কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

আবু তাহের

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

জীবনের ধারাপাত

ফিরফিরে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে শরীর। সে মনে ভাবছে, ঠান্ডাটা যেন লেগে না যায় বাবার। আজকাল আবার কী সব নতুন নতুন জ্বর আসছে বাজারে। নতুন নতুন রোগ, নাকি এইসব বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর জালিয়াতি! বুঝতে পারে না সে।

এই তো আগের সপ্তাহে বাবাকে বুকের নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। মেডিকেল কলেজ। সেখানে যে ডাক্তারের আন্ডারে ভর্তি ছিল, উনি নিজে খুব যত্ন করে দেখেছিলেন। তারপর পাঁচ দিনের মাথায় ছুটিও দিলেন। কিন্তু না, বাড়ি এসে আবার যে কে সেই। মনে হচ্ছে বুকের একেবারে ভেতরে সেঁধে বসে আছে। তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করার সাধ্য কার আছে। মনে হচ্ছে সাঁড়াশি দিয়ে টেনে বের করতে হবে। ঘড়ঘড় করে কেশেই যাচ্ছে। আর হাঁপাচ্ছে অনবরত।

বাড়িতে নেবুলাইজার করার সময় একটু ভালো থাকে, তারপর আবার যে কে সেই। যমে-মানুষে টানাটানি লেগেই আছে।

"তুমি ভালো ডাক্তারের কাছে দেখাতে পারছ না?"

"ভালোই তো ডাক্তারের কাছে দেখালাম।"

"মেডিকেল কলেজের আবার ভালো ডাক্তার হয় নাকি?

“কেন, সেখানে তো সব প্রফেসর ডাক্তারের ছড়াছড়ি।"

"তারা অত বড় ডাক্তার নয়। তুমি বরং চেম্বারে দেখাও।"

মোহিনী বাবাকে খুব ভক্তি করে। আর বাবা মানুষটাও খুব নিরীহ ধাঁচের। সেই কারণে কোনোদিন উচ্চবাচ্য, কথা-কাটাকাটি এইসব থেকে দূরে থেকেছে। আজকাল প্রাইভেট চেম্বারে দেখানোর নানান ঝক্কি। তার ওপর একপালা টাকা-খরচ। তাই পারতপক্ষে প্রাইভেটের ধারেকাছে ভেড়ার চেষ্টা করে না সে। যেমনভাবে তাদের টিউশন পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে সরকার, তেমন সরকারি ডাক্তারের চেম্বার করাও বন্ধ করা দরকার ছিল। সরকার শুধু টিচারদের বেলাতেই কড়া হতে পারে।

"তোমার শুধু এক কথা?"

"তোমার ডিউটি আর ডাক্তারদের কাজ কি এক হলো? তাদের রাত জাগতে হয়। দিন নেই, রাত নেই হাসপাতালে পড়ে থাকতে হয়।"

মুখের ঝামটা মেরে কথাগুলো বলে মোহিনী। মোহিনীর এই যুক্তির আড়ালে অবশ্য অন্য গন্ধ পায় শিশির। কারণ মোহিনীর ভাই গত বছর মেডিকেল এন্ট্রান্স পাশ করে উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজে পড়ছে এখন। তার আগে অবশ্য সেও ডাক্তারদের নিয়ে নান সমালোচনা করত। এখন বললে স্বীকার করবে না। নানারকম যুক্তি দেখাবে।

লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কোমরে ব্যথা ধরে যায় সরকারি হাসপাতালে গেলে। তারপর ডাক্তার এক মিনিট দেখারও সময় পায় না। কারণ ডাক্তারের অনেক তাড়া। দুটোর মধ্যে আউটডোরের সব পেশেন্ট দেখা শেষ করতে হবে। দু-একজন ডাক্তার আছে যারা নিজেরা ধীরে-সুস্থে পেশেন্ট দেখে। তাদের দেরি হলে অবশ্য ফার্মাসিস্ট, গ্রুপ ডি স্টাফ, গেটম্যান—সবার খুব রাগ হয়।

পেশেন্টদের কান ভাঙিয়ে বলে, "ওর কাছে যাবেন না। ওষুধে কাজ হয় না। অমুকের কাছে দেখান, তাহলে তাড়াতাড়ি ফল পাবেন।"

একশ্রেণির কর্মচারী আছে, তারা তো আরেক কাঠি ওপরে। তাদের দাবি হলো তারা প্রাইভেটে সুন্দরভাবে দেখিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। এইরকমভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে নিজের কাজ-কারবার বন্ধ করে এখানে পড়ে পড়ে হত্যা দিতে হবে না।

আর দেখার কী ছিরি! এক ঘণ্টা লাইন দিয়ে এসে এক মিনিট দেখেই "ভাগো ভাগো" ভাব।

সুপ্রকাশকেও এরকম একজন ধরেছিল। "আপনি লাইনটা দেখেন তো ওনার।" বলে চোখ রাঙিয়ে পাশে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল, "দাদা, এত কষ্ট কেন করছেন? এই গরমে লাইনে দাঁড়িয়ে কোনো মানে হয়? পোশাক-আশাকের দিকে কায়দা করে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল, আপনাকে দেখে তো ভালোই ভদ্রলোক মনে হয়। আপনি কেন নিজের কাজ-কাম ছেড়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাপিত্যেশ করবেন? চলেন, আপনাকে দেখিয়ে দিচ্ছি। লাইন দেওয়ার ঝক্কি নেই। একদম ফার্স্ট ক্লাস ডাক্তার, ব্যাঙ্গালোর থেকে আসছে।"

সুপ্রকাশ চোখ কটমট করে বলেছিল, "তোমার ব্যাঙ্গালোরের ডাক্তারকে বোলো ব্যাঙ্গালোরেই ট্রিটমেন্ট করতে। এখানে এসে খেপ না খাটতে।" বলেই লাইনে এসে দাঁড়িয়েছিল।

আজ শহরে কোনো বড় নেতা আসছে। মন্ত্রী গোছের। তাতে শহরের বেশ কয়েকটি রাস্তা ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। সোজা বাজারের রাস্তাটি অবশ্য খোলা আছে। বাজারে গিয়ে তরিতরকারি আর মাছ কিনে বাড়ি ফিরে তাড়াহুড়ো করে স্নান সেরে স্কুলে বেরোনোর পরেই আবার ঝিমঝিম করে বৃষ্টি শুরু হলো। এই বৃষ্টিতে স্কুটার চালানো মুশকিল। রেইনকোট পরতেও ঝামেলা মনে হয়। আবার ছাতা ধরে স্কুটার চালানো রিস্কি। যেকোনো মুহূর্তে ছাতা উড়ে যেতে পারে। নাহলে অ্যাক্সিডেন্টের ভয় থাকে। যাইহোক, কোনোমতে ছাতা ধরে স্টেশনে পৌঁছে খবরের কাগজটা নিয়ে ট্রেনে চেপে চলল তার গন্তব্যের দিকে।

আজ এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে ট্রেনের কামরায় উঠেছে। ওদের উচ্ছল, উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে নিজের কলেজ বেলার কথা মনে পড়ে গেল। সেই কত বছর আগে নিজের কলেজ জীবন পার করে এসেছে। তখন এমন স্বাধীনতাও ছিল না, আর ঘুরতে যাওয়ার এইরকম বাহারও ছিল না। তবুও তার আনন্দ লাগে ওদের দেখে। নিজের ছোটবেলার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য মনে মনে ওদের ধন্যবাদ দেয়। তার মনের গ্লানিগুলো দূর হয়ে যায়। গতির কাছে মানুষ নিরুপায়। কোনো রাগ, অভিমান, হিংসা পুষে রাখতে দেয় না সে 

ফিরে আসার তীব্র বাসনা আজ। সত্যি, বাবার পাশে বসে কতদিন ঠিকঠাক গল্প করা হয়নি। কতদিন বাবাকে জড়িয়ে ধরা হয়নি। মায়ের সঙ্গে টুকটাক কথা হয়। কিন্তু বাবার সঙ্গে তো যোজন যোজন দূরত্ব। এই দূরত্ব গতির কাছে হার মেনে যায়।

আজ আকাশে মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। বর্ষার দিনে এই এক সুবিধা। ঘরে বসে দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যায় পুরো বেলাটা। স্কুলের স্টাফরুমের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনটা কোথায় উড়ে চলে যায়। এই সেই জানালা, যেখান থেকে সামনের বিশাল স্কুল মাঠটা দেখা যায়। ওপাশে ঘোষবাবুর আমবাগান। এদিকে বিডিও অফিস। বামদিকে পুলিশথানা। কতদিন সে এইরকম করে ভাবেনি। কলেজের ছেলেমেয়েগুলো আজ তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। তাদের জন্য হয়তো বড় কোনো অঘটন থেকে সে বেঁচেছে।

প্রথমে তার হাত-পা ভয়ে ভয়ে কাঁপছিল। ছেলেগুলো তাকে ধরে সিটে বসিয়ে দিয়েছে। তারপর স্কুলের দু-পাঁচজন সহকর্মী ছিল ট্রেনে। তারাও এসে খোঁজখবর নিয়েছে। কী ভাবতে ভাবতে এমন হলো? এমন অন্যমনস্ক তো সে কখনো হয় না! মোহিনীর কথাগুলোই হয়তো তার কানে বাজছিল।

সে নিজে কোনোদিন ফাঁকিবাজি করেনি। তবুও তাকে এই ধরনের হীন কথা শুনতে হলো। যাকগে। সেইসব কথা সে মনে করতে চায় না এখন। আবার বেঁচে ফেরা। আবার জীবনে ফেরা। স্কুল মাঠের ওপ্রান্তে গরু চরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি।

তার ভালো লাগছে। এই বৃষ্টিমুখর দিনটা তার বেশ লাগছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে। টিফিনের সময়টা সে স্টাফরুম থেকে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। একসময় এই স্কুলেই সে পড়ত। আজ এই স্কুলে সে পড়ায়। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে রাস্তাঘাটে সব জায়গায় আড়ি পাতলেই শোনা যায়, "মাস্টাররা আজকাল আর পড়ায় না। শুধু ফাঁকিবাজি করতে স্কুলে যায়।"

গভীর এক আত্ম-অনুশোচনায় সে ভোগে। পাশের জর্জিসকে জিজ্ঞেস করলে সে অভয় দেয়, "আরে, এইসব ভাবছিস কেন তুই? নিজের কাজটা শুধু করে যা।"

স্কুলের রেজাল্ট কিছু বছর থেকে একদম ভালো নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেসব দেওয়াও যায় না।

কেন এমন হচ্ছে? ভালো ছেলেমেয়েগুলো সব চলে যাচ্ছে এদিক-ওদিক প্রাইভেট স্কুলে।

হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে। পকেট থেকে বের করে দেখে মোহিনী। এই সময় তো সে ফোন করে না। তাহলে কি কোনো অঘটন ঘটল?

কানে দিতেই ওপার থেকে মোহিনীর গলা ভেসে এল, "শোনো, বাবা কেমন গোঙাচ্ছে গো। তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো।"

"আমি আসছি শিগগিরই। তুমি একবার চেম্বারে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করো।"

"আচ্ছা, তোমার বাড়ি আসার দরকার নেই। ওখান থেকেই সরাসরি চেম্বারে চলে এসো তুমি।"

ঝটপট ফোনটা কেটে দিয়েই ভাবে, আজকে তো টিফিনের পরে একটাই ক্লাস ছিল তার — এইট বি।

বাড়ি ফিরে চেম্বারে গিয়ে দেখল বাবা ঠিক আছে। ডাক্তার কয়েকটা ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দিলেন। সে বুঝল, অনেকগুলো ফাঁড়া আজ তার জীবন থেকে ক্রমাগত সরে সরে যাচ্ছে।

আকাশ এখন কিছুটা পরিষ্কার। রাতের আকাশে ইতিউতি তারা দেখা যাচ্ছে। ঝকঝকে নয়। আবার খুব অন্ধকারও নয়। ঠিক তার জীবনের মতো!

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন