কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

যুগান্তর মিত্র

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

রোহিত 

রোহিত 

রোহিত শর্মার মনখারাপ

আমাদের বারান্দার একপাশে সবসময়ই দু-তিনটি প্ল্যাস্টিকের চেয়ার পাতা থাকে। আমি খেয়াল করে দেখেছি, রোহিত শর্মা ঠিক লাল চেয়ারটাই টেনে নিয়ে বসে।

আজ রবিবার, আমার অফিস ছুটি। মা তাই রোহিত শর্মার খোঁজ নিতে বলেছিলেন আমাকে। অনেকদিন হল তার দেখা নেই বলে বেশ চিন্তিত দেখলাম মাকে। শেষ যেদিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল রোহিত শর্মা, সেদিন তার মনখারাপের আঁচ পেয়েছিলাম। সেদিনও ছিল রবিবার। তখন আমি সবেমাত্র বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়েছি, দেখলাম রোহিত শর্মা এসে হাজির। প্রতি রবিবার বাজার করা আমার একটা রুটিন কাজ। এবং মায়ের কড়া নির্দেশ, সকাল সকাল বাজার এনে দিতে হবে। এর অন্যথা করা যাবে না কিছুতেই।

বাজারে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম লাল চেয়ারটায় বসে আছে রোহিত শর্মা। সাধারণত রবিবার সে আসে না। মঙ্গলবারই আমাদের বাগানের কাজ করে। সেদিন তাকে দেখে একটু অবাক হলেও পরে ভেবেছিলাম, হয়তো মা আসতে বলেছেন। অন্যদিন আমার দিকে তাকিয়ে একমুখ হাসি ছড়িয়ে দেয় রোহিত। কিন্তু সেদিন অন্যরকম লাগলেও তখন কিছু মনে হয়নি। জানতাম, কিছুক্ষণ বসে থেকে কাজে লেগে পড়বে। বাজার থেকে ফিরে দোতলায় চলে এসেছিলাম চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। ঝুলবারান্দায় বসে দেখছিলাম তখনও মাথা নীচু করে ঠায় বসে আছে রোহিত শর্মা।

‘ভবেনদার দোকান থেকে একটু পোস্ত এনে দিস তো। পটল-পোস্ত করব ভাবছি। পোস্ত ফুরিয়ে গেছে।’

মা এসেছিলেন চায়ের কাপ ফেরত নিতে। পোস্ত আনতে বলাটাও কাপ নেওয়ার কাজের সঙ্গে জুড়ে নিয়েছেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘রোহিত শর্মা ওভাবে বসে আছে কেন? ঘণ্টা দুয়েকের বেশি হয়ে গেল! আজ কি কাজ করবে না?’

‘কী জানি। একবার জিজ্ঞাসাও করলাম এভাবে বসে আছো কেন সম্বুদ্ধ? কোনও জবাব দিল না। বললাম, মনখারাপ? শুধু বলল হুঁ। আমি আর কথা বাড়াইনি। জানিসই তো কেমন খ্যাপাটে। কী কথার কী জবাব দেবে তার ঠিক আছে?’ 

রোহিত শর্মার প্রকৃত নাম সম্বুদ্ধ রায়। একমাত্র মাকেই দেখেছি স্পষ্ট উচ্চারণে ‘সম্বুদ্ধ’ ডাকতে। বাবা ডাকেন শম্ভু বলে। সম্বুদ্ধের সঙ্গে শম্ভুর কী সম্পর্ক বুঝতে না-পেরে একবার বাবাকে বলেছিলাম, ‘কোথায় সম্বুদ্ধ আর কোথায় শম্ভু!’

বাবা পুরো কথা শোনার মানুষ নন কোনওকালেই। আমি ভেবেছিলাম সম্বুদ্ধ আর শম্ভু শব্দের অর্থের পার্থক্যটুকু বুঝিয়ে বলব। বাবা চকিতে জবাব দিয়েছিলেন, ‘তুই যে ওকে রোহিত শর্মা ডাকিস, তার সঙ্গে বুঝি খুব মিল আছে?’

আমি থেমে গিয়েছিলাম। জানতাম আর কথা বাড়ালে হইচই বাঁধিয়ে বসবেন। তখন আবার মাকে মাঝখানে এসে দাঁড়াতে হবে। আমার ওপর বাবা চটে গেলে মা এবং মা চটে গেলে বাবা এসে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়েন। এই পক্ষপাত আমি বেশ উপভোগ করি।

আমার ঠাকুমা অবশ্য কিছুটা কাছাকাছি নামে ডাকতেন রোহিতকে। ‘আমার জন্য একটা নয়নতারা আর তুলসীগাছ আনিস তো সম। বাড়িতে থাকা ভালো।’ ‘সম’ বলে এমনভাবে ঠাকুমা থামতেন, যেন সুর-তাল-লয় একেবারে শমে এসে ঠেকেছে। ঠাকুমা না-থাকলেও তাঁর কথাগুলো থেকে গেছে বাড়ির হাওয়ায়।

আমি কেন সম্বুদ্ধ রায়কে রোহিত শর্মা ডাকি, তার একটা কৈফিয়ত দেওয়া প্রয়োজন এখানে। সম্বুদ্ধ রায়ের সঙ্গে ক্রিকেটার রোহিতের ত্রিসীমানায় কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকি ক্রিকেটের সঙ্গেও বিন্দুমাত্র যোগাযোগ নেই। আমাদের পাড়া থেকে বেশ খানিকটা দূরের এক পাড়া থেকে সম্বুদ্ধ রায় তিন চাকার ভ্যানে করে নানা ধরনের ফুলগাছ ও অন্যান্য গাছপালা এনে বিক্রি করে ঘুরে ঘুরে। সেভাবেই আমাদের বাড়িতে এসেছিল একবার। তারপর প্রধানত মায়ের উদ্যোগে বাড়ির কাজে লেগে গেছে।

আমার যখন বারো কি তেরো বছর বয়স, তখন থেকেই সম্বুদ্ধ রায় আমাদের বাড়িতে গাছের চারা দিয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার এসে বাগানে গাছ লাগানো, সেগুলোর পরিচর্যা ইত্যাদি করে। সকালের ওই সময় সাধারণত পড়ার ঘরে থাকতাম আমি। তারপর সময় হয়ে গেলে চলে যেতাম স্কুলে। তাই তার কাছাকাছি যাওয়া হয়নি আগে।

এক মঙ্গলবার আমাদের স্কুল ছুটি ছিল কী একটা কারণে। আমি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম বাগানে। লোকটা বলে বসেছিল, ‘কী খোকা, আইজ কি ইস্কুল ছুটি?’

খোকা! আমি তখন মনে মনে বড় হয়ে উঠেছি। অনেক নিষিদ্ধ ব্যাপার বন্ধুদের সঙ্গে গোপনে আলোচনা হত (যদিও সেসবের বেশিরভাগই ছিল ভ্রান্ত ধারণা)। সেই আমাকেই ‘খোকা’ বলা? ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম। কোনও জবাব না-দিয়ে দুপদাপ শব্দে ঘরে এসে মাকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। শুধু মা নন, বাবারও আমার অভিযোগ শুনে কী হাসি! রাগটা আরও চরমে উঠে গিয়েছিল। ফলত ওই বয়সে তার সম্বুদ্ধ নামটা আমার কাছে খুব খারাপ মনে হয়েছিল। তখন সদ্য রোহিত শর্মা ইন্ডিয়ান ওডিআই টিমে চান্স পেলেও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ব্যাটিং করার সুযোগ পাননি। রোহিতের মতোই খানিকটা চেহারা বলে আমি রাগ করেই সম্বুদ্ধ রায়কে ‘রোহিত শর্মা’ নাম দিয়েছিলাম। সেই থেকে আমার কাছে সম্বুদ্ধ রায় হয়ে গেল রোহিত শর্মা। তবে নামটা পিছনে বলতাম। সামনে বলার প্রশ্নই ছিল না। কেননা তার সঙ্গে কথাই বলতাম না। এমনকি তাকাতামও না তার দিকে।

একদিন বাবা বলে দিয়েছিলেন আমি তাকে রোহিত শর্মা ডাকি। ঠিক সেইসময় আমি নীচে নেমে এসেছিলাম। সম্ভবত স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে। আমার সামনেই কথাটা বলেছিলেন বাবা। শুনে খুব হেসেছিল সম্বুদ্ধ রায়। জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘হেইডা আবার কেডা খোকাবাবু? এই পাড়ায় থাকে নাকি?’

‘রোহিত শর্মার নাম শোনোনি? ইন্ডিয়ান টিমের একজন ক্রিকেটার!’ প্রশ্নটা আমাকেই করেছিল, কিন্তু বাবা জবাব দিয়েছিলেন।

‘লোকটা কোন্‌ দ্যাশের?’ চোয়াল ঝুলিয়ে প্রশ্ন করেছিল আমার রোহিত শর্মা।

‘লোকটা আমাদের দেশেরই খোলোয়াড়। নাগপুরের বাসিন্দা।’ সম্বুদ্ধ রায় সম্ভবত ইন্ডিয়া শব্দটা খেয়াল করেনি।

‘ও, সে বোধহয় ম্যালা দূরে, তাই না?’

‘তা দূর আছে বটে।’ প্রসঙ্গে আমি থাকলেও বাবার সঙ্গেই কথাবার্তা চালু হয়ে গিয়েছিল।

‘কিন্তুক কত্তাবাবু, আমি জীবনে কিরিকেটের বলই ধরি নাই হাতে। খ্যালা তো দূরের কতা! তয় নামটা আমার ম্যালা পছন্দ হইছে।’ তার মুখে একটুকরো আলো ছড়িয়ে পড়তে দেখেছিলাম সেদিন।

সেই থেকে আমি আর আড়ালে নয়, সামনেই রোহিত শর্মা বলতাম তাকে। তাছাড়া আমার দেওয়া নাম পছন্দ হয়েছে বলে খানিকটা গর্বও হচ্ছিল। ততদিনে রোহিত দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো খেলে নাম করে ফেলেছেন। তবু নামটা বদল করার কথা ভাবিনি। আর ‘খোকাবাবু’ বললে রাগও করি না আমি।

বাগানের কাজ সারা হলে বারান্দায় এসে লালা চেয়ারে বসত রোহিত শর্মা। মা কিছু খাবার দিতেন তাকে। খাওয়া হলে ভ্যান নিয়ে পথে পথে হাঁক পেড়ে গাছ বিক্রি করতে বেরিয়ে পড়ত আবার। রোহিতের খাওয়ার সময়টা দীর্ঘ হত নানা বিষয় নিয়ে গল্পের কারণে।

আমি তখন উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গ্রাজুয়েশন কোর্সে ভর্তির মুখে। সেইসময় একদিন গল্পের ছলে রোহিত শর্মা বলেছিল, ‘ছেলেটারে এবার ইস্কুলে ভর্তি কইরতে হইব কত্তাবাবু। দ্যাখতে দ্যাখতে তিন বচ্ছর হইয়া গেল।’

‘আচ্ছা শম্ভু, তোমার এখন বয়স কত?’ বাবা প্রশ্ন করেছিলেন।

‘এই ধরেন গিয়া পঁয়তাল্লিশ পঞ্চাশ হইবে।’

‘দুটো বয়সের মধ্যে পাঁচ বছরের ফারাক হয়ে যাচ্ছে শম্ভু! যে-কোনও একটা বয়স বলো।’

‘অত কি আর মনে থাকে কত্তাবাবু? তাইলে মাঝামাঝিই ধরেন। সাতচল্লিশ কি আটচল্লিশ।’

‘বেশ বেশ, আটচল্লিশই ধরলাম তাহলে। তা তুমি এত বেআক্কেলে কেন শম্ভু? ছেলের বয়স মাত্র তিন! ও যখন একটু বড় হবে, তখন তো তুমি পুরোই বুড়ো হয়ে যাবে। একটু হিসাবপত্র করে চলতে পারো না?’

‘কী করুম কত্তাবাবু! আর এট্টু আয় বাড়ুক ভাবতে ভাবতে বেলা গড়াইয়া গেল যে!’

বাবার সঙ্গে প্রায়শই এইরকম কথাবার্তা হত। একবার রোহিতের বউ সরমা বেপাড়ার একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তার ঘর করবে বলে চলে গিয়েছিল। সেই মোহ কাটতে লেগেছিল মাত্রই মাস দুয়েক। এক সন্ধ্যায় বেদম ঝগড়াঝাঁটি করে বউটা ফিরে এসেছিল পুরনো স্বামীর ঘরে। তখনও তাদের ছেলে জন্মায়নি। ঘটনাটা দিন কয়েক পরে রোহিত শর্মা নিজেই বলেছিল আমাদের বারান্দায় বসে। বউ চলে যাওয়ার কথাটাও এখানে বসেই জানিয়েছিল। সেদিন তার মুখ ছিল থমথমে।

‘তোমারই ভুল হয়েছে সম্বুদ্ধ। একবার যখন চলে গিয়েছিল তোমাকে ছেড়ে, তখন আর ফিরিয়ে না-নিলেই ভালো হত। ঝাড়া হাত-পা নিয়ে থাকতে পারতে তাহলে।’ মা বলেছিলেন।

‘কী করব মা, মেয়েটা তো ভালো। কাজেকম্মের আছে। ও তো আমার কাছে কোনও দাসখত দেয় নাই যে অন্য কাউরে ভালোবাসতে পারবে না। শুধু আমারেই…।’

মা গম্ভীর মুখে রান্নাঘরে চলে গিয়েছিলেন। এমন জবাবের পরে আর কোনও কথা বলতে ইচ্ছে হয়নি সম্ভবত। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে চলে গিয়েছিল রোহিত শর্মা। সে চলে যাওয়ার পরে মা বিড়বিড় করেছিলেন, ‘এমন বোকাসোকা লোকের জন্য এইরকম বউই ঠিক আছে!’

আর একদিন আমাদের বাগানের একটা গাছের ডালে বসে-থাকা পাখি দেখিয়ে আমাকে বলেছিল, ‘ওই পাখিডা ডানা ঝাড়ে ক্যান কইতে পারো খোকাবাবু?’

অদ্ভুত প্রশ্ন! আমি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, ‘কেন ডানা ঝাড়ে?’

‘ও ওর শরীলের যত দুঃখশোক, সব ঝাইড়া ফ্যালায়। পাখিরা এইভাবেই দুঃখ ভোলে। তাই অরা সবসময় আনন্দে থাকে। কোনও পাখিরে কানতে দ্যাখছ কখনও?’

সত্যিই তো! কোনও পাখি কি কাঁদে? কী জানি! রোহিত শর্মার আবিষ্কার আমাকে চিন্তায় ডুবিয়ে দিয়েছিল।

এই হল আমার রোহিত শর্মা। কী কথার কী জবাব দেবে, কোন্‌ ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া জানাবে, বোঝা দায়। বছর সতেরো-আঠারো ধরে লোকটাকে এইরকমই দেখে আসছি।

সেদিনের মনখারাপ দেখে আমার মনে হয়েছিল, বউ কি আবার ভেগে গেল কারও হাত ধরে? ব্যাপারটা বোঝার জন্য গিয়ে বসেছিলাম রোহিত শর্মার পাশের চেয়ারে।

‘কী হল রোহিত শর্মা? মনখারাপ কেন?’

অদ্ভুত উত্তর ভেসে এসেছিল যেন কোন্‌ সুদূর থেকে, ‘আমার আর নূতন পিরথিবী গড়া হইল না খোকাবাবু!’

হাহাকারের মতো শোনাচ্ছিল তার কথা। ‘কী বলছ? নতুন পৃথিবী মানে কী?’ বিস্মিত আমি প্রশ্নটা গড়িয়ে দিয়েছিলাম তার দিকে।

‘সে এক অন্যরকম পিরথিবী। সেইখানে কোনও রাগ-টাগ থাকব না। সবাই মিলমিশ থাকব। কোনও ঝামেলি নাই, কেউ কাউরে মন্দ কতা কইবে না।’

এমন কথা আগে কখনও শুনিনি। মজার ছলেই জানতে চেয়েছিলাম, ‘তা ছেলে কী বলল শুনে?’

‘সে তো রাজিই হয় না। তারে কইলাম, চল দুইজনে মিইল্যা চেষ্টা করি। ও আমারে কইল পাগল! আমি বুঝাইছিলাম নূতন পিরথিবী না-হয় গড়লি না। দুইজনে চেষ্টা করলে অন্তত এট্টা বড়সড় নৌকা বানায়া নিতে তো পারি! গোটা দুনিয়াটাই ঘুইরা ঘুইরা বেড়ামু দুইজনে। তর মা চাইলেও যাইতে পারে। তা সে আমারে কয় কিনা বুড়া ভাম!’

সত্যিই তো, বাবাকে বুড়ো ভাম বললে মনখারাপ হওয়ারই কথা। আবার অস্বীকার করার উপায় নেই, এমন প্রস্তাব দিলে রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হওয়াও অবান্তর নয়। আমি বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, ‘মনখারাপ কোরো না রোহিত শর্মা। বাড়িতে যাও। ও ছেলেমানুষ। ভুল করে ফেলেছে।’

রোহিত শর্মা চুপ করে চলে গিয়েছিল। পরপর দুই মঙ্গলবার আর তার দেখা নেই। ভ্যান নিয়ে এদিকে আসে কিনা সেই খোঁজও নিয়েছিলেন মা। তাকে নাকি কেউই দেখেনি কিছুদিন ধরে।

বাজার করে ফেরার পরে মা বললেন, ‘একবার দেখতো গিয়ে কী করছে লোকটা! শরীর-টরির খারাপ হয়নি তো!’ সর্ষে-পোস্ত এনে দিয়ে তারপর যেতে বলেছেন।

রোহিতের পাড়াটা আমি চিনি। সেখানে চলে গেলাম স্কুটি নিয়ে। বাড়ি খুঁজে পেতেও বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু বাড়িতে তাকে পেলাম না। বউ আর ছেলেও তার খবর দিতে পারল না। একজন পাগলাটে গোছের লোক নিজেই এগিয়ে এসে বলল, ‘স্টেডিমায়ে যান, পাইবেন ওনারে।’

সম্বুদ্ধ রায় এবং খেলার স্টেডিয়াম! কোনও যুক্তিই খুঁজে পেলাম না। তবু লোকটার কথা শুনে গেলাম সেখানে। স্টেডিয়ামের অবস্থান আমার জানা ছিল। দু-একবার ক্রিকেট ম্যাচও দেখেছি। যদিও সেখানে খেলা খুব কমই হয়। তবে ধনীদের বিয়ের আসরে মিউনিসিপ্যালিটি স্টেডিয়াম ভাড়া দেয় বলে শুনেছি।

গিয়ে দেখলাম আমার রোহিত শর্মা স্টেডিয়ামের এক ধারে সিমেন্টের বেঞ্চে বসে আছে। তার পাশেই বসে আছেন আসল রোহিত শর্মা। বিস্ময়ে আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল। স্বয়ং খ্যাতিমান রোহিত শর্মা এখানে? অতি সন্তর্পণে কাছাকাছি চলে গেলাম আমি। শুনতে পেলাম আসল রোহিত শর্মা বোঝাচ্ছেন, ‘নৌকা দিয়ে কিছু হবে না হে সম্বুদ্ধ রায়। শিখে নাও কীভাবে ছক্কা মারতে হয়। ছক্কা বা চৌকা না-মারতে পারলে এই পৃথিবীতে বাঁচার উপায় নেই। তুমি বরং সেটাই শেখো।’

হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়ল সম্বুদ্ধ রায়ের। চোখ চিকচিক করে উঠল তার। আমাকে দেখেই হয়তো উত্তেজিত হয়ে উঠল সে। দ্রুত উঠে দাঁড়াল। আসল রোহিতের হাত থেকে প্রায় ছিনিয়ে নিল ব্যাট। দু-তিনবার হাওয়ায় ঘুরিয়ে নিল সে। তারপর রোহিত শর্মা পিছন থেকে তার হাত ধরে শেখাতে লাগলেন ব্যাট ধরার কৌশল। বল ছাড়াই চলল শিক্ষা। অদৃশ্য বলে ছক্কা মারার কৌশল শেখাচ্ছেন। দুজনের বোঝাপড়ায় প্র্যাকটিস চলছে জোরকদমে। তবু আমার রোহিত শর্মার মুখ গম্ভীর। মন ভালো হয়নি বোধহয়। তাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য আসল রোহিত বললেন, ‘মনখারাপ কোরো না। এর পরদিন বল নিয়ে আসব। আমি বল করব আর তুমি ব্যাট চালাবে।’

রোহিত শর্মা মূলত ব্যাটসম্যান, খুব কমই বল করেন। তবু ছক্কা মারার কৌশল শেখানোর জন্য নিজেই বল করবেন বলছেন! শুনে আমার খুব আনন্দ হল। এতদিনে আমিও জেনে গেছি, এই পৃথিবীতে ছক্কা মারার কৌশল আয়ত্ত করতে না-পারলে পদে পদে বিপদ। তাই ব্যাট হাতে না-তুলেই আমিও শিখতে থাকি। মনে মনে ব্যাট চালাই। বল আকাশ ছুঁয়ে ফিরে এসে মাঠের চৌহদ্দির বাইরে আছড়ে পড়ে। আর আমার কানে বেজে চলে স্টেডিয়ামের হাজার হাজার মানুষের করতালির শব্দ।

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন