![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫০ |
ঘ্রাণ-ভ্রান্তি
সময়টা ছিল শ্রাবণ মাসের এক সন্ধ্যেবেলা। ছাদে উঠে কলকাতা শহরের এক বিরল দৃশ্য দেখছি। আকাশে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে। বারিবর্ষণ এখন বিশ্রামে। হাওয়ায় তখনও জলের গন্ধ। বেশ কিছু দূরে বহুতলগুলো যেন এক নিষ্প্রাণ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছাদে দাঁড়িয়ে এই শহুরে সান্ধ্যদৃশ্য দেখতে দেখতে অনেক কিছুই ভাবছি।
শহরের উপকণ্ঠ বলে তেমন কোলাহল নেই। তবে কান পাতলে এক মৃদু গুঞ্জন শোনা যায়। আলো আঁধারিতে মায়াবী লাগছিল সময়টা। এমন সময় হঠাৎই এক অদ্ভুত গন্ধ নাকে এলো। গন্ধটা খুব যে সুন্দর তা নয়। বরং বেশ পচা, ভারী। মোটেও সুখদায়ক নয়। মনে হলো কোনো ইঁদুর মরে গেছে বা কোনো নিকাশি নালা হয়তো খোলা পড়ে আছে। রাত হয়ে এসেছিলো। এই সময় নিচে গিয়ে এই অদ্ভুত ঘটনার উৎস খোঁজবার মতো ইচ্ছে আর ছিল না। ঘরে ফিরলাম।
ঘটনাটা যে মনে সেরকম দাগ কেটেছিল তা নয়। সেদিনের পরেও ছাদে উঠেছি। তবে আমার নাক আর কোনো অদ্ভুত ঘটনা অনুভব করেনি। যদিও তারপর দিন সকালে এদিক ওদিক খুঁজেছিলাম। বলাই বাহুল্য কিছু পাইনি বা আমার চোখে পড়েনি।
কয়েকদিন পরের কথা। বেশ গরম ছিল। ছাদে হাওয়া পাওয়ার আশায় উপরে উঠছি। ছাদ সাধারণত অন্ধকার থাকে। তেমন আলো থাকে না। তবে এমন নয় যে কিছুই দেখা যাবে না। ছাদ থেকে আমি বেশ কয়েক ধাপ নিচে। হঠাৎ চোখের আড়ে দেখলাম, কোনো এক ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে আছে ছাদের দরজায়। সঙ্গে সঙ্গে ভালো করে তাকালাম। কেউ তো নেই! ছাদে উঠে এদিক ওদিক দেখলাম। না, কেউ নেই। ফাঁকা ছাদ। এমন নয় যে কেউ লুকিয়ে থাকবে। না, কোনো বিড়াল জাতীয় প্রাণীও নয়। কারণ যে-ছায়া মূর্তিকে ক্ষণিকের জন্য দেখেছিলাম তার উচ্চতা মানুষের মতোই।
ইতিউতি তাকিয়ে ছাদের কিনারর দিকে হাঁটছি। এমন সময় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম কেউ আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পিছনে তাকালাম। কেউ তো নেই!
ভাবতে ভাবতে কিছুটা বেখেয়ালে একেবারে ছাদের কিনারায় এসে দাঁড়ালাম। এটা বাড়ির পিছনের দিক। আমি নিচের দিকে ঝুঁকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি। হঠাৎই সেই গন্ধ। এবার অত্যন্ত তীব্র, আরও উগ্র। হাওয়াটা যেন সাথে সাথে ভারী হয়ে উঠেছে। চকের সাদা রেখার মতো ধূপের ধোঁয়া যেমন ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে যায়, তেমনি গন্ধটা দুই নাসিকা রন্ধ্রে প্রবেশ করে আমার মস্তিষ্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল! কি মনে হতে একেবারে নিচে নামলাম। আমার ফোনের আলো জ্বেলে চারিদিকটা দেখতে থাকলাম। অস্বাভাবিক কিছুই নেই।
ঘরে ফিরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। রাত কটা জানি না। ঘুমের ঘোরে টের পেলাম কেউ আমার কাঁধে হাত দিয়ে ঝাঁকাচ্ছে আর আমাকে ডাকছে। সঙ্গে তেমনি অস্বস্তিকর যেন গোলাপের ঘন ভারি গন্ধ। গোলাপের গন্ধ হলেও কেমন যেন কটু লাগছিল। আমি সাড়া দিয়ে উঠে বসলাম, "হ্যাঁ, উঠছি" বলে...
এ মহানগর এখন ঘুমে আচ্ছন্ন। আমার মনে ছায়ামূর্তি আর গন্ধকুণ্ডলী জট পাকাচ্ছে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন