কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

সৈয়দ তারিক

 

বিপ্লবের মরমিতা

 


(২)

চে গুয়েভারা ও মরমিতা

চে গুয়েভারা ও মরমিবাদকে পরস্পর বিপরীত বিষয় মনে হতে পারে। একদিকে কঠোর মার্ক্সবাদী গেরিলা যোদ্ধা, অন্যদিকে আধ্যাত্মিক অতীন্দ্রিয়বাদ। কিন্তু চে-র জীবনদর্শন, চিঠিপত্র এবং ডায়েরি বিশ্লেষণ করলে সেখানে এক প্রকার 'ধর্মনিরপেক্ষ মরমিবাদ' বা 'সেক্যুলার মিস্টিসিজম' বা 'বিপ্লবী রোমান্টিকতা' খুঁজে পাওয়া যায়।

চে গুয়েভারা কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলেননি, তিনি মানুষের অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠায় কেবল কলকারখানা দখল করলেই হবে না, মানুষকে তার স্বার্থপরতা ও লোভ ত্যাগ করে এক 'নতুন মানুষে' পরিণত হতে হবে।

এটি অনেকটা সুফি বা বৌদ্ধ দর্শনের আত্মশুদ্ধির মতো। একজন ব্যক্তি নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলে যখন সমাজের জন্য উৎসর্গ করেন, তখন তার সেই নৈতিক উচ্চতা মিস্টিক স্তরে পৌঁছে যায়।

চে-র একটি বিখ্যাত উক্তি আছে: "একজন প্রকৃত বিপ্লবী পরিচালিত হন এক গভীর প্রেমবোধের দ্বারা। এই গুণটি ছাড়া একজন প্রকৃত বিপ্লবী হওয়া অসম্ভব।"

বিপ্লবীদের জন্য এই 'প্রেম' কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি নয়, বরং নিপীড়িত মানবতার প্রতি। এই বিশ্বজনীন প্রেম মরমিবাদের অন্যতম প্রধান শর্ত। নিজের ঘর-সংসার ত্যাগ করে অজানার উদ্দেশ্যে মানুষের মুক্তির জন্য বেরিয়ে পড়া এক ধরনের আধ্যাত্মিক ভ্রমণ বা 'পিলগ্রিমেজ'।

চে জানতেন যে তার লড়াইয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রবল। কঙ্গো থেকে বলিভিয়া, প্রতিটি অভিযানে তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুত ছিলেন। নিজের জীবনকে একটি বৃহত্তর লক্ষ্যের অর্থাৎ বিপ্লবের যূপকাষ্ঠে উৎসর্গ করার এই যে অদম্য ইচ্ছা, তা অনেকটা মরমি সাধকদের পরম সত্তার সাথে একীভূত হওয়ার আকুলতার মতো। বলিভিয়ার জঙ্গলে তার শেষ দিনগুলোর স্থিরতা ও সাহস তাকে অনেক অনুসারীর কাছে এক 'যিশু-সদৃশ' মিস্টিক চরিত্রে রূপান্তরিত করেছে।

চে গুয়েভারার আরাধনার বিষয় শোষিত মানুষের মুক্তি ও সাম্য। তাঁর সাধনা হলো গেরিলা যুদ্ধ ও গণসংযোগ। তাঁর আত্মত্যাগ হলো সাংসারিক মোহ অতিক্রম; ক্ষমতা ও মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে আবার যুদ্ধে ফেরা। তাঁর মোক্ষ বা নির্বাণ হলো শোষণমুক্ত 'নতুন পৃথিবী'।

 

চে মার্ক্সবাদী হলেও তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের 'যান্ত্রিক বস্তুবাদ' পছন্দ করতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল পেটের ক্ষুধা মেটানোই মানুষের লক্ষ্য হতে পারে না; মানুষের প্রয়োজন নৈতিক উদ্দীপনা। এই নৈতিক শক্তির উৎস কোনো বৈজ্ঞানিক সমীকরণ নয়, বরং এটি মানুষের অন্তরের এক রহস্যময় প্রেরণা, যা তাকে অসম্ভবকে জয় করার শক্তি দেয়।

চে-র ডায়েরিগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝেও তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য নিয়ে লিখছেন। লাতিন আমেরিকার বিশাল পর্বতমালা আর অরণ্যের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার যে অনুভূতি, তা ছিল এক প্রকার প্রকৃতি-নির্ভর মরমিবাদ বা নেচার মিস্টিসিজম।

চে গুয়েভারার 'নতুন মানুষ' (El Hombre Nuevo) ধারণাটি কেবল একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, এটি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক বিবর্তনের একটি রূপরেখা। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত প্রবন্ধ "Socialism and Man in Cuba" তে তিনি এই ধারণাটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।

চে বিশ্বাস করেন, সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কেবল কলকারখানার জাতীয়করণ বা অর্থনীতির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; যদি মানুষের ভেতরের 'ব্যক্তিগত লালসা' ও 'স্বার্থপরতা' দূর না হয়, তবে সেই সমাজতন্ত্র ভেঙে পড়তে বাধ্য।

চে-র দর্শনে নতুন মানুষের প্রধান চালিকাশক্তি হলো 'নৈতিক উদ্দীপনা'। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ টাকার লোভে কাজ করে, কিন্তু চে-র 'নতুন মানুষ' কাজ করবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আর সৃষ্টির আনন্দ থেকে।

চে নিজে ছুটির দিনে আখের খেতে বা নির্মাণ কাজে সাধারণ মানুষের সাথে ঘাম ঝরাতেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে, মানুষ যখন নিজের লাভের কথা না ভেবে সমষ্টির জন্য কাজ করে, তখন সে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে।

চে-র মতে, ব্যক্তিসত্তার রূপান্তর একদিনে সম্ভব নয়। এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। নতুন মানুষকে প্রতিনিয়ত পড়াশোনা ও আত্ম-সমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। চে বলতেন, সাম্যবাদ কোনো 'মাংসের দোকান' নয় যেখানে কেবল খাওয়া-পরার নিশ্চয়তা থাকবে। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের চেতনাকে উন্নত করা।

চে গুয়েভারার কল্পনায় একজন নতুন মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কেমন হবে, তা বুঝে বেওয়া যাক:

স্বার্থহীনতা: নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে অন্যের দুঃখ দূর করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

বিশ্বজনীন দায়িত্ববোধ: পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেকোনো মানুষের ওপর অবিচার হলে তা নিজের গায়ে অনুভব করা।

শৃঙ্খলাপরায়ণতা ও ত্যাগ: আমোদ-প্রমোদ বা বিলাসিতার বদলে কঠোর জীবনযাপন এবং সংগ্রামের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকা।

অবিরাম সৃজনশীলতা: কাজকে কেবল বেঁচে থাকার মাধ্যম হিসেবে না দেখে একে আত্মপ্রকাশের পথ হিসেবে গ্রহণ করা।

'নতুন মানুষ' ধারণাটি এখানে এসেই মিস্টিক বা মরমি হয়ে ওঠে। একজন মানুষ যখন তার সহজাত 'জৈবিক স্বার্থ' ত্যাগ করে পুরোপুরি 'সামষ্টিক স্বার্থে' বিলীন হয়ে যায়, তখন সে আর সাধারণ মানুষ থাকে না। এটি অনেকটা সুফি দর্শনের 'ফানা' (নিজের অস্তিত্ব বিলীন করা) বা বৌদ্ধ দর্শনের 'নির্বাণ'-এর মতো। পার্থক্য হলো, চে এই মুক্তি খুঁজছেন কোনো মঠে বা গুহায় বসে নয়, বরং জনতার ভিড়ে এবং সংগ্রামের ময়দানে।

আাসলে চে গুয়েভারা নিজেই এই 'নতুন মানুষ'-এর প্রতিচ্ছবি, এই তত্ত্বের জীবন্ত উদাহরণ। কিউবার মন্ত্রিত্ব ও সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ত্যাগ করে তিনি যখন বলিভিয়ার দুর্গম পাহাড়ে সাধারণ সৈনিকের মতো লড়াই করতে গেলেন, তখন তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে 'নতুন মানুষ' কেবল একটি স্বপ্ন নয়, এটি বাস্তবে সম্ভব।

অনেকে মনে করেন, চে-র এই ধারণাটি ছিল অত্যন্ত 'রোমান্টিক' এবং মানুষের প্রাকৃতিক প্রবৃত্তির (যেমন ব্যক্তিগত লাভ) পরিপন্থী। কিন্তু চে-র কাছে এটি ছিল এক অনিবার্য বিবর্তন। তিনি মনে করতেন, মানুষ যদি পশুত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করে সত্যিকারের মানবিক স্তরে পৌঁছাতে চায়, তবে 'নতুন মানুষ' হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। চে-র এই 'নতুন মানুষ' হওয়ার সাধনা মরমি সাধনারই সমান্তরাল ব্যাপার।

 

চে গুয়েভারার কিছু উক্তি

 

বিপ্লব, প্রেম, সমাজ পরিবর্তনের চেতনা ও মানবতাবোধের অনন্য এক প্রতীক আর্নেস্তো চে গুয়েভারা। তাঁর কথা ও দর্শনে রাজনৈতিক তত্ত্বের চেয়েও বেশি প্রকাশ পেয়েছে এক গভীর আত্মিক টান, বিবিড় অনুভূতি আর মানুষের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা। তাঁর অনেক উচ্চারণ ও অন্তর্নিহিত ভাবধারা মরমিবাদীদের ভাবের সাথে মিলে যায়। তাঁর কিছু কথা অনুধাবন করা যাক।

(১) "সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো, একজন প্রকৃত বিপ্লবী পরিচালিত হন এক গভীর ভালোবাসার অনুভূতি দ্বারা। এক তীব্র মানবতাবোধ না থাকলে একজন প্রকৃত বিপ্লবীকে কল্পনা করাও অসম্ভব।"

(২) "নিষ্ঠুর না হয়েও একজন মানুষকে শক্ত হতে হবে; এবং হৃদয়ের কোমলতা না হারিয়েই একজন মানুষকে অবিচল থাকতে হবে।"

(৩) "ভবিষ্যত আমাদেরই, বিশেষ করে তাদের যারা মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারায়নি এবং যারা মানুষের মুক্তির জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত।"

(৪) "ভেড়ার মতো শত বছর বেঁচে থাকার চেয়ে সিংহের মতো একটি দিন বেঁচে থাকা অনেক শ্রেয়।"

(৫) "আমি একজন মুক্তিকামী মানুষ নই। মুক্তিকামী মানুষ বলে কিছু হয় না। মানুষ নিজেই নিজেকে মুক্ত করে।"

(৬) "আমরা যদি বাস্তববাদী হতে চাই, তবে আমাদের অসম্ভবকে অর্জনের স্বপ্ন দেখতে হবে।"

(৭) "যদি আমি আজ হেরে যাই, তার মানে এই নয় যে এই লড়াইটা ভুল ছিল। আমাদের পর যারা আসবে, তারা ঠিকই এই লড়াইয়ের গুরুত্ব বুঝবে এবং এটি চালিয়ে যাবে।"

(৮) "বিপ্লব কোনো আপেল নয় যে পেকে গেলে গাছ থেকে এমনি এমনি মাটিতে পড়বে; একে মাটিতে ফেলতে হলে আপনাকে লড়াই করতে হবে।"

(৯) "তারা আমার শরীরকে ধ্বংস করতে পারে, কিন্তু আমার আদর্শকে কখনো হত্যা করতে পারবে না।"

(১০) "পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো মানুষের বিরুদ্ধে হওয়া যেকোনো অন্যায়কে নিজের ভেতরে গভীরভাবে অনুভব করতে পারাটাই একজন বিপ্লবীর সবচেয়ে বড় গুণ।"

(১১) "আমার কোনো দেশ নেই, যেখানেই অনাহার, শোষণ আর নিপীড়ন আছে, সেটাই আমার দেশ এবং তার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করাই আমার ধর্ম।"

(১২) "আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, বিপ্লব কেবল ক্ষমতার জন্য লড়াই নয়; এটি মানুষের চেতনাকে উন্নত করার এবং মানুষের ভেতরের প্রকৃত মনুষ্যত্বকে জাগিয়ে তোলার এক মহৎ প্রক্রিয়া।"

(১৩) "বিপ্লব কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় যে তা কেউ একা ভোগ করবে। এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন স্রোত, যা শোষিত মানুষের যৌথ আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হয়।"

(১৪) "শহিদ হওয়া মানেই লড়াইয়ের শেষ নয়, বরং তা হলো বেঁচে থাকা মানুষদের হৃদয়ে এক নেভানো আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দিয়ে যাওয়া।"

(১৫) "যদি আমাদের জীবন অন্য কোনো মানুষের জীবনকে কিছুটা উন্নত করতে না পারে, তবে সেই বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই।"

(১৬) "আমরা যখন শোষিতের পক্ষে দাঁড়াই, তখন আমরা কেবল একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিই না, বরং আমরা আমাদের নিজেদের আত্মার শুদ্ধি ঘটাই।"

(১৭) "আমি জানি তুমি আমাকে হত্যা করতে এসেছ। গুলি করো, কাপুরুষ! তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করবে, তার আদর্শকে নয়।"

(মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁর ঘাতকের উদ্দেশ্যে বলা শেষ কথা)

চে গুয়েভারার এই কথাগুলো প্রমাণ করে যে, তাঁর দৃষ্টিতে একজন বিপ্লবী কেবল অস্ত্রধারী যোদ্ধা নন, বরং তিনি হলেন সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং প্রেমময় এক সত্তা।

 

বিপ্লবীদের কিছু অ্যানেকডোটস

 

(১)

 

১৯৬৭ সালের ৯ অক্টোবর, বলিভিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রামের জীর্ণ স্কুলঘরে চে গুয়েভারাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। তাঁকে গুলি করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মারিও তেরান নামের এক বলিভিয়ান সৈনিককে। কিন্তু মদ্যপ তেরান যখন ঘরের ভেতরে ঢুকলেন, তখন চে-র চোখের তীব্র দৃষ্টি এবং শান্ত অবয়ব দেখে সে ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছিল এবং ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল।

পরে সে যখন আবার ভেতরে ঢোকে, চে তাকে দেখে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তিনি নিজের আসন্ন মৃত্যুকে এক পরম নিয়তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কোনো ক্ষোভ বা রাগ ছাড়াই তিনি অত্যন্ত শান্ত গলায় তাঁর ঘাতককে বলেছিলেন: "গুলি করো, কাপুরুষ! তুমি কেবল একজন মানুষকে হত্যা করতে যাচ্ছ, তার আদর্শকে নয়।"

মরমি দর্শনে একেই বলা হয় মৃত্যুভয়কে জয় করা বা 'ফানা' তথা অহং-এর বিলুপ্তি। চে এখানে তাঁর নিজের শরীরকে উৎসর্গ করে এক চিরন্তন আদর্শের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ঘাতকের ভয় দেখে তাঁর এই শান্ত অভয়বাণী একজন রাজনৈতিক যোদ্ধার চেয়েও গভীর এক মরমি সাধকের আত্মার শক্তির পরিচয় দেয়।

 

(২)

 

একবার মহাত্মা গান্ধী তাঁর এক সহকর্মীর সাথে একটি জরুরি চিঠি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। চিঠিটি একটি সাধারণ সেফটি পিন দিয়ে আটকানো ছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে গান্ধীজি পিনটি খুলে টেবিলের ওপর রাখেন এবং অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরে যখন তিনি আবার লিখতে বসলেন, তখন পিনটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে টেবিলের নিচে, ঘরের কোণায় পিনটি খুঁজতে শুরু করলেন। তাঁর সহকর্মী অবাক হয়ে বললেন, "বাপু, একটা সামান্য পিনের জন্য আপনি এত সময় নষ্ট করছেন কেন? আমি আপনাকে এখনই একটা নতুন পিন এনে দিচ্ছি।" গান্ধীজি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উত্তর দিলেন: "না, তুমি বুঝছ না। এই পিনটি কোনো এক দরিদ্র মানুষ শ্রম দিয়ে তৈরি করেছে। একে হারিয়ে ফেলা মানে সেই শ্রমের অবমাননা করা। আর প্রকৃতির কোনো সম্পদকে অপ্রয়োজনে নষ্ট করার অধিকার আমাদের নেই।"

 

মরমি দর্শনে ''ক্ষুদ্রের মাঝে পরমকে দেখা' একটি বড় সাধনা। গান্ধীজির কাছে একটি সাধারণ পিন কেবল একটি বস্তু ছিল না, বরং তা ছিল সামষ্টিক মানবশ্রম এবং প্রকৃতির এক পবিত্র উপহার। ক্ষুদ্রতম জিনিসের প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধা ও একাত্মবোধই হলো বিপ্লবের আসল মরমি ভিত্তি—যেখানে কোনো কিছুই তুচ্ছ নয়।

 

(৩)

 

রবেন দ্বীপের নির্জন বন্দিশালায় নেলসন ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ১৮ বছর বন্দি ছিলেন। চারদিকের নিশ্ছিদ্র অন্ধকার আর শোষণের মাঝেও তিনি কারাগারের এক চিলতে উঠোনে একটি ছোট টমেটো গাছের চারা রোপণ করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন গভীর মমতায় সেই চারাটির যত্ন নিতেন, জল দিতেন। ম্যান্ডেলা তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, সেই ছোট চারাটির প্রতিদিন একটু একটু করে বড় হওয়া এবং তাতে ফুল ফোটার দৃশ্যটি তাঁকে কারাগারের সমস্ত নির্যাতন ভুলে থাকতে সাহায্য করত।

এই ঘটনাটি সুফি কবি রুমির সেই দর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়—"অন্ধকারের মাঝেই আলোর জন্ম হয়।" ম্যান্ডেলার কাছে সেই টমেটো গাছটি কেবল একটি উদ্ভিদ ছিল না, সেটি ছিল জীবনের অবিনশ্বরতার প্রতীক। চারপাশের সমস্ত হিংসা ও ধ্বংসের মাঝেও একটি নতুন জীবনকে ফুটিয়ে তোলার এই যে আকুলতা, তা এক গভীর মরমি সাধনা। এটি প্রমাণ করে যে, বাইরের খাঁচা মানুষের ভেতরের সৃষ্টিশীল ও প্রেমময় আত্মাকে বন্দি করতে পারে না।

 

(৪)

 

বাংলার সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু যখন মুজাফফরপুর কারাগারে ফাঁসির অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন, তখন তাঁর মুখে কোনো ভয়ের রেখা ছিল না। ফাঁসির ঠিক আগের দিন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তাঁর কোনো শেষ ইচ্ছা আছে কি না, ক্ষুদিরাম অত্যন্ত সহজভাবে হেসে বলেছিলেন, তিনি যদি আর কিছুটা সময় পেতেন, তবে দেশবাসীকে বোমা বানানোর কৌশলটা শিখিয়ে দিয়ে যেতেন।

 

নিজের মৃত্যুকে সহজ সাবলীলভাবে নেওয়া আর আপন কর্তব্য ও উদ্দেশ্যের ভাবনায় অবিচল থাকতে পারাটা এক আত্ম-রূপান্তরের নিদর্শন।

 

(৫)

 

১৯৮০-এর দশকে কিউবান বিপ্লবের প্রধান নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সাথে ব্রাজিলের বিখ্যাত মুক্তিতাত্ত্বিক পাদ্রি (লিবারেশন থিওলজিয়ান) ফাদার ফ্রে বেত্তোর এক ঐতিহাসিক সংলাপ হয়। কাস্ত্রো সমাজতান্ত্রিক ও মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া সত্ত্বেও গভীর রাত পর্যন্ত ফাদারের সাথে ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা এবং মানুষের মুক্তি নিয়ে আলোচনা করতেন।

এক রাতে কাস্ত্রো বাইবেলের 'মাউন্টেন সারমন' (যিশুর পর্বত উপদেশ) এবং প্রথম যুগের খ্রিস্টানদের জীবনযাত্রার প্রসঙ্গ টেনে ফাদারকে বলেছিলেন: "আপনি যদি যিশুর মূল বাণীগুলোকে দেখেন, তবে বুঝবেন তিনি শোষিত ও দরিদ্রদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথম যুগের খ্রিস্টানরা যেভাবে সম্পত্তি ভাগাভাগি করে সাম্যের সমাজ গড়েছিলেন, তা এক ধরণের আদিম সমাজতন্ত্র। আমি নিজেকে কমিউনিস্ট বলি কারণ আমি মানুষের মুক্তি চাই; কিন্তু যিশু যা চেয়েছিলেন, আমার লড়াই তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়।"

 

মরমি দর্শনের মূল কথা হলো, সব পথের উদ্দেশ্য এক—এক মহৎ সামষ্টিক কল্যাণ। কাস্ত্রোর এই উপলব্ধি প্রমাণ করে যে, বাহ্যিক নাস্তিক্যবাদ বা রাজনৈতিক তত্ত্বের দেয়াল ভেঙে একজন প্রকৃত বিপ্লবী যখন গভীরে তাকান, তখন তিনি সব যুগের আধ্যাত্মিক মহামানবদের ভেতরের সেই শোষিতের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা ও ন্যায়ের সুরটিকেই খুঁজে পান। এটি ধর্মের বাহ্যিক আচারকে অস্বীকার করে তার ভেতরের আসল 'মরমি সারবত্তা'কে বুকে টেনে নেওয়ার বৈপ্লবিক রূপ।

 

(৬)

 

চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনকে যখন ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি ফাঁসি দেওয়া হয়, তার আগের দিনগুলোতে ব্রিটিশ রাজ তাঁর ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালিয়েছিল। হাতুড়ি দিয়ে তাঁর দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল, হাড় গুঁড়ো করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তিনি ফাঁসির মঞ্চে হেঁটে যেতে না পারেন।

কিন্তু ফাঁসির ঠিক আগের রাতে, জল্লাদ ও রক্ষীরা যখন তাঁর সেলের সামনে আসে, তারা অবাক হয়ে দেখে মাস্টারদা অত্যন্ত শান্ত ও স্থির হয়ে বসে আছেন। তাঁর মুখে কোনো যন্ত্রণার বা ক্ষোভের রেখা ছিল না। তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে একটি শেষ চিঠি লিখেছিলেন, যার মূল কথা ছিল: "আমি কী রেখে গেলাম? মাত্র একটি জিনিস—আমার স্বপ্ন। স্বাধীনতার সোনালী স্বপ্ন। মৃত্যুর এই অন্ধকার রাতেও আমি সেই আলোর ভোরের গান শুনতে পাচ্ছি। তোমরা বিষাদগ্রস্ত হয়ো না। ভাঙনের এই খেলায় আমি কেবল আমার জীর্ণ শরীরটা হারিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আমার আত্মা তোমাদের মাঝেই বেঁচে থাকবে।"

 

সুফিদের 'ফানা ফিল্লাহ' কিংবা উপনিষদের 'অমৃতস্য পুত্রাঃ' চেতনার মতো, মাস্টারদা মৃত্যুর আগমুহূর্তে নিজের নশ্বর শরীরকে সম্পূর্ণ ভুলে এক পরম ও অবিনশ্বর আনন্দের সাথে যুক্ত হতে পেরেছিলেন। তীব্র শারীরিক যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে অন্তরের এই যে পরম প্রশান্তি এবং ভোরের আলোর উপস্থিতি টের পাওয়া—এটি কেবল রাজনৈতিক জেদ নয়, এটি এক পরম সাধকের মরমি মহিমা।

 

(৭)

 

ইতালির ফ্যাসিস্ত শাসক মুসোলিনির আদালত কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী আন্তোনিও গ্রামশিকে সাজা দেওয়ার সময় বলেছিল, "আমাদের এই মস্তিষ্কের কাজ অন্তত বিশ বছরের জন্য থামিয়ে দিতে হবে।"

গ্রামশিকে এক অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে নির্জন কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়, যেখানে তাঁর শরীর দিন দিন যক্ষ্মা ও নানাবিধ রোগে ভেঙে পড়ছিল। কিন্তু সেই জীর্ণ বন্দিশালায় বসে গ্রামশি খাতার পর খাতা লিখে যাচ্ছিলেন, যা পরে 'প্রিজন নোটবুকস' নামে বিশ্ববিখ্যাত হয়)। তিনি তাঁর চিঠিতে লিখেছিলেন: "তারা আমার শরীরকে লোহার শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে, কিন্তু তারা জানে না যে আমার মন এই ব্রহ্মাণ্ডের সমান স্বাধীন। আমি যখন এই খাতার পাতায় কলম ছুঁইয়ে মানুষের মুক্তির কথা লিখি, তখন এই অন্ধকার দেয়ালগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি এক অনন্ত আলোর রাজ্যে প্রবেশ করি, যেখানে শোষকের কোনো অস্তিত্ব নেই।"

 

মরমি দর্শনে 'চেতনার মুক্তি' বলতে যা বোঝায়, গ্রামশির এই যাপন ছিল ঠিক তাই। বাইরের কোনো শৃঙ্খল বা জীর্ণতা যখন মানুষের অন্তরের সৃজনশীল ও স্বাধীন সত্তাকে স্পর্শ করতে পারে না, তখনই মানুষ জাগতিক সীমানা পেরিয়ে এক মরমি উচ্চতায় পৌঁছায়। গ্রামশির কাছে লিখতে বসাটা কোনো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা মাত্র ছিল না, তা ছিল তাঁর আত্মার বেঁচে থাকার এক পবিত্র প্রার্থনা।

 

(৮)

 

১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ লাহোর সেন্ট্রাল জেলে ভগৎ সিং, সুখদেব ও রাজগুরুকে ফাঁসি দেওয়ার দিনটি নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই এগিয়ে আনা হয়েছিল। যখন জেলার ভগৎ সিংয়ের সেলে যান, তখন ভগৎ সিং মহান বিপ্লবী লেনিনের একটি জীবনী গ্রন্থ পড়ছিলেন। জেলারকে দেখে তিনি অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, "একটু অপেক্ষা করুন, একজন বিপ্লবী আর একজন বিপ্লবীর সাথে সাক্ষাৎ শেষ করে নিক।"

বইয়ের পাতাটি মুড়ে রেখে তিনি যখন ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর মুখে ছিল এক স্বর্গীয় হাসি। সহযোদ্ধাদের সাথে গলা মিলিয়ে তিনি গাইছিলেন সুফি কবিদের দ্বারা প্রভাবিত পাঞ্জাবের ঐতিহ্যবাহী প্রেমের উপাখ্যান 'হীর রাঞ্ঝা'র গান এবং দিচ্ছিলেন 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' স্লোগান।

 

মরমি সাধকেরা যেভাবে মৃত্যুকে 'উরস' বা পরমেশ্বরের সাথে আত্মার মিলনের উৎসব হিসেবে দেখেন, ভগৎ সিংয়ের কাছে ফাঁসির মঞ্চটি ছিল ঠিক তেমনই এক মহৎ প্রেমের মিলনমেলা। দেশের মানুষের প্রতি এবং স্বাধীনতার প্রতি এক তীব্র, নিঃশর্ত এবং মরমি প্রেম না থাকলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন আনন্দ প্রকাশ করা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

 

(৯)

 

লং মার্চের সেই দীর্ঘ, ক্লান্তিকর ও রক্তক্ষয়ী যাত্রার সময় চীনা বিপ্লবের অন্যতম শীর্ষ নেতা চৌ এনলাই মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। চারদিকে শুধু পাহাড়, বরফ আর শত্রুসেনাদের তাড়া। এক রাতে, যখন বিপ্লবীরা এক দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় সাময়িক আশ্রয় নিয়েছেন, তখন চৌ এনলাই যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারছিলেন না।

মাও সেতুং তখন চৌ-এর পাশে গিয়ে বসেন এবং নিজের থলি থেকে একটি সাধারণ বাঁশের বাঁশি বের করেন। মাও কোনো রাজনৈতিক বা যুদ্ধের কথা না বলে গভীর রাতে সেই পাহাড়ি প্রকৃতির মাঝে নিস্তব্ধতা ভেঙে বাঁশিতে সুর তোলেন। পরে চৌ এনলাই তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন: "সেই সুরের মাঝে যুদ্ধের কোনো কোলাহল ছিল না, ছিল পাহাড়ের নীরবতা আর নদীর বয়ে চলার গান। মাওয়ের বাঁশির সেই সুর আমার ভেতরের সমস্ত শারীরিক যন্ত্রণা আর রাজনৈতিক উদ্বেগ ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছিল। আমার মনে হয়েছিল, আমরা কেবল একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছি না, আমরা এই প্রকৃতির আদিম ও অকৃত্রিম শান্তিতে ফিরে যাওয়ার জন্য লড়ছি।"

 

তাওবাদ ও প্রাচ্যের মরমি দর্শনে প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়া এবং সব কোলাহলের মাঝেও অন্তরের নীরবতা ধরে রাখাকেই পরম সাধনা বলা হয়। মাও সেতুংয়ের মতো একজন রূঢ় বাস্তববাদী ও সমরকুশলী বিপ্লবীর এই কোমল ও মরমি রূপটি দেখায় যে, বাহ্যিক কঠিন লড়াইয়ের পেছনের মূল শক্তিটি আসলে আসে প্রকৃতির সাথে গভীর আত্মিক সংযোগ থেকে।

 

(১০)

 

ভিয়েতনামের মহান বিপ্লবী নেতা হো চি মিন যখন ১৯৪০-এর দশকে চীনের চিয়াং কাই-শেক সরকারের কারাগারে বন্দি ছিলেন, তখন তাঁর পায়ে লোহার শৃঙ্খল পরানো ছিল। এক অন্ধকার রাতে, কারাগারের ছোট্ট গরাদের ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার আলো এসে পড়েছিল তাঁর জীর্ণ শয্যায়। হো চি মিন সেই দৃশ্য দেখে হাত বাড়িয়ে দেন আলোর দিকে এবং খাতার কোণায় একটি ছোট কবিতা লেখেন: "মানুষ যখন খাঁচায় বন্দি থাকে, তখন সে আকাশের চাঁদের দিকে তাকায়; আর চাঁদও মেঘের ওপার থেকে নেমে আসে বন্দির সাথে সাক্ষাৎ করতে। শরীর আমার শৃঙ্খলিত হতে পারে, কিন্তু আমার মন তো এই চাঁদের আলোর মতোই মুক্ত। এই আলো যেখানে পৌঁছাতে পারে, আমার আত্মাও সেখানে অনায়াসে চলে যায়।"

 

সুফি বা জেন দর্শনে 'মুক্তির' সংজ্ঞা কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আটকে থাকে না। হো চি মিনের কাছে কারাগারের অন্ধকার কোনো অভিশাপ ছিল না, বরং তা ছিল মহাজাগতিক আলোর সাথে একান্তে মিলিত হওয়ার এক পবিত্র মন্দির। যখন একজন মানুষ বাইরের সমস্ত সীমানাকে তুচ্ছ করে প্রকৃতির এক চিলতে আলোর মাঝে নিজের আত্মার পূর্ণ স্বাধীনতা খুঁজে পান, তখনই ঘটে আসল মরমি রূপান্তর।

 

(১১)

 

ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণের অন্যতম বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার যখন গুলিবিদ্ধ ও অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন, তখন ব্রিটিশদের হাতে জীবন্ত ধরা দেওয়ার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেওয়া শ্রেয় মনে করেছিলেন। তাঁর কাছে ছিল পটাসিয়াম সায়ানাইডের একটি ছোট পাত্র।

মৃত্যুর ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে, তিনি তাঁর ডায়েরিতে বা শেষ চিঠিতে লিখেছিলেন যে, তাঁর কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি অত্যন্ত শান্ত চিত্তে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন তাঁর এই আত্মত্যাগ দেশের মানুষকে জাগিয়ে তোলে। তিনি মৃত্যুর মুখকে দেখেছিলেন এক পরম প্রিয় সত্তার মতো।

 

ভারতীয় মরমি ঐতিহ্যে ও সুফি দর্শনে মৃত্যুকে বলা হয় 'বিয়ে' বা পরম সত্তার সাথে চিরন্তন মিলন। প্রীতিলতা সায়ানাইড গ্রহণ করার সময় কোনো ভীতি বা যন্ত্রণার প্রকাশ ঘটাননি; বরং এক পরম সমর্পণের সাথে নিজের নশ্বর দেহকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। এই যে দেশের জন্য, মানুষের জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেওয়ার আনন্দ—এটি কেবল এক রাজনৈতিক যোদ্ধার জেদ নয়, এটি এক পরম প্রেমিকার মরমি আত্মোৎসর্গ।

 

(১২)

 

জার্মান কমিউনিস্ট আন্দোলনের মহান নেতা কার্ল লিবক্লেখতকে (যিনি রোজা লুক্সেমবার্গের সহযোদ্ধা ছিলেন) যখন ১৯১৯ সালের এক রাতে বার্লিনের এক উদ্যানে এনে ঘাতক বাহিনী গুলি করার জন্য দাঁড় করায়, তখন ঘাতকেরা তাঁর চোখ বেঁধে দিতে চেয়েছিল। কার্ল অত্যন্ত শান্তভাবে চোখের বাঁধনটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ঘাতক সৈনিকদের চোখের দিকে সরাসরি তাকান এবং অত্যন্ত কোমল স্বরে বলেন: "চোখ বেঁধো না। আমি দেখতে চাই এই ভোরের আলো কীভাবে ফোটে। তোমরা আমাকে গুলি করবে, কিন্তু তোমরা কি আকাশের এই নক্ষত্রগুলোকে নিভিয়ে দিতে পারবে? মানুষের ভেতরের স্বাধীনতার যে আলো, তা এই নক্ষত্রদের মতোই অবিনশ্বর। গুলি করো, আমি প্রস্তুত।"

 

উপনিষদের সেই অমোঘ বাণী—"বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ" (আমি অন্ধকারের ওপারে সেই সূর্যসম পরম সত্তাকে চিনেছি)—কার্লের এই অন্তিম মুহূর্তে হুবহু প্রতিধ্বনিত হয়। ঘাতকের রাইফেলের নলের সামনে দাঁড়িয়েও মৃত্যুর ওপারে এক অবিনশ্বর আলোর উপস্থিতি টের পাওয়া এবং ঘাতককে ক্ষমাশীল দৃষ্টিতে দেখতে পারা কেবল এক জননেতার পক্ষেই সম্ভব, যার হৃদয় এক পরম সাধকের আধ্যাত্মিক আলোয় উদ্ভাসিত।

 

(১৩)

 

নোবেলজয়ী লেখিকা ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী ডরিস লেসিং আফ্রিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় এক প্রত্যন্ত গ্রামে বিদ্রোহীদের সাথে কিছু সময় কাটিয়েছিলেন। এক বিকেলে, এক ভয়াবহ যুদ্ধের পর চারদিকে শুধু ধ্বংসস্তূপ আর বারুদের গন্ধ। এক কৃষ্ণাঙ্গ বিপ্লবী যোদ্ধা মাটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেখানে যুদ্ধের ট্যাংকের চাকার নিচে একটি ছোট ঘাসের গোছা পিষে চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। সেই যোদ্ধা পরম মমতায় নিজের আঙুল দিয়ে সেই পিষ্ট ঘাসটিকে সোজা করে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এবং ডরিসকে দেখে বলেছিলেন: "দেখো, তারা আমাদের এই ঘাসগুলোর মতোই পিষে দিতে চায়। কিন্তু মাটির ভেতরের যে প্রাণশক্তি, তাকে তারা মারবে কীভাবে? এই ঘাসটি আবার বেঁচে উঠবে, আমরাও আবার জেগে উঠব। কারণ জীবন কোনোদিন পরাজয় মানে না।"

 

এই ছোট ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, একজন বিপ্লবীর চোখ কতখানি সংবেদনশীল ও মরমি হতে পারে। একটি সাধারণ পিষ্ট ঘাসের মাঝে পুরো মানবজাতির অবিনশ্বরতার প্রতীক খুঁজে পাওয়া—এটি বৌদ্ধ দর্শনের 'সবকিছুর মাঝে বুদ্ধত্ব দেখা' বা সুফি দর্শনের 'সব সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে অনুভব করা'-র সমতুল্য।

 

(১৪)

 

ইরানের প্রখ্যাত সমাজতন্ত্রী, বুদ্ধিজীবী ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন জালাল আল-ই আহমেদ। তিনি দীর্ঘদিন প্রথাগত ধর্ম থেকে দূরে ছিলেন এবং মার্ক্সবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন।

১৯৬০-এর দশকে তিনি যখন মক্কায় হজ পালন করতে যান, তখন লক্ষ লক্ষ শোষিত, দরিদ্র এবং পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের এক পোশাকে, এক সারিতে দাঁড়িয়ে থাকার সাম্যবাদী রূপ দেখে তাঁর ভেতরে এক পরম রূপান্তর ঘটে। তিনি তাঁর ডায়েরিতে (যা পরে 'খাসি দর মিকাত' বা 'হজের দিনলিপি' নামে প্রকাশিত হয়) লিখেছিলেন: "আমি এখানে কোনো অলৌকিক ঈশ্বরের খোঁজ করতে আসিনি। কিন্তু যখন দেখলাম এই মরুভূমির বুকে রাজা আর ফকির, শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গ তাদের সমস্ত বাহ্যিক অহংকার আর পরিচয় বিসর্জন দিয়ে এক হয়ে গেছে, তখন আমি বুঝলাম—এই সাম্যই হলো মহাজাগতিক সত্য। আমার মার্ক্সবাদ আর মানুষের এই আধ্যাত্মিক আকুলতা আসলে একই মহাসমুদ্রে গিয়ে মিশেছে।"

 

সুফি দর্শনের মূল কথাই হলো 'ওয়াহদাতুল উজুদ' বা সৃষ্টির একত্ব। জালাল আল-ই আহমেদ বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে হজের আধ্যাত্মিক সাম্যবাদের মাঝে সমাজতন্ত্রের সেই পরম রূপটি দেখতে পেয়েছিলেন। এটি আমাদের শেখায় যে, সত্যিকারের বৈপ্লবিক চেতনা যখন আধ্যাত্মিকতার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন সব কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে একাকার হয়ে যায়।

 

(১৫)

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রখ্যাত ইহুদি বিপ্লবী লেখক ও সাংবাদিক ইলিয়া হরেনবার্গ লাল ফৌজের সাথে বার্লিনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। চারদিকে তখন কেবল কামানের গর্জন, বারুদের গন্ধ আর মৃত্যু।

একবার নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হওয়া একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত শহরে প্রবেশ করে হরেনবার্গ দেখলেন, একটি বোমাবিদ্ধ বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে, দেয়াল ভেঙে পড়েছে, কিন্তু তার মাঝে একটি পিয়ানো অলৌকিকভাবে অক্ষত রয়ে গেছে।

একজন ক্লান্ত, রক্তাক্ত সোভিয়েত তরুণ সৈনিক রাইফেলটি পাশে রেখে সেই পিয়ানোর সামনে বসল আর অত্যন্ত পরম মমতায় শোপ্যাঁ-র একটি ধ্রুপদী সুর বাজাতে শুরু করল। হরেনবার্গ সেই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং পরে লিখেছিলেন: "চারপাশে যখন মানুষের তৈরি করা নরক, তখন এই সুরটি ছিল এক স্বর্গীয় অভয়বাণী। আমি বুঝলাম, আমরা কেবল হিটলারের ফ্যাসিবাদকে ধ্বংস করতে লড়ছি না; আমরা লড়ছি মানুষের ভেতরের এই অবিনশ্বর সৌন্দর্য আর সুরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এই সুরই আমাদের আসল জন্মভূমি।"

 

এই অ্যানেকডোটটি প্রমাণ করে যে, চরম ধ্বংস আর যুদ্ধের মাঝেও মানুষের ভেতরের সৃষ্টিশীল ও শিল্পমনস্ক আত্মা কীভাবে অক্ষত থাকে। মরমি সাধকেরা যেভাবে সমস্ত জাগতিক কোলাহলের অন্তরালে এক পরম মহাজাগতিক সুর শুনতে পান, সেই বিপ্লবী সৈনিকের পিয়ানোর সুরও ছিল ঠিক তেমনই এক অন্ধকার সময়ে আলোর পরম ইবাদত।

 

(১৬)

 

নিকারাগুয়ার স্যান্ডিনিস্তা বিপ্লবের সময় স্বৈরশাসক সোমোজার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিলেন তরুণ বিপ্লবীরা। এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্যান্ডিনিস্তারা সোমোজার এক কুখ্যাত কমান্ডারকে বন্দি করে, যে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। বিপ্লবীরা যখন তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন দলের এক মরমি ভাবাপন্ন তরুণ কমান্ডার ইদেলফনসো নিঝুম রাতে সেই বন্দির সেলের সামনে গিয়ে বসেন। তিনি বন্দিকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার মা কি বেঁচে আছেন?" বন্দি মাথা নিচু করে বলল, "হ্যাঁ।" তখন সেই স্যান্ডিনিস্তা যোদ্ধা নিজের পকেট থেকে ক্রুশ বের করে বন্দির হাত ধরে বললেন: "আমরা তোমাকে শাস্তি দেব কারণ তুমি মানুষের ওপর জুলুম করেছ। কিন্তু এই শাস্তির পেছনে কোনো ব্যক্তিগত ঘৃণা নেই। এসো, আমরা দুজনে মিলে তোমার মায়ের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, কারণ কাল থেকে এক মা তাঁর সন্তানকে হারাবেন—তা সে শোষকই হোক আর শোষিতই হোক। মায়ের চোখের জলের কোনো দল হয় না।"

 

বৌদ্ধ দর্শনের 'করুণা' আর সুফিবাদের নিঃশর্ত ক্ষমার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এটি। একজন বিপ্লবী যখন শত্রুকে শাস্তি দেওয়ার সময়েও তার ভেতরের মানবিক সত্তাটিকে অনুভব করতে পারেন এবং শোষকের মায়ের দুঃখকেও নিজের করে নিতে পারেন, তখন সেই লড়াই রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এক পরম আত্মিক পবিত্রতা লাভ করে।

 

(১৭)

 

১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর, মেদিনীপুরের তমলুক থানায় ভারত ছাড়ো আন্দোলনের এক মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ৭৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা—মাতঙ্গিনী হাজরা। ব্রিটিশ পুলিশ যখন মিছিলের ওপর গুলি চালানো শুরু করে, তখন সবাই যখন ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল, এই বৃদ্ধা ভারতের তেরঙা পতাকাটি বুকে জড়িয়ে ধরে অবিচলভাবে এগিয়ে যেতে থাকেন।

পুলিশের প্রথম বুলেটটি তাঁর এক পায়ে লাগে। কিন্তু তিনি পড়ে যাননি। দ্বিতীয় বুলেটটি তাঁর অন্য হাতে লাগে। কিন্তু তিনি পতাকাটি মাটিতে পড়তে দেননি। অন্য হাতে তা উঁচিয়ে ধরেন। শেষ বুলেটটি যখন তাঁর কপালে বিঁধে যায়, তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ার মুহূর্তেও পতাকাটিকে সোজা করে ধরে রেখেছিলেন। তাঁর মুখে ছিল পরম এক নাম— "বন্দে মাতরম্"।

 

ভারতীয় মরমি ঐতিহ্যের 'বীর ভাব' বা বীরত্বের মাধ্যমে পরমাত্মায় বিলীন হওয়ার এক জীবন্ত রূপান্তর এটি। মাতঙ্গিনী হাজরার কাছে সেই কাপড়ের টুকরোটি কোনো সাধারণ পতাকা ছিল না, সেটি ছিল কোটি কোটি মানুষের শৃঙ্খলিত আত্মার স্বাধীনতার প্রতীক। মৃত্যুর চরম মুহূর্তেও নিজের নশ্বর দেহের পতনকে অগ্রাহ্য করে সেই আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এক পরম মরমি সমর্পণেরই বহিঃপ্রকাশ।

 

(১৮)

 

পুয়ের্তো রিকোর স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান বিপ্লবী নেতা ডন পেড্রো আলবিজু ক্যাম্পোসকে মার্কিন সরকার দীর্ঘকাল ফেডারেল কারাগারে নির্জন কারাবাসে রেখেছিল। বছরের পর বছর চারদিকের দেয়াল ছাড়া কোনো মানুষের মুখ তিনি দেখতে পাননি।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "এই দীর্ঘ একাকীত্বে আপনি পাগল হয়ে যাননি কেন?" ডন পেড্রো মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন: "তারা আমাকে মানুষের কাছ থেকে আলাদা করতে পেরেছিল, কিন্তু ঈশ্বরের কাছ থেকে নয়। আমি যখন সেই অন্ধকার কুঠুরিতে চোখ বন্ধ করতাম, তখন এই দেয়ালগুলো মিলিয়ে যেত। আমি আমার দেশের প্রতিটি নদী, প্রতিটি পাহাড়ের হাওয়া আমার গায়ে অনুভব করতাম। শৃঙ্খল কেবল শরীরের জন্য; যে আত্মা পরম সত্যের সাথে যুক্ত, তাকে কোনো দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা যায় না।"

 

এটি সম্পূর্ণভাবেই একজন মরমি যোগী বা সুফি সাধকের অন্তর্দৃষ্টির সাথে মিলে যায়। বাহ্যিক সমস্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎ যখন স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন অন্তরের গভীরে যে অনন্ত আলোর জগত উন্মোচিত হয়—ডন পেড্রো তাঁর বৈপ্লবিক বিশ্বাসের জোরে সেই আধ্যাত্মিক মুক্তি লাভ করেছিলেন।

 

(১৯)

 

কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় রোজা লুক্সেমবার্গ একদিন জানালা দিয়ে দেখতে পান, একটি মালবাহী গাড়ি টেনে নিয়ে আসার সময় এক নির্মম সৈনিক একটি বুড়ো মহিষকে চাবুক দিয়ে যত্রতত্র আঘাত করছে। মহিষটির শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছিল এবং তার চোখে ছিল এক অবর্ণনীয় যাতনা। রোজা সেই দৃশ্য দেখে নিজের সেলের ভেতরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিলেন এবং পরে তাঁর চিঠিতে লিখেছিলেন: "আমি সেই মহিষটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তার চোখের সেই চাউনি... ওহ ঈশ্বর! সে যেন আমার দিকে তাকিয়ে এক পরম কান্নায় বলছিল—'আমি তো কোনো অন্যায় করিনি, তবে আমার ওপর এই জুলুম কেন?' আমি সেই পশুর চোখের জলের মাঝে পুরো পৃথিবীর সমস্ত শোষিত, লাঞ্ছিত মানুষের আদিম ক্রন্দনটি দেখতে পেলাম। আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। মানুষের মুক্তি কেবল মানুষের জন্য নয়, এই প্রকৃতির প্রতিটি সত্তার যন্ত্রণামুক্তির জন্যই আমাদের এই লড়াই।"

 

বৌদ্ধ দরৃশনের 'মহাকরুণা' এবং সুফিবাদের সর্বভূতে স্রষ্টাকে দেখার অনুভূতির এক চূড়ান্ত রূপ এটি। একজন রাজনৈতিক বিপ্লবী যখন নিজের বন্দিত্বের কষ্ট ভুলে একটি পশুর চোখের জলের মাঝে পুরো মহাবিশ্বের শোষণকে অনুভব করেন এবং তার ব্যথায় একাকার হয়ে যান, তখন তা প্রমাণ করে যে প্রকৃত বিপ্লবীদের হৃদয় আসলে কতটা সংবেদনশীল ও মরমী হয়।

 

(২০)

 

রবেন দ্বীপে দীর্ঘ ১৮ বছর বন্দি থাকার সময় নেলসন ম্যান্ডেলার ওপর ক্রিস্টো ব্র্যান্ড নামের এক শ্বেতাঙ্গ তরুণ কারারক্ষীকে নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকার নিয়ম অনুযায়ী, শ্বেতাঙ্গদের কৃষ্ণাঙ্গ বন্দিদের সাথে চরম নিষ্ঠুর আচরণ করার কথা ছিল। ম্যান্ডেলা সেই রক্ষীর দিকে কখনো শত্রুতার দৃষ্টিতে তাকাননি। তিনি প্রতিদিন ক্রিস্টোর সাথে অত্যন্ত কোমল ভাষায় কথা বলতেন, তাঁর পরিবারের খোঁজ নিতেন এবং তাঁকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। ম্যান্ডেলার এই নিঃশর্ত স্নেহ ও মানবিক ব্যবহারে ক্রিস্টোর ভেতরের সমস্ত বর্ণবাদী ঘৃণা ধুয়ে মুছে যায়। তিনি ম্যান্ডেলার পরম বন্ধু ও ভক্তে পরিণত হন।

 

মরমি দর্শনের একটি অন্যতম স্তম্ভ হলো—"প্রেম দিয়ে সমস্ত শত্রুতাকামী হৃদয়কে জয় করা।" ম্যান্ডেলা কারাগারের লোহার গরাদ এবং বর্ণবাদের নির্মম দেয়ালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিলেন কোনো অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং তাঁর ভেতরের গভীর ক্ষমাশীল আত্মা এবং মানবপ্রেম দিয়ে। একজন বন্দি যখন তাঁর নিজের অত্যাচারী রক্ষীর আত্মাকে মুক্ত করতে পারেন, তখন সেই লড়াই রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এক পরম আধ্যাত্মিক ইবাদতে পরিণত হয়।

 

(ক্রমশ)

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন