কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

কাজল সেন

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫২

 

ভবিষ্যতদ্রষ্টা

সুতনয়দার মস্তিষ্ক স্বাভাবিকতা যখন হারিয়েছিল, তখন আমি খুবই ছোট। তাই বোঝার ক্ষমতা বিশেষ ছিল না, তবে শুনেছিলাম, সুতনয়দার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল ত্রিবেণীদির সঙ্গে। তিনি তাঁকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। ত্রিবেণীদিও অরাজী ছিলেন না। কিন্তু ত্রিবেণীদির মা-বাবা সম্বন্ধ করে তাঁর অন্যত্র বিয়ে দিয়েছিলেন। আর তখন থেকেই নাকি সুতনয়দার মস্তিষ্ক ক্রমশ অস্বাভাবিক হতে শুরু করে। তারপর পুরোপুরি অস্বাভাবিক। পাড়া-প্রতিবেশীরা সুতনয়দার নামের আগে একটা বিশেষণ জুড়ে দেয়, পাগলা। পাগলা সুতনয়।

ছোট ছিলাম। বড় হলাম। কিন্তু একট সমীকরণ এখনও পর্যন্ত সমাধা্ন করতে পারিনি, প্রেমে ব্যর্থ হলে একটা সুস্থ মানুষ কীভাবে বদ্ধ পাগল হয়ে যায়? বিশেষত সুতনয়দার মতো একজন শিক্ষিত, সুভদ্র, সুবিনয়ী মানুষ?

স্বাভাবিকতা হারানোর পর সুতনয়দা কারও সঙ্গে কথা বলতেন না, সম্ভবত নিজের সঙ্গেও নয়, অথচ তাঁর ওষ্ঠাধর কখনও স্থির থাকত না, সমানেই অস্ফূট উচ্চারণের বন্যা বয়ে যেত। আরও আশ্চর্য, আচমকা কখনও সেই অস্ফূট উচ্চারণকে ছাপিয়ে কিছু কিছু স্পষ্ট স্বর ও বক্তব্য বেরিয়ে আসত, যা নির্ঘাত সংঘটিত হত। এই যেমন কিছুদিন আগে সুতনয়দা নিজের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন, কাছাকাছি আরও কয়েকজন ছিল, পাড়ার মহান্তীবাবুকে সাইকেলে যেতে দেখে বলে উঠলেন, সাইকেল এখানে রেখে হেঁটে যান। নাহলে বিপদ হবে। কথাটা সবার কানেই গেল, কিন্তু পাগলের কথায় কে আর পাত্তা দেয়। মহান্তীবাবু পরোয়া না করে সাইকেলে বেরিয়ে গেলেন। অল্প কিছুক্ষণ পরেই খবরটা এলো, একটা ট্রাকের ধাক্কায় তিনি ছিটকে পড়েছেন। অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জীবন সংশয়।

যারা এই খবরটা শুনল, তারা তাজ্জব হয়ে গেল। এটা কীভাবে সম্ভব! একটা পাগলের কথা সত্যি হলো কীকরে? পাগল হলে কি কেউ ভবিষ্যতদ্রষ্টা হয়?

সুতনয়দার দ্বিতীয় ভবিষ্যতবাণীটা ছিল আরও মারাত্মক ও মর্মান্তিক। বিয়ের বেশ কিছু বছর পর, ত্রিবেণীদি তাঁর দুই পুত্রসন্তান সহ মা-বাবার বাড়িতে এসেছেন। দিন কয়েক থাকার পর, তিনি দেখা করতে এসেছিলেন সুতনয়দার সঙ্গে। তিনি জানতেন, সুতনয়দা এখন বদ্ধ উন্মাদ, তবুও এসেছিলেন। না, সুতনয়দা চিনতে পারেননি ত্রিবেণীদিকে। আকাশের দিকে উদাসীন চোখ মেলে সমানেই বিড়বিড় করছিলেন, কিন্তু তাঁর সেইসব অস্ফূট উচ্চারিত শব্দসম্ভার কারও শ্রুতিগোচর হচ্ছিল না।

কিছুটা সময় ত্রিবেণীদি ছিলেন সুতনয়দার মুখোমুখি বসে। কিছু কথাও বলেছিলেন। সুতনয়দা তা শুনতে পেয়েছেন, মনে হয়নি। এমনকী একবারও তিনি ত্রিবেণীদির চোখে চোখ রাখেননি। ত্রিবেণীদির দু’চোখ বেয়ে নেমে এসেছিল কান্না।

ত্রিবেণীদি এবার উঠে দাঁড়িয়েছেন, ফিরে যাবেন, হঠাতই তিনি শুনতে পেলেন, অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে সুতনয়দা বলছেন, আপনি এখনই আপনার স্বামীর কাছে চলে যান, তিনি আজই মারা যাবেন।

না, এসব ভবিষ্যতবাণীর পেছনে আমি কোনো যুক্তি-তর্ক খুঁজে পাইনি। বিশেষত সুতনয়দার মতো একজন বদ্ধ উন্মাদ কীভাবে ভবিষ্যতদ্রষ্টা হয়ে উঠেছিলেন, তার কোনো সমাধান খুঁজে পাইনি। সবটাই আমার কাছে কাকতালীয় বলে মনে হয়। তবে উক্ত নির্দিষ্ট দিনে ত্রিবেণীদির স্বামীর মৃত্যুই বা অস্বীকার করি কীভাবে! আর সেইদিনেই সুতনয়দার নিজের মৃত্যু! সবই কি কাকতালীয়!

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন