কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

নিবেদিতা আইচ

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

ওটিপি

“এই রে, আরেকবার পাঠাতে হবে!”

বাজারের ব্যাগটা মেঝেতে রেখেই ভেতরের ঘরের দিকে ছুটলেন দিতি। দরজায় খিল দিয়েছেন কি দেননি, সেদিকে খেয়াল করার সময় নেই। আলু, পটল, টমেটো টপাটপ বেরিয়ে এসে ফ্লোরে গড়াগড়ি খেতে লাগল। একহাতে ফোন ধরে আছেন, আরেকবার কোডটা পাঠাতে বলতেই মেয়ের গলায় বিরক্তি ঝরে পড়ল।

দিতি কাচুমাচু হয়ে বললেন, "স্যরি।”

মনে মনে বিড়বিড় করলেন, আজকাল সবকিছুরই মেয়াদ যেন ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ডের মতো। দু'মিনিট দেরি হলেই শেষ।

মেয়ের দোষ নেই। প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় ঠিক এসময় দিতিকে ভিডিওকল দেয় ঝুমি, এ তো জানা কথা। ওখানে তখন সাত সকাল। দিতি তবুও মাঝেমাঝে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ফোন হাতের কাছে রাখতে ভুলে যান। আজ অবশ্য বেরিয়েছিলেন খুব দরকারেই। গলির সামনের দোকান থেকে ফোনের জন্য নতুন একটা চার্জার কেনার ছিল। হঠাৎ মনে হল হালকা একটু বাজার না করলেই নয়; একটু হেঁটে এগোলেই তো সুপারশপ। কফি ফুরিয়েছে, সঙ্গে সল্টেজ বিস্কুটও।

ওয়াইফাই কানেক্ট হতেই জিহ্বায় কামড়, তিনটা মিসড কল। ঝুমির গলায় রাজ্যের বিরক্তি।

“আবার পাঠিয়েছি, মা; এবার বলো, কুইক!”

অর্ধেকটা মুখ দেখা যাচ্ছে। কোডটা বলতেই খোশমেজাজী স্বরে ঝুমি বলে উঠল- যাক বাবা, এতক্ষণ পর ইমেইলে লগ ইন করা গেল!

তারপরেই বলল- “বাজার থেকে কী আনলে? জানো, আজকে সর্ষে ইলিশ ট্রাই করব, গতকাল ইন্ডিয়ান শপ থেকে কিনে এনেছি!”

দিতি বললেন- ”সর্ষে ইলিশ! পারবি তো?”

-”কেন পারব না? ইউটিউব দেখে করে নেব! তুমি কি রাঁধলে আজকে?”

দিতি ফোনের স্ক্রিনে মেয়েকে ভাল করে দেখেন।  গত দু'মাসে ঝুমি অনেকটাই রোগা হয়ে গেছে। ঘুমের ঠিক নেই।

-”কীরে ঝুমঝুমি, ভাতটাত খাস না নাকি?” কথাটা মনে মনেই বললেন হয়ত, তাই ঝুমি শুনতে পেল না। ঝুমঝুমি থেকে সত্যিই ঝুমি হয়ে উঠেছে সে। ফেসবুক আইডিতেও ‘নীহারিকা’ থেকে ‘রিকা’ হয়ে গেছে।

ঝুমি একটানা নিজের কথা বলে চলল। উইকেন্ডে বাজার করবে, লন্ড্রি করবে, সপ্তাহের শেষের দিকে দুটো পরীক্ষা, এক মেক্সিকান পরিবারের সঙ্গে ডিনারের নিমন্ত্রণ, কী উপহার দেয়া যায়- এইসব। এইসব বলতে বলতে সে কপাল থেকে চুল সরায়, কফির মগে চুমুক দেয়। দিতি চুপচাপ শোনেন।

ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাতের খাবার সেরে নেন দিতি। শোবার আগে চুল বাধার সময় একটু টিভি চালিয়ে দেন। নিচে একের পর এক নিউজ দৌড়ে যায়- বিদেশে পড়তে গিয়ে নিখোঁজ বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর খোঁজ মিলছে না, সমুদ্রের তলদেশে অপটিক্যাল কেবল ক্ষতিগ্রস্ত, কয়েকটি দেশে ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত, নতুন অভিবাসন নীতিতে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা। শব্দগুলো শেষ অবধি পড়ার আগেই হুটোপুটি করে হারিয়ে যেতে থাকে। মাথার দু'পাশ টনটন করে ওঠে দিতির।

সেই মাথা ধরা নিয়েই ভোরবেলা ঘুমটা ভাঙ্গল, অফিসের কাজের ফাঁকেও সারাদিন সে নিজের অস্তিত্ব জানান দিয়ে গেল। প্রেশারটা হয়ত বেড়েছে, একবার দেখা দরকার। দিতি ঠোঁট ওল্টান, নিজেই নিজেকে বলেন-মাপলেই কি প্রেশারটা কমে যাবে?

মাসের শেষ দিক, অফিসে প্রচন্ড ভিড়। এ অবস্থায় মাথার ভেতরে কুয়াশা জমলেই হিসেবের গড়মিল। কী অসহ্য গরমও পড়েছে। একটু হেঁটেই ঘেমে নেয়ে গেছেন দিতি। এককাপ চা অর্ডার দিয়ে ফাঁকা দেখে একটা টেবিলে বসলেন। কাউন্টারে হালকা ভিড়। রোকেয়া আপা বিল দিচ্ছেন, ওখান থেকেই হাত নাড়লেন একবার। দিতি মাপা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে চোখ রাখলেন।

রোকেয়া আপাকে দেখেই রুপমের কথা মনে পড়ে গেল। তাদের কলিগ হাসান ভাইয়ের ছেলে রুপম,  বুয়েটে থেকে বেরিয়ে গত বছর বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। গত সপ্তায় ওর মৃত্যুর খবর এসেছে। অফিসে সবাই এখন সেটাই আলোচনা করছে।

রোকেয়া আপা বলছিলেন- “এ কারণেই আমার ছেলেকে যেতে দিইনি, চোখের সামনে থাকুক। অ্যাম্বিশান বড় নাকি জীবন?”

দিতি শুধু হু-হা করেন। ঝুমিকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তাটা  বাড়তে থাকে। সেই যেদিন প্রথমবার স্কুলে গেল, সেদিনকার কথা এখনো মনে পড়ে। রুইতন শেইপের গ্রিলের ওপাশে ছোট্ট একটা মুখ, দু'গালে শুকিয়ে আসা কান্নার দাগ। ফোন পেয়েই ছুটে গিয়েছিলেন দিতি, তবু ফেরার সময় পুরো রাস্তা একটাও কথা বলেনি অভিমানী ঝুমি।

আজকাল অবশ্য দিতিই হয়ত বেশি অভিমান করেন। পুরো সপ্তাহে শুধু একবার কথা বলে মন ভরে? অভিমান দেখাতে গেলেই ঝুমি বলে ওঠে- “ভিসার অ্যাপ্লাই করে দিচ্ছি, ছ'মাস থেকে যাও আমার কাছে।”

অমনি এক অদৃশ্য সুতো ভেতর থেকে তাকে টেনে ধরে রাখে। সেকথা মনেই রেখে দিয়ে দিতি হেসে উঠে বলেন- অত লম্বা ছুটি মঞ্জুর হবে না। আর অমনি ঝুমি রাগ করে ফোন রেখে দেয়।

ওর যাবার আগে ভর্তিপ্রক্রিয়া আর ভিসার প্রস্তুতিতে দিতি প্রায় সপ্তা তিনেক ছুটি কাটিয়ে ফেলেছেন। ইন্টারভিউয়ের দিন দিতি ভোর থেকে জেগেছিলেন। ঝুমির পাসপোর্ট, কাগজপত্র, ছবি-সব বারবার করে দেখে নিয়েছিলেন। ঝুমি তখন বিরক্ত হয়ে বলেছিল- তুমি প্রায় দশবার চেক করে ফেলেছ! দিতি হাসতে পারেননি। দশবার নয়, আরও একশবার দেখলেও যেন মন ভরত না। এয়ারপোর্টে বিদায়ের সময় ঝুমি কড়াগলায় বলেছিল- “মা, কাঁদবে না কিন্তু।”

দিতি সেদিন কাঁদেননি। খুব কষ্ট করে পুরোটা সময় হাসিমুখ ধরে রেখেছেন আর বারবার বলেছেন-”পৌঁছে ফোন করিস।”

সেই মেয়েকে কাছে পেতে সাতসমুদ্র পাড়ি দিতে হবে। শুধু অচেনা পথে নামার ভয় নয়, সত্যিই ছুটির সুযোগ নেই এখন। সদ্য প্রোমোশনের পর অফিসে দায়িত্ব অনেকটা বেড়ে গেছে, অভ্যস্ত হতে সময় লাগছে বলে এখনো তাকে হিমশিম খেতে হয়।

এদিকে প্রোমোশনের পর অফিসের ওরা খুব করে ধরেছিল বলে সেদিন দুপুরে বাড়িতে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেছিলেন। আড্ডার ফাঁকে জানা গেল রোকেয়া আপার ছেলে বাড়ি ছাড়বে শিগগিরই, বান্দরবানে পোস্টিং হয়েছে, সামনের মাসে জয়েনিং। ছুটিছাটায় না এলে তিনি নিজেই ছুটে যাবেন ওখানে। এভাবে একা থাকতে হবে সেকথা কখনো ভাবতেই পারেননি আপা।

কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান দিতি, এই প্রথমবার তার মনে হয় বান্দরবান আর ক্যালিফোর্নিয়া তো সমান দূরত্ব। নিশ্চয়ই রোকেয়া আপারও তাই মনে হচ্ছে এখন। মনে মনে নিজেকে প্রশ্ন করেন দিতি- আচ্ছা, একা নয় কে? সবাই যার যার নিজস্ব বুদবুদে বন্দি থাকা মানুষ, হাসিকান্নার ভার নিজেকেই বয়ে নিতে হয়। ওটিপির মতো মেয়াদ ফুরোলেই চোখের পলকে ফসকে যায় সবার নাগাল।

তবে একা একা থাকাটাও প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। আজকাল ব্যাপারটা উপভোগও করতে শুরু করেছেন দিতি। একেকটা সপ্তাহ চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়, মন খারাপের অবসর খুব একটা হয় না৷

বাজার করতে বেরিয়েছেন দিতি। দুটো বড় রুই মাছ কেনা হল, মাথাগুলো দিয়ে মুড়িঘণ্ট করলে বেশ হবে আর তরতাজা মিষ্টিকুমড়ো দিয়ে চিংড়ির মাখোমাখো ঝোল। এসব রান্না ঝুমি বেশ পছন্দ করত। আজকাল সে নিজেও রাঁধুনি হয়ে উঠেছে। ইউটিউবে যতই রেসিপি থাকুক, মাঝেমাঝে দিতির কাছে সে ধন্না না দিয়ে পারে না।

বাজার সেরে তাড়াহুড়োয় ফেরা হল আর বাড়ি ফিরতেই ভিডিওকলটা এলো। ওপাশ থেকে ঝুমির গলা ভেসে এলো- ?মা, কুইক! এইমাত্র একটা কোড পাঠিয়েছি।”

দিতি হেসে বললেন- “আগে তোর মুখটা দেখি!”

ঝুমি একটু বিরক্ত হয়, তারপর ফোনটা একটু দূরে সরায়; পুরো মুখটা দেখা যায় এবার। দিতি দেখেন সাদা জানালা দিয়ে আপেলের মতো সকালের আলো ঢুকছে ঝুমির ঘরে।

“নতুন ফোন নম্বর নিয়েছিস?”

“কেন জানতে চাইছ, মা? তখন কিন্তু আমার ফোনেই কোড আসবে।”

ওর মুখে সেই ছোটবেলার ঝুমিকে দেখতে পান, যখন রাগ করে ঠোঁট ফুলিয়ে রাখত। দিতি আবার হেসে ফেলেন।

কথা শেষ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকেন তিনি। কপালের ওপর হাত রেখে মনে মনে হিসেব করেন-শনিবার আসতে আর ছয় দিন। ছোটবেলায় ঝুমি যেমন অপেক্ষায় থাকত, শুক্রবার এলেই পার্কে বা চিড়িয়াখানায় বেড়াতে যাবে বলে; দিতিও আজকাল তেমন অপেক্ষায় থাকেন।

তবু দিনগুলি যেন উড়ে উড়ে চলে যায়, দিতির চুমকি বসানো ওড়না পিঠে লাগিয়ে ঝুমি যেমন প্রজাপতির মতো এঘর থেকে ওঘরে ছুটে বেড়াত। দিতি জানেন, এই ছয় দিনের শেষে হয়তো আবার একটা ওটিপি আসবে। কয়েকটা সংখ্যা মাত্র, যার মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে দু'মিনিটে; কিন্তু তার আগেই পৃথিবীর দুটো প্রান্ত একই ঘরে এসে বসবে।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন