| সমকালীন ছোটগল্প |
আহুতি
(১)
ছেলেবেলার কথা মনে পড়লে সাধারণত যা যা মনে আসে, তাদের গন্ধ-বর্ণ-স্পর্শরা কেমন হয়? নীলের যেমন বহু স্মৃতির ভিড়েও মনে পড়ে যায় পশ্চিমের রোদে তেতে থাকা একটা ছাদ… রোদ মরে আসা শেষ দুপুরে ঘুড়ি ওড়ানো… বাঘা মাঞ্জায় একের পর এক কেটে উড়িয়ে দেওয়া ঘুড়ির রক্তে ভরে ওঠা আকাশ, শাহেনশার মত আকাশে বিচরণ করতে করতে ওরটাও যে ঘ্যাচাং ফুঁ হয়ে গেল! একা ছাদে বোকা বনে যাওয়া থেকেই জল তেষ্টা পেল। পাশেই ছোটদার ঘর। নতুন বৌদি বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওঘরে নীলের অবারিত দ্বার। ভেজানো দরজা খুলে জলের বোতল নেবে বলে ঢুকতে গিয়েই চোখে পড়ে গেল… দাউদাউ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে দুচোখ, তবু অবাধ্য দৃষ্টিপথ অচিরাচরিত দৃশ্যের প্রতিটি পিক্সেল হাপুসহুপুস করে চেটেপুটে নিচ্ছে… এক অসম্ভব অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে নীলের গলা শুকিয়ে এলেও জল খাওয়ার কথা নিমেষে ভুলেই গেল, লাটাই ঘুড়ি নিয়ে দুদ্দাড়িয়ে নেমে এল নীচে। তারপর মাঠফেরত রোজকার রুটিন মত সোজা বড়পুকুরে গিয়ে ঝাঁপ… অনেকক্ষণ ধরে জলে দাপাদাপি করে ক্লান্ত নীল ফিরবে, সেদিন রাত্রে ধূম জ্বর আসবে ওর… কী যেন ঢাকতে চেয়েও পারবে না কিছুতেই। রাত্রে নতুন বৌদি যখন ওর উত্তপ্ত কপালে হাত রাখছে, ও প্রায় বেহুঁশ।
এই দৃশ্যের শয়তান দৈত্য ওর গোটা বয়ঃসন্ধিকাল খেয়েও ছাড়েনি। মাঝেমাঝে তৈরী হয়েছে এমন আরও অনেক দৃশ্যের গোপন অছিলা, তার ভেতর থাকা ধারালো ছুরিতে ও ফালাফালা হয়ে গেছে। কিন্তু সহবতরেখা, সৌজন্যপরিধি কোনদিনও অতিক্রম করেনি। পারেনি। চায়ওনি। কারণ ভালো ছেলের তকমার কাছে নিজের গোপন জিম্মা রেখেছিল। স্বাভাবিক প্রতিবর্তে নীল বুঝে গেছিল, ছেলেবেলাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকার নামই বড় হয়ে ওঠা। স্বভাবগতভাবে দিলদরিয়া ও উচ্ছ্বলসুন্দরী নতুন বৌদির সঙ্গে এরপর গার্জিয়ানসুলভ দূরত্ব তো নয়ই, বরং বন্ধুতার এমন এক স্নিগ্ধ সম্পর্ক তৈরী হবে যে স্খলনের অপরাধবোধ ওকে কুরে কুরে খেতে থাকবে। ছাড়াতে চেয়েও না পারার এই নাছোড় আবর্ত একদিন মুছে আসবে যদিও… জীবন তো আর গল্প, উপন্যাস নয়। এখানে আবেগ, অনুভূতি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বাস্তববোধকে দান ছেড়ে দেয়।
(২)
সুচেতা সুন্দরী, মিশুকে, হাসিখুশী, দিলখোলা এক চরিত্র। কোন ব্যাপারেই সেভাবে কোন ট্যাবু নেই। এমন একজনকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে নীলও বেশ শ্লাঘা অনুভব করে। সবচেয়ে বড় কথা ওর সামাজিক ও পেশাগত জীবনে সুচেতার স্পষ্ট অবস্থান নীলের কাছে বেশ স্বস্তিদায়ক। যদিও স্বস্তির অনেকটা গভীরে থেকে যাওয়া সংশয় প্রথমদিকে সেভাবে ঠাহর করে ওঠা যায় না। এই অনিশ্চয়তারেখা অতিক্রম করতে পারা না-পারাকে ঐহিক আয়ুর মাপে ধরাতে চাওয়াই জীবনযাপন। এই পাঠক্রম অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝে নিতে হয়।
সেদিন নীল অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে। সাইট ইন্সপেকশনের দিনগুলোয় এভাবে অযাচিত ছুটি মিলে যায়। আগে হলে হয়ত আড্ডা দেওয়ার একটা বন্দোবস্ত করা যেত। কিন্তু সুন্দরী বউয়ের দুপুরের নিঃসঙ্গতায় অকস্মাৎ আকাঙ্ক্ষার পানসি ভাসিয়ে দিতে কে না চায়? যথারীতি নীল বাড়িমুখো হয়েছে। সুচেতাকে আগাম কিছু জানায়নি। প্রিয়জনকে চমকে দিতে চাওয়ার দুর্দমনীয় ইচ্ছে লোভী করে তোলে।
বাড়ির সদর দরজা ভেজানো দেখে নীল ভাবল কেউ এসেছে বোধহয়। ওর মুড বিগড়ে গেল প্রথমেই। পরিকল্পনা কি মাঠে মারা গেল! ও দরজা খুলে ঢুকতে যাবে, এমন সময় পাশের বাড়ির অভি ধাঁ করে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়ে নীলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে থামল। হাঁফাচ্ছে। ওর হাতে একটা ঘুড়ি।
“তোমাদের ছাদে এসে পড়েছিল। আমিই কেটেছি। ঠাম্মি দরজা খুলে দিল।” কোনক্রমে কৈফিয়ত দিয়েই দৌঁড়ে চলে গেল অভি। সদর দরজা বন্ধ করে মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখা গেল – পরিচিত দৃশ্য। টিভি চলছে এবং তিনি দিব্য ঢুলছেন। হঠাৎ কী একটা মনে পড়ায় নীল চকিতে ঘুরেই দু’টো সিঁড়ি লাফ দিয়ে উঠতে লাগল। গিয়ে দেখল ছাদের দরজাটা তখনো খোলা, কোলাপ্সেবেলটা টেনে বন্ধ করা। পাশের ঘরেই ঘুমে ডুবে থাকা সুচেতা… সেই বিপজ্জনক বাঁক নিয়ে সব ভাসানোর জন্য অপেক্ষমান আগ্রাসী নদীটা যেমন বুভুক্ষুর মত একদিন গিলে নিতে চেয়েছিল বয়ঃসন্ধিকালের উষ্ণ কৌতুহল, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা, দুর্নিবার মোহ… আজও যেন অবিকল একই বিভঙ্গে… নীল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এই অনতিক্রম্যের সামনে… নতুন বউদির ক্যানভাসে যেভাবে আঁকা হয়ে উঠেছিল তপ্ত ছবিটা…
অভির কি আজ রাতে জ্বর আসবে?
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন