ফ্ল্যাশব্যাকের থিয়েটার পাঁচালি
প্রতি
হে দর্শক,
একদিন পালা এল, নাটকের কিছু কথা যেন লিখি...। মাননীয় সম্পাদক শ্রী কাজল সেন মহাশয়ের উপদেশে ও সাহসে লেখার শুরু। ইতিহাসের বিনা যুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিকের কথাই এই ফ্ল্যাশব্যাকের আলোচনা।
একুশ শতকেও তার সঙ্গে দেখা হয়, হয়েই চলেছে। নিয়মিত। সেই সৈনিকের কাজ ছিল যা কিছু ইতিহাস সব মনে রাখা আর পরীক্ষা দেওয়া। আর ঘুরে ঘুরে দেখা দেশে কে কে ইতিহাস পড়ছে না। এই কারণেই আমার সঙ্গে একটু আধটু দেখা হত। আর ইতিহাস... শব্দটা উচ্চারণ করলেই আমার মাথার ভেতর একগাদা গোলমাল শুরু হয়ে যায়। রাজা, রাজ্য, যুদ্ধ, সাল-তারিখ, পরীক্ষার খাতা—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত কোলাহল। সেই গোলমালেরই কিছু ঘটনা বা ইতিহাস নিয়ে শুরু হচ্ছে ফ্ল্যাশব্যাকের থিয়েটার পাঁচালি। তবে তার আগে একটু আমি-র কথা লিখি।
আমি ইতিহাসে পাতিহাঁসও পেতাম না কখনও। এমনকি ইতিহাসে শূন্যও পেতাম না। এরই মধ্যে ইতিহাসের বইয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন জাগত। কেন পড়তে হবে রাজা, মহারাজাদের যুদ্ধ, আর রাজ্যজয়ের কথা? কেন? এতে আর কোনও সাধারণ স্কুল পড়ুয়া নেই কেন? আচ্ছা রাজাদের দেশ মানে কতটা? রাজাদের সবার সঙ্গে সবার কি আলাপ ছিল? রাজারা কি আমাদের মতো ইতিহাস পড়তেন? যদি পড়তেন তাহলে ইতিহাসে কত নম্বর পেতেন? এইসব প্রশ্নের মধ্যে দু-চারটে কলম ফসকে বেরিয়েও পড়ত। সেও বড় ঐতিহাসিক ঘটনা। এবং পরীক্ষার খাতায় এর বেশ প্রভাব পড়ত। ঐ না-দেখা রাজারা সব নাম্বার জয় করে নিত। আমি বিনা যুদ্ধে পরাজিত হতাম। কাজেই ইতিহাসের রাজাদের সঙ্গে আমার একটা জয় পরাজয়ের সম্বন্ধ ছিল। আর সেটা রয়েও গেছে।
এরপরও রয়েছে ইতিহাস ...।
সেটা রাজা-রাজদের ইতিহাস নয়, সম্প্রতির ইতিহাস। এটাও আমি ভাবতাম, এক্ষুনি ঘটে যাওয়া ঘটনা আবার ইতিহাস নাকি? হ্যাঁ, হতেই পারে। কথ্যভাবে তো যেকোনো কথাকে সময়ের মান্যতায় বাড়াতে বলে থাকি-- "এর একটা ইতিহাস আছে।" বা, এটা ঐতিহাসিক ঘটনা। বলি কিনা? সেই সূত্রেই এবারের লেখার ইতিহাস-কম ফ্ল্যাশব্যাক বেশি।
হে পাঠক, দেখেছেন তো ... এই ধারাবাহিকের শিরোনাম? "ফ্ল্যাশব্যাকে থিয়েটার পাঁচালি"। হ্যাঁ, ফ্ল্যাশব্যাকও একটা ধরনের ইতিহাসের গন্ধ নির্ভর। কিন্তু, সেই ইতিহাস কতটা সময়ের , অতীতের সমাধিফলক , সেটাই নির্মাণের জন্যে এই লেখা। তবে, তাত্ত্বিক আলোচনা করলে, ইতিহাস একটি চলমান পাঠ। প্রতিটি সময় তাকে নতুন করে পড়ে, নতুন করে ব্যাখ্যা করে, আবার নতুন করেই প্রশ্ন তোলে। ফলে ইতিহাসের কোনও শেষ সংস্করণ নেই; আছে কেবল ক্রমাগত পুনঃপাঠ। সম্ভবত এই কারণেই ইতিহাস মনে রাখা এত এত কঠিন। আর এই কঠিনেরেই সাধনা করলাম। এই কদিন ধরে ফের সেই সৈনিক হানা দিচ্ছে। রাতের বেলা। ইতিহাস ... ইতিহাসভিত্তিক রচনা, বা ইতিহাসের কোনও ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচনা... সেই রচনা গল্প, কাহিনি হোক না, তবুও লেখ বলছে। এই করে তরবারি ঘোরাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেও এই নির্যাতন। ইতিহাসভিত্তিক রচনা, বা ইতিহাসের কোনও ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচনা... সেই রচনা গল্প, কাহিনি সেকি সোজা কথা? শব্দ চয়নের মধ্যেই বারবার ইতিহাস আসছে। আর আমাকে ফ্ল্যশব্যাকে যেতে হচ্ছে। আমার পরীক্ষা আর পড়াশোনা নিয়ে বিস্তর জয়-পরাজয় ছিল। অস্থির করে তুলে রাজারা যখন আমাকে ঘুমাতেও দিত না। ঠিক তখনই আমার গল্পের বইয়ের একটাও চরিত্র এসে দাঁড়াত না পাশে। ওরাও রাজাদের ভয় পেত নিশ্চয়। তখন একা আমার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস বই খুঁজতে একজন গোয়েন্দার দরকার হত। এবং একার লড়াইয়ে একটা ইতিহাসের বইও কি ভীষণ ক্ষমতাবান, সেটা ভেবে ঘাম নামত শিরদাঁড়া বেয়ে। ফের, এই ইতিহাস বইয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন জাগত। কেন পড়তে হবে রাজা, মহারাজাদের যুদ্ধ, আর রাজ্যজয়ের কথা? কেন?
হে পাঠক, একটু থামুন। আমিও একটু থামি। কারণ এখানেই আমার নিজের গোলমালটা। ছোটবেলায় ভাবতাম, ইতিহাস মানেই রাজা-রাজড়ার গল্প। যুদ্ধের সাল, তারিখ, কে কাকে হারাল, কে কতটা রাজ্য দখল করল—এইসব। আমার তো প্রশ্নই জাগত, এগুলো পড়ব কেন? ইতিহাস মানেই কি জয়-পরাজয়ের হিসেব? অঙ্কের চেয়েও ইতিহাস ছিল কঠিন। অথচ আমারই এক প্রিয় সহপাঠী এই ইতিহাসে নব্বইয়ের ওপর নম্বর পেত। আমিও লিখতাম সব প্রশ্নের উত্তর, কিন্তু লিখেও নম্বর পেতাম না। তখন মনে হতো, একই বই তো পড়ছি, তাহলে আমাদের ইতিহাস কি আলাদা?
বয়স বাড়তে বাড়তে বুঝলাম, প্রশ্নটা নম্বরের ছিল না। প্রশ্নটা ছিল ইতিহাসকে কীভাবে পড়ছি, তার। আরও পরে দেখলাম, একই ইতিহাসের বই দু'জন মানুষ পড়ে দু'রকম কথা বলছেন। একজন বলছেন, এ ইতিহাস বীরদের। আরেকজন বলছেন, এ ইতিহাস সাধারণ মানুষেরও। তখন মনে হল, ইতিহাসও বুঝি একবার পড়ে শেষ হয় না।
এরপর একদিন হাতে এল কয়েকজন ইতিহাস-ভাবুকের কিছু লেখা। বইও ছিল, প্রবন্ধও ছিল। সবকিছুর সারকথা যেন একটাই—পড়ো। আবার পড়ো। তারপর আবার পড়ো। প্রথমে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এ আবার কেমন কথা! সারাজীবন ধরে একই ইতিহাসই কি পড়ে যেতে হবে? তারপর ধীরে ধীরে বুঝলাম, আসলে ইতিহাস বদলায় না; বদলায় আমাদের চোখ। বয়স বদলায়, অভিজ্ঞতা বদলায়, সমাজ বদলায়। তাই একই ঘটনাও নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। একসময় যে ইতিহাসে শুধু রাজাদের দেখা যেত, আজ সেখানে সাধারণ মানুষও জায়গা করে নিয়েছে। আগে ইতিহাসবিদেরা রাজদরবারের দলিল খুঁজতেন, এখন তাঁরা মানুষের চিঠি খোঁজেন, ডায়েরি খোঁজেন, লোককথা শোনেন, স্মৃতি সংগ্রহ করেন। যেন ইতিহাসও ধীরে ধীরে মানুষের কাছে ফিরে এসেছে।
এবারে আবারও ফ্ল্যাশব্যাক ও ইতিহাসের শেকড় সন্ধানে ... দেখা যাচ্ছে ইতিহাস থেকে সাহিত্য: ইউরোপীয় ঐতিহ্য ও বাংলা ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যচর্চার বিকাশ।
ইতিহাসকে সাহিত্যের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করার ঐতিহ্য প্রাচীন। কিন্তু আধুনিক অর্থে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যধারার সুসংগঠিত বিকাশ ঘটে উনিশ শতকের ইউরোপে। এর আগে থেকেই নাটকে ইতিহাসের ব্যবহার ছিল, বিশেষত ইংরেজি সাহিত্যে উইলিয়াম শেক্সপিয়র ইংল্যান্ডের রাজবংশীয় ইতিহাসকে নাট্যরূপ দিয়ে ইতিহাস ও সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তাঁর ইতিহাসনির্ভর নাটকগুলিতে রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, উত্তরাধিকার সংকট এবং মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতা ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে মিলেমিশে এক নতুন নাট্যভাষা তৈরি করে।
১৫৯২ থেকে ১৫৯৪ সালের মধ্যে রচিত শেক্সপিয়রের Richard III নাটকের পটভূমি ছিল ১৪৮৩ থেকে ১৪৮৫ সালের War of the Roses এবং তার পরিণতি ১৪৮৫ সালের Bosworth Field-এর যুদ্ধ। ১৫৯৫ সালের Richard II নাটকে উঠে আসে ১৩৯৯ সালে রাজা দ্বিতীয় রিচার্ডের সিংহাসনচ্যুতি এবং ল্যাঙ্কাস্টার রাজবংশের উত্থানের রাজনৈতিক সংকট। ১৫৯৬ থেকে ১৫৯৯ সালের মধ্যে রচিত Henry IV-এর প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে ১৪০৩ সালের Shrewsbury যুদ্ধ এবং ইংল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ১৫৯৯ সালের Henry V নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে ১৪১৫ সালের Agincourt যুদ্ধ। তবে শেক্সপিয়রের উদ্দেশ্য কখনও শুধুমাত্র ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ছিল না। তিনি ঐতিহাসিক ঘটনাকে ব্যবহার করেছিলেন ক্ষমতা, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং মানবিক মনস্তত্ত্বের অনুসন্ধানের জন্য। ফলে তাঁর নাটকে ইতিহাস তথ্যের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে মানুষের ভাগ্য ও রাজনৈতিক নাটকের উপাদান।
আধুনিক ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা ঘটে স্কটিশ সাহিত্যিক ওয়াল্টার স্কটের হাতে। ১৮১৪ সালে প্রকাশিত তাঁর Waverley উপন্যাসের পটভূমি ছিল ১৭৪৫ সালের Jacobite Rebellion। ১৮১৭ সালের Rob Roy উপন্যাসে তিনি ব্যবহার করেন ১৭১৫ সালের Jacobite বিদ্রোহের রাজনৈতিক পটভূমি। ১৮১৯ সালের Ivanhoe উপন্যাস ফিরে যায় ১১৯৪ সালের ইংল্যান্ডে, রাজা রিচার্ড প্রথমের সময়কালে, যেখানে নরম্যান ও স্যাক্সনদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাত ইতিহাসের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ওয়াল্টার স্কটের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তিনি ইতিহাসকে শুধু রাজা, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজ, সংস্কৃতি এবং পরিবর্তনশীল সময়কেও ইতিহাসের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ফরাসি সাহিত্যে ইতিহাসভিত্তিক রচনার নতুন যুগ শুরু হয় ভিক্টর হুগো এবং আলেকজান্ডার দ্যুমার হাতে। ১৮৩১ সালে প্রকাশিত ভিক্টর হুগোর Notre-Dame de Paris বা The Hunchback of Notre-Dame উপন্যাসের পটভূমি ১৪৮২ সালের মধ্যযুগীয় প্যারিস। এখানে মধ্যযুগীয় ফ্রান্সের সমাজ, ধর্ম, স্থাপত্য এবং সাধারণ মানুষের জীবন ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত হয়েছে। ১৮৬২ সালের Les Misérables উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ঐতিহাসিক ঘটনা ১৮৩২ সালের Paris June Rebellion, যদিও এর বিস্তৃত পটভূমি নেপোলিয়নিক যুগ থেকে ফরাসি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পর্যন্ত বিস্তৃত।
অন্যদিকে আলেকজান্ডার দ্যুমার ১৮৪৪ সালে প্রকাশিত The Three Musketeers উপন্যাস নির্মিত হয়েছে ১৬২৫ থেকে ১৬২৮ সালের ফ্রান্সকে কেন্দ্র করে, যেখানে কার্ডিনাল রিশেল্যুর রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং La Rochelle অবরোধ গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। একই বছরে প্রকাশ শুরু হওয়া The Count of Monte Cristo উপন্যাসে রয়েছে ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের এলবা দ্বীপ থেকে প্রত্যাবর্তন, Hundred Days এবং বোরবোঁ রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইতিহাস। ইউরোপীয় এই ধারায় ইতিহাস কখনও কেবল অতীতের তথ্য নয়; বরং মানুষের আকাঙ্ক্ষা, সংঘাত এবং সমাজ পরিবর্তনের এক জীবন্ত উপাদান হয়ে উঠেছে। এই ইউরোপীয় ঐতিহ্যের কয়েক দশক পরে বাংলা সাহিত্যে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্যচর্চার সুস্পষ্ট সূচনা ঘটে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম উল্লেখযোগ্য ইতিহাসনির্ভর নাটক মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃষ্ণকুমারী, যা প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালে। নাটকটির পটভূমি ১৮১০ সালের উদয়পুরের রাজকুমারী কৃষ্ণকুমারীর আত্মবলিদানের ঘটনা। মাইকেল এই কাহিনির সূত্র পান কর্নেল জেমস টডের Annals and Antiquities of Rajasthan (১৮২৯–১৮৩২) গ্রন্থ থেকে। কিন্তু তিনি ইতিহাসকে দলিল হিসেবে পুনরাবৃত্তি করেননি; বরং একটি রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংকটকে শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডির শিল্পরূপ দিয়েছেন। ফলে নাটকে ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়ে মানবিক সংকট, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং ট্র্যাজিক আবেগ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
এরপর ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী, যা বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত। এর পটভূমি ষোড়শ শতকের শেষভাগ, যখন সম্রাট আকবরের আমলে বাংলায় মুঘল ও আফগান শক্তির সংঘর্ষ চলছিল। ঐতিহাসিক পরিবেশ বাস্তব হলেও জগৎসিংহ, তিলোত্তমা ও আয়েশার মতো চরিত্র এবং তাঁদের প্রেমকাহিনি মূলত সাহিত্যিক কল্পনার সৃষ্টি। বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে ইতিহাস ছিল কাহিনির পরিবেশ নির্মাণের শক্তি, কিন্তু মানবিক সম্পর্ক ও নাটকীয় সংঘাতই ছিল মূল চালিকাশক্তি।
১৮৭৭ সালে প্রকাশিত চন্দ্রশেখর উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র ব্যবহার করেন ১৭৬০ থেকে ১৭৬৪ সালের বাংলার রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষত নবাব মীরকাশিম ও ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংঘর্ষ এবং ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। ১৮৮২ সালের রাজসিংহ উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম ইতিহাসনিষ্ঠ রচনা, যার পটভূমি ১৬৭৮ থেকে ১৬৮১ সালের রাজপুত-মুঘল সংঘর্ষ, বিশেষত মেওয়ারের মহারানা রাজ সিংহ এবং সম্রাট আওরঙ্গজেবের দ্বন্দ্ব।
একই বছরে প্রকাশিত আনন্দমঠ-এর ঐতিহাসিক ভিত্তি ছিল ১৭৭০ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং পরবর্তী সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ। তবে বঙ্কিমচন্দ্র এই ঘটনাকে সরাসরি ইতিহাস হিসেবে লেখেননি; তিনি তাকে ঔপনিবেশিক ভারতের জাতীয় চেতনার প্রতীকে রূপান্তরিত করেছেন। ১৮৮৭ সালের সীতারাম উপন্যাসে তিনি বাংলার ভূঁইয়া শাসক রাজা সীতারাম রায়ের জীবন ও উত্থান-পতনকে কেন্দ্র করে আঠারো শতকের সূচনাপর্বের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছেন।
বাংলা ঐতিহাসিক নাটকের ক্ষেত্রে গিরিশচন্দ্র ঘোষের সিরাজউদ্দৌলা (১৯০৫) একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নাটকটির ভিত্তি ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন। ঐতিহাসিক কাঠামো বজায় রেখেও গিরিশচন্দ্র নাটকের প্রয়োজন অনুযায়ী চরিত্রের আবেগ, সংলাপ এবং সংঘাত নির্মাণ করেছেন।
এরপর দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বাংলা ঐতিহাসিক নাটককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর রানা প্রতাপ (১৯০৫), দুর্গাদাস (১৯০৬), নূরজাহান (১৯০৭), মেবার পতন (১৯০৮), শাহজাহান (১৯০৯) এবং চন্দ্রগুপ্ত (১৯১১)-এ ভারতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় নাট্যরূপ লাভ করে। মেওয়ারের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুঘল দরবারের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নূরজাহানের রাজনৈতিক ভূমিকা, শাহজাহানের বন্দিজীবন এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা—এসব বিষয় তাঁর নাটকে শুধু ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং আত্মমর্যাদা, বীরত্ব এবং জাতীয় চেতনার প্রতীক হিসেবেও উপস্থিত হয়েছে।
বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইতিহাসভিত্তিক নাটক নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মাত্রা লাভ করে উৎপল দত্তের হাতে। ১৯৬৫ সালের কল্লোল নাটকের বিষয় ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভি বিদ্রোহ। ১৯৬৭ সালের ফেরারী ফৌজ ফিরে যায় ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং ভারতীয় বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে। ১৯৭১ সালের টিনের তলোয়ার-এ তিনি নির্মাণ করেন ১৮৭২ সালে ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা, ঔপনিবেশিক কলকাতার রঙ্গমঞ্চ, নাট্যব্যবসা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সামাজিক সংগ্রাম এবং বাংলা থিয়েটারের বিকাশের ইতিহাস। ১৯৭৩ সালের ব্যারিকেড নাটকে তিনি ব্যবহার করেন ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে হিটলারের ক্ষমতায় উত্থান এবং ফ্যাসিবাদের বিস্তারের ইতিহাস।
উৎপল দত্তের কাছে ইতিহাস কখনও অতীতের নিছক পুনর্কথন নয়; বরং বর্তমানকে বোঝার এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার। তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ টিনের তলোয়ার-এ তিনি যাত্রা, বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সামাজিক অবস্থান এবং তাঁদের সংগ্রামকে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর কাছে নাটকের ইতিহাস কেবল মঞ্চের বিবর্তনের ইতিহাস নয়; বরং সমাজ, সংস্কৃতি, শ্রেণি, ক্ষমতা এবং লিঙ্গ-রাজনীতির এক জটিল দলিল।
এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতার দিকে তাকালে দেখা যায়, শেক্সপিয়রের কাছে ইতিহাস ছিল ক্ষমতা ও রাজনীতির নাটক; ওয়াল্টার স্কটের কাছে সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবন; ভিক্টর হুগো ও দ্যুমার কাছে জাতীয় স্মৃতি ও মানবিক সংঘাত; মাইকেল মধুসূদনের কাছে ট্র্যাজেডির উপাদান; বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে জাতীয় কল্পনার ভিত্তি; গিরিশচন্দ্র ও দ্বিজেন্দ্রলালের কাছে নাট্যবীরত্বের উৎস; আর উৎপল দত্তের কাছে ইতিহাস ছিল বর্তমানকে প্রশ্ন করার এক শক্তিশালী ভাষা। বাংলা সাহিত্যে ইতিহাস তাই কখনও শুধু অতীতের দলিল হয়ে থাকেনি; প্রতিটি যুগে তা নতুন প্রশ্ন, নতুন ব্যাখ্যা এবং নতুন শিল্পরূপ লাভ করেছে।
এই কিস্তিতে নাটকের চেয়ে ইতিহাসই বেশি কথা বলে ফেলল। আসলে ইতিহাসের দরজায় না দাঁড়ালে ইতিহাসভিত্তিক নাটকের ঘরে ঢোকাই যায় না। তাই এই পথটা একটু ঘুরে আসতেই হল। কিন্তু এতক্ষণ ধরে ইতিহাস, সাহিত্য, নাটক—সব মিলিয়ে যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল, তার উত্তর যেন হঠাৎ করেই সামনে এসে দাঁড়াল। মনে পড়ল, বাকি ইতিহাস। কী আশ্চর্য নাম! নাটকের নামই 'বাকি ইতিহাস'। শিরোনামের মধ্যেই যেন একটা প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। ইতিহাস কি কখনও শেষ হয়? নাকি প্রতিটি ইতিহাসেরই কিছু না কিছু বাকি থেকে যায়? সেই না-বলা অংশ, না-লেখা অংশ, না-দেখা অংশ নিয়েই কি নাটক শুরু হয়? আবার সেই সৈনিক এল, ইতিহাস পড়ছে কিনা দেখতে। আমি তখন থিয়েটার নিয়ে পড়ছি। হাতে থিয়েটারের বই। সেখানে ইতিহাস? হ্যাঁ, একেই বলে ...।
আমাকে একটা থিয়েটার দেখতে যেতে বলে আমাদের এক সহপাঠী। জিজ্ঞেস করলাম, কি নাম প্রোডাকশনের? সে বলল, 'বাকি ইতিহাস'। বাদল সরকার ইতিহাস লেখেন? সেই প্রশ্ন করব কাকে? না আমি যাব না। কিন্তু, তখন আমাদের একে অপরের দলের প্রোডাকশন দেখার একটা অলিখিত চুক্তি ছিল। তাই, দেখতেই হবে। চললাম। শিশির মঞ্চে হবে। আমি পালাব হয়তো। তাই শেষ রো-তে। কিন্তু এখানে ইতিহাস কই, এ তো নাটক, তাতে হাসি আছে। কতদিন ইতিহাসের চাপে হাসিনি। সেদিন মন খুলে হাসলাম। আজ মনে হল, আমার এই 'ফ্ল্যাশব্যাকে থিয়েটার পাঁচালি'-ও বুঝি সেই বাকি ইতিহাসেরই খোঁজ করছে।
সেই ইতিহাসের পথ ধরেই এবার আমরা ঢুকব নাটকের ভেতরে।
পরের কিস্তিতে শুরু হবে একটি নাটকের গল্প। আর সেই গল্পের ভেতর দিয়েই আবার ফিরে আসবে ইতিহাস।
ইতি--
একুশ শতকের ফ্ল্যাশব্যাক সত্ত্বাধিকারী...
.








0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন