কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / ষষ্ঠ সংখ্যা / ১৪৫

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

শ্যামল ভট্টাচার্য

 

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

মহাকর্ষের ছায়া

 


(এক)

তাপস এখন উড়তে পারে। ওড়বার সময় সে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ক্ষমতাটা তার ভিতরে এসেছে। আসলে বেশ কয়েকদিন ধরে তার অন্য মানুষের সঙ্গে অর্থাৎ বিভিন্ন রকমের রাজনীতির সঙ্গে, মানে এক কথায় সমাজের সঙ্গে, এমনকি সমগ্র প্রাকৃতিক পৃথিবীর সঙ্গেও এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছিল। কিছুতেই কার‌ও সঙ্গে এবং কোনও কিছুর সঙ্গে আর নতুন করে সংযুক্ত অনুভব করার প্রশ্নই ছিল না, কেননা সে আর সেটা চায়ও না।

তাপস আসলে খুব করে চাইছিল জীবনের একটা বাঁক। সেই বাঁকটা কিরকম হবে সেটা নিয়ে ভাবতে চাইলে ইদানিং পুরীর সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে দেখা বড় বড় ঢেউগুলোর ভেঙে যাওয়ার দৃশ্যই মনে আসতো তার। কি সুন্দরভাবে বেঁকে গিয়ে প্রত্যেকটা ঢেউ ভেঙে আবার মিশে যায় সমুদ্রের একাকার বিস্তৃতির সঙ্গে। যেন একটি ঢেউয়ের যতটুকু অহংকারী উদ্ধত ফুলে ওঠা তা এক প্রকার শান্তি এবং তৃপ্তি পায় ওইভাবে বেঁকে, ভেঙেচুরে যাওয়ার ভিতরে। অসীম বিস্তৃতির অনুভব সবসময় একটা আলাদা ধরনের তৃপ্তি আনে, তার তুলনায়, যতই পরিসর থাক, অহংকারের ঔদ্ধত্য আর কতটুকু সুখ হতে পারে?

তবে এটাও ঘটনা, রাত্রিবেলায় পূরীর সমুদ্র সৈকতে যে বিরাট আলোর ব্যবস্থা আছে সেই আলোয় সে ওই ভেঙে যাওয়া ঢেউগুলির শীর্ষে ভাসমান সাদা ফেনাগুলিকেও আকাশের দিকে উড়ে যেতে দেখেছে। দিনের বেলায় সেই উড়ে যাওয়া বোঝা যায় না কিন্তু রাত্রিবেলা এই আলো অন্ধকারের প্রেক্ষাপটে সেই ফেনিল সূক্ষ্ম জলবিন্দুর মেঘের উড়ে যাওয়া নজরে আসে। তার এই ফেনিল মেঘের উড়ে যাওয়া দেখতে বেশ ভালো লাগে। রাতের সমুদ্র সৈকতে ঘন্টার পর ঘন্টা সে এইভাবে বসে সেই ফেনিল উড়ে যাওয়া খেয়াল করেছে। কিন্তু সে নিজেও যে এত দ্রুত এইভাবে উড়ে যেতে সক্ষম হবে তা সে কল্পনাও করেনি।

তবে তার উড়ে যাওয়া সব সময় ঘটে না। শুধু ভোরবেলায় হাঁটতে বেরিয়ে এবং কখনও কখনও রাতের দিকে হাঁটতে বেরিয়ে সে টের পেয়েছে, যখনই সে কোন‌ও নির্জন রাস্তার বাঁক পেরিয়েছে, সেই বাঁক ফেরা রাস্তায় তার পা আর মাটিতে থাকেনি। সে উড়তে শুরু করেছে। তবে সে যে খুব উঁচু পর্যন্ত উড়তে পারে, তা নয়। আগে শুধু পা মাটির উপর ভেসে থাকতো, এখন একটা মানুষের মাথার উপর পর্যন্ত সে উড়তে পারে। আর এই অবস্থায় সে যে অদৃশ্য হয়ে থাকে, সেটা সেই সময় রাস্তায় যেকজন ভ্রমণকারী থাকে তাদের নির্লিপ্ত প্রতিক্রিয়া দেখে সে বুঝে গেছে।

তবে এই উড়ে যাওয়া ঠিক কখন শুরু হবে এবং কতক্ষণ ধরে চলবে তা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। এটা নিজে থেকে শুরু হয় এবং নিজে থেকেই শেষ হয়। তবে এর ফলে সে এখনো পর্যন্ত কোনও বিড়ম্বনায় পড়েনি। নিজের এই উড়তে পারার ঘটনায় প্রথমদিকে সে নিজে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরের দিকে তার মনে হয়েছে, যে মানুষটা তার চারপাশের সমাজ থেকে, সমাজের রাজনীতি এবং ধর্ম থেকে,‌ প্রায় সমস্ত ধরনের রীতিনীতি থেকে, এমনকি এই পৃথিবীতে নিজের দেহগত অবস্থানের ধারণা থেকেও এত বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, তার তো এভাবেই উড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। সে তো কোনোভাবেই এই পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত অনুভব করে না, তাহলে একটা মাধ্যাকর্ষণের যান্ত্রিকতা তাকে আর কতদিন ধরে রাখতে পারবে এই পৃথিবীতে?

অবশ্য মাধ্যাকর্ষণের শক্তি যে চরমতম কিছু নয় তা তো স্বাভাবিক চোখেই দেখা যায়। যা কিছু স্থুল সবই সুক্ষ্ম হয়ে শেষ পর্যন্ত উড়েই যায়। অল দ্যাট ইজ সলিড মেলট্স ইনটু এয়ার। এটাতো সব স্থূল ভৌত জগতেরই সত্য। আর মানুষ তো শুধু ভৌত পদার্থ নয়, সে তার চেতনা, কল্পনা, মানে তার নিজস্ব আধ্যাত্মিকতা নিয়ে ব্যাপকতর, অন্তত এই মাধ্যাকর্ষণের বোধ কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে।

তবে তাপস কিন্তু ভাবেনি, এই বিচ্ছিন্নতার বোধ তাকে এইভাবেই উড়িয়ে নিয়ে যাবে। সে বরং ভেবেছিল, সে নেমে যেতে পারে এমন একটা অতল গহ্বরে যেখানে সে শুধু অনন্তকাল ধরে তলিয়ে যেতে থাকবে, চূড়ান্ত পতনের সফলতাও সে পাবে না কখনও। সেই ব্যর্থতার বোধে তখন সে হয়তো উঠে আসতে চাইবে, সেই অতল গহ্বর থেকে, কিন্তু সেটাও আর তার পক্ষে সম্ভব হবে না তখন। ‌ কিন্তু সেরকম ঘটল না। এখন যে অভিজ্ঞতা তার ঘটে চলেছে নিজের ব্যাপারে সেটা তারই ঐ ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত।

অবশ্য তার ক্ষেত্রেও যে এরকম হতে পারে এটা সে একেবারেই প্রত্যাশা করেনি তা কিন্তু নয়। বিষয়টা হল, সে নিজের ব্যাপারে এত দ্রুত এই ক্ষমতা আশা করেনি। যদিও তার ক্ষেত্রেও যে এরকম হতে পারে সেটা সে অনুমান করেছিল, ভেবেছিল সেটা পরে, আরো কিছুটা বয়স হলে, মানে, মৃত্যু হবার মতো পরিণত বয়সে পৌঁছালে, তার মায়ের মত সেও হয়তো এইভাবে ভেসে থাকার একটা ক্ষমতা পেয়ে যেতে পারে। আসলে তার মায়ের শেষ সময়ে তাপসকে এরকম কিছু অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল।

তাপসের মা যখন মারা যায়, ব্যাপারটা খুবই আকস্মিক ছিল। সে তখন বাড়িতেও ছিল না। সে ছিল স্কুলে। পড়াচ্ছিল। প্রতিবেশীরাই তাকে খবর দিয়ে নিয়ে আসে। তারপর এত দ্রুত ডাক্তারের সার্টিফিকেট থেকে শ্মশান পর্যন্ত সবকিছু ঘটে যায়, সবকিছু ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। সে তখনও ভাবতে পারছিল না যে তার মা আর নেই। এই বিশ্বাস না হওয়াটা কয়েকদিন পর থেকে তাকে প্রভাবিত করতে থাকে। সে স্কুল থেকে ফিরে এসে প্রতিদিনই দেখতো তার মা, তার জন্য নিজের  ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এমন এক আশ্চর্য শান্তি এবং তৃপ্তির অভিব্যক্তি মায়ের সারা মুখে ছড়িয়ে থাকত যে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করত খুব। মনে হতো অন্য কোনও অভিব্যক্তি এসে যেন এই শান্তি আর তৃপ্তির অভিব্যক্তি মুছে না দেয়। এই ভাবনা থেকে সেই মায়ের সঙ্গে কোনও কথা বলতো না। শুধু গদগদ ভাব নিয়ে তাকিয়ে থাকতো মায়ের মুখের দিকে। মা কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকত তার ওই নির্দিষ্ট জায়গাটিতেই। সে যখন চারিদিকে ঘুরে ঘুরে ঘরের নূন্যতম কাজগুলো করত তখন তার মা সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে তাকে দেখতো।

সপ্তাহখানেক এইভাবে যাওয়ার পর এবার একটা পরিবর্তন ঘটতে থাকল। এরপর একদিন সে বাড়িতে এসে ফিরে দেখল, তার মা তার জন্যে ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন বটে, তবে তার পা আর মাটিতে নেই। মাটি থেকে খানিকটা উপরে ভাসছে তার শরীর। তবে তাতে তো তাপসের কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাপস এটা নিয়ে বিচলিত‌ও হয়নি।

কিন্তু দিনের পর দিন তাপস লক্ষ্য করছিল তার মায়ের শরীর আরো কিছুটা উঁচুতে ভাসছে অর্থাৎ দিনের পর দিন তার উচ্চতা একটু একটু করে বাড়ছে। এইভাবে একদিন সে বাড়ি ফিরে দেখল তার মায়ের মাথা ঠেকে গেছে তাদের ঘরের ভেতরের দিকের ছাদে। তাদের ঘরটা এমনিতেই পুরনো আমলের এবং সেই জন্য যথেষ্ট বড়। সেই প্রথম সে একটা চেয়ার টেনে, তার উপরে উঠে, মাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করেছিল সেই উচ্চতা থেকে, যাতে মায়ের কষ্ট না হয়। কিন্তু যতবার সে টেনে নামিয়েছে ততবারই মা ফিরে গেছে আবার সেই একই জায়গায়। খানিকটা গ্যাস বেলুনের মত অবস্থা। সে বুঝতে পারছিল, এইভাবে সে আর মাকে বেশি দিন ধরে রাখতে পারবে না।

এর পরের দিন যখন সে বাড়ি ফিরে আসছে। তখন দূর থেকেই দেখতে পেল তার মা ভাসছে তাদের ছাদের উপরে। তার মাকে যে সে ছাড়া আর কেউ তখন দেখতে পাচ্ছে না, সেটা সেই সময়ই বুঝতে পেরেছিল। মা একই সময়ে ভাসতে পারেন এবং অদৃশ্য হয়ে থাকতে পারেন‌। সেই দিন সে রাত্রিবেলা নিজের ছাদের উপরেই শুয়ে কাটিয়েছিল। মায়ের সঙ্গে অনেক কথাবার্তা বলেছিল। মা সেইসবের যদিও কোনও উত্তরই করেনি। মা শুধু একই রকম শান্তির অভিব্যক্তি নিয়ে তাকিয়ে থেকেছে তার দিকে। তবে তার জন্য সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। এর পরের কয়েকদিনের ঘটনা তার স্কুল থেকে ফিরে এসে ছাদের উপরে রাত্রিবাসে প্রস্তুতি এবং প্রতিটি রাতেই এটা লক্ষ্য করে চলা যে তার মা একটু একটু করে আরো উপরে হারিয়ে যাচ্ছে। এইভাবে একদিন সে যে তার মাকে একেবারেই হারিয়ে ফেলবে আকাশের ঐ নক্ষত্রগুলোর দিকে সে সেটা বুঝতে পেরেছিল। যদিও মা এরপরের রাতগুলোতে দিনের পর দিন অস্পষ্ট হয়ে আসছিল তবু সে প্রতি রাতে ছাদের উপরে রাত্রিবাস থেকে নিজেকে বিরত করতে পারেনি।

এরপর এমন একদিন এল যখন মায়ের ভেসে থাকার আর কোন‌ও স্পষ্টতা ছিল না। ছাদের উপরে শুয়ে আকাশের দিকে তাকালে মায়ের বদলে সংখ্যাতীত নক্ষত্রগুলিই চোখে পড়তো তার। এরপর সে আবার নেমে আসে নিচে। সবকিছু মেনে নিয়ে সে আবার তথাকথিত স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে। তবে তখন থেকেই তার মনে একটা সন্দেহ এসেছিল, মা যেভাবে ভেসে ভেসে হারিয়ে গেল এই পৃথিবী থেকে, একদিন কি এই ক্ষমতা তারও হবে? সেও কি এইভাবে ভেসে ভেসে সমস্ত সীমা অতিক্রম করে চলে যেতে পারবে কোনও অজানার দিকে?

না। তাপস খুব কেউকেটা গোছের কেউ নয়। সে একজন প্রাইমারি স্কুলের টিচার। হতদরিদ্র পরিবার থেকে কষ্ট করে গ্রাজুয়েশন করে সে দীর্ঘদিন টিউশন করে তার সংসার চালিয়েছে। সংসার বলতে ছিল সে এবং তার মা। বাবাকে বহু আগে সেই ছোটবেলাতেই হারিয়েছে। না, তাপসের এখনো বিয়ে হয়নি। অবশ্য বিয়ে করার কোনও সংকল্প এখনও থাকলে তার পক্ষে যে আর এইভাবে উড়ে যাওয়া সম্ভব হতো না সেটা সে এখন টের পায়। সে এখন শুধু বিয়ে থেকে নয়, নারী সঙ্গের কামনা থেকেও বিচ্ছিন্নতা উপভোগ করে। নারীর প্রতি, নারীর প্রেমের প্রতি কৈশোরকালীন রোমান্টিক প্রত্যাশা এবং যৌবনের অন্ধ তাড়না কিছুই তাপস আর অনুভব করে না। এর পিছনে তার নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভূমিকাই যথেষ্ট কারণ। তবে এর পাশাপাশি পৃথিবীর বেশ কিছু মহান সাহিত্য পাঠ এবং তার চারপাশের সমাজে যা কিছু ঘটছে সেসব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলাও অনেকটা ভূমিকা রেখেছে।

যদিও নিজের মাকে নিয়ে যখন এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটা তার ঘটছিল, তাপস কিন্তু তখন সেই অভিজ্ঞতাকে সন্দেহ করেনি। বরং সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু যখন নিজের ক্ষেত্রে এরকম ব্যাপার ঘটতে থাকল তখন তাপসের মনে হয়েছে, এই যে তার নিজের এই অদৃশ্যভাবে উড়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা, এটা এক ধরনের আত্মপ্রতারণা নয় তো? বা এটা কোনরকম অজানা শক্তিতে সংক্রমিত হওয়ার ঘটনা নয় তো? সেই অজানা শক্তি, শুভ না অশুভ বা কোনটাই বা শুভ এবং কোনটাই বা অশুভ, এইসব কূটকাচালি বিচারে তাপসের মন ছিল না।

আসলে তাপস মূলত ভয় এবং একই সাথে এক ধরনের আনন্দ পাচ্ছিল যা যে কোনও মানুষকেই সমস্ত প্রচলিত নৈতিক ভাবনার ওপারে নিয়ে যেতে পারে। তাপস তার পড়াশোনা থেকেও জানে, ইউরোপের মধ্যযুগে কোথাও যদি কোন‌ও অলৌকিক ঘটনা ঘটত তাহলে সেটি শুভ না অশুভ তা বিচার করবার জন্য সেই মধ্যযুগীয় চার্চ চারটি পরীক্ষার বিধান দিত - ভাষার পরীক্ষা, অলৌকিক শারীরিক শক্তির পরীক্ষা, শূন্যে ভেসে থাকার পরীক্ষা এবং দিব্যদৃষ্টি ও ভবিষ্যৎবাণীর পরীক্ষা। যদি কোনও ব্যক্তি মাঝেমধ্যে এমন কোনও ভাষা বুঝতে পারে, বা ভালো, বলতে পারে, যে ভাষা সম্পর্কে স্বাভাবিক অবস্থায় সে সম্পূর্ণ অজ্ঞ; যদি সে শূন্যে ভেসে থাকার মতো শারীরিক অলৌকিক ঘটনা ঘটাতে পারে এবং যদি সে সঠিকভাবে ভবিষ্যৎবাণী বা দূরবর্তী কোনও ঘটনার বর্ণনা দিতে পারে - তবে সেই ব্যক্তিকে শয়তান আবিষ্ট বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, অথবা বিকল্পভাবে, তাকে অসাধারণ অনুগ্রহের প্রাপক হিসেবেও ধরে নেওয়া যেতে পারে; কারণ অনেক ক্ষেত্রে ঈশ্বরের এবং শয়তানের অলৌকিক ঘটনা অভিন্ন হয়ে থাকে। সাধু ভাবাবেশে থাকা ব্যক্তির শূন্যে ভেসে ওঠা এবং ভাবাবেশগ্রস্ত শয়তানের শূন্যে ভেসে ওঠার মধ্যে পার্থক্য কেবল ঘটনাটির নৈতিক পূর্ববর্তীতা এবং পরবর্তী পরিণতির ভিত্তিতেই করা যায়। এই নৈতিক পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনাগুলো মূল্যায়ন করা কঠিন, এবং কখনও কখনও এমনও ঘটেছে যে পবিত্র সাধু‌ও তার অলৌকিক ক্ষমতার প্রদর্শন শয়তানি উপায়ে ঘটিয়েছেন বলে সন্দেহ করা হয়েছে।

অবশ্য সমাজের প্রেক্ষিত থেকে তাপস তার এই হঠাৎ করে পাওয়া সামর্থ্যকে বিচার করে না। এই সমাজকে তার মোটামুটি বোঝা হয়ে গেছে। এই সমাজের প্রভাবশালী অংশ আশা করে, তাঁদের নিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এমন একদল শিক্ষিত সাধারণ মানুষ তৈরি হবে যারা পুরোপুরি সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি তথা স্বার্থের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ থাকবে। বিষয়টি এমন: দোলনায় থাকা শিশুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সঠিক গড়ন দেওয়ার জন্য যেমন অনেক উপজাতিরা কাপড় দিয়ে জড়িয়ে বা বেঁধে রাখে, তেমনই। যেন ঠিক একইভাবে, শৈশব থেকেই ইচ্ছাশক্তিকেও বেঁধে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা প্রবল থাকলেও, ইচ্ছাশক্তিকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ বা ‘বাঁধাই’ করার পরেও, কেউ কেউ অবশ্য মুক্তচিন্তক হয়ে যায় অর্থাৎ ‘কৌশল’ বা ‘পলিসি’র দিক থেকে বিচার করলে, এই ব্যবস্থাটি কখনোই এর নিয়ন্ত্রকদের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর হয় না। আবার সেই মধ্যযুগ থেকে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও লেখকের সন্ধান পাওয়া কঠিন যিনি এটা ধরে নেননি যে এই সমাজ নিয়ন্ত্রকরাই সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি ভেঙে তথাকথিত অবৈধ সুবিধাগুলো সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে। আসলে যত‌ই চেষ্টা করা যাক না কেন, সীমাহীন এই বিরাট আকাশের প্রাচীন ছায়া পৃথিবীর সমস্ত স্থাপত্যশৈলীকে বিহ্বল করে ছড়িয়ে থাকবে সর্বত্রই।

চারপাশের জগত থেকে নিজের এই ক্রমবিচ্ছিন্নতার ভাবকে সামলানোর জন্য তাপস কিছুদিন আগে পর্যন্তও খুব চেষ্টা করেছে। ভেবেছে, মানুষের সমাজ নিশ্চয়ই এর মধ্যে যথেষ্ট উপলব্ধি ও জ্ঞান সঞ্চয় করেছে যা তাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে। দর্শন, সাহিত্য ও মনোবিজ্ঞানের প্রসিদ্ধ লেখকদের গ্রন্থগুলি অধ্যয়ন করতে গিয়ে সে দেখেছে, তারা যে ভাষায় তাদের উপলব্ধি রেখে গেছেন, সে সব এখন মৃতপ্রায় এবং এই মৃত ভাষাগুলো দিনের পর দিন আরও বেশি মৃত হয়ে উঠছে। আবার যে সমসাময়িক ভাষায় তাদের সে উপলব্ধিগুলো অনুবাদ করে ধরে রাখতে চাওয়া হচ্ছে সেই ভাষাও আর ততটা অতিজীবিত নয় যে তা সেই সব উপলব্ধির প্রাণশক্তিকে ধরতে পারবে। তবে সব মিলিয়ে সকলেরই ভাব এরকম যে তারা যে উপদেশ দিচ্ছে তা এই জগতকে সামলানোর জন্য যথেষ্ট সার্থক। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তাপস যেটা বুঝতে পারছে সেটা অন্যরকম। সেটা যথেষ্ট বিদ্রূপাত্মক‌ও বটে। আসলে, সমাধান বাৎলে দেওয়া বা উপদেশ দেওয়া একটি শিল্প, এবং অন্যান্য সব শিল্পের মতোই এখানেও ভালো শিল্পীরা যেমন ততটা ভালো নয়, তেমনই আবার ভালো শিল্পীর চেয়ে খারাপ শিল্পীর সংখ্যাই অনেক বেশি।

তবে সে যে সমস্যায় আছে সেই সমস্যার দর্শন নিরপেক্ষ কোনও রাজনৈতিক সমাধান আছে কিনা, সেই সম্পর্কেও তাপস উৎসাহিত হয়েছিল। সে যেমন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের চরিত্র বিশ্লেষণ করেছে, তেমনি তার চারপাশে যে সমস্ত রাজনৈতিক নেতারা সক্রিয় হয়ে আছে তাদের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখেছে। তার মনে হয়েছে প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যক্তির চরিত্র মোটামুটি একই রকমের। এদের কাছে ভালোবাসার থেকে ঘৃণা ও ক্রোধ অনেক বেশি আনন্দ বয়ে আনে। এইসব মানুষরা জন্মগতভাবেই আক্রমণাত্মক স্বভাবের হওয়ায়, দ্রুত ‘অ্যাড্রেনালিন’-এর নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে। মানসিক উত্তেজনার ফলে নিঃসৃত হরমোন থেকে প্রাপ্ত সেই তীব্র শিহরণ বা ‘কিক’-এর লোভে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই নিজেদের কদর্য প্রবৃত্তিগুলোকে প্রশ্রয় দেয়। তারা জানে যে, নিজের আধিপত্য বা অস্তিত্ব জাহির করার চেষ্টা করলে তা অনিবার্যভাবেই অন্যদের কাছ থেকে পাল্টা ও বৈরী প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে; তবুও তারা অত্যন্ত যত্নসহকারে নিজেদের সেই উগ্র ও ঝগড়াটে স্বভাবকে লালন করে চলে। ফলস্বরূপ, তারা নিজেদের এক ঘোরতর সংঘাতের মাঝখানে বারবার খুঁজে পায়। আসলে এই সংঘাতই তারা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে; কারণ লড়াইয়ের মুহূর্তেই তাদের শরীরের রক্ত-রসায়নে নিজেদের অস্তিত্বকে তারা সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে। আর ‘ভালো বোধ করা’র এই অনুভূতি থেকেই তারা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয় যে তারা আসলে ‘ভালো’ বা সঠিক পথে আছে। অ্যাড্রেনালিন-জনিত এই আসক্তিকে তারা ন্যায্য আবেগ হিসেবে বিচার করে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তাদের এই ক্রোধ বা ক্ষোভ একদম যথার্থ। তাপস নিশ্চিত, এ-ই যদি মোটামুটিভাবে রাজনৈতিক পন্থা হয় তবে তা তাকে কোনও সার্থক সমাধান দিতে পারবে না।

যাইহোক, উড়ে যাওয়ার সময় তাপস নিজের ভিতরে যে ধরনের অনুভব তৈরি হয় সেই সম্পর্কে সচেতন হওয়ার চেষ্টা করেছে। টের পেয়েছে, কেমন একটা গাছের পাতার মতো অনুভব সারা শরীর জুড়ে। শুকনো পাতা নয়, বেশ সরস এক পাতা, যে পাতা দিয়ে বাঁশি বাজানো যায়, যে পাতা দিয়ে তৈরি করা যায় অলংকার, যে পাতা হয়ে উঠতে পারে নারীর পোশাক। আর এই শান্ত উড়ে যাওয়ার ভিতরে তাপস কখনো কোন‌ও অস্থিরতা টের পায়নি। বরং টের পেয়েছে, এই ভেসে থাকা যেন ঠিক এরকমই সরস সবুজ পাতার একটা শান্ত অপেক্ষা, যেন সমস্ত দূরাগত পাখির ডাক মন দিয়ে শুনে নিতে হবে, শুনে নিতে হবে দূরাগত হতে থাকা সমস্ত নদী এবং নক্ষত্রের শব্দ।

যখনই সে এইভাবে উড়ে যায় তখন তার অনেক রকম আশ্চর্য অনুভুতিও খুলে যেতে থাকে যেটা অন্যভাবে এর আগে খোলেনি কখনও। যেমন, বাতাসের প্রবাহ স্পর্শে টের পাওয়া যাক বা না যাক, উড়ে যেতে যেতে সে হাওয়ার ফিসফিসানি শুনতে পায়। সেই হাওয়া যেন সারাক্ষণ একইসঙ্গে সৃজন ও ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করে চলেছে আর সেটা এমন এক ষড়যন্ত্র যার শেষ বলে কিছু নেই। যেন মাটির সঙ্গে বোঝাপড়া করে এই লৌকিক জগতের একটা অলীক প্রেক্ষাপট তৈরি করতে চায় এই বাতাসের ফিসফিসানিগুলি।

শুধু তাই নয়, তার উড়ে চলার সময় চারপাশে, বিশেষ করে কোন‌ও মানুষ থাকলে, বাতাস তার শরীরের গন্ধ ঠিক উড়িয়ে আনবে তার কাছে। সেই গন্ধের ভিতর একটাই জিনিস তাপস চিহ্নিত করতে পারে আর তা হলো ওষুধ। এই মানুষগুলোর সবার গা থেকে শুধুই ওষুধের গন্ধ বের হচ্ছে। ওদের ঘামে, মূত্রে, অন্যান্য বর্জ্যে ওষুধের গন্ধ বড় প্রকট। এটা তাপসকে মানুষের সঙ্গ সম্পর্কে আরও বিরূপ করে তুলছে যেন।

তবে শুধু গন্ধ নয়, নতুন স্পর্শের অনুভবও তৈরি হয়েছে তার ভিতরে। যেমন উড়ে যেতে যেতে নিজের সারা শরীরে মাকড়সার জালের মত এক ধরনের মিহি স্পর্শ টের পায় তাপস। এই সুতোর উৎস যে ঠিক কোথা থেকে তা বোঝা না গেলেও তা যে উপরের দিক থেকে আসছে, এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তাপস কখনও অনুমান করেছে, হতে পারে নক্ষত্র জগত থেকে এরকম মাকড়সার জালের মত আশ্চর্য কিছু মিহি সুতো নেমে এসে তাকে পুতুলের মত ভাসিয়েছে এইভাবে। তাহলে সে যে একটা আবর্ত স্রোতে অকিঞ্চিৎকরভাবে ভেসে চলেছে, সেটা নাও হতে পারে। কি যে উদ্দেশ্য, কার যে সাধিত হতে পারে, সেটা এরকম আর কিছুদূর এবং আরো কিছুদিন ওড়াউড়ি শেষ না হলে বোঝা যাবে না।

আসলে এই সব ওড়াউড়ির ভিতরে কিছু ছোট ছোট ঘটনাও ঘটছে। এই যেমন, দিন তিনেক আগে তাদের পাড়ার পুকুরের উপর দিয়ে রাত্রিবেলা ওড়বার সময় এই পুকুরের দক্ষিণ দিকে যে বনতুলসী এবং গন্ধরাজ ফুলের মিলেমিশে থাকা ঝোপ এখনও অক্ষুন্ন আছে সেখানে সে অনেক জোনাকিকে একসাথে জ্বলতে আর নিভতে দেখছিল। দেখতে দেখতে তার মনে হচ্ছিল, কোনও রাত্রিকেই এই ব্রহ্মাণ্ড হারায় না কখনও। এইটা ভাবতে ভাবতেই সে খেয়াল করেছিল, ঐ জোনাকিগুলো উড়ে আসছে তার দিকে। ওরা যেন তার ভিতরে প্রবেশ করতে চায়। কিন্তু ঐ সময় সে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে চায়নি, এটা ঘটুক। নিজেকে প্রবলভাবে ওদের কাছে শারীরিক ও মানসিকভাবে বন্ধ করবার চেষ্টা করতে গিয়ে তাপস আরও টের পেয়েছিল যে তার বুকের ভিতরে হৃদপিণ্ড ঠিক যেন স্পন্দিত হচ্ছে না, বরং থাপ্পড় মারতে চাইছে তাকে, এই সংকীর্ণতার জন্য।  যাইহোক কিছুক্ষণ তাকে আবর্তন করে ওই জোনাকিগুলো আবার ফিরে যায়।

জোনাকিরা চলে যাওয়ার পরও তাপসের বুকের ভেতর সেই থাপ্পড়ের প্রতিধ্বনিটা যেন দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়েছিল। এক ভারী অনুশোচনা তার গলা পর্যন্ত উঠে এসে আবার নেমে গেল নিঃশব্দে। সে বুঝতে পারছিল, নিজের চারপাশের এই সংকীর্ণ দেয়ালটা সে নিজে হাতে ধরে রেখেছে বলেই বহির্বিশ্বের সেই দ্যুতিময় আমন্ত্রণকে সে গ্রহণ করতে পারল না। কিন্তু ওই প্রত্যাখ্যানের পর মুহূর্তেই, মাথার উপর থেকে নেমে আসা সেই অদৃশ্য মাকড়সার সুতোগুলো যেন সামান্য টান টান হয়ে উঠল। যেন এক অদৃশ্য সূত্রধার ওপর থেকে অলক্ষে মৃদু বিরক্তি প্রকাশ করল তার এই ভীরুতার জন্য।

তাপস আরেকটু ওপরের দিকে ভেসে উঠতে শুরু করল। নিচে পাড়ার পরিচিত ছাদগুলো, ইলেকট্রিকের তারের জট, আর ফাঁকা অন্ধকার গলিগুলো আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসছে। এক অদ্ভুত নীরবতা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরল। এটা কেবল শব্দের অনুপস্থিতি নয়, এ যেন এক ধরনের নিরেট, ঘন নীরবতা—যার নিজস্ব একটা ওজন আছে। ভেসে থাকতে থাকতে তাপসের মনে হতে লাগল, তার শরীরের ত্বক বলে আর কিছু আলাদা করে অস্তিত্বশীল নেই। বাতাস যেখানে শেষ হচ্ছে, তার শরীর যেন ঠিক সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে না; বরং বাতাসই তার চামড়ার ওপর এক ধরনের নতুন মানচিত্র এঁকে দিচ্ছে।

কিছু দূর যাওয়ার পর, তার নাকে ভেসে এল এক নতুন গন্ধ। এটা বনতুলসী বা গন্ধরাজের পরিচিত সুবাস নয়। এটা ভেজা মাটির নীচের গভীর থেকে উঠে আসা এক প্রাচীন অন্ধকারের গন্ধ, যার সঙ্গে মিশে আছে শত শত বছরের পুরনো শুকনো পাতার পচন এবং নোনা জলের বাষ্প। তাপস চোখ বন্ধ করল। সে টের পেল, নিচে শহরের বাড়িগুলোতে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলোর মাথার ভেতর থেকে যে স্বপ্নগুলো বাষ্পের মতো হালকা হয়ে আকাশের দিকে উঠে আসছে, সেগুলোকে সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। কারো স্বপ্নে থিকথিক করছে পুরনো কোনো অপরাধবোধ, কেউ বা এক অদেখা সমুদ্রের তীরে একাকী দাঁড়িয়ে আছে, আর কারো মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধুই কালকের বাজারের হিসাব। এই সব স্বপ্ন, এই সব বিচিত্র চিন্তার মেঘ তাপসের শরীরের অদৃশ্য সুতোগুলোতে এসে ধাক্কা মারছিল।

হঠাৎই তাপসের ডান হাতের চেটোতে এক তীব্র শিরশিরানি অনুভূত হলো। যেন একটা সুতো তার হাতের চামড়া ফুঁড়ে ভেতরের রগ-শিরাগুলোর সঙ্গে নিজেকে বুনে নিতে চাইছে। সে হাতটা নাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু দেখল তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো এখন আর কেবল তার নিজস্ব মস্তিষ্কের আদেশে চলে না। তারা অন্য কোনো মহাজাগতিক ছন্দের অনুগামী হয়ে উঠেছে। এই সুতো কি তাকে কেবল ধরে রাখার জন্য, নাকি তাকে ধীরে ধীরে এই অসীম শূন্যতার সাথে বুনে দেওয়ার জন্য? তাপস মনে মনে প্রশ্ন করল। কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কেউ ছিল না, কেবল দূর নক্ষত্রপুঞ্জের মৃদু আলো যেন এক নীরব হাসির মতো ছড়িয়ে পড়েছিল দিকচক্রবালে।

পাড়ার সীমানা ছাড়িয়ে সে এখন নদীর উপরের বিস্তৃত নীলচে অন্ধকারের ওপর ভাসছে। নিচে কালচে জলধারা নিঃশব্দে বয়ে চলেছে। নদীর মাঝখানে একটা পরিত্যক্ত নৌকা কাঁপতে কাঁপতে দুলছিল। তাপসের মনে পড়ে গেল, বহু বছর আগে, তখন সে নিতান্তই এক তরুণ, ঠিক এরকমই এক অমাবস্যার রাতে এই নদীর তীরে এসে বসেছিল সে। তখন তার বুকের ভেতর ছিল কত শত জটিল হিসেব-নিকাশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠার টানাপোড়েন, আর এক ধরনের না-পাওয়ার তীব্র ক্ষত। অথচ আজ, মাটি থেকে অত উঁচুতে ভেসে থাকতে থাকতে, সেই পুরনো ক্ষতগুলোকে বড্ড কৌতুকপ্রদ বলে মনে হচ্ছিল। মানুষের এই যা কিছু আঁকড়ে ধরার প্রবণতা—এই যে 'আমার বাড়ি', 'আমার সম্মান', 'আমার অস্তিত্ব'—এই সব কিছু যেন ওই রাতের জোনাকির মতোই ক্ষণস্থায়ী। জোনাকিকে নিজের ভেতরে আসতে না দেওয়ার ভয়টাই আসলে তার সেই পুরনো 'আমি'-কে বাঁচিয়ে রাখার শেষ মরিয়া চেষ্টা ছিল।

হৃদপিণ্ডটা আবার সামান্য দুলে উঠল। তবে এবার আর কোনো থাপ্পড়ের মতো আঘাত নয়, এবার যেন একটা করুণাময় মৃদু অনুযোগ। তাপস বুঝতে পারল, তার ভেতরের সংকীর্ণতা এখনও পুরোপুরি গলে জল হয়ে যায়নি। সে এখনো নিজের নাম, নিজের অবয়ব, আর নিজের অতীতে অর্জিত স্মৃতিগুলোকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। কিন্তু এই সুতোগুলো, যা উপর থেকে নেমে এসেছে, তা তো তাকে কোনো বিশেষ নাম দিয়ে চেনে না। তার কাছে সে কেবলই এক ফোঁটা চেতনা, যা এই অসীম চরাচরে ভেসে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছে।

হঠাৎ করেই বাতাসটা আরও বেশি ভারী এবং ঠান্ডা হয়ে এল। আকাশের এক কোণে এক অদ্ভুত বেগুনি আভা ছড়িয়ে পড়তে দেখল সে। ওই বেগুনি আলোর বুক চিরে যেন নেমে আসছে একের পর এক মিহি আলোকমালা। সেগুলো সেই মাকড়সার জালের সুতোগুলোর সাথে মিশে গিয়ে এক বিশাল জাল বুনে ফেলছে সমগ্র আকাশের ক্যানভাসে। তাপস দেখল, তার নিজের শরীরও ধীরে ধীরে সেই জালের একটা ছোট গিঁট হয়ে উঠছে। তার আঙুলের ডগাগুলো থেকে বেরোচ্ছে সূক্ষ্ম আলো, তার চুলগুলো বাতাসের টানে উধাও হয়ে গিয়ে কেবল আলোর রশ্মিতে পরিণত হচ্ছে।

এক গভীর আতঙ্কের পাশাপাশি এক পরম অলৌকিক শান্তির অনুভূতি তার ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সে বুঝতে পারল, এই যে ওড়াউড়ি, এটা কোনো সাময়িক বিপর্যয় বা স্বপ্ন নয়। এটা এক ধরনের রূপান্তর। নদীর জল যেমন বাষ্প হয়ে আকাশে ওঠে, আবার বৃষ্টি হয়ে ফিরে আসে মাটিতে—সেও তেমনি নিজের জড় শরীরের গণ্ডি ছাড়িয়ে এক বৃহত্তর অস্তিত্বের প্রবাহে সামিল হচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের শেষ কোথায়? সে কি তবে আর কোনোদিন মাটিতে নেমে এসে নিজের পরিচিত বিছানায় ঘুমাতে পারবে না? সকালে উঠে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ পড়া—সেই সব অতি সাধারণ, ধূসর দিনগুলোর কি তবে চিরতরে সমাপ্তি ঘটে গেল?

এই ভাবনায় তার চোখ দুটো ভিজে উঠল। অশ্রুর সেই দু ফোঁটা বিন্দু যখন তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে চাইল, তখন দেখল সেই জলবিন্দু দুটো আর নিচে খসে পড়ছে না। তা যেন মাধ্যাকর্ষণকে অস্বীকার করে শূন্যেরই এক কোণে থমকে রয়েছে, আর তার ভেতরে প্রতিফলিত হচ্ছে রাতের নক্ষত্রমণ্ডল। যেন তার এক ফোঁটা চোখের জলেও ধরা আছে গোটা মহাবিশ্বের আয়না।

তাপস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজেকে ছেড়ে দিল সেই অদৃশ্য সুতোগুলোর টানে। সে আর প্রতিরোধ করবে না। যদি আবার কখনো সেই জোনাকির দল ফিরে আসে, কিংবা যদি কোনো নক্ষত্রের আলো তার ভেতরে প্রবেশ করতে চায়, তবে সে আর নিজের দরজায় খিল আঁটবে না। নিজের পৃথক অস্তিত্বের বিলয়কে সে স্বীকার করে নেবে পরম সমর্পণে।

দূরে কোথাও সকালের প্রথম ট্রেনের বাঁশি বেজে উঠল। কিন্তু সেই শব্দ তাপসের কানে পৌঁছাল এক প্রাচীন সুরের মতো, যা বহু দূরে ফেলে আসা কোনো এক পৃথিবীর অবশিষ্ট স্মৃতি মাত্র। তার যাত্রা এখনও শেষ হয়নি; রাতের নীলচে অন্ধকার পার হয়ে সে এখন এক অসীম অনন্তের দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে গন্ধ, স্পর্শ আর চেতনার সমস্ত সীমানা একে অপরের সাথে মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

(ক্রমশ)

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন