![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫১ |
জুতোর ভেতর পিঁপড়ে
বললাম, “ছুটিছাটা নেই, পয়সাকড়ির টানাটানি – আর কদিন পরে না হয় যাব”! বৌ ঝামটা দিয়ে উঠল, “যখনই বলি তখনই তোমার হাজার সমস্যা। সকলে বেড়াতে যায় – আমারই কপালগুণে এমন বাড়িতে পড়েছি। ‘বি’ ব্লকের সাহাবৌদি, দশ নম্বরের চৌধুরিরা – এই তো ঘুরে এল। শীতের ছুটিতে আবার নাকি যাবে। আর আমরা … বছরের পর বছর পচে মরছি…”!
অসুবিধে সত্ত্বেও যেতে হলো। বৌ খুশি। আমাদের সাত বছরের ছেলে প্রীতমও। সে ট্রেনে এত দূরের যাত্রা কখনো করেনি। ট্রেনে শোয়াও যায়, এটাও সে আগে দেখেনি।
গিয়েছিলাম বেনারসের দিকে। কাশীধাম দেখা হলে একদিন গেলাম সারনাথে। ভগবান বুদ্ধের জীবন সম্বন্ধিত আর সম্রাট অশোকের সময়কার বহু নির্দশন রয়েছে। রাস্তার পাশে একটা দোকানে আমরা তিনজনে আইসক্রীম খাচ্ছি, এমন সময় একটা ছেলে কটা চটিবই নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল। মলাটে বুদ্ধ কিংবা আশোক স্তম্ভের ছবি। ইংরেজি, হিন্দী এমনকি বাংলাও আছে। ছেলেটা আমাদের প্রীতমেরই বয়সী। গায়ে ফাটাফুটো জিনসের শার্ট। পরনে হাফ-প্যান্ট। বৌ আর আমি সমস্বরে বললাম, “এই যা, যা – আমাদের বই লাগবে না।”
সংসারে থাকতে থাকতে কঠিন হয়ে গেছি। আমার নিজের গলার আওয়াজটাই যেন দু-পর্দা বেশি রূঢ় শোনাল। প্রীতম কিন্তু একদৃষ্টে ছেলেটিকে দেখছে। তার শিশুমন মানুষের স্বাভাবিক মন। ছেলেটা যে অভাবগ্রস্ত এবং একটা বইও বিক্রি হওয়া তার জন্য অনেক, তা সে বুঝে নিয়েছে। আইসক্রীমের দিকে তার আর মন নেই, সুমিষ্ট সুশীতল সুধা গলে-গলে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে।
প্রীতম আমার দিকে তাকালো – মানে স্পষ্ট। সে চায় আমরা একটা বই কিনি। প্রীতম এও জানে যদি রাজি করানো যায় তাহলে বাবাকেই করানো যাবে। মাকে বলা বৃথা।
আইসক্রীম শেষ করে ছেলেটাকে জিগেস করলাম, “কত রে…”
“ষাট রুপয়া।”
“ধুর, এই পাতলা বই-এর দাম এত!”
“পচাস দিজিয়ে”
আমি প্রীতমকে দেখলাম সে একদৃষ্টে দরাদরি দেখছে। তবে বাবার চোখ তো, বুঝলাম বইটা না কিনলে সে মুখে কিছু বলবে না, কিন্তু ভেতরে কষ্ট পাবে। আবার দরাদরি শুরু করলাম।
“আরে এই দেখলাম ওদিকে এই বইটাই কুড়ি টাকায় পাওয়া যাচ্ছে…”
প্রীতম ভারি অবাক হয়ে আমাকে দেখল। বলতে চায় – তুমি তো কোনো বই বিক্রি হতে দেখনি… তাহলে এসব কেন বলছ?
আমিই জিতলাম। ছেলেটা পঁচিশেই দিল।
তবে প্রীতম অমনভাবে কেন দেখছিল আমাকে? দাম কমাবার জন্য মিথ্যে বললাম বলে? কাছেই একটি বুদ্ধ-মন্দির ছিল। সিঁড়িতে জুতো খুলে ঢুকলাম। ভেতরে শ্বেতপাথরের শান্ত সমাহিত বুদ্ধের মূর্তি। বসলাম একটু। তারপর বেরিয়ে জুতো পড়ব এমন সময় ছেলে বলল, “বাবা, তোমার জুতোয় পিঁপড়ে ঢুকল…”!
স্নীকার জুতোটা ঝাড়লাম, পিঁপড়ে দেখলাম না, হয়তো বেরিয়ে গেছে।
ফিরতি বাসে বসলাম, তবে জুতোর অস্বস্তি গেল না। পিঁপড়েটা সত্যিই বেরিয়েছে তো? এই ভীড় বাসে জুতো খোলা যায় না। ছেলেটাকে ভুজুং-ভাজুং দিয়ে অর্ধেকেরও কম দামে বইটা নিলাম, তারপর বুদ্ধমন্দিরের সিঁড়িতে পিঁপড়েটা ঢুকে গেল! কামড়ায়নি, তবু এত অস্বস্তি লাগছে যে কী বলব!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন