কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছবি (২৩শ পর্বঃ) দুই আদিত্যের আখ্যান (২) আদিত্য সুহাস জাম্ভালে

আদিত্য ধরের পরিচালনায় তিনটি বলিষ্ঠ এবং সাহসী ছবির আলোচনা এর আগের পর্বে করেছি। আদিত্য ধরের কাহিনি নিয়ে বা তাঁর সঙ্গে মিলে কাহিনি রচনা করে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ছবি করেছেন একই প্রথম নামের অধিকারী আদিত্য সুহাস জাম্ভালে।

আর্টিকল ৩৭০ (২০২৪)

 


আগের তিনটি ছবির মতোই বিভিন্ন পরিচ্ছেদে বিভক্ত এই ছবিটি নাটকীয় – কিন্তু কোনভাবেই অতি-নাটকীয় নয় – ভাবে দেখিয়েছে কিভাবে দেশের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী – মূলত স্বরাস্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে – ১৯৪৭ কৃত এক চরম অন্যায়ের প্রতিকার করল স্বাধীনতার বাহাত্তর বছর পরে। ৩৭০ ধারার ছত্রছায়ে ভারতবর্ষে সৃষ্ট হয়েছিল একই দেশের মধ্যে দুটি সংবিধান, দুজন প্রধানমন্ত্রী এবং দুটি জাতীয় পতাকাঃ প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে একটি কাশ্মীরের আর অপরটি বাকি ভারতবর্ষের!

৩৭০-এর কুফল ব্যাখ্যা করছেন ছবির দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে কাশ্মীরের এক প্রাক্তন রাজ্যপাল (রূপায়নে মোহন আগাশে)। তিনি দেখাচ্ছেন কিভাবে ৩৭০ ধারাকে সুচতুরভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় ভাবাবেগের সঙ্গে। কাশ্মীরের মুসলমান বাসিন্দাদের বোঝানো হয়েছে যে ৩৭০ ধারা না থাকলে তারা নামাজ পড়তে পারবে না আর অন্য রাজ্যের ‘বিধর্মী’-রা এসে তাদের পরিবারের মেয়েদের ওপর অধিকার ফলাবে। ছবির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র জুনি হাকসার (রূপায়নে ইয়ামি গৌতম ধর), যে পেশায় প্রথমে কাশ্মীরে গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার, তার শৈশবে তার বাবার তথাকথিত ‘আত্মহত্যা’-র সঙ্গেও ৩৭০ ধারা জড়িত। উক্ত ধারার দোহাই দিয়ে জুনির বাবার মৃত্যু নিয়ে কোনো অনুসন্ধান হতে দেওয়া হয়নি। ছবি শীর্ষবিন্দুর কাছাকাছি সময় আমরা জানব যে জুনির বাবা আসলে খুন হয়েছিলেন, জম্মু-কাশ্মীর ব্যাংকের এক বড় আর্থিক কেলেংকারির কথা জেনে ফেলার জন্য।

ছবির আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যুগ্ম সচিব রাজেশ্বরী স্বামীনাথন (রূপায়নে প্রিয়া মনি)। সে জুনিকে জাতীয় তদন্ত সংস্থার (NIA) একটি দলের মাথা করে কাশ্মীরে ফেরত পাঠায় (ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে জুনি বুরহান ওয়ানি নামক সন্ত্রাসবাদীকে ‘এনকাউন্টার’ করার জন্য দিল্লীতে নির্বাসিত হয়েছিল, প্রথম পরিচ্ছেদে তা দেখানো হয়েছে)।

যা আমাকে চমৎকৃত করেছে তা হলো ৩৭০ লোপ করার প্রচেষ্টায় সমান্তরালভাবে চলেছে কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সশস্ত্র মোকাবিলার চিত্রায়ন আর তার সঙ্গে উক্ত ধারা লোপ করার পথে অতীতে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের এক সুচতুর সাংবিধানিক কৌশলকে কষ্টসাধ্য বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ব্যর্থ করার রুদ্ধশ্বাস উপস্থাপনা। এক সময় জুনি ও তার সহকর্মীর একটি অপরিহার্য নথির খোঁজে জম্মু-কাশ্মীর সচিবালয় গ্রন্থাগারে অনুসন্ধান যে-কোন ‘অ্যাকশান থ্রিলার সিকয়েনস’-এর সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে। আর নথি নিয়ে বেরিয়ে আসার পরেই ঘটছে জুনির গাড়ির ওপর প্রাণঘাতী সন্ত্রাসবাদী হামলা। মানসিক ও শারীরিক উত্তেজনার পাশাপাশি উৎপাদন এত সুনিপুণ যে দর্শক মুগ্ধ  নীরবতা পালন করতে বাধ্য।

৩৭০ বিলুপ্ত করতে সরকারের কাছে সাংবিধানিক বাধা তৎকালীন রাজ্যসভা যেখানে শাসকদলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। আর ২০১৯-এর ৫ই আগস্ট একদিকে স্বরাস্ট্রমন্ত্রী রাজ্যসভায় বিরোধীদের সঙ্গে বুদ্ধির মল্লযুদ্ধে ব্যস্ত, অপরদিকে বুরহান ওয়ানির উত্তরাধিকারী জাকির নাইকুর নেতৃত্বে এবং প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে শ্রীনগরে চলছে গৃহবন্দী মুখ্যমন্ত্রী সালাহুদ্দিন জালালকে (বাস্তবে ওমর আবদুল্লা, রূপায়নে রাজ জুতশি) – যিনি সগর্বে বলেছিলেন যে ৩৭০ ধারা কাশ্মীর আর ভারতের মধ্যে একমাত্র সেতু, এবং তার অবর্তমানে কাশ্মীর আর ভারতের অংশ থাকবে না – হত্যার চেষ্টা। দুটি লড়াই আমরা দেখব পর্যায়ক্রমে। রাজ্যসভায় অবশেষে সাফল্য লাভ করেন স্বরাস্ট্রমন্ত্রী আর জুনি নিজের হাতে নিকেশ করে জাইকুকে।

ছবি শেষ হচ্ছে যারা শহীদ হয়েছে সেই সেনানীদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন দিয়ে। সবার শেষে পর্দায় দেখি ৩৭০ বিলোপের পর কাশ্মীরে কী কী ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে আছে নিজভূম থেকে সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে উৎখাত হওয়া কাশ্মিরী পণ্ডিতদের মনে আশার উদ্রেক।

নির্মাণে চরম দক্ষতার ছাপ রাখা এই ছবি সমালোচিত হয়েছিল শাসকদলের পক্ষে অপপ্রচার বলে। যে ঘটনাসমূহ, বিশেষ করে পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দলের ৩৭০-এর মাধ্যমে কাশ্মীরে কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখার যেসব প্রতারণামূলক কীর্তিকলাপ চিত্রিত হয়েছে সেগুলি কি অস্বীকার করার মতো কোন তথ্য এই সমালোচকেরা দিতে পেরেছে?

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন