ধারাবাহিক উপন্যাস
দ্য ক্লাউড
(২৬)
বৃষ্টি নামলো না। তবু মেঘের ভেতর থেকে জলের গন্ধ আসছিল। যেন বহুদিন আগে কাঁদতে না-পারা মানুষের চোখ আজ খুলে গেছে। পতাকাটা একবার ডানদিকে ঝুঁকল। তারপর বাঁদিকে। উৎপল চিত্রকর বুঝলো, বাতাস দিচ্ছে না। কেউ যেন আলতো করে ছুঁয়ে দিচ্ছে। আনন্দ ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। আজ তার হাঁটায় কোনো শব্দ নেই। ভাঙা বিজ্ঞাপনের টিনটা যেন নিজেই উঠে এসে তার পায়ের কাছে দাঁড়ালো। সে টিনের ওপর হাত রেখে বললো— এ পৃথিবীতে যত বিজ্ঞাপন দেখেছ, সবই মানুষকে কিছু না কিছু বিক্রি করেছে। আজ প্রথমবার কিছুই বিক্রি হবে না। আজ শুধু ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বাবলু মুখ তুলে তাকালো। তরুণী আইপিএসও। তাদের মাঝখানে কোনো মালা নেই। কোনো আগুন নেই। কোনো পুরোহিতের আসন নেই। আছে শুধু একটানা বাতাস। মেঘের ভেতর তখন ডুগডুগির মতো শব্দ। ডুগ... ডুগ... ডুগ... বিদ্যুৎ আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সাদা সুতো টেনে দিল। উৎপলের মনে হলো— এই বুঝি মঙ্গলসূত্র। হঠাৎ ফটিকজল পাখিরা নেমে এলো। তারা দুজনকে ঘিরে একবার, দু'বার, তিনবার বৃত্ত আঁকল। কেউ মন্ত্র পড়লো না। তবু বজ্রের গলা ভেসে এলো— গভীর। অস্পষ্ট। অপরিমেয়। মনে হলো, হাজার বছরের পুরোনো কোনো ভাষা আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। আনন্দ দু'হাত বাড়িয়ে বললো— বাবলু — তুমি কি তোমার অসমাপ্ত সাক্ষ্য এই মানুষের হাতে রাখলে? বাবলু ধীরে মাথা নাড়লো। আনন্দ তরুণীর দিকে তাকালো। — আর তুমি? তরুণী বললো— আমি আমার ভয় রেখে নির্ভয়া হলাম - আর কিছু নয়। মুহূর্তেই চারিদিক নিস্তব্ধ। তারপর বাতাস একবার দীর্ঘশ্বাস ফেললো। উৎপল দেখলো— দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা শূন্যতা আর শূন্য নেই। সেখানে একটি ছোট্ট মেঘ জন্ম নিয়েছে। আঙুলের ডগার মতো। সাদা। স্বচ্ছ। ধীরে ধীরে সে ওপরে উঠতে লাগলো। পতাকার গায়ে গিয়ে একবার ছুঁয়ে দিল। তারপর আকাশের দিকে। নিমচাঁদ দাগার কণ্ঠ শোনা গেল— এবার বুঝলাম... রাষ্ট্র কাপড় তোলে। স্মৃতি বাতাস তোলে। মনিরত্না ভরদ্বাজ বললেন— যে সাক্ষ্য লেখা যায় না, ইতিহাস একদিন তাকেই খুঁজতে থাকে। উৎপল চিত্রকর ডেটা-ডায়েরি খুললো। আজ কোনো নাম লেখা উঠলো না। শুধু একটি বাক্য— "দুইটি অসমাপ্ত জীবন আজ পরস্পরের স্মৃতি হলো।" উৎপল আর লিখলো না। কারণ সে বুঝলো—
আজ থেকে খাতা নয়, আকাশই লেখা শুরু করেছে। দূরে কোথাও ভোরের প্রথম আলো ফুটলো। মেঘের ভেতর দিয়ে সেই আলো সাত রঙে ভেঙে পড়লো। উৎপল আবার অবাক হলো। সে তো মেঘ থেকে কালো নিয়েছিল। তাহলে এই রং এলো কোথা থেকে? আনন্দ মৃদু হেসে বললো— চিত্রকর... কালো কখনও একা থাকে না। তার ভেতরেই সব রং অপেক্ষা করে।
(২৭)
রাতের শেষ প্রহরে ভারতবর্ষের আকাশ, যা কার্যত মেঘের দখলে। খুব ভালো করে দেখলে মেঘে ঢাকা আকাশ রাষ্ট্রহীন। মেঘালয়ের পাহাড়ে যে মেঘ জন্মেছিল, সে কখন মিজোরামের বন ছুঁয়ে ত্রিপুরার বাঁশবনে নেমেছে, কখন ব্রহ্মপুত্রের বিস্তৃত বুকের উপর দিয়ে অসম অতিক্রম করেছে, কখন উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের সবুজে নিজের কালো শরীর ছড়িয়ে দিয়েছে—সে হিসেব কোনো মানচিত্র না রাখলেও উৎপল চিত্রকর রাখে। সে জানে, বাতাসেরও একটি ভূগোল আছে। তার কাঁধের ব্যাগে আজও ঝুলছে দ্য ক্লাউড। ডেটা-ডায়েরি আর আলাদা করে চেনা যায় না। কখন যে তার পাতাগুলো মেঘের সঙ্গে মিশে গেছে, উৎপল নিজেও বলতে পারে না। সে কেবল অনুভব করে—ব্যাগটা আগের চেয়ে হালকা। হয়তো ডেটা ওজন হারিয়েছে! হয়তো স্মৃতি বাতাস হয়ে গেছে! আজ সে কালো রং খুঁজছে। ক্যানভাস প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু কালোর কৌটো খুলতেই দেখে ভিতরে কিছুই নেই। উৎপল আকাশের দিকে তাকায়। উপরে জমাট কালো মেঘ। সে হাত বাড়ায়। মেঘ যেন চুপচাপ একটু নেমে আসে। চিত্রকর তার তুলির ডগায় অল্প একটু কালো তুলে নেয়। কিন্তু ক্যানভাসে প্রথম আঁচড় দিতেই সে বিস্মিত হয়ে যায়। কালো ওঠে না। সেখানে একসঙ্গে ফুটে ওঠে সূর্যের সাতটি রং। বেগুনি। নীল। আকাশি। সবুজ। হলুদ। কমলা। লাল। উৎপল থেমে যায়। সে বুঝতে পারে—কালো কখনও রঙের অভাব নয়। কালো সমস্ত রঙের গোপন আশ্রয়। ঠিক তখনই ক্যানভাসের ভেতর থেকে একটি পরিচিত হাসি ভেসে আসে। — এইবার বুঝলে? উৎপল চমকে ওঠে। আনন্দ। ভাঙা বিজ্ঞাপনের টিনের মানুষটি যেন আজও হেসে চলেছে। — কী বুঝবো? — বিজ্ঞাপন মানুষকে যা দেখায়, প্রকৃতি তার ঠিক উল্টোটা লুকিয়ে রাখে। তুমি কালো খুঁজতে গিয়ে সাত রং পেয়ে গেলে। আমি হাসি বিক্রি করতে গিয়ে কান্না পেয়েছিলাম। এবার হিসেব মিললো?
উৎপল কিছু বলে না। দূরে কোথাও বাবলুর কণ্ঠ ভেসে আসে— চিত্রকর, ভালো করে আঁকো। এ ছবি মানুষের জন্য নয়। সময় একদিন এটাকে পড়বে। মনিরত্না ভরদ্বাজের স্বরও বাতাসে মিশে যায়— সাক্ষ্য কাগজে থাকে না, উৎপল। সাক্ষ্য বাতাসে ভেসে থাকে। হঠাৎ পতাকাটা একবার দুলে ওঠে। খুব ধীরে। সুতলির কাছে যেন একটি ক্ষীণ কম্পন। উৎপল তাকিয়ে থাকে। সে কিছুই দেখতে পায় না। কিন্তু অনুভব করে—নিমচাঁদ দাগা এখনও আছেন। আঁটকে নেই। আবার মুক্তও নন। যেন বিদায়ের আগে শেষবারের মতো ভারতবর্ষকে দেখে নিচ্ছেন। পাহাড়। নদী। জঙ্গল। জনপদ। মন্দিরের ঘণ্টা। মসজিদের আজান। গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। বৌদ্ধ বিহারের প্রার্থনা। সব মিলেমিশে এক দীর্ঘ বাতাস। দূরে ভোরের আলো ফুটছে। মেঘের গায়ে প্রথম সূর্যালোক পড়তেই উৎপল বুঝতে পারে— আজ থেকে তার ক্যানভাস আর আকাশকে নকল করবে না। আকাশই তার ক্যানভাস হয়ে উঠবে। আর দ্য ক্লাউড? সে আর ব্যাগে নেই। সে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে পতাকার দিকে। যেন কাপড়, বাতাস আর স্মৃতি—তিনে মিলে একটি নতুন ডায়েরি লিখতে শুরু করেছে।
(ক্রমশঃ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন