স্যার সিগারেটটা বাইরে গিয়া খান, ভিতরে খাইয়েন না।

সেই গায়ে পড়া কনস্টেবল। আজকের ঘটনায় যার উত্তেজনার শেষ নেই। একটু আগে পার্থিববাবু দেখেছেন একজন এস আই তাড়িয়ে তাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। সিগারেটটা ফেলে দিয়ে তিনি থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। থানা কখনো ঘুমোয় না। ডিউটি অফিসার চেঞ্জ হয়েছে। আগের জন্য বয়স্কমতো এক ভদ্রলোক ছিলেন। এখনের জন অল্পবয়সী এস আই। বেশ স্মার্ট ও গম্ভীর প্রকৃতির।

—আপনেরা বাড়িতে যান গিয়া। এখন তো আর কিছু হওনের নাই। আজকা থানায় থাকতে হইব আপনার মেয়ের। কাউরেই তো ছাড়া হইত না।

কনস্টেবল লোকটা পার্থিববাবুর কানে কানে এসে বলল।

পার্থিববাবু এস আই এর কাছে গিয়ে বললেন, আমি একটা কথা বলছিলাম, কালকে তো পত্রিকায় খবর বের হবে। আমার মেয়ের নাম ও ছবি দেবেন না প্লিজ!

—আমরা এসব দিই না স্যার। তবে খবর কি আর কারোর জাননের বাকি আছে?  ফেসবুকটা খুইল্যা দেখেন একবার।

সেই কনস্টেবলটাই আগ বাড়িয়ে উত্তর দিল।

এস আই দীপঙ্কর ঘোষ ফোনে ব্যস্ত। রাত বাড়ে অপরাধ বাড়ে। পার্থিব চৌধুরীকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছেন না তরুণ এস আই।

কনস্টেবলকে ধমকাবেন এই মানসিকতা মরে গেছে এখন, পার্থিব চৌধুরী বড়ই অসহায় বোধ করছেন।

–এই ভয়েই তো ফেসবুক খুলছি না, ফিসফিস করে স্বগতোক্তি করলেন পার্থিববাবু।

শ্রেয়সী ভাবছে, তমন্না খুব ফিগার সচেতন। রাতে দুটো রুটি, স্যুপ আর ডিমের পোচ খায়। গোলমরিচের গুঁড়ো কম বেশি হলে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে। ফুলের মতো মেয়ে এতো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে গেলো কী করে! আবার নাকি ড্রাগস খাচ্ছিল কয়েকজন এই প্রমাণও পাওয়া গেছে। উঃ মা মাগো! শ্রেয়সী কি মেয়ের কাছে যাবেন একবার? ওকে কি লক আপের কাছে যেতে দেবে পুলিশ?

শেষপর্যন্ত থানায় এসে বসে থাকতে হবে, মেয়ে পুলিশের হেফাজতে থাকবে, এ ধরনের বিষয় স্বপ্নেও কল্পনা করেনি শ্রেয়সী।

একজন মহিলা পুলিশ শ্রেয়সীকে মেয়ের কাছে নিয়ে গেলো। শ্রেয়সী, তমন্না ছাড়া বাকি দুজন মেয়েকে দেখছিল। ফুটফুটে তিনটি মেয়ে। কী হবে ওদের ভবিষ্যৎ? সমাজ কি আর তাদের মেনে নেবে?

-আমরা এখন বাড়ি যাচ্ছি, এখানে বড্ড মশা রে, তোর বাবার রাতের ঔষধগুলোও খেতে হবে। কাল সকালে আসব। বিস্কুট খাবি? ওরা খেতে দেবে কিনা জানি না।

—ম্যাডাম প্লিজ কিছু খেতে দিয়েন না। আমরা দিমু খাবার। এবার আপনি যান।

মহিলা পুলিশটি বলে উঠল।

তমন্না ভাবলেশহীন মুখে দাঁড়িয়েছিল। শ্রেয়সী অবাক হয়ে লক্ষ্য করছিলেন তমন্নার চেহারায় একটা ঔদ্ধত্য। সে যেন অন্য এক পৃথিবীর মেয়ে হয়ে গেছে কয়েকঘন্টা সময়ের মধ্যে। অপরাধবোধে কুঁকড়ে যাওয়া মেয়ে হয়ে নেই তমন্না। সে কাঁদছেও না।

কাল কোর্টে কি হবে শ্রেয়সী জানে না, এধরনের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হবে ভাবেনি কখনো। তমন্না যা করেছে তা কি অন্যায় না বোকামি? খুব ভুল হয়ে গেছে শ্রেয়সীর। মেয়েকে এতোটা ছাড় দেওয়া ঠিক হয়নি!

ভোর পাঁচটা। থানা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। আলো-আঁধারি অফিসঘরে ফ্যান ঘুরছে গোঁ গোঁ করে। মহিলা সেলে বসে থাকা তমন্না জানে আজ সকালে কিছু একটা বড়ো হতে চলেছে। পুলিশের চোখে চোখ রাখতে ভয় পাচ্ছে না সে, ব্যাপারটা এতোদূর গড়াবে তমন্না বুঝতে পারেনি। এরকম এনজয়মেন্ট তো তারা প্রায়ই করে। ওদের আরো বহু বন্ধুবান্ধবই করে। কই কেউ তো ধরা পড়ে না! অত্রি বলেছিল, খুব ভালো হোটেল ভাড়া করেছে কয়েক ঘন্টার জন্য। পার্টিটা দারুণ হবে। সিক্তা, টিয়া, বান্টি, রৌনক, অত্রি, তমন্না যখন এনজয়মেন্টের তুঙ্গে তখনই পুলিশ এসে গেল। তমন্না কল্পনাও করেনি তাদের জেলে থাকতে হবে। বিরাট ব্লান্ডার হয়ে গেছে।

পুলিশ বলছে সেক্সরেকেট, ইস্ তা তো নয়! এটা তো জাস্ট একটু ফূর্তি ছিল। বাবা কি উদ্ধার করতে পারবে তাকে? আবার কি জেলে ঢুকতে হবে? ওহ্ মাই গড কী মশা সেখানে! জঘন্য খাবার। তমন্নার ইচ্ছে করছে বাড়ি গিয়ে ডিপ শাওয়ার নেয়, তারপর চিকেন স্যুপ আর রুটি খেয়ে তোফা ঘুম দেয়। কিন্তু এই পোড়া শহরে এসব করতে গিয়ে কী বিপদেই না পড়া গেল। সত্যিই টেনশন হচ্ছে এবার।

এস আই দীপঙ্কর ঘোষ ডেকেছেন। প্রথমে তমন্নাকে লক আপ থেকে বের করা হলো।

“তমন্না চৌধুরী, তোমার ফোনের ডাটা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ আছে।”

একটা ছোটো ঘরে বসানো হয় তমন্নাকে। সাথে মহিলা কনস্টেবল। সামনে দুই অফিসার – একজন সাইবার শাখার, আরেকজন ক্রাইম শাখার ইনচার্জ।

“তোমার ফোন আনলক করো।”

তমন্না ঠাণ্ডা স্বরে বলল, “আমি কেন করব?”

“বিকজ ইট ইজ মাই অর্ডার, দেখাতে হবে?” — অফিসার চোখ তুলে তাকালেন।

তমন্না চুপ করে গেল। চোখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। সাইবার অফিসার বললেন, “আমরা অন্য উপায়ে আগেই ডেটা তুলে নিয়েছি। এখন শুধু জানতে চাই — এই ভিডিওটা তুমি রেকর্ড করেছিলে কেন?”

ল্যাপটপ স্ক্রিন ঘুরিয়ে তমন্নার দিকে এগিয়ে আনা হয়। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে — একটি ঘরের ভিতর কয়েকজন ছেলে-মেয়ে, কেউ কেউ উত্তেজিত অবস্থায়, নাচানাচি করছে, গান বাজছে। হঠাৎ ক্যামেরা এক জোড়া চেনা মুখকে ধরছে। মুখগুলো স্পষ্ট। তমন্না আর এক কলেজ পড়ুয়া ছেলে আলিঙ্গনাবদ্ধ।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যটা আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে। একজন আর একজনের জামা খুলে দিচ্ছে, কেউ হাসছে, কেউ মোবাইল তুলে ভিডিও করছে।

তমন্না বলে, “আমি করিনি... ওটা আমার ফোনে ছিল ঠিক, কিন্তু ভিডিওটা আমি করিনি।”

“তুমি ওই ফ্ল্যাটে ছিলে?”

“ছিলাম।”

“তুমি জানো ভিডিও তোলাটা কার কাজ?”

“হয়তো আমার বন্ধুদের কেউ…”

“তারা তোমার বন্ধু?”

“হ্যাঁ।“

“তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে এখানে?”

সে কথা আপনাকে বলতে বাধ্য নই!”

এখানে তোমার জেদ দেখিয়ে লাভ নেই, যা জিজ্ঞেস করছি উত্তর দাও!”

“আমরা সবাই সবার বন্ধু।”

“তাহলে তো ওপেন সেক্স!”

“মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ।”

এস আই দীপঙ্কর ঘোষ হাসলেন।

“তুমি শেয়ার করেছিলে?”

তমন্না এবার চুপ।

একটা দীর্ঘ নীরবতা। তারপর অফিসার বলেন, “এই ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এমনকি কিছু লোক ওটাকে পেমেন্ট দিয়ে পাচ্ছে। ডিজিটাল ট্রাফিক বেড়েছে কয়েকশো শতাংশ। ভিডিওর হ্যাশট্যাগে তোমার নামও লেখা হচ্ছে।”

তমন্না এবার বলে, “আমার ফোনটা কয়েকবার ওরা নিয়েছিল, আমি বুঝিনি... আমি শেয়ার করিনি।”

থানার বাইরে পার্থিব ও শ্রেয়সী দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ি গিয়েছিল নামে মাত্র। স্থবিরের মতো বসেছিল কিছুক্ষণ শুধু। শ্রেয়সী তবুও কাঁদতে পারছে। পার্থিব চৌধুরী তো কাঁদতেও পারছেন না।

এস আই এসে জানালেন, “স্যার, আপনার মেয়ের মোবাইল থেকে আপত্তিকর ভিডিও পাওয়া গেছে। এখন এটি ‘পক্সো অ্যাক্ট’ ও ‘আইটি অ্যাক্ট 67’ এর আওতায় আসছে। এটা গুরুতর অপরাধ।”

পার্থিব যেন মুহূর্তে পাথর হয়ে গেলেন।

“আপত্তিকর মানে... পর্নোগ্রাফিক?”

“সোজা কথায় বলতে গেলে, হ্যাঁ।”

শ্রেয়সীর পা দুম করে ভেঙে পড়ে।

“ওরে বাবা গো... তমন্না, তুই এটা কী করলি!”

পার্থিব আর ফোন করলেন না কাউকে। তিনি মাথা নিচু করে বসে রইলেন। এখন আর মেয়েকে বাঁচাতে চাইছেন না, শুধু ভাবছেন, সব শেষ হয়ে গেল। সামনে অন্ধকার। তমন্নার জীবনটা কি নতুন করে গোছানো যাবে আবার?

কোর্টে যাওয়ার জন্য পুলিশ ভ্যান এলো। তমন্না চুপচাপ বসে। চোখে জল নেই, মুখে অনুশোচনা নেই। সে কেমন শূন্য।

একজন মহিলা অফিসার ধীরে এসে বললেন, “চলো, গাড়িতে ওঠো। কোর্টে নিয়ে যাবো। আজ ম্যাজিস্ট্রেটের মুখোমুখি হতে হবে।”

তমন্না মায়ের দিকে একবার তাকায়। শ্রেয়সী জিজ্ঞেস করেন, “তুই কেন করলি রে মা এমন? এসব কী? তুই কেন বদলে গেলি?”

থানার গেটের সামনে ছাউনিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুলিশ ভ্যান কাছে চলে আসে। মেয়েদের জন্য রাখা ভ্যানে ওঠানো হলো তমন্না ও তার দুই বান্ধবীকে, সঙ্গে বেশ কয়েকজন মহিলা কনস্টেবল। অন্য গাড়িতে ছেলেগুলো। সকলের মুখে মাস্ক, পুলিশের নির্দেশে ভিডিও তোলাও নিষেধ।

ধর্মনগর আদালতের সামনে ভ্যানটি এসে দাঁড়ালো। পার্থিব ও শ্রেয়সী কোর্টে আগে থেকেই অপেক্ষা করছেন। তাঁদের পাশে অ্যাডভোকেট তাপস রায় — শহরের অন্যতম অভিজ্ঞ ক্রিমিনাল ল’ ইয়ার। তিনি প্রথমেই বললেন, “আমি জানি, আপনি প্রভাবশালী লোক। কিন্তু এখন আমাদের একমাত্র পথ — ন্যায়বিচার চাওয়া, না হলে মিডিয়া এই ঘটনাকে জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে। তমন্নাকে ‘ভিকটিম’ হিসেবে প্রমাণ করতে হবে।”

ঘড়ির কাঁটা এগোয়, ১১টা ২০ বাজে। কোর্টরুমে ম্যাজিস্ট্রেট মীনাক্ষী দেববর্মা ঢুকলেন — ঠান্ডা মাথার, কিন্তু শোনা যায় বেশ অভিজ্ঞ। কেসের বর্ণনা পড়ে শুনিয়ে বললেন, “অভিযুক্ত ছয়জন – তিনজন ছেলে ও তিনজন মেয়ে — সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর পরিবেশে ‘অশ্লীল কার্যকলাপ’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে আটক হয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আইটি অ্যাক্ট 67 (A), পক্সো অ্যাক্ট, এবং সাধারণ চুক্তিভঙ্গ (Indian Penal Code Section 294)। এখন প্রশ্ন হলো, তাদের পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হবে কি না!”

উকিল তাপস রায় গলায় বেশ জোর এনে বলছেন, “আপনার মাননীয়তা, তমন্না চৌধুরী একজন কলেজ স্টুডেন্ট। তার পরিবার এই সমাজের সম্মানীয় নাগরিক। সে হয়তো ভুল বন্ধু নির্বাচনে একটা পরিস্থিতিতে জড়িয়ে পড়েছে — কিন্তু সে অপরাধী নয়, অপরাধের শিকার মাত্র। যেহেতু ভিডিওটি সে শেয়ার করেনি, বরং তার ফোন ব্যবহার করে অন্য কেউ করেছে — এবং সাইবার রিপোর্টে এখনো তার হস্তক্ষেপ প্রমাণ হয়নি — তাই অনুগ্রহ করে তাকে জুডিশিয়াল কাস্টডি নয়, জামিনে মুক্তি দেওয়া হোক। সে যদি পুলিশ হেফাজতে থাকে, তাহলে আরও ট্রমার শিকার হবে — সামাজিকভাবে, মানসিকভাবে। একজন কিশোরীকে হেফাজতে রেখে শাস্তি নয়, সুযোগ দেওয়া হোক।”

ম্যাজিস্ট্রেট মীনাক্ষী দেববর্মা চুপচাপ কিছুক্ষণ চোখ নামিয়ে নথিপত্র দেখলেন। তারপর বললেন, “সত্যি বলতে গেলে, এখনকার তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি অ্যাক্সেস পাচ্ছে এমন জিনিসের, যা ওদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে। আমি ভিডিও ক্লিপিংসের একটি প্রিভিউ দেখেছি। এটিকে একতরফা দোষ দিয়ে বিচার করা যায় না।

তবে ভিডিওর সোর্স এখনো অজ্ঞাত — এবং তা যেহেতু সামাজিকভাবে মারাত্মক রকম ভাইরাল হয়েছে, তাই তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তদের কিছুদিন পুলিশ হেফাজতে রাখার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য মনে করছি।”

পার্থিব চৌধুরী এসব কিছুই শুনছেন না, পাগলের মতো ফেসবুক দেখছেন শুধু। খুললেই তাদের পরম আদরের মেয়ে তমন্নার খবর নর্দমার জলের মতো ভেসে আসছে। ভিডিওর ক্লিপের নিচে "এই দেহব্যবসার পেছনের মাথা কে?" এমন হেডলাইন।

শ্রেয়সীর চোখের নিচে একরাতের মধ্যে ডার্ক সার্কল পড়ে গেছে। পার্থিববাবু স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন, আমরা শেষ হয়ে গেলাম। এই ভিডিও ক্লিপিং কোনদিনই ডিলিট হবে না তাই না! তমন্নার বেঁচে থাকার সঙ্গে আমাদের জীবিত থাকার প্রত্যেকটি সেকেন্ডে ক্লিপিংটা শুধু ঘুরতেই থাকবে।

পুলিশের ভ্যানে তমন্না উঠে গেল। সে একবার মা বাবার দিকে তাকাল। কিন্তু তারা কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না।

তমন্না হঠাৎ যেন প্রাণপণে বলতে চাইল, মা-বাবা তোমরা বেঁচে থাকো প্লিজ! আমাকে আরো একটিবার সুযোগ দিও, আমি আবার নতুন করে শুরু করব সব দেখো! মরব না, ভীষণভাবে বাঁচতে চাই তোমাদের নিয়ে! কিন্তু তার গলা থেকে কথা বেরুচ্ছে না, একটি অদ্ভুত ফ্যাঁসফ্যাসে আওয়াজ  দুর্বল পাখির মৃদু শিসের মতো আদালত চত্বরে হারিয়ে গেলো।

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন