বড় পর্দায় হিন্দী ছবি (২২শ পর্বঃ) দুই আদিত্যের আখ্যান (১) আদিত্য ধর
ধুরন্ধরঃ দ্য রিভেঞ্জ (২০২৬)
চতুর্দশ পর্বে বলেছিলাম ধুরন্ধর-এর দ্বিতীয় পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছি। এতটুকু হতাশ করেনি এই ‘সিকুয়েল’।
আসি দ্বিতীয় পর্বের প্রথম পরিচ্ছেদে, যার ঘটনা ঘটছে জানুয়ারি ২০০০-এ। প্রথমেই দেখি আমাদের নায়ক জসকিরত (পাকিস্তানে ‘হামজা আলি মাজারি’, রণবীর সিং) সপরিবারে তার হবু ভগ্নীপতি গুরবাজের (বাস্তবে হরবিন্দর সিং সন্ধু, রূপায়ণে উদয়বীর সন্ধু) ক্যামেরার সামনে দাঁড়াচ্ছে। এরপর দেখি এলাহাবাদে সে যায় ঐ ভগ্নীপতির সঙ্গে ‘আতিফ আহমেদ’ (বাস্তবে আতিক আহমেদ, রূপায়ণে সালিম সিদ্দিকি) নামক মাদক কারবারীর কাছ থেকে গুরবাজকে দিয়ে গুরবাজের ব্যবসার মাদক, এবং মাদকের খদ্দেরদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অজুহাত দেখিয়ে এ-কে ৪৭ এবং আরও কিছু আগ্নেয়াস্ত্র জোগাড় করতে। পাঠানকোটে ফিরে জসকিরত সাংসদ সুখবিন্দর সিং-এর (রূপায়ণে আশিষ দুগ্গল) বাড়ীতে ঢুকে এক-এক করে হত্যা করে বাড়ির বারো জন পুরুষকে, মুখে জসকিরতের একটাই প্রশ্নঃ আমার বোন কোথায়? টুলু পাম্পের ঘরে বন্দিনী বোন জসলীনকে (রূপায়ণে পরী পান্ধের) সে উদ্ধার করে।
২০০২ঃ উচ্চতর আদালতে জসকিরতের উকিল বীণা (রূপায়ণে ভাষা সুম্বলি) পুরো ঘটনার প্রেক্ষিত ব্যাখ্যা করেন। সামান্য জমি বিবাদের জন্য সুখবিন্দর ও তার পরিবারের পুরুষেরা জসকিরতের বাবাকে গাছের ডালে লটকে ফাঁসি দেয়, তার বড় বোন হরলীন-কে (রূপায়ণে হিতিকা বালি) গণধর্ষণ করে খুন করে, আর ছোট বোনকে করে অপহরণ। সে সময়ে জসকিরত বাড়ীতে ছিল না, তার সেনানী বাবা-ঠাকুর্দার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সৈন্যদলে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিল। ফিরে এসে সে প্রাণপণ চেষ্টা করে পুলিশে অভিযোগ জানাতে, কিন্তু রাজনৈতিক চাপে পুলিশ কোন অভিযোগই গ্রহণ করে না। এর ফল, সরকারী উকিলের ভাষায়, জসকিরতের হাতে সুখবিন্দরের বংশধারার অবলুপ্তি। সরকারী উকিল নিম্ন আদালত যে জসকিরতকে ‘মাত্র’ সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল তা বাতিল করে প্রাণদণ্ডের দাবী করেন।
ধুরন্ধর প্রভূত দর্শক-সমাদর পাবার ফলে কিছু বিশেষ শিবির থেকে ‘কাঁউকাঁউ’ আর্তনাদ উঠেছিল যে (১) ছবিতে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে দানবায়িত করা হয়েছে, এবং এই কথার সূত্র ধরে (২) একটি পুরো দেশকে – পাকিস্তান – দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা, প্রথম পরিচ্ছেদে ভারতের অন্তর্গত পাঞ্জাবের এক শিখ পরিবারের আরেক শিখ পরিবারের প্রতি কী আচরণ দেখলাম? এর ফলে কি সমস্ত শিখ সম্প্রদায়কে ‘দানবায়িত’ করা হলো, না পাঞ্জাব প্রদেশকে ‘দাগিয়ে’ দেওয়া হলো? প্রথম পর্বে লক্ষ্যস্থির করা হয়েছে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষদের ওপর নয়, পাকিস্তানী গুপ্তচর সংস্থা আই-এস-আই এবং লিয়ারির অপরাধ জগৎ-কে। এটা বাস্তব যে এই মহোদয়রা সবাই একটি বিশেষ ধর্মাবলম্বী।
২০০৪ : এক জেল থেকে যখন অন্য জেলে জসকিরতকে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, পথে সেই গাড়ীর পথরোধ করে দাঁড়ায় আরেকটি গাড়ি, আর অপহৃত হয় জসকিরত। তাকে উপস্থিত করা হয় ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্টর অজয় সান্যালের (বাস্তবে অজিত দোভাল, রূপায়ণে আর মাধবন) সামনে। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, মৃত্যুকামী জসকিরতকে উদ্বুদ্ধ করেন অজয়, বলেন সরকার দায়িত্ব নেবে তার মা-বোনের আর্থিক প্রয়োজনের (প্রতি মাসে তাদের ব্যাঙ্কে জমা পড়বে তিরিশ হাজার টাকা), প্রতিদানে জসকিরত তার অন্তরের সুপ্ত আগুনকে পুনঃপ্রজ্জ্বলিত করে দেশের কাজে লাগুক, যা সে ভারতীয় সৈন্যদলে থেকে করতে চেয়েছিল।
২০০৯ : এবার অতীত থেকে বর্তমানে। রেহমান ডাকাইতকে শেষ করে হামজা-জসকিরত এখন লিয়ারিতে তার ‘হ্যান্ডলার’ মহম্মদ আলমের (রূপায়ণে গৌরব গেরা) সঙ্গে আলোচনায় রত। প্রসঙ্গত, ভারতের শত্রুদের বিরুদ্ধে এই মুসলমান মানুষটিও লড়াইতে সাহায্য করছে ‘হামজা’-কে! কোন সম্প্রদায়কেই ‘দাগিয়ে দেওয়া’ হয়নি। এর আগে দেখেছি একটি ঘরে বসে হামজায় রূপান্তরিত জসকিরত ধীরে ধীরে তার পূর্ব-পরিচয় সংক্রান্ত সব কিছু – পাসপোর্ট এবং গুরবাজের তোলা সেই পারিবারিক ছবি – পুড়িয়ে ফেলতে। করতে করতে তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল। মনে পড়ে প্রথম পর্বে লিয়ারিতে ঢোকার আগে অখাদ্য আহার্য গলাধঃকরণের সময় হামজার নীরব অশ্রুপাত? পুরুষ মানেই নাকি testosterone!
রেহমানের মৃত্যুর পর লিয়ারির মসনদ দখলে লড়াইতে নামে রেহমানের জ্ঞাতি ভাই উজের বালোচ এবং তার বিপক্ষে আরসাদ পাঠান। সুকৌশলে হামজা উজেরের পক্ষাবলম্বন করে বীভৎস হিংসার মাধ্যমে লিয়ারিতে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। উজের অপহৃত আরসাদের সর্বসমক্ষে শিরশ্ছেদ করে সেই কাটা মাথা নিয়ে ফুটবল খেলে! ফলে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে লিয়ারির স্থানীয় সাংসদ জমিল জামালি (বাস্তবে নবিল গাবোল এবং আলতাফ হুসেন, অভিনয়ে রাকেশ বেদী), হামজার শ্বশুরের, ওপর আসে প্রবল চাপ। সাধারণ মানুষের লিয়ারি থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে পুলিশ অফিসার আসলাম চৌধুরী (সঞ্জয় দত্ত) এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে চার নিরপরাধ বালোচ ছাত্রকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে ‘এনকাউন্টার’-এর মাধ্যমে হত্যা করে। (এদেশেও কোনো জঘন্য অপরাধের পর ‘জনমানস’-কে তুষ্ট করতে ‘এনকাউন্টার’ করা হয়!) আর হামজা ও জমিল মিলে উজেরকে আত্মরক্ষার দোহাই দিয়ে দুবাই পাঠায় যেখানকার বিমান বন্দরে নামামাত্র উজের হয় গ্রেপ্তার। লিয়ারির শূন্য সিংহাসনে এবার আরোহণ করে আমাদের হামজা!
এই পরিচ্ছেদের শুরুতে একটি অণু ঘটনা আছে। আই এস আই প্রধান মেজর ইকবাল (বাস্তবে ইলিয়াস কাশ্মিরী, অভিনয়ে অর্জুন রামপাল) বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে আসলাম চৌধুরীকে প্রশ্ন করছেন সে রেহমানকে মারল কেন (ইকবাল হামজার রহস্য এখনো জানেন না)। উত্তরে আসলাম বলে যে রেহমান ‘বড়ে সাহেব’-এর বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। এই ‘বড়ে সাহেব’ কে আমরা পরে জানব। কথোপকথন চলাকালীন আমরা দেখছি এক ক্ষিপ্ত জনতা এক অসহায় ব্যক্তিকে নৃশংসভাবে প্রহার করছে। নির্লিপ্ত ইকবাল আসলামকে ব্যখ্যা করেন যে লোকটির একটা দোকান ছিল যা সেই আই সি ৮১৪ বিমান হামলার নায়ক জহুর মিস্ত্রীর (বাস্তবে জাহিদ আখুন্ড, রূপায়ণে বিবেক সিনহা, ধুরন্ধর ১ম পর্ব) পছন্দ হলেও লোকটি তা বেচতে সম্মত হয়নি। আসলাম খোঁজ নিয়ে জানেন যে লোকটি শিখ ধর্মাবলম্বী। সঙ্গে সঙ্গে তার নামে রটানো হয় যে ‘কাফের’ হয়ে সে কোরান পুড়িয়েছে। বলতে বলতে ইকবাল হাতের সিগারটি বারান্দার কাঠে টিপে নির্বাপিত করেন আর সেই ধর্মোন্মাদ জনতা পেট্রোল ঢেলে নিরপরাধ শিখ, এবং তাকে রক্ষা করার বৃথা চেষ্টায় তার শরীরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা তার স্ত্রীকে জ্যান্ত দগ্ধ করে।
মুসলমান মৌলবাদের কথা উঠলেই একপক্ষ চিৎকার করেন ‘ইসলামোফোবিয়া’! তা, উক্ত ধর্মাবলম্বীদের হিংস্র ‘কাফের বিদ্বেষ’ নিয়ে কথা হোক! মনে করিয়ে দিই, ধুরন্ধর-এ ২৬/১১-র মুম্বাই হামলার সময় তাজ হোটেলের ‘কাফের’-দের নিয়ে ইকবাল হামলাকারীদের কী নির্দেশ দিয়েছিলেন!বর্তমান ছবিতে তিনি বলবেন যে ভারতে যে কোন সন্ত্রাসবাদী হামলার সময় তিনি স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে হামলাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন কারণ ‘কাফেরদের আর্তনাদ’ শুনলে তাঁর অন্তরাত্মা তৃপ্ত হয়!
পরের পরিচ্ছেদে দেখি হামজার ঘরে পুত্রসন্তানের জন্ম, ইকবালের ঘরে তাঁর মানসিক-প্রতিবন্ধী কন্যা এবং তাঁর গুণধর, দুর্মুখ, উইলচেয়ারে আসীন পিতৃদেব ব্রিগেডিয়ার জাহাঙ্গীর (রূপায়ণে সুবিন্দর ভিকি)। পুত্রের পৌরুষ নিয়ে চরম অবজ্ঞাজ্ঞাপন করে তিনি বলেন যে ১৯৭১-এর যুদ্ধে তিনি হাজার বাংলাদেশী মেয়েদের ধর্ষণ করে যেসব পুত্র ‘পয়দা’ করেছিলেন, তাদের একটিকে তুলে আনলেও এই ‘ডাউনস সিন্ড্রোম’ আক্রান্ত কন্যার চেয়ে সে কাজে আসত। তাঁর এত ক্রোধের কারণ ইকবাল ভারতের রাজনৈতিক দল, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিতে প্রভূত পরিমাণ ডলার ঢেলেও ২০১৪-তে নরেন্দ্র মোদীর প্রধান মন্ত্রী হওয়া আটকাতে সক্ষম হননি, পাকিস্তানের ‘পছন্দের’ লোকেরা ক্ষমতায় আসেনি। ইতিমধ্যে ইকবালের কাছে ফোন আসে ‘বড়ে সাহেবের’। তিনি হামজাকে দেখতে চান। ‘বড়ে সাহেব’ আর কেউ নয়, স্বয়ং দাউদ ইব্রাহিম (রূপায়ণে দানিশ ইকবাল)! শয্যাশায়ী এই আতঙ্কবাদী নিদান দেয় যে করাচি থেকে সস্তায় মাদক কিনে ভারতে, বিশেষ পাঞ্জাবে, তা চড়া দামে বেচে সেই টাকায় পাকিস্তান মার্কিনী ও রুশী অস্ত্র কিনতে পারবে। তা সরবরাহ করা হবে ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংস্থাদের এবং নক্সালদের। উৎফুল্ল জমিল জামালি বলেন যে এর মানে ভারতের টাকায় ভারতের মানুষদের মাদকাসক্ত করা আর অস্ত্রের মাধ্যমে ভারতের সরকারের স্থিতিশীলতা ধ্বংস করা! দাউদ যোগ করে যে ছ’হাজার কোটি টাকার জাল নোট নেপালে তাদের এজেন্ট মারফৎ ভারতে ঢোকাতে হবে। দাউদ এবার হামজাকে বলে যে মাদক পাচারের দায়িত্ব নিয়ে তাকে মুসলমানদের প্রতি তার আনুগত্য প্রমাণ করতে হবে। মাদক সীমান্ত পার করা অবধি হামজার ওপর নজর রাখবে আসলাম চৌধুরী। পাঞ্জাব থেকে মাদক কেনার দল পাকিস্তানে আসে। চমকে উঠে হামজা দেখে যে তাদের মধ্যে রয়েছে তার সেই ভগ্নীপতি গুরবাজ/পিন্ডা। সে এখন স্বাধীন পাঞ্জাবের স্বপ্নে বিভোর। পার্টি চলাকালীন হামজা কে নিয়ে শৌচাগারে ঢুকে সে আচমকা প্রশ্ন করে, “নিজের দেশ মনে পড়ে না, জসসি?”
এর ফল হয় দুজনের মধ্যে হাতাহাতি আর হামজার চোখে সিরিঞ্জ ঢোকাতে গিয়ে মাদকসেবন করে অপ্রকৃতস্থ গুরবাজের নিজের চোখেই ঢোকে সিরিঞ্জ আর পড়ে যেতে গিয়ে তার মাথা ঠুকে ভেঙে যায় বাথটব।
দেহ আবিষ্কৃত হতে তুলকালাম শুনে হামজা আবার শৌচাগারে গিয়ে দেখে ওমর (রূপায়ণে আদিত্য উপ্পল) নামক পুলিশ অফিসার চেপে ধরেছে আলমকে – সেইই নাকি গুরবাজের খুনী। আসলাম বলে যে আলম নির্ঘাত “হিন্দুস্তানী গুপ্তচর”। হামজা আলমকে গুলি করে শেষ করে দেয়। ফলে তার জোটে আসলাম চৌধুরীর বাহবা।
এরপর হামজা যে চায়ের দোকানে আলমের সঙ্গে চা খেত, সেখানে গিয়ে যথারীতি দু’ কাপ চায়ের অর্ডার দেয়। আলমকে সে ভুলবে কী করে? ফ্ল্যাশব্যাকে দেখি যে গুরবাজ মরার পর সেখানে কপালজোরে এসে পড়ে আলম। সে হামজাকে বলে যে হামজার অক্ষতভাবে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। সে চলে যাক আর আলমের মতো “বারেলির এক পকেটমারকে” দেশের জন্য আত্মবলিদান দিতে সে দিক! অর্থাৎ গুরবাজের মৃত্যুর দায় নিজের ওপর নিয়ে হামজাকে বাঁচায় আলম। মুসলমানেরাও ধর্মের ওপর দেশকে স্থান দিতে জানে! আর সহকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করতে বাধ্য হওয়ার ফলে আরও বেশী করে তার উপস্থিতির অভাব তাড়না করে হামজাকে। আর, মনে রাখা ভাল যে পরবর্তীকালে দুবাইয়ে অজয় সান্যাল হামজা/জসকিরতকে বলবেন, “আলমের ব্যাপারে শুনলাম।” যদি আলম আদতে জসকিরতের মতো অ-মুসলমান হতো, তাহলে সান্যাল তাঁর আসল নামই ব্যবহার করতেন। লিয়ারিতে হামজার ছায়াসঙ্গী আরেক ভারতীয় মুসলমান, রিজওয়ান (রূপায়ণে মুস্তাফা আহমেদ) ।
কিন্তু হামজা যে অতর্কিতে আলমকে মেরে ফেলে তার জন্য ওমরের মনে জাগে সন্দেহ এবং সে তা আসলামকে জানায়। আসলাম ওমারকে নির্দেশ দেয় হামজার ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে। এই কথোপকথন শুনে ফেলে হামজার বৌ ইয়ালিনা (সারা অর্জুন) । ফলে সে হামজার কাগজপত্র ঘেঁটে পায় সেই ডায়েরি যাতে হামজা যাদের নিকেশ করবে তাদের নামের তালিকা বিদ্যমান। রেহমান ডাকাইতের নাম কাটা!
হামজা বাড়ি ফিরতেই তার দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ইয়ালিনা জানতে চায় যে সে হিন্দুস্তানী গুপ্তচর কিনা, এবং ইয়ালিনা তার কী ক্ষতি করেছিল যে হামজা এইভাবে ইয়ালিনার জীবন নষ্ট করেছে। প্রত্যুত্তরে হামজা ডায়েরির তালিকায় থাকা প্রত্যেকে যে কত কত নিরপরাধ মানুষের গণহত্যার জন্য দায়ী তা নিজের স্ত্রীকে জানায়। হামজা স্পষ্ট বলে যে তার শত্রুতা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে নয়। তার লক্ষ্য এই গণহত্যাকারীরা, যারা যতটা ভারতের ক্ষতি করছে, ততটাই করছে পাকিস্তানের। প্রায়শই নিরপরাধ বালোচ যুবকদের তুলে এনে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যা দিয়ে ‘এনকাউন্টার’ করা হয়। বালোচিস্তানে তাদের জল সরবরাহে বিষ মিশিয়ে মারা হয়েছে তেষট্টি স্কুলশিশুকে। হাজারা সম্প্রদায়ের পাঁচশোর ওপর লোক, কোয়েট্টায় ছ’শোর বেশি মানুষের মৃত্যুর দায় এই স্বঘোষিত ‘গাজী’-দের। নিজের পুত্রসন্তানের দিব্য দিয়ে হামজা বলে তার একমাত্র লক্ষ্য তার নিজের দেশের নিরাপত্তা। তার কাজ শেষ হলে ইয়ালিনা সকলের সামনে তার পরিচয় ফাঁস করতে পারে, সপুত্রক তাকে ত্যাগ করতে পারে।
ইয়ালিনা তখন বলে যে হামজার যা করবার, সে যেন তা তাড়াতাড়ি করে, আসলামের সন্দেহ জেগেছে তার ওপরে।
ইতিমধ্যে উজের বালোচ দুবাই থেকে ভারতে প্রত্যার্পিত হচ্ছে বিচারের জন্য। আসলাম ঠিক করেছে যে উজের বিমানবন্দর থেকে জেল জীবিত অবস্থায় পৌঁছবে না। হামজা সুচতুরভাবে আসলামকে বলে যে হামজার বালোচ ছেলেরা একটি বিশেষ রাস্তায় আসলামকে আক্রমণ করবার অপেক্ষায় থাকবে। আসলাম যেন অন্য একটি রাস্তা দিয়ে উজেরকে নিয়ে যায়। অবিশ্বাসী আসলাম ওমরকে পাঠায় দ্বিতীয় রাস্তা দিয়েই উজেরকে নিয়ে যেতে যাতে বালোচদের হামলায় উজের – তৎসহ ওমর – মারা যায়! আসলাম ভেবেছে যে হামজা তথাকথিত নিরাপদ রাস্তাতেই ফাঁদ পেতেছে। প্রথম রাস্তা দিয়ে যখন আসলাম যাচ্ছে তখন হামজা ও বালোচদের বর্ষীয়ান নেতার ঠিক করা আত্মঘাতী যুবক বিস্ফোরক-বোঝাই গাড়ির ধাক্কায় নিজেকে আর আসলামকে উড়িয়ে দেয়।
আদালত উজের বালোচকে বারো বছরের একাকী কারাবাসের দণ্ড দেয়। হামজা তাকে জেলে গিয়ে আশ্বাস দেয় যে তার বিলাসের কোন অভাব হবেনা এবং সে বেশী দিন জেলবন্দীও থাকবে না। এরপর জেলারকে ব্যাগ ভর্তি টাকা দিয়ে তাকে হামজা বলে উজেরের যেন কোন অসুবিধে না হয়।
দুবাইয়ে পৌঁছে হামজা প্রথমে টেলিভিশনে দেখে যে ভারত পাকিস্তানের উরি হামলার উত্তরে উরিতে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ করেছে। এরপর সে মুখোমুখি হয় অজয় সান্যালের। তিনি এবার তাঁর ‘সিংহ’-কে free hand দেন। শুরু হয় হামজার পরিচালনায় এবং কখনও তার নিজের হাতে, এক এক করে ভারতে হামলাকারীদের নিধন। বিশেষ করে উল্লেখ করব মুম্বাই হামলার এক চক্রীকে নিকেশ করার আগে তাকে বলা, “কি যেন বলেছিলে? ‘গাজোয়া –এ –হিন্দ (ভারতীয় উপমহাদেশের বিরুদ্ধে ‘পবিত্র’ যুদ্ধ) শুরু হবে মুম্বাই থেকে?”)। আর আছে গুলিতে ঝাঁজরা করে দেবার আগে আই সি ৮১৪ বিমান ছিনতাইকারী জহুর মিস্ত্রীকে ফোনে অজয় সান্যালের হুকুমে কাঁদতে কাঁদতে বলানো, “ ভারতমাতা কী জয়!” ধুরন্ধর-এ এই জহুরই সদর্পে সান্যালকে বলেছিল, “হিন্দুরা স্বভাব-কাপুরুষ। তোমাদের পাশের দেশেই থাকি। দম থাকলে কিছু করে দেখাও!” এর ওপর হামজার কাছ থেকে জাল নোটের খবর পাওয়ার ফলে ভারতে জারি হয় ‘নোটবন্দী’। যেহেতু জাল ৬০০ কোটির সবই ছিল ৫০০ আর হাজার টাকার নোট, পাকিস্তানের উত্তর প্রদেশের বিধান সভায় নিজেদের পছন্দের লোক বসানোর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। এর ওপর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বাবরী মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের পক্ষে রায় ঘোষণা করে। ক্ষিপ্ত দাউদ নিদান দেয় আরও মুজাহিদ্দীন ভারতে ঢুকিয়ে রক্তগঙ্গা বওয়াবার। তার ক্রীড়নক সেই আতিফ আহমেদ। তাকে জেল থেকে বার করার সময়েই গুলিতে ঝাঁজরা করে দেয় পাকিস্তানের মতোই ‘অজানা আততায়ী’। বাস্তবেও ১৫ই এপ্রিল ২০২৩-এ আতিক আহমেদকে এইভাবে প্রয়াগরাজে শেষ করা হয়েছিল।
ওমরের সন্দেহ নিশ্চিতরূপ ধারণ করে যখন সে দেখে হামজা ইয়ালিনার হাতে তুলে দিচ্ছে বিদেশ যাত্রার (ক্যানাডায়) প্লেনের টিকিট। সে অতর্কিতে হামজার বাড়িতে চড়াও হয় আর ছেলের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ইয়ালিনার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে যে তার স্বামী ভারতের গুপ্তচর। এই খবর সে জানিয়ে দেয় মেজর ইকবালকে যিনি কিছুক্ষণ আগেই নিজের দুর্মুখ পিতাকে বাথটবে চুবিয়ে হত্যা করেছেন! ইকবাল প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেন। অতীতের মতো আরেক হিন্দুস্তানীর শিরশ্ছেদ করে তিনি মুরিদকের মিনারে সেটা স্থাপিত করবেন।
পরের পর্বের রক্তক্ষয়ী এবং মিনিটে মিনিটে পাশার দান উল্টে যাওয়া লড়াইয়ের বর্ণনা দেওয়া আমার ক্ষমতার বাইরে। শুধু উল্লেখ করব হামজা-জসকিরতকে শিকলে বেঁধে নির্মম প্রহার করতে করতে মেজর ইকবালের ভবিষ্যদর্শনেরঃ পুরো পাকিস্তান ভারতের ওপর চড়ে বসবে; সবাইকে কলমা পড়ানো হবে (মনে পড়ে পহেলগাঁওয়ের হতভাগ্য পর্যটকদের কথা?), হবে সমস্ত কাফের পুরুষদের ‘খৎনা’ অর্থাৎ লিঙ্গাগ্রচর্মছেদন, আর ভারতীয় মেয়েরা যুদ্ধলব্ধ লুট হিসেবে বিক্রী হবে বিভিন্ন ‘কোঠায়’! প্রত্যুত্তরে জসকিরত বলে, “অনেক ভারতীয় রক্ত ঝরিয়েছিস। এবার তোর পালা। এ হলো নতুন ভারত – তোদের ঘরে ঢুকে তোদের মারবে!” ইকবাল ছিল Angel of Death বা মৃত্যুর ফেরেশতা। জসকিরত হলো তাঁর পাল্টা Wrath of God, ঈশ্বরের ক্রোধ। এই Wrath of God নাম নিয়েই ১৯৭২ সালে ইজরেল মিউনিখে ইজরেলী ক্রীড়াবিদদের নিধনকারী ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর আর পি এল ও দলের ঘাতকদের খুঁজে খুঁজে শেষ করে। জসকিরতও খুঁজে খুঁজে ভারতের মানুষের ওপর হামলাকারীদের নিকেশ করেছে। শেষ এই ইকবাল। অদম্য ইকবাল মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়েও সদর্পে ঘোষণা করেন, যে তাঁর মতো হাজার হাজার যোদ্ধা খোরাসান থেকে ভারতে ঢুকে দিল্লীকে নতুন ইসলামাবাদ করবে।লাল কেল্লায় উড়বে তারা আর অর্ধচন্দ্রের পতাকা। “পাকিস্তান জিন্দা-” ‘-বাদ’ উচ্চারণের আগেই বিস্ফোরণে উড়ে যান ইকবাল। জসকিরত ইয়ালিনাকে ফোন করে অনুরোধ করে যে সে যেন একবার তার নাম উচ্চারণ করে। ইয়ালিনা “হামজা” বলার পর জসকিরত তার আসল নাম স্ত্রীকে জানায়। ওমর এসে গ্রেপ্তার করে হামজাকে।
শেষ পর্ব শুরু হয় জেলে হামজার ওপর স্বীকৃতি আদায়ের জন্য নির্মম শারীরিক নির্যাতন যা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে থাকেন লেফটানেন্ট জেনারেল শমশাদ হাসান (অভিনয়ে রাজ জুতসি), আই এস আইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল। হঠাৎ তাঁর ফোন বেজে ওঠে। অপর প্রান্তে অজয় সান্যাল! শমশাদ যেন অবিলম্বে জসকিরতকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ছেড়ে দেন। তার কিছু পরে এক বিমানবন্দরে নামবে এক প্রাইভেট জেট। তার নামাওঠায় যেন কোন বিঘ্ন না ঘটে। শমশাদ যখন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন যে তাঁর মতো জেহাদীরা কাফেরদের শাসানিকে ডরান না, সান্যাল সহাস্যে উত্তর দেন যে তাহলে কয়েক বছর আগে আই এস আইয়ের এক উচ্চপদস্থ অফিসার বিদেশে গিয়ে যে মোটা পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে পাকিস্তানের পারমাণবিক পরিকল্পনার প্রচুর গুপ্ত তথ্য পাচার করে এসেছিলেন, সেই খবর ছবিসহ প্রচারিত হবে। ‘জিহাদী’ শমশাদ দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হস্তান্তর করেছেন মুসলমানদের শত্রু ইহুদী কাফেরদের! শমশাদ কী ভেবেছিলেন? ইজরেল ভারতকে সে কথা জানাবে না? পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ তো হাসানকে কুকুরের মতো মারবেই, তাঁর স্ত্রী-কন্যাও রক্ষা পাবে না! মুহূর্তের মধ্যে বাঘ থেকে কেঁচো হয়ে যাওয়া শমশাদ কাতরকন্ঠে বলেন, “কিন্তু চারিদিকে যে রটে গেছে যে আমরা একজন ভারতীয় গুপ্তচরকে ধরেছি! একটা বলির পাঁঠা তো চাই!” ক্ষতবিক্ষত জসকিরত ফিসফিস করে বলে,”উজের বালোচ। এইজন্যই ওকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছি!” বলে জসকিরত হাসতে থাকে। পরবর্তীকালে উজের ভারতের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির (মিথ্যা) অভিযোগে কারাদণ্ড পায়।
নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি থেকে ফেলে দেওয়া হয় জসকিরতকে। আরেকটি গাড়ি এসে তাকে তুলে নেয়। উঠে যাকে জসকিরত দেখে সে হলো যার সম্বন্ধে সান্যাল বলেছিলেন যে তোমার হ্যান্ডলারের (আলম) ওপরেও একজন থাকবে যাকে হয়তো তুমি কখনও দেখতে পাবে না। চরম বিপদে সেইই তোমায় বাঁচাবে। গাড়িতে বসে জসকিরত-হামজার শ্বশুর জমিল জামালি!!! ৪৫ বছর আগে তাঁকে পাকিস্তানের রাজনীতির জগতে প্রবিষ্ট করা হয়েছিল। ইয়ালিনার কাছ থেকে ওমরের হাতে হামজার গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা জেনে জমিল সান্যালকে ফোন করেন। এরপরেই সান্যালের ফোন যায় শমশাদের কাছে। বিমানবন্দরে নামার সময় জসকিরত একটা ক্ষোভ ব্যক্ত করেঃ সে দাউদকে মারতে পারেনি। উত্তরে জমিল তাঁর ফোনে সংরক্ষিত একটা ভিডিও জামাইকে দেখান। বহু বছর আগে এক ভোজসভায় দাউদের সঙ্গে করমর্দনের অছিলায় জমিল দাউদের শরীরে এক বিষাক্ত রাসায়নিক (dimethyl mercury) ঢুকিয়ে দেন যা খাদ্য বিষক্রিয়ার ছদ্মবেশে দাউদের মূত্রাশয়, যকৃৎ ও ফুসফুস ধীরে ধিরে নষ্ট ক’রে তার বর্তমান মুমূর্ষু অবস্থার জন্য দায়ী। জমিল জসকিরতকে বলেন, “যন্ত্রণা দিয়ে বাঁচিয়ে রেখে ধীরে ধীরে মারার মধ্যে যে তৃপ্তি, সরাসরি হত্যায় তা কোথায়?” জসকিরত প্লেনে ওঠে। পরে একটি ঘরে ছবির আরম্ভে যে ভাবে চোখের জলে নিজের বাবা-মা-বোনেদের ছবিকে বিদায় জানিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল, ঠিক সেইভাবে অশ্রুসজল নেত্রে সে পুড়িয়ে ফেলে স্ত্রী ইয়ালিনা আর পুত্র জায়ানের সঙ্গে নিজের ছবি।
পাঠানকোটের পথে জসকিরত। ট্রেনে মায়ের কোলে এক বালক সন্তানকে দেখে আবার তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। নিজের বাড়ির বাইরে থেকে সে দেখে তার মা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন, আর তাঁর দু পাশে খেলে বেড়াচ্ছে বোন জসলীনের দুই সন্তান, যাদের পিতৃবিয়োগের সঙ্গে দুর্ভাগ্যক্রমে জড়িত জসকিরত নিজে। ছাত থেকে তাদের দেখছে জসলীন। নীরবে ফিরে যায় সংসার থেকে নির্বাসিত জসকিরত।
আর এক বিশেষ মতবাদের প্রবক্তারা এই ছবিতে পেয়েছেন শুধুই testosterone!
ছবির উপসংহারে দেখব ২০০২ সালে জসকিরত, লিয়ারিতে তার ছায়াসঙ্গী রিজওয়ান এবং অন্যান্যদের কঠোর শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ। এছাড়া তাদের বিভিন্ন পাকিস্তানে চলা ভাষা এবং কোরান ও মুসলমান ধর্মের আচারবিধি আত্মস্থ করতে হয়েছে।
একেবারে শেষে শমশাদ ওমরকে পাঠাবেন পাগলা গারদে কারণ ওমর তাঁকে শাসিয়েছে যে সে জাতীয় পরিষদে গিয়ে রাষ্ট্র করবে যে হামজা এক ভারতীয় গুপ্তচর যে অসংখ্য পাকিস্তানীর মৃত্যুর জন্য দায়ী এবং তাকে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শফিক-এর (বাস্তবে নওয়াজ শরীফের) অনুগত বলে মিথ্যাচার করছেন শমশাদ!
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য যাঁদের প্রাণ কাঁদে, তাঁদের জন্য এই আখ্যানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও তাদের সম্প্রদায়ের তালিকাঃ
জসকিরত সিং রঙ্গি – শিখ, ভারতে সংখ্যালঘু
আলম ও রিজওয়ান – মুসলমান, সংখ্যালঘু
এবং যে দেশ ও সম্প্রদায়ের মূল্যবান তথ্যসরবরাহের জোরে সান্যাল শমশাদকে বাধ্য করেন জসকিরতকে মুক্তি দিতে, সেই ইহুদীরা সারা পৃথিবীর জনসংখ্যার দুই শতাংশ – চরমভাবে সংখ্যালঘু!
উরিঃ দ্য সার্জিকাল স্ট্রাইক (২০১৯)
নাম যদিও ‘উরি’, ছবি শুরু হচ্ছে জুন ২০১৫-তে চান্ডেল, মণিপুরে ভারতীয় সৈন্যদলের ওপর উত্তর-পূর্বের এক বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের আক্রমণ এবং তার প্রতিক্রিয়ারূপে মেজর বিহান সিং শেরগিলের (বাস্তবে কর্নেল কপিল যাদব, রূপায়ণে ভিকি কৌশল) নেতৃত্বে সীমান্ত পার করে একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ও তাদের নেতাকে নিকেশ করা দিয়ে। এরপর বিহান প্রধানমন্ত্রীর কাছে অকাল অবসরের আবেদন করে, কারণ অ্যালজাইমারে আক্রান্ত তার মা-র সেবায় নিযুক্ত হওয়া। প্রধানমন্ত্রী বিকল্প প্রস্তাব দেন যে বিহান দিল্লীতে ‘ডেস্ক জব’ করুক। বিহান সম্মত হয়।
আখ্যানের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দেখি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত মা সুহাসিনীকে (রূপায়ণে স্বরূপ সম্পৎ) নিয়ে বিহানের নানা সমস্যা। সরকার থেকে একজন নার্সকে নিযুক্ত করা হয়, যে তার নাম জানায় ‘জাসমিন আলমিডা’ বলে (রূপায়ণে ইয়ামি গৌতম)। আদতে সে একজন এজেন্ট, যার বুদ্ধিমত্তার জোরে সুহাসিনী তার নজর এড়িয়ে একদিন বাড়ী থেকে বেরিয়ে হারিয়ে গেলেও – যার জন্য বিহান জাসমিনকে কড়া ভাবে দোষারোপ করে – উদ্ধার হন। কর্মক্ষেত্রে বিহানের পরিচয় হয় বায়ুসেনার ফ্লাইট লেফটানেন্ট সীরাত কৌরের (রূপায়ণে কীর্তি কুলহারী) সঙ্গে যে জসকিরত সিং রঙ্গির বিধবা বলে নিজের পরিচয় দেয়।
তৃতীয় পরিচ্ছেদে ঘটে ১৮ই সেপ্টেম্বর ২০১৬-র উরিতে পাকিস্তানী জঙ্গী আক্রমণ যাতে ১৯ জন সেনানীর মৃত্যু ঘটে। জঙ্গীদের মারতে সক্ষম হলেও গ্রেনেড বিস্ফোরণে প্রাণ হারান বিহানের ভগ্নীপতি মেজর করণ কশ্যপ (বাস্তবে কর্নেল এম এন রাই, রূপায়ণে মোহিত রাইনা)। তাঁর স্ত্রী, বিহানের বোন নেহার (রূপায়ণে মানসী পারেখ) গর্ভে তখন তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা গোবিন্দ ভরদ্বাজ (বাস্তবে অজিত দোভাল, রূপায়ণে পরেশ রাওয়াল) মিউনিখ অলিম্পিকে ইজরেলী ক্রীড়াবিদদের হত্যার পর ইজরেল যে Operation Wrath of God-এর মাধ্যমে প্রতিটি হত্যাকারীকে শেষ করে, সেই উপমা টেনে সার্জিকাল স্ট্রাইকের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন যে এবার পাকিস্তান দেখুক নতুন ভারতকে যে পাকিস্তানী চোরা হামলার জবাবে পাকিস্তানে ঢুকে প্রত্যাঘাত করবে। বিহান এই ক্রিয়াকাণ্ডে সামিল হয়।
চতুর্থ পরিচ্ছেদে গোবিন্দ ISRO, DRDO এবং RAW-এর সাহায্যে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে আতঙ্কবাদীদের বিভিন্ন ডেরার সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ DRDO-র এক শিক্ষানবিশ ঈশানের তৈরি এক বিচিত্র ‘ড্রোন’, যা অবিকল পাখীর মত দেখতে এবং যার নামকরণ ঈশান করেছে ‘গরুড়’! এই ড্রোন শত্রুপক্ষের ডেরার একেবারে কাছে, জানলায় গিয়ে ভেতরের ছবি পাঠাতে সক্ষম। আবার আমরা দেখা পাই জাসমিনের, যার আসল নাম পল্লবী শর্মা।
পঞ্চম পরিচ্ছেদে আমরা দেখব ২৮শে সেপ্টেম্বর ২০১৬-র সার্জিকাল স্ট্রাইকের রুদ্ধশ্বাস চিত্রায়ণ। পাকিস্তান কিছু আগাম খবরের ভিত্তিতে ভূমি থেকে আকাশে কার্যকরী ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করায় বিহানের দল তাদের হেলিকপ্টার ছেড়ে পদব্রজে এক গুহার মাধ্যমে ‘আজাদ কাশ্মীর’-এ প্রবেশ করে। এখানে তাদের পথ প্রদর্শক হয় সেই গরুড়! দুটি লঞ্চপ্যাডের সমস্ত উগ্রবাদীদের তারা শেষ করে, তার মধ্যে উরি হামলার দুই মাথা জব্বর এবং ইদ্রিস। শেষোক্তজনের সঙ্গে বিহানের হাতাহাতি লড়াই হয় যার শেষে বিহান ইদ্রিসকে বলে, “আমার ঘরে ঢুকে আমার ভাইদের মেরেছিলি। এবার আমি তোর ঘরে ঢুকে তোকে শেষ করলাম!” বাকি তিনটি দলও সফলভাবে শত্রুঘাঁটি ধ্বংস করে। শেষ মুহূর্তে বিহানের পেছনে পড়ে প্রথমে স্থানীয় পুলিশ এবং তারপর পাকিস্তান সেনার হেলিকপ্টার। এইখানে বিহানের হুকুমে আসরে নামে সীরাত কৌর। তার বায়ুযান থেকে নিজের প্রয়াত স্বামীর স্মরণে সে বর্ষণ করে মেশিনগানের গুলি। পাকিস্তানী এম-আই ১৭ হেলিকপ্টার রণে ভঙ্গ দেয়। বিহান নিজের প্রতিশ্রুতি মতন সমগ্র অভিযানের সকলকে অক্ষত অবস্থায় নিয়ে ভারতে ফেরে।
তৃতীয় পরিচ্ছেদে গোবিন্দ একটি বিচক্ষণ মন্তব্য করেছিলেন। পাকিস্তান কখনও তারা যে সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর তা স্বীকার করে না। তাই সার্জিকাল স্ট্রাইক করে তাদের জঙ্গী ঘাঁটি ধ্বংস করলে আন্তর্জাতিক ফোরামে তারা টুঁ শব্দটি করতে পারবে না কারণ তারা তো সবসময় গলা ফাটাচ্ছে এই বলে যে পাকিস্তানের মাটিতে কোন জঙ্গী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাই নেই!
দুর্ভাগ্যক্রমে, উরি সার্জিকাল স্ট্রাইকের সাফল্য হয়তো খানিকটা আত্মতুষ্টির জন্ম দিয়েছিল, যার ফল হয়েছিল পহেলগাঁওয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, যার প্রত্যুত্তর দিতে হয় অপারেশন সিঁদুরের মাধ্যমে। আদিত্য ধর তাঁর প্রত্যুত্তর রাখেন ধুরন্ধর-এর মাধ্যমে, যদিও সে ছবির ঘটনাকাল সমসাময়িক নয়। ধুরন্ধর-এর প্রথম ভাগ ১৪শ পর্বে আলোচিত হয়েছে। এবার আসব দ্বিতীয় পর্বে। তারপর হবে আরেক আদিত্যের কথাঃ তিনি আদিত্য সুহাস জাম্ভালে।
(ক্রমশ)
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন