ধারাবাহিক উপন্যাস
ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান
(১৭)
“ছায়ার ঘোমটা মুখে টানি / আছে আমাদের পাড়াখানি”
দেড়বছরে এই প্রথম অমলা একলা বাপের বাড়ি এসে দু-দিন থাকার ছুটি পেয়েছে। গত দুর্গাপূজার বিজয়াতে দিবাকরের সঙ্গে দুপুরে এসে প্রণাম করে, খেয়ে সন্ধের আগে ফিরে যেতে হয়েছে কনকপ্রভার নির্দেশে। ভাইফোঁটাতেও আসতে পারেনি। প্রতিবার ছোটো ননদ সুলেখা সকালে আসে দিবাকরকে ফোঁটা দিতে। মধুসূদন ও নিরঞ্জন সন্ধেবেলা তার ফোঁটা নিতে গেছে। মধুসূদন চাকরিতে বেশ উন্নতি করেছে—দামী কাপড় দিয়েছে অমলাকে। তবু অমলার মন ভালো ছিল না, ঘ্যানঘ্যান করেছিল দিবাকরের কাছে। সে পুরুষমানুষ। যতই আধুনিক চিন্তার হোক, স্ত্রীর মনখারাপের ভাগীদার হওয়ার ক্ষমতা নেই। বলেছিল, “তোমার ভাইরা ত আসবে। মায়েরে দ্যাখ নাই? দেওয়ালে ফোঁটা দেয়?”
অমলা বিড়বিড় করে, “তুমি আর কী করে বুঝবা? কাউরে ছেড়ে থাকতে ত হয় না।”
কনকপ্রভার ভাইদের মধ্যে তিনজন জীবিত। একজন আছেন রাজশাহীতে, একজন আসামে আর একজন বারানসীতে। অনেকবছর তাঁদের দেখেননি কনকপ্রভা। যিনি বারানসীতে থাকেন তিনি অবশ্য বছরতিন আগে একবার এসেছিলেন। সন্ন্যাস নেওয়া মনস্থ করার পর কাছের জনদের সঙ্গে দেখা করে গেলেন। কনকপ্রভা প্রতিবছর গোপনে চোখের জল মুছে ভাইদের উদ্দেশ্যে দেওয়ালে ফোঁটা দেন। ঘরের এককোণে পাশাপাশি তিন জায়গায় আঙুলের ডগায় দই, ঘী, চন্দন, কাজল লাগিয়ে মনে মনে মন্ত্র পড়েন। “আইজ অইতে ভাইধন যমদুয়ারো কাটা/যমের বইন যুমুনা আমি, যমদুয়ারো না যাইয়ো তুমি।”
অমলাও দেখেছে, তাতে অবশ্য তার মনখারাপ লাঘব হয়নি। বাপের বাড়ি মানে কি শুধু মা-বাবাকে প্রণাম করে নেমন্তন্ন খেয়ে আসা? প্রতি সকালে উঠেই মা-বাবাকে মনে পড়ে। বাসার আনাচ-কানাচে মন ঘুরে বেড়ায়। পাড়ার মানুষদের মুখ মনে পড়ে। কত অসংখ্য কথা জমেছে—সব বলে ফেলতে ইচ্ছা করে। এবার আসার আগে কনকপ্রভা বলেছেন, “ভোরের টিপিন খাইয়াই আইয়া পড়বা। ভাইরে কইয়ো য্যান ট্রামে বওয়াইয়া দেয়।”
কালীকিঙ্কর তাকে তুলে দিতে সঙ্গে এসেছিলেন। ট্রাম আসার মুহূর্তে মাথায় আদরের হাত রেখে বলেছিলেন, “সাবধানে যাইয়ো। দুইদিন আমগ ঘরখান য্যান আন্ধার হইয়া থাকব। বেইমশয়রে কইয়ো, আমি কথার খিলাফ করি নাই। তাইনের মাইয়া গ্র্যাজুয়েট হইল।”
সন্ধের পর রান্নাঘরে তারাসুন্দরীর পাশে বসে গল্প করছিল অমলা। একফাঁকে ধীরেন্দ্রনাথ এসে পিঁড়িতে উবু হয়ে বসেছেন। অমলার গায়ে নানারঙে বোনা ভুটিয়া চাদর। চাদরটা দিবাকরের, তাকে দিয়েছে। কলেজে থাকতে সে বন্ধুদের সঙ্গে একবার দার্জিলিং গিয়েছিল। ধীরেন্দ্রনাথ ধূসররঙের যে চাদর গায়ে দিয়েছেন, সেটা বহু পুরোনো। দু-চারটে ফুটোও হয়েছে বুঝি। অমলা বাবার গা-ঘেঁষে বলে, “তোমারে একটা চাদর কিনে দেব বাবা।” ধীরেন্দ্রনাথ হাসেন, “আইচ্ছা দিস’অনে। তয় তুমি গ্র্যাজুয়েট হইছ বইল্যা বড় আনন্দ পাইলাম।”
যে-দুটি বিষয়ে সে ব্যাক পেয়েছিল, প্রাইভেট পরীক্ষায় বসে দুটিতেই পাশ করেছে। পাশের খবর চিঠিতে জানিয়েছিল, আসা হয়নি। কনকপ্রভা তার এবাড়িতে আসার ব্যাপারে বড্ড কড়াকড়ি করেন। বারবার শুনিয়ে দেন, বিয়ের পর মেয়েদের মূল ঠিকানা তার শ্বশুরবাড়ি। দিবাকরকে দু-একবার বলে লাভ হয়নি। একই ভাবনায় জারিত সে-ও এই ব্যাপারে কনকপ্রভার বিপক্ষে আলাদা কিছু বলেনি। কিন্তু মূলতঃ দিবাকরের উৎসাহে সে নতুন করে পড়া আরম্ভ করেছিল। দিবাকর তাকে পড়িয়েছে, একটা কোচিঙ্-ক্লাসেও ভর্তি করে দিয়েছিল। অবশ্যই বাহ্যতঃ কনকপ্রভা খুশী ছিলেন না। অথচ তার পাশের খবরে তিনি প্রতিবেশী ভাড়াটেদের নকুড়ের মিষ্টি খাইয়েছেন। লজ্জা পেয়েছিল অমলা, বারণ করতে গিয়ে ধমক খেয়েছে শুধুশুধু। এবার তার স্বামী ও শ্বশুর তাকে ডেভিড হেয়ার শিক্ষক-শিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করার পরিকল্পনা করেছে। সেশন শুরু হতে দেরি আছে। তার আগে ফর্ম নিয়ে ফিল-আপ করে জমা দিতে হবে। দিবাকর একদিন তাকে জাজেস কোর্টের পাশে আলিপুর ক্যাম্পাস দেখিয়ে এনেছে। বৃটিশ-আমলের চকমেলানো বাড়ি, বিস্তৃত বাগান, অজস্র গাছপালাসমৃদ্ধ সবুজ ক্যাম্পাস। দূরের মেয়েদের জন্য হস্টেল আছে। অমলা অবশ্য বাড়ি থেকে যাতায়াত করবে। উজ্জ্বলমুখে অমলা সব গল্প শোনাচ্ছিল। ধীরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত সুখী হয়েছেন কন্যার সফলতায়। শিক্ষকমনে অশেষ কৃতজ্ঞতা বোধ জন্মেছে জামাতা ও বৈবাহিকের প্রতি। তারাসুন্দরীর চোখে অমলাকে আরও সুন্দর দেখায়। ভরভরন্ত দেহ, আলোর মতো ত্বকের রঙ। একবোঝা কালো চুল ঘাড়ের কাছে মস্ত খোঁপায় বাঁধা। সরু সিঁথিতে সিঁদুরের পথ। গোল দুহাতে শাঁখা-পলা, চিকচিকে সোনার চুড়ি। মা-র নজর লাগবে বলে চোখ সরিয়ে নিচ্ছেন বারবার। ছদ্ম বকুনির সঙ্গে মেয়েকে বলেন, “শাশুড়িরে ‘মা’ ডাকস নি? তাইনের লগে-লগে থাকবি, যা কইবেন করবি। তর যা চোপরা! গোসা অইলে মুহের উপরে কইবা না। তাইনই হইল ঘরের মাথা!”
অমলা হেসে মা-কে দু-কথা শুনিয়ে দিল। তারাসুন্দরী বোঝেন মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। আগের ছিঁচকাদুনি, নাকের-ডগায়-রাগ মেয়ে খানিক বদলেছে। আরও একটু রাতে কারখানা থেকে ফিরে নিরঞ্জন রান্নাঘরে পিঁড়িতে বসে বলে, “বড় খিদা লেগেছে মা। অমু তুই তাইলে ছুটি পেলি অ্যাদ্দিনে? বস্ স্বয়ং ছুটি দিল নাকি স্ট্রাইক করে আইসা পড়ছিস? মানব না মানছি না বলে?”
অমলা গুমগুম করে ভাইয়ের পিঠে কিল বসায়। নিরঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে লাফায় আর হাসে,
“গায়ের জোর বেড়েছে দেখি! মোটাও হয়েছিস জব্বর—বালিভরা ছালার মতো দেখাইতাছে। বকসিং প্র্যাকটিস করা যাবে।”
অমলা চেঁচায় আগের মতো, “দ্যাখ না মা, নিরুটার কত সাহস বাড়ছে!”
কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল ভাইবোনের নিত্য খুনসুটির দিনগুলো। তারাসুন্দরীর হাসেন, “অহনও দুইওজনে কাইজ্যা করস?”
ছেলেকে বকুনি দেন অমলাকে মোটা বলার জন্য। ছেলে-মেয়ে-স্বামীকে ভাত বেড়ে দেন। সামান্যই উপকরণ, তবু কী আনন্দ। অমলা বলে, “তার মা কবে য্যান পিয়াজ-রসুনবাটা দিয়ে বোয়ালমাছের রসা রানছিল। খুব তার হাতের রান্নায়।”
নিরঞ্জন আবার খেপায়, “অ, তাই ক! ওদের বাসায় খাইয়া খাইয়া এই অবস্তা—এইদিকে মান্ষের কপালে ভাতই জুটেনা। তা তুই কি শুধু বইসা খাস আর গাব জ্বাল দিস?”
অমলা ভাইয়ের ওপর আরো রেগে যায়, কথার উত্তর দেয় না। তারাসুন্দরী ভাবেন, আরও একটা দিন ও রাত মেয়েটা আছে। রবিবার সকালে চলে যেতে হবে।
পাড়ার অনেকে এসে দেখা করে গেলেও বাসন্তী আসেনি। বাসন্তী এল শনিবার দুপুরে ইস্কুল-ফেরত। শনিবার হাফ-ডে’র নিয়ম করা হয়েছে। অমলাকে দ্বিপ্রাহরিক ঘুম থেকে তুলল। ক্ষমা চাওয়ার মতো স্বরে বলল, “আসতে পারি নাই রে অমু, ইস্কুলের কাজে খুব জড়িয়ে গেছি। চল কাপড় পর, ট্রামে করে ঘুরে আসি। সিনেমা যাবি? প্রদীপ-হলে বাংলাবই আসছে।”
অমলা উঠতে যাচ্ছিল, তারাসুন্দরী ঘুমচোখে আপত্তি করলেন। বাসন্তী দুঃখিত হয়ে বলল, “কেন খুড়িমা বারণ করেন?”
“অখন কই যাবি? তাই দুইডাদিনের লাইগ্যা আইছে—,কাল ভোরেই ফিরব। কুনো জাগাত পইরা গেল, দুঃখু পাইল—তাইর শাশুড়ি আমগ মন্দ কইব না?”
অমলা মা-র মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল। শান্তস্বরে বাসন্তীকে বলল, “আজ ছাইরা দ্যাও। পরে আসলে যাব বাসন্দিদি।” বাসন্তীর বুক থেকে ভারী শ্বাস নির্গত হল। তার জীবন অন্যখাতে বইছে—অনেক স্বাধীন সে। অমলা হেসে বলল, “তোমাদের ইস্কুলে নাকি মেমসাহেব পড়াতে আসছে বাবা কইল?”
বাসন্তীদের অভিযানের গল্প তারাসুন্দরী অনেকবার শুনেছেন। তাঁর চোখে ঘুম জড়িয়ে আছে। অমলা আস্তে আস্তে বাসন্তীর হাত ধরে উঠে সামনের দাওয়ায় গিয়ে বসল। শীতের রোদ্দুর মরে এসেছে। তাতে আর তাপ নেই, কেমন একরকম ধোঁয়াটে আলো জেগে আছে। অমলা গায়ের চাদর টেনে নিয়ে বাসন্তীর গা ঘেঁষে বসল। তাদের দু-জনেরই ঝুলিভরা গল্প, মনভরা কথা। বাসন্তী একটু পরে জানতে চাইল কেমন আছে অমলা! কেমন কাটছে সংসারের দিন। অমলা বলে, “ভালো আছি গো, তারা সবাই লোক ভালো। কিন্তু শ্বশুরবাড়ি আর বাপেরবাড়ি ক্ষেত্র ত এক হইব না। তোমার গল্প শুনি।”
বাসন্তী অন্যমনস্কভাবে বলে, “আমার গল্প নাই। তর গ্র্যাজুয়েটের খবরে খুব আনন্দ পাইছি। বি-এ, বি-টি হলে ভাল জাগায় চাকরি পাবি। আমিও টিচার্স ট্রেনিং করব—কাকাবাবু বলছেন। নাইলে নাকি ইসকুল অ্যাফিলিয়েশন পেলেও টাকা-পয়সা পাব না।”
অমলা বাসন্তীকে লক্ষ করে, তারপর জড়িয়ে ধরে বলে, “অ দিদি এইসব কথাবাত্তা ছাড়। মেমসাহেবের ঘরদুয়ার কেমন দ্যাখলা বল।”
“অইদিকের পুকুরপাড় দিয়ে হেটে আসি চল—নিত্যা কেমন মাসকাবারির দোকান দিয়েছে দেখবি। তেতুলগোলা কাগজে মুইরা বেচে—বলে আচার!”
“তাই নাকি? নিত্যাপাগলা—ল্যালা-ক্যাবলাটা? বাজারে পিঠে করে বস্তা নামাত?”
বাসন্তী মাথা নাড়িয়ে হাসতে থাকে। অমলা মেমসাহেবের কাহিনি শোনার অনুরোধ করতে থাকে। বাসন্তীর কেমন যেন বিরক্তি হয়। স্থির গলায় বলে, “শোনার মতো কিছু নাইরে! তোর কথা ক’ শুনি।”
অমলার সম্প্রতি বি-টি কলেজের প্রশস্ত কম্পাউণ্ড—সাহেবের ছেড়ে-যাওয়া আস্তানা দেখে মুগ্ধ হয়ে আছে। বড়ো-বড়ো থামওয়ালা বাড়ি, গাড়ি-বারান্দা, বারান্দা দিয়ে ঢুকে ওপরে যাওয়ার কাঠের সিঁড়ি, লোহার কাজকরা রেইলিং। দিবাকরের কাছে শুনেছে যারা হস্টেলে থাকে তাদের নাকি বিভিন্ন অলৌকিক অভিজ্ঞতা হয়। দিবাকরের এক বন্ধুর বোন ওই কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছে বছরখানিক আগে। গভীর রাতে ঘোড়ার খুরের শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে চত্বর। কর্মশিক্ষাঘরের জিনিসপত্র ছত্রখান করে দেয় কোনও অদৃশ্য অস্তিত্বের রহস্যময় হাত। বলতে গিয়ে অমলার গায়ে কাঁটা দেয়। তারপর নিজের নতুন জীবনের গল্প শোনায়, কত-কী বলার আছে। বাসন্তী চুপ করে থাকে, মন দিয়ে শোনে না। একটু পরে ছোট্ট করে বলে, “খুব ভাল বর পাইছিস, তাই না?”
অমলা লজ্জারুণ মুখে মাথা নাড়ায়, “তারও অনেক কীর্তিকলাপ ছিল ছাত্রবয়সে। রাজনীতি করত।”
জিভের গোড়ায় এসে-যাওয়া জেলখাটার ঘটনা অতিকষ্টে গিলে ফেলে। বাসন্তী পেছনে লাগে, “তোরে পেয়ে সে-সব ভুলছে, তাই ক’—!”
কোন ফাঁকে আকাশের আলো নিভে গেছে, মশাদের ভনভনি শুরু হয়েছে। তারাসুন্দরী হ্যারিকেন জ্বালিয়ে বারান্দায় রেখে গেলেন। তাঁর ছোট্ট ঠাকুরের আসনের সামনে প্রদীপ জ্বেলেছেন। ধুনুচিখানা নিয়ে এঘর-ওঘর করছেন। মনের মধ্যে ছ্যাঁতছ্যাঁত করে, দিনটা ফুরিয়ে এল। অমলা নিঃশব্দে বসে কী ভাবে, বাসন্তীকে আর প্রশ্ন করেনা। বাসন্তী নীরবে ফিরিঙ্গি পাড়াটির পুনর্নিমাণ করার চেষ্টা করে। রবিঠাকুরের সহজপাঠের সহজ কবিতার বর্ণনা যেন ওই ফিরিঙ্গিপাড়া। ওপারের দেশের বাড়ির বিন্যস্ত ঘরদুয়ার, খোলা মাঠ-পুকুর মনে পড়ে! দাঙ্গার দাউদাউ আগুন লাগার আগেকার নির্মল আনন্দময় সেইসব দিনগুলো। স্মৃতি ফিকে হয়ে এলেও মিলিয়ে যায়না। এই শ্রীছাঁদবিহীন মাথাগোঁজার বাসাবাড়ির মাইলচার দূরত্বে এমন সুন্দর কবিতার মতো বসতি! অদূরে সবুজ কার্পেটের মতো গলফ-খেলার মাঠের সরু চিলতে দেখা যায়। তাকে ঘিরে ছড়ানো নিরিবিলি ছবির মতো সাহেবকলোনি সম্পূর্ণ অন্যরকম। বাংলোবাড়িগুলোর চৌহদ্দি পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, লোহার মজবুত কালো গেট। পাঁচিলের ধারে লম্বা বাইরে থেকে বাড়িগুলোকে দেখতে দেয় না। অনেক বাড়িই অবশ্য তালাবন্ধ। জোনাথনের মতোদের বাদ দিলে এদেশ ছেড়ে বাসিন্দারা নিজেদের আসল দেশে ফিরে গেছে। ধীরেন্দ্রনাথকে সঙ্গে করে চার যুবক-যুবতী নম্বর মিলিয়ে জোনাথনের বাংলো খুঁজে বের করেছিল। কালো গেট খুলে ঘাসের চমৎকার লন, ফুলের বাগান। মোরামের সরু পথ বেয়ে এসে লম্বাটে বারান্দা, লোহার চেয়ার টেবিল পাতা। টেবিলের ওপর ক্রোশকাঁটা আর সুতো, কী একটা বুনছিল জোনাথন। সকলকে ভাঙা-ভাঙা বাংলায় আন্তরিক আপ্যায়ন করল। জড়তা, অস্বস্তি, হীনন্মন্যতা ওদের মুখ বন্ধ করে রেখেছিল–সাদা চামড়ার শাসকের জাত বলে কথা, হলই বা প্রাক্তন। তার ওপর এমন ঘরবাড়ি। জোনাথন ওদের ডেকে নিয়েছিল ঘরের ভেতরে, লিভিংরুমে। বলল, “মেনি মস্ক্যুটোজ ইন গার্ডেন, কাম ইন্সাইড।”
মোটা পর্দা দিয়ে ঢাকা লম্বা কাচের জানালা। লম্বাটে ল্যাম্প জ্বলছে ঘরের কোণায়। অনেক উঁচু সিলিং থেকে ঝুলছে আলো আর ইলেক্ট্রিক পাখা। চেয়ার-কৌচ, লম্বাটে খাটের মতো বসার জায়গা –জিনিসপত্র ঠাসাঠাসি। মেঝেতে কার্পেট। চেয়ার-সোফার মাঝে ছোটো লম্বাটে নীচু টেবিল। দেওয়ালের একদিকে যিশুর লম্বামতো ক্রুশবিদ্ধ তৈলচিত্র, সঙ্গে মাতা মেরি। নীচে বাতিদানে কম পাওয়ারের আলো। বাসন্তীর ঘোর লাগছিল, বাকিদের কেমন লাগছিল বুঝতে পারছিল না। অন্যদিকের দেওয়ালে সোনালি ফ্রেমে কয়েকটি ফোটোগ্রাফ। জোনাথন সকলকে কাছে ডাকল, চিনিয়ে দিল তার পূর্বপুরুষদের। বাবা-মা-র ছবি, স্বামীর ছবি–কেউই আর জীবিত নেই। জোনাথনের মেয়ে অ্যালিস ট্রে-তে করে নিয়ে এল নিজেদের হাতের তৈরি কেক ও বিস্কিট। ঘরের এককোণে বড়ো একটা লম্বা, লোহার আলমারির মতো ভারী মেশিন। সেটা খুলে কিছু বের করছিল অ্যালিস, খুলতেই ঠাণ্ডা বাতাস এল। বাসন্তী সাহস করে জিজ্ঞেস করেছিল, “কোল্ড আলমারি?” জোনাথন সস্নেহে হাসল, “ইয়েস, দ্যাটস আ কোল্ড ওল্ড ফ্রিজিডেয়ার।”
শান্তি বা লীলার মধ্যে কে যেন স্বগতোক্তি করেছিল, “হেইডা কী?”
জোনাথন আন্দাজে বুঝে হেসে বলেছিল, “ঠাণ্ডা মেশিন। আইসক্রিম ইউ ইট ইন সামার? আই মেক ইন দিস মেশিন।”
গুণী মহিলা, কত কী পারে—মনে হয়েছিল বাসন্তীর, সাদা-চামড়ার সাহেব বলেই পারে। অনেক কথা হল জোনাথনের সঙ্গে ধীরেন্দ্রনাথ এবং দিলীপের। বাসন্তী ছিটকে-আসা দু-চারটে টুকরো শব্দ বুঝল, বাকি দু-জন তাও না।
দু-দিন পরে স্কুলে যাওয়ার পর দিলীপ বলেছিল, “কী দিদিমুনিরা, পরশু মেমসাহেবের কথাবাত্তা কিছু বুঝলেন?”
বাসন্তী বিরক্তভাবে মাথা নেড়েছিল, “আমার ঠ্যাকা লাগে নাই। আপনি বুঝছেন তো, তাইলেই হইল।”
“শোনেন, মেমসাহেবের জীবনের গল্প। বাবা ছিল সরকারি কর্মচারি। তার আবার দুই বিয়া। প্রথম বউ সে ছিল খাঁটি মেমসাহেব। জোনাথনের জন্মের দুইবছর পর অসুখ করে সে মারা যায়। তারপর যারে বিয়া করে সেই বিবি আছিল এদেশীয়, কালা চামড়া মাইয়া, সে জোনাথনরে মানুষ করছে। সাহেব তখন কলকাতায় ছিল না। পরে চাকরিতে বদলি হয়ে কলকাতায় আসে, এই বাসা বানায়।”
রসিয়ে গুছিয়ে কাহিনি শোনায় দিলীপ। শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে। দিলীপ বলে, “দেশভাগের দুই-তিনবচ্ছর আগে সাহেব নিজের দেশে ফিরে যায়। বাড়িঘর বেইচ্যা থুইয়া জোনাথনরে নিয়ে যেতে চাইছিল। জোনাথন ত্যাদ্দিনে বিয়া করছে—সে-ও কালাচামড়া। ওই যে ক্লাব আছে, গলফ খ্যালে, ঘুরা ছুটায়—জকি না কী য্যান কয়, সের’ম একজনরে। খুব নাকি হ্যাণ্ডসাম ছিল। হ্যাণ্ডসাম মানে বুঝেন? সুপুরুষ! তার প্র্যামে—,”
মহিলাদের সামনে বলতে না পেরে অস্বস্তিতে চুপ করে গেল দিলীপ। কিন্তু মহিলারা সমস্বরে বলল, “শ্যাষ করেন—দিলীপবাবু।”
লিলিয়ান জোনাথন বাবার সঙ্গে ফিরে গেলেন না। থেকে গেলেন এখানে, তাঁর মেয়ে বড়ো হচ্ছিল। তাঁর বাবার দ্বিতীয়া স্ত্রী খুব ভালোবাসতেন জোনাথনকে, তাঁর এদেশীয় স্বামীকেও।
বাসন্তীর মন অকারণে ভার হয়ে উঠেছিল। বলল, “কাউরে দেখলাম না?”
“কেউ বেচে নাই। স্বামী মারা গেছে তিন-চার বছর আগে। অখন অই বাসাতে মা আর মেয়ে – মেয়ে ত কইল বিয়াশাদী করে নাই। সাহেবি ইশকুলে টিচারি করে।”
আনমনে সংক্ষেপে বাসন্তী এসব শোনায় অমলাকে। বাইরে নিকষ কালো, আকাশে তারা চিকচিক করছে। গাছের পাখিরা পাশ ফিরে শুচ্ছে। অমলাদের দাওয়া লণ্ঠনের কমিয়ে রাখা আলোতে অন্ধকারপ্রায়। দু-তিনটে চামচিকে নেচে-নেচে ঢুকছে আর বেরিয়ে যাচ্ছে। কবে এই অঞ্চলে আলো আসবে কোনও নিশ্চয়তা নেই।
(ক্রমশঃ)

বাহ... চমৎকার ❤️
উত্তরমুছুনতারপর?
একমাস আবার 😊
উত্তরমুছুন