| সমকালীন ছোটগল্প |
পালতু দালালের কোষ্ঠকাঠিন্য
সাংঘাতিক ব্যাপার! ভাবা যায় না। ভাবতে গিয়ে সকাল থেকে দুবার টেবিল, একবার দরজা ধরে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়েছে পালতু বাবু। মানে পালতু দালাল, এভাবেই সবাই ডাকে। দালাল হলে কি হবে বাড়ীতে যে বউ আছে না, একেবারে রাজহংসী। স্ট্যাটেস্টিক্সে এলাকার লোকের মাথা খারাপ। তাই নিজে বাড়ী না থাকলে পালতু দালাল বাইরের গেটে নিজে হাতে তালা দিয়ে বেরোয়। হ্যাঁ, নিজে হাতে দেখেছি থুড়ি নিজে চোখে দেখেছি। যাই হোক, হাগুঘরের নিরাপদে কোমোডে বসে গভীরভাবে ভাবতে ভাবতেই পাঁচদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য, উদরের চাপ একেবারে ক্লীয়ার। পালতুবাবু সে ব্যাপারেও ভাবে-- কী করে হয়, পাঁচদিনের টঙ্ক মাল একদিনেই ঝরঝরে! একেবারে অন্নপ্রাশনের চাল-দুধ যা ঢুকিয়েছিলো, কোমোডে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দিয়েছে। এ ব্যাপারে পালতু বাবু সরল সমাধানের তত্ত্ব হাতে হাতেই বুঝে ফেললো যে, চাপে চাপ ক্লীয়ার। ব্যাস। এবার সেই চাপের তত্ত্ব কাঁধে নিয়ে হাগুঘর থেকে বীরদর্পে বেরিয়ে এলো পালতু দালাল। তোমাকে এবার আমি বুঝে নেবো মকর কৈবর্ত। মেদিনীপুরের মাল, ভেবেছো বিনে পয়সায় একটিন মুড়ি দিয়েই আমার রূপোর সংসার তামা কোরে দেবা! অত সহজে তোমায় ছাড়ছি না। জেলে ঢুকিয়ে তোর গায়ে যদি চামউকুনের চাষ না করতে পারি, আমার নাম পালতু দালাল নয়।
এ তো গেলো চাপে চুপে চাপাচাপির তত্ত্ব ওড়াউড়ি। কিন্ত পাঠক, আমাদের তো এখানে থামলে হবে না, কবি বলেছেন গভীরে যেতে হবে, এত গভীরে যেন সাংঘাতিক ব্যাপারকে সাধারণ ব্যাপার বানিয়ে আমরা খেউড় গাইতে পারি। তাই এ গল্প লেখার প্রচেষ্টা। তো চলেন, জুতোজাতা, ছাতা লাঠি টুপি, অন্দর কন্দরের যাবতীয় ঢাকাঢাকি ছড়িয়ে দিয়ে, রসের হাঁড়িতে জিভ চাতাই। কেয়া খুশবু জনাব! গল্পের কেন্দ্রে রাজহংসী! এত সহজে এ গল্প ছেড়ে দেয়া যায়! দালালির কাজে ছুকছুক চিড়েচুপসি পালতু কত্তার নানারকম ক্লায়েন্ট। বাড়ী কেনাবেচা, ভাড়া দেখে দেওয়া থেকে মেয়েছেলের দালালী, সবেতেই তুখোর খেলুড়ে পালতু দালাল। ছেঁড়া জামা থেকে রাণী ভিক্টোরিয়ার রান্নার মাসী, খদ্দের চাইলেই পালতু দালাল একটিভ। যতই "উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স", ইডি সিবিয়াই এনয়াইএ এনটিএ, ধ্যাধধেরে আইবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-- যাই থাক দামী পরীক্ষার উত্তরসহ প্রশ্নপত্র সাতদিন আগেই পৌঁছে যাবে খদ্দেরের হাতে, পাতি উপযুক্ত খসালে। লে বোম্বা, করে খা। বেঁটে কালো মোটা, চ্যাপটা যেকোন মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, পালতু দালালের কাছে যান, খেল খতম। কানা খোঁড়া ঠসা দুইবিয়ে তিনবিয়ে পাঁচবিয়ে, ছেলে যেমনই হোক পয়সার ঝনঝনি দেখিয়ে পাত্রি পার করে দেবে, এমনই হাতযশ এই দালাল পালতুর। শুধু ঘরের রাজহংসী যেন ঘর থেকে না বেরোয় তার সব রকম তালা চাবি শিকল তার কোমড়েই গোঁজা থাকে।
তো এহেন পালতুর এক মেদনিপুরিয়া ক্লায়েন্ট মকর কৈবর্ত। এ ব্যাপারে পালতু প্রথম পরিচয়ে মকরের নাম শুনেই বিজ্ঞের মত বলেছিলো-- "নাম শুনে মনে হচ্ছে, মেদনীপুরি। কী, ঠিক বলেছি? মিললো?"
-- একদম দাদা, আপনি তো জ্ঞানী মানুষ গো!
-- না না, তেমন কিছু নয়, তবে যত রকম বিদঘুটে টাইটেলের লোক আমার কাছে আসে, সবাই দেখেছি তোমার অই মেদিনীপুরের মানুষ। হাতী, বারান্দা, দা, কুড়ুল সব মেদিনীপুর। বোলচালে বিস্তর খাসা কিন্তু মাল ঝারতে বললেই ধানাইপানাই। আমিও পালতু দালাল, চাল টিপে ভাত রোজগার করি। বুঝেছো। আগে কড়ি ফেলো, তারপর তোমার কি চাই সেটা বলবা।
-- আমি এই মকর কৈবর্ত কিন্তু সে ধাতের লোক নই। আমাদের বাপ ঝ্যাঠারা ইংরেজের সাথে লড়াই করেছে, আমাদের একটা সততা আছে, লড়াই করার ঐতিহ্য আছে। বুঝলেন। আমি এককথার মানুষ। সে কৈবর্ত হই আর যাই বলেন।
-- এ সব কথা শুনলেই কেমন চাঙ্গা হয়ে যাই। লড়াই, ইংরেজ, সততা। আহা, এখন তেমন লোক কোথায় এমন কথা বলবে! সবই তো কানার মধ্যে ঝাপসা, নাহয় ভেঁড়ার দলে বাছুর। যাই হোক, কি বাসনায় আমার কাছে এসেছেন এবার সেইটা বলেন।
ছোট করে বললে, উত্তর কলকাতায় তাদের একটা বাড়ি আছে, ঠাকুর্দার আমলে কেনা। তিনি সেখানে কিছুদিন থেকে ক্যাওড়াওতলা গেছেন। কিন্তু বাবার কাছে কলকাতার প্রলোভন ব্যাপক থাকলেও গ্রামের বাড়ির জমিজমা গরুছাগল হাঁসমুরগী নিয়ে ছড়ানো রাজ্যপাট সেসব ছেড়ে কলকাতায় থাকার সুযোগ ও সময় কমই পেতেন। মকর কৈবর্তেরও অবস্থা তথৈবচ। ঠিক বাবার মতই। তিনি কাজ থেকে অবসর নিতেই জমিজমা চাষবাস পুরো দায়িত্বটাই তার উপর পড়ে। কাজেই বাড়ি পুরনো হয়েছে, ধারাবাহিক না-থাকায় দীর্ণ হয়েছে। পুরোনো, ভাঙাচোরা, বিপজ্জনক বাড়ির লেবেল সাঁটিয়েছে পৌরকর্তৃপক্ষ। কিন্তু সেখানে সমস্যা পাকিয়েছে দু-তিনঘর ভাড়াটে। ছাদ চাপা পড়ে মরবে বললেও কিছুতেই তাদের ওঠানো যাচ্ছে না। ভালো টাকায় কেনার খদ্দের থাকলেও আইন আদালত পুলিশ এলাকার কাউন্সেলর সবই কিভাবে যেন ভাড়াটেদের বশে চলে যায়। অবশেষে কেউ একজন বলেছে এই পল্টু মহাজন বা পালতু দালালের কাছে একবার সমস্যাটা জানানোর কথা। তাই মকর কৈবর্ত একদিন সকাল সকালই চলে এসে চেপে ধরেছে এই পালতু বাবুকে। পালতু বাবু মুহূর্তেই ছকে ফেলেছে কোন পথে এগোতে হবে। এবং পার্টিকে এও বলে নিয়েছে কেসটায় খরচ আছে সেটা কৈবর্ত বাবু করতে রাজি কিনা! কৈবর্ত এখন বাড়ি বিক্রির কোটি টাকার স্বপ্নে মশগুল, কাজেই যা খরচ হবে হোক। বাড়িটা আগে হাতে আসা দরকার। পালতুও পাকা জিনিস, মাছকে খেলিয়ে ছিপে তুলতে খুব ভালোই জানে। সুতরাং মকর কৈবর্তের কাছ থেকে প্রথমে ভাঙা বাড়ির ঠিকানা, তার নিজের ঠিকানা, ফোন নম্বর, যে প্রোমোটর বাড়িটা কিনতে চেয়েছে তার ঠিকুজি ইত্যাদি বিস্তারিত খাতায় লিখিয়ে নেয়। সবকিছু নিয়ে পনেরো দিন পর এই সকালের দিকেই আবার আসবার কথা জানিয়ে বলে, কেসটা হাতে নেয়া যাবে কিনা পরের দিনই জানিয়ে দেবে। কৈবর্তও জোরাজুরি করে হাতফাত চেপে ধরে বলে, যেভাবেই হোক বাড়িটা তাকে ফিরিয়ে এনে দিতেই হবে। কথাগুলো বলার সঙ্গেই একথোকা টাকা ব্যাগ থেকে বার কোরে পালতু বাবুর হাতে ধরিয়ে দেয়। টাকা দেখে চোখ চকচক করে উঠলেও, নেবো না নেবো না বলতে বলতে টাকাটা তুলে নিয়ে যত্ন সহকারে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে দেয়। কৈবর্ত শুধু যাবার আগে জানতে চায়-- পালতু দালালের আসল নামটা কি? উত্তরে জানতে পারে, নাম পল্টু কিন্তু প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময় মাঝে মাঝেই তার পেট ছেড়ে যেত এমনকি স্কুলে এসেও প্যান্ট-ফ্যান্ট দুয়েকবার নষ্ট কোরে বাড়ি ফিরেছে। সেই থেকেই তাদের মাস্টারমশাই তাকে মজা কোরে পল্টুর বদলে পালতু বলে ডাকতো। সেই থেকেই পল্টু পালতু হয়ে গিয়েছে। তাদের পারিবারিক পদবী মহাজন থাকলেও দালালীর কাজ করার জন্য সবাই তাকে পালতু দালাল বলেই ডাকে। নাম নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই, কামাই থাকলেই চলবে। তাই পল্টু মহাজন এখন পালতু দালাল। সে-বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মকর কৈবর্তর চোখে পড়ে গিয়েছিলো পাশের ঘরের জানলায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে এক অতীব সুন্দরী মহিলা বাটি করে মুড়ি খাচ্ছেন। দৃশ্যটা কেমন বেমানান লাগলেও তার মনে বা মাথায় ঢুকে যায় মহিলার চকচকে চেহারার সতেজ উপস্থিতি। ব্যাস গল্পও ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে যায়। আর এই দেখাটাই সকালের পালতু দালালের "সাংঘাতিক ব্যাপারের" গৌরচন্দ্রিকা বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। নীরস, চাম এক আধবুড়ো পালতুর ঘরে অমন এক মহিলা কি করে আসলো! যাই হোক, মকর কৈবর্তর পরের আসা ১৫ দিন পর। সেটাও মাথায় ঢুকিয়ে নিয়ে সেদিনের মতো গলি পেরিয়ে বাসরাস্তায় এসে পাদানিতে পা রেখে সটান মকর কৈবর্ত বাসের অন্দরে বিলীন হয়ে যায়। আদিনিবাস পূর্ব মেদিনীপুর।
পরের দৃশ্যে ১৫ দিন পর সেই কৈবর্ত একহাতে একটা বড় টিন অন্য হাতে একটা ছোটো নিয়ে হানা দেয় পালতু দালালের বাড়ি। চারদিনের কোষ্টবদ্ধ পালতু তাকে দুহাতে দুই টিন সহ দেখে জিজ্ঞাসু হয় এবং ঘরে ভাজা মুড়ি ও মুড়কির গল্প শুনে খুশি দালাল, পাশের ঘরে বৌয়ের হাতে তুলে দিয়ে আসবার কথা বলেই কোষ্ঠ ক্লীয়ারের ডাকে ল্যাট্রিনমুখী ছুটে যায়। মাথায় শুধু মকর কৈবর্তের অমন লাঙল চষা পেটানো লম্বা চেহারার জলছবিটা লটকে থাকে। ভেতর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ‘বৌদি’ ডাক দিতেই খোলামেলা পোষাকের যে চকচকে ও সতেজ মহিলা বেরিয়ে এলো, আগের দিন মকর যে তাকেই দেখেছিলো, নিশ্চিত হয় এবং মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা ভুলে যায়। অবশেষে হুঁশ ফিরতে হাতের টিনদুটো দেখিয়ে বলে, নিজের ঘরে বানানো মুড়ি আর নলেনগুড়ে পাকানো মুড়কী। বাবু এগুলো রাখতে বললেন। বাবুর অনুমতিতে কদাচিৎ এই অন্দরমহলে যারা এর আগে এসেছে, তাদের থেকে মকর কৈবর্ত আলাদা, বৌটি সেটি বোঝে। এত সুঠাম, পেটা চেহারার লম্বা পুরুষ সরাসরি সামনাসামনি দাঁড়িয়ে অবলীলায় তার সঙ্গে কথা বলছে, ভাবতেই কোকিলার বুকের কাপড় পিছলে খসে যায়। দুজনার বুঝতে ভুল হয় না, আন্তর্জাতিক থুড়ি আদিম ক্ষুধার ইশারায় তারা পারস্পরিক শরীরবন্দী। টিন হস্তান্তরের খেলায় নখ ও থাবার কারিগরীতে আগুন সঞ্চারিত হয় কাঁপন দুর্যোগে। কোকিলার আঁচল আজ কিছুতেই বশে থাকছে না, ঢাকনা খুলে উথলে উঠছে দুধের বাটি। নিজেকে সামলে মকরকে মৃদু সম্বোধনে বলে--
-- আপনি ও'ঘরে গিয়ে বসুন, আমি চা নিয়ে আসি। মকর আর কিছুটা উত্তাপের আশায় তাড়াতাড়ি বলে ওঠে--
-- বৌদি, আমি মাঝেমাঝে আমাদের পুকুরের মাছ দিয়ে যাব, আপনারা খেলে খুব খুশি হব। এখানে তো আপনারা বরফ দেয়া মাছ খান। একদিন খেয়ে দেখবেন, নেশা ধরে যাবে।
-- নেশা তো এখুনি ধরিয়ে দিলেন, আড়চোখে বলে মুড়ি-মুড়কির নেশা। কথাটা বলেই বুক দুলিয়ে হেসে ওঠে। মকর নিজেকে আটকে নিয়ে বলে, আচ্ছা, তবে ভেতরে বসছি। আপনার হাতের চা খাবো, তবে কিন্তু আমার জন্যে দুধের চা করবেন। কোকিলা আবারও কিছুটা আড়চোখে মকরকে দেখে হেসে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়। মকর তার দুলে ওঠা পেছনের দুলুনিবিদ্ধ। এসে পালতু কত্তার টেবিলের সামনে একটা চেয়ার নিয়ে বসে। হাগুঘরের নানাবিধ যুদ্ধ-বিগ্রহ সামলে পালতুবাবু এসে চেয়ারে বসেই হল্লা কোরে ওঠে-- কৈ রে, চা হলো? কিছুটা পরেই কোকিলা ভেতরের ঘরের দরজার বাইরে থেকে দুহাতে দুকাপ চা নিয়ে বলে ওঠে, চা-টা নিয়ে যান।
-- থাক আর লজ্জা করতে হবে না। ভেতরে এসে দিয়ে যা। ওর হাত মুড়ি-মুড়কি নিলি আর চা দিতেই লজ্জা!
পালতুবাবু কথা বলার ফাঁকেই একটা খাতা খুলে আজকের কাজ বুঝে নিতে থাকেন আর চায়ের কাপ মকরের দিকে এগিয়ে দিতে এলে সে দেখে, একজোড়া চোখ তার ঈষৎ ফাঁক বুকের না-দেখা দিগন্তে সাঁতার খেলছে। ইচ্ছে করেই আঁচল কিছুটা সরিয়ে বলে--
-- আপনি দুধ খাবেন বললেন, মানে দুধের চা।
-- হ্যাঁ হ্যাঁ, দুধ। দুধ দিয়ে। আসলে আপনাদের মতো লাল চা আমি খেতে পারিনা। আসলে বাড়ির গরুর খাঁটি দুধ, বুঝলেন তো! বৌদি, আপনারা ঘি খান তো!
-- আমি খাই, উনি খান না। ওনার বেশি তেল ঘি খাওয়া নিষেধ আছে।
হঠাৎই পালতু দালাল খাতা থেকে মুখ তুলে বললো--
-- খাঁটি ঘি! নিজের বাড়ির গরুর দুধের ঘি! আহা, আপনি তো একটা স্বপ্ন দেখিয়ে ফেললেন গো! সেই ছোটবেলায় মা মাঝেমাঝে দুধের সর জ্বাল দিয়ে ঘি বানিয়ে আমাদের খাওয়াতো। গরম গরম ঘি আলুসেদ্ধের ফেনা ভাত, চালটাও কেমন একটা লাল রঙের চাল ছিলো, আমন না আউষ কি যেন একটা বলে। তা, পারলে একটু খাঁটি ঘি খাইয়ে যেও তো। এই দেখো তুমি বলে ফেললাম।
-- তুমিই তো বলবেন। আপনি আমার থেকে এমনিতেই বেশ কিছুটা বড়ো। দিয়ে যাবো, বৌদিকে বলেছিলাম, আপনারা খেলে আমাদের পুকুরের টাটকা মাছও খাইয়ে যাব। তবে হয়তো সব সময় এত সকাল সকাল আসতে পারবো না। নানা রকম কাজ থাকে তো!
-- ঠিক আছে, তুমি এসো, ও তো বাড়িতে থাকেই, ওর হাতে দিয়ে যেও। তবে আগে থেকে একটা ফোন কোরে আসবে। কোকিলার দিকে তাকিয়ে বললো, ও যখন আসবে ওর হাত থেকে মালগুলো নিয়ে নিস আর এখন ঘরে গিয়ে আমার খাবার রেডী কর, এখুনই বেরুতে হবে। মকরকে উদ্দেশ্য করে বললো, তোমার কেসটা আমি নিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু যখন যেমন বলবো খরচের ব্যাপারটা কিন্তু মাথায় রাখবে।
-- আপনি টাকার ব্যাপারে কিচ্ছু ভাববেন না, আমাদের কাছে সততার মূল্য অনেক।
-- ঠিক আছে, আজ তাহলে যেতে পারো। আর শোনো, ঘি মাছ দিতে তোমার যখন সময় হবে এসে দিয়ে যেও। তবে বাইরের গেটে আমি বেরোবার আগে তালা দিয়ে যাই যাতে চোর ছ্যাঁচোর কেউ ঢুকে না পরে, তুমি আগে থেকে ফোনটা করলে আমি তালা খুলে রেখে যাবো। ঠিক আছে। তাহলে ঘরে যাই।
-- হ্যাঁ দাদা, আমিও চললাম। তবে যাবার আগে নেশাবশতঃ একবার ভেতরের জানালায় তাকাতেই দেখে, সেই চকচকে মহিলা জানালার গরাদ ধরে স্পষ্ট তাকিয়ে আছে মকরের বাইরে বেরোনোর দিকে। হাত দিয়ে যেন টাটাও দিয়ে দিলো। মকরের বুকে যেন ঢাক বাজতে থেকে আকাশ ফাটিয়ে।
এক্ষেত্রে গল্পের গরু লাফ দিয়ে একদম গাছে ওঠেনি। একেবারে বিধিদদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ কোরে যেমন কর্পোরেশনের কর্মী, প্রোমটরের নিজস্ব একশন স্কোয়াড, থানাবাবু, বিরোধী প্রমোটরের আন্ডারগ্রাউন্ড লড়াকুবাহিনী-- তাদের যথাযথ সাম্মানিক কাঁচা টাকায় নিবেদন কোরে এবং তিন পরিবারের দুটি মেয়ে একটি যুবতী অন্যটি কিশোরী, তাদের উপর অন্ধকারে ঘুরঘুর করে ঘরের পাশে হিসহিস ফিসফিস বলাৎকারের ক্রমাগত ক্যাম্পেন চালিয়ে অবশেষে তিনজনকেই তিনটে ঘর দেয়া হবে চুক্তি কোরে সেখান থেকে তুলে দিয়ে জীর্ণ বাড়ি বুলডোজারে মাঠ বানিয়ে দেয়া গেছে। পালতুর উপস্থিতিতেই বিক্রীর উইল, নামপত্তনও প্রমোটর ক্রেতার ডান। মিষ্টির যেন ছড়াছড়ি। বাকি এখানেই থাক। মকর কৈবর্তর কোটি টাকার স্বপ্ন সার্থক। পুরোটাই পালতু দালালের হাতযশ। আর ওদিকে, পালতুর অবর্তমানে যখন তখন মকর কৈবর্তের সে বাড়িতে যাতায়াত বেড়েছে। জমির ফসল, খাঁটি দুধের ঘি, পুকুরের মাছ আর সঙ্গে মকর কৈবর্তকে ফ্রি পেয়ে তাকেও খেতে খেতে কোকিলা এখন পাঁচমাসের পোয়াতি। পালতু দালালের যখন হুশ ফিরলো সেদিন মধ্যরাতে বাড়ি ফিরে দেখলো বাড়ি ঠিকঠাকই আছে শুধু কোকিলাকে হাজার চিৎকার কোরে ডাকলেও কোথাও পেলো না, এমনকি সারারাত বাড়িও ফিরলো না। মোবাইলও বন্ধ এবং সেটা বাড়িতেই পাওয়া গেলো। পালতু এসব নিয়ে কোনও চাপ নিলো না, যা ভাববার সকালে যদি না ফেরে তখন দেখা যাবে। সকাল এলো, কোকিলা এলো না। ঘর খুঁজে বাঁকা হাতে লেখা একটুকরো বার্তা পেলো-- "আমি চললাম, আমাকে খুঁজবেন না। আমি আর ফিরবো না। আশীর্বাদ করবেন যেন গর্ভের সন্তানটি সুস্থভাবে জন্ম নিতে পারে।"
বার্তাটা হাতে নিয়ে পালতু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। এত নজরদারী কোরে বাড়িতে মেয়েছেলে পোষা যায় না। তারপর যতবারই সে ভাবতে চায় তবে কি মকর কৈবর্তই তার তলা কেটে ফাঁক করে দিলো, ততবারই মাথা পাঁইপাঁই ঘুরে ওঠে। একেতেই সাত দিনের কোষ্ঠবদ্ধতা তার উপর মেদিনীপুর। বার তিনেক মাথার চক্করে লাট খেয়ে সে সোজা হাগুঘরে গিয়ে বসলো এবং অন্নপ্রাশনের ভাত খালাসের কথা গল্পের শুরুতেই তো বলেছি। পালতু দালাল বা পল্টু মহাজন কোমোডে বসে আপন মনেই বলতে থাকলো, ভুলটা তার নিজেরই। অমন জমিচষা পোড়া তামার মতো টঙ্ক চেহারা কৈবর্তকে, ঘরে ঢুকিয়েছিলো তো সে নিজেই। তার ওপর খাটি ঘি, জ্যান্ত মাছ, ঘরে পাতা দৈ-- আহা, কোকিলারে, ভালো করে খা, আমি তো তোকে তেমন খাওয়াতে পারিনি, এবার প্রাণভরে খা, খেয়ে যা!
লোক জানাজানির আগেই পরের দিনই পালতু দালাল, বাড়িতে এক বাপমরা বিধবার মেয়েকে বেশ কিছু টাকাপয়সা তার মার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঘরে নিয়ে এসে ঢোকায়। প্রথম দিনই মেয়েটাকে জানিয়ে দেয়, আমি মরে গেলে আমার টাকা পয়সা এনামে-বেনামে যা কিছু সম্পত্তি তোর হবে, কিন্তু শর্ত একটাই, আমার সব রকম সেবা তোকে করতে হবে। বিছানা থেকে রান্নাঘর-- সব রকম সেবা। আজ থেকে তুই আমার রক্ষিতা। আমার বিছানাতেই তুই শুবি। পড়াশুনো করবার সুযোগ না-পাওয়া মেয়েটা বোকার মত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে অবশেষে বলে, "আপনি যা বলবেন, তাই হবে মালিক।" এখান থেকেই একটা উপন্যাস টানা যেতে পারে, পরে ভাববো।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন