| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫২ |
শূন্যস্থান
স্বামী মারা যাবার পর শেষ কুড়ি বছর এই জরাজীর্ণ শ্যাওলা ধরা পোড়োবাড়িতে শোভনা একাই রয়েছে। মাটির চারদেওয়াল। মেয়েটাও বছর কুড়ি আগে এক বর্ষাকালে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছে। ছেলেটা সেই যে কলকাতা পড়তে গেল, আর ফিরল না। ওখান থেকেই চাকরি নিয়ে ব্যাঙ্গালোর। সেখানে বিয়ে, ঘর সংসার, বাচ্চাকাচ্চা। তারপর আর এদিকে আসার কথা ভাবেনি। হ্যাঁ, কয়েক বছর আগে কলকাতায় একটা ফ্ল্যাট কেনার পর মাঝে মাঝে বৌ বাচ্চা নিয়ে কলকাতা আসে। বছরে বা দু'বছরে একবার গ্রামে এসে নিজের মা’কে কয়েক ঘণ্টার জন্য দেখে যায়। আর প্রতি মাসে পাঁচ হাজার টাকা মানি অর্ডার পাঠায়। পুজোর মাসে পাঁচশ টাকা বেশি। ঐ টাকায় শোভনা নিজের জন্য দুটো সাদা থান কেনে, সারাবছরের জন্য। আর কাজের বৌ রমলার জন্য একটা ছাপা শাড়ি।
এমাসে দশ তারিখ হয়ে গেল, আর পাঁচদিন পরেই পুজো, কিন্তু এখনও এমাসে টাকা এল না। ডাকপিয়ন গেলেই শোভনা রোজ দুপুরে জিজ্ঞেস করে। পিয়ন হেসে চলে যায়। কাল পাড়ার দুটো ছেলে এসেছিল।
-- বুড়িমা, পুজোর চাঁদা দেবে না?
-- দেব রে বাবা, কিন্তু এখনো তো তোদের দাদা টাকা পাঠায়নি। আর কদিন ধৈর্য্য ধর। আমি না হয় তোদের ডেকে দিয়ে দেব।
আজ সকালে রমলা বলছিল, পিসিমা, রান্নাঘরে তো একটুও চাল ডাল নেই গো, আজ কী খাবে?
কী খাবে সেটা শোভনা এখনো জানে না। টাকা না এলে কী হবে। বাড়ির মধ্যের গোবর নিকোনো উঠোনে বসে শোভনা ভাবে, এই হয়ত ডাকপিয়ন কড়া নাড়বে, হাতে টাকা তুলে দেবে। এবছর শোভনা আশী পেরিয়ে গেছে, সে জানে বেশিদিন আর নেই। এই বাড়িতে ষাট বছরের বাস। সে চলে গেলে বাড়ির কী হবে সে জানে না। এবার ছেলে এলে তাকে বলতে হবে।
ওমনি দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ।
-- মা, মা, কই গো, দরজা খোলো!
একটা মেয়েলি গলার ডাক। এই অবেলায় কোন মেয়ে এল! রমলা তো সকালেই কাজ করে চলে যায়। তারপর সারাদিন কেউ আসে না। তাহলে কে? কে ওকে মা বলে ডাকল?
-- কে?
-- কে গো তুমি?
-- কে?
শোভনা অনেকক্ষণ ডাকল। আর কোন সাড়া শব্দ নেই। শোভনা লাঠিতে ভর দিয়ে আস্তে আস্তে গিয়ে দরজা খোলে। কেউ কোনদিকে নেই। ফাঁকা রাস্তা। খাঁ খাঁ। যদ্দুর চোখ যায়।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন