কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

প্রণব চক্রবর্তী

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

 

তেলেভাজা ও রাধিকার দাঁত

(১)

সমুদ্র দাপিয়ে উঠে আসা সেই ভয়ঙ্কর জানোয়ারটাকে যেই বিচ্চু কলা খাওয়াতে গিয়েছে, প্যান্টে হিসি হয়ে গেলো। বিচ্চু যতই ভাবুক সমুদ্রের জল তাকে ভিজিয়ে দিয়েছে, কিন্তু পাশে থাকা মা সেটা টের পে্তেই, ঘুম ভাঙ্গিয়ে আজেবাজে বকতে শুরু করলো। আর বিচ্চু মনে মনে কষ্ট পেলো এইভেবে যে, কলাটা সেই জানোয়ারটাকে খাওয়ানোই গেলো না।

এভাবেই বোমভাকাকু একটা গল্প বলা শুরু করতেই, তার পকেটে ঘন্টা বেজে উঠলো কর্কশ চীৎকারে :

- হ্যালো, কী হয়েছে?

- তোমাকে যে বাজার থেকে কচু আনতে বলেছিলাম, সেটা কোথায়? গুচ্ছের পানিফল নিয়ে এসেছো প্যাকেট ভরে। ওগুলো দিয়ে আজকে তোমাকে ভাত খেতে হবে। তোমার পাগলামি অনেক সহ্য করেছি, আর না।

- আরে সে না হয় কচু নিয়ে যাচ্ছি, তাতে অত চেঁচানোর কি আছে?

- এখন নিয়ে আসবে তারপর রান্না করে মুখের সামনে থালা সাজিয়ে দেব? ভাতে জল ঢেলে দিলাম। যেভাবে পারো আজকে গিলো বসে বসে। আমি ছেলেকে বলেছি আজ বিকেলের ট্রেনে ওর কাছে চলে যাচ্ছি।

- সে যাও না, কদিন কাটিয়ে এসো। মন ভালো হয়ে যাবে।

কথা শেষ না হতেই তিড়িং কোরে লাফিয়ে উঠলো বোমভাকাকু। তার সঙ্গেই তীব্র চিৎকার কাঠপিঁপড়ে... কাঠপিঁপড়ে...

- কোথায় কামড়ালো?

- সুপুরিতে।

- ঠিক হয়েছে। ওই সুপুরি হাতে নিয়ে বসে থাকো, আমি বেরোচ্ছি।

 বোমভাকাকু কোন কথা না বলে, খুব কষ্ট কষ্ট মুখ নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিতে্‌ই, প্রথম বুঝলাম বোমভাকাকু একজন দুখী মানুষ।

 (২)

এর পরের পৃথিবী অনেক বদলেছে। আমরাও বদলেছি দ্রুত। এখন আর সেভাবে আড্ডা হয়না সকাল সন্ধ্যে। সময়ের বেশ কিছু বছরের দূরত্বে বোমভাকাকুর বদলটা চোখে ধরার মতো। চুলে সেই বালক বয়সের মত চুকচুক করছে কালো। দাঁত যে বাঁধানো, পরিচিত চোখে বুঝতে অসুবিধে হবে না। ডান হাতের কব্জীতে ভারি একটা রূপোর চেনের কি যেন বলে সেইসব। ডাকলেই বলবে- ব্যস্ত আছি, পরে আড্ডা হবে। খোঁজ নিয়ে জানলাম কাকিমা ছেলের কাছেই সুন্দরবনে থাকে। আর বোমভাকাকু যেখানে যেখানে ছড়ানো ছিটোনো জমিজমা ছিলো, ছোটোখাটো কারখানা মালিকদের কাছে চড়া দামে বেচে দিয়ে ব্যাঙ্কের সুদ খাচ্ছে বসে বসে। কারখানা চোখে না পড়লেও জলা জমিফমি ভরাট কোরে মাঝেমাঝেই বড় বড় হাউজিং কমপ্লেক্স চোখে পড়ছে এ এলাকায়। সে যা হবার হোক, বোমভাকাকু তেড়ে যে মেয়েবাজী করে বেরাচ্ছে, এ এলাকার গর্ভের বাচ্চাটাও সে গল্প জেনে ফেলেছে।

এমনই একদিন চোখের উপর বোমভাকাকুর বিভূতি টের পেলাম। গরমে আমাদের আমসত্ব হবার অবস্থা, আর বেশ টাইট এক পঁয়ত্রিশে মহিলাকে কাকু বগলে লটকে নিয়ে বাসে চেপে ঠান্ডা খেতে যাচ্ছে পাহাড়ে। একবার চোখাচুখি হতে নিজে থেকেই বললো, দুদিন পাহাড়ে কাটিয়ে আসি, এখানে যা গরম।

আমি বলতে যাচ্ছিলাম, সঙ্গে কে? কিন্তু তার ফাঁকেই কন্ডাক্টরের কানফাটানো চিৎকারে নিজের স্টপেজে নেমে যেতে হলো। বিষয়টা এখানে মিটলো না, মিটলো মাস তিনেক পর পাঁকুড়ের মেলায় গিয়ে। বোমভাকাকু সাড়া শরীর গেরুয়ায় মুড়িয়েছে, মাথাতেও জব্বর পাগড়ি। গলা থেকে নানারকম বড় ছোটো পুঁতির মালার জঙ্গল ঝুলছে। আর তার সাথে সাথে চলেছে এক তরুণী বাউলানী। বোমভাকাকু ডবকা বাজাবে, বাউলানি গাইবে। স্কীমটা বোধহয় এইরকম। আর প্রশ্নহীন থাকতে না পেরে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।

- বোমভাকাকু, তোমার এ কী সাজ গো? চমকে দিচ্ছ তো! পাহাড় থেকে ল্যান্ড করলে কবে?

- ঈষৎ গাঁজা জড়ানো গলায় কাকু বললো, পূর্বাশ্রমের কথা ভুলে যেতে হয় রে বাবু। এখন এই যে বাউলানী দেখছিস, গভীর সাধনায় আছি রে বাবু, দেহসাধনা সব সাধনার সার। আর তুই তো জানিসই বাউলরা মানুষ সাধনা করে। বাউলানী আমার শরীরে কড়াপাকের ভীয়েন চাপিয়েছে। কী যত্নে যে রসে সিদ্ধ করছে তার নাগরকে, একদিন সময় করে গরীবের আশ্রমে আসিস, শুধু সাথে কটা তেলেভাজা আনিস, সব রস স্বাদে ভিজে যাবি।

তার কথা শেষ করতেই তরুণী বাউলানী কেমন খিলখিল কোরে হেসে উঠে বললো, আপনের কাকা যখন আপনাকে ডেকেছে, একদিন চলেই আসেন না, দুচারদিন নাহয় একসাথেই রস সাধনা করবো তিনজন মিলে।

কথাটা শুনেই আমার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিলো, চাকরীবাকরী ছেড়ে দিয়ে এক্ষুণী এদের সাথে ভিড়ে যাবো। শুধু তেলেভাজার খরচায় এমন নাগরী! এ তো একেবারে সরাসরি গ্রুপ-সেক্সের প্রস্তাব! বুঝলাম এই বাউলানীটিও ফেক মাল। একেও গেরুয়া মাখিয়ে সাধক সাজিয়েছে বোমভাকাকু। মাথায় দুচারটে থাবড়া মেরে নিজেকে শীতল করলাম। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমার মতো অধমকে যে আপনাদের মতো সাধক-সাধিকা এভাবে হৃদয় ঢেলে আমন্ত্রণ জানালো, তোমাদের সঙ্গ না পেলে তো আমার রাত্রের ঘুম নষ্ট হয়ে যাবে রাধে। তোমরা ফিরবে কবে ঘরে?

- বাঃ, বাউলানীর নামটাতো ঠিকঠাকই বললিরে বাবু। আমি তো ওকে রাধে বলেই ডাকি।

- তাই নাকি?

- একদম তাই। আমি না হয়ে অন্য কেউ হলে ভাবতো, তুই ওকে আগে থেকেই চিনিস।

বোমভাকাকু এবার নিজে থেকেই, যাকে বলে, স্বতোৎসারিত হয়েই রাধে বিষয়ে যে সব ইনফরমেশন দিলো সংক্ষেপে সেটাই বলছি। কাকু খোলামেলা রাধের সামনে দাঁড়িয়েই বলে চললো--

- বাসে যাকে দেখেছিলি তার প্রচুর খাই। এটা চাই, ওটা চাই, সেটা চাই-- তাই ভাগিয়ে দিয়েছি। রাধেকে পেলাম গাঁয়ের এক বটতলায়। আপন মনে গান গাইছিলো। লোকগান। ব্যস, জমিয়ে পিড়ীত সাধলাম। তারপর এক বাউলের কাছে গিয়ে দুজনাই হাজির হয়ে বললাম, আমরা যুগলে বাউল সাধন করব। আমার রাধিকাকে আপনার গানের ঘরে ঢোকাতে হবে। গুরুদেব রাধিকাকে পা থেকে মাথা একবার ঝারি মেরে বললো, একখান গেয়ে শোনাও কি গান জানো একবার বুঝে নি, কতদূর আগায়েছো দেখি। রাধের গান শুনে গুরুদেব খুশি হয়ে বললো, সুরের ঘরে জায়গা দিলেও আমার আশ্রমে কিন্তু তোমাদের থাকা যাবে না। নিজেরা আশ্রম বানায়ে নাও অন্য কোথাও। তবে গানের সুর তাল এরে আমি ঠিকঠাক ধরায়ে দিতে পারবো। তোমরা তো আর বাউল ভজনা করতে আসোনি, এসেছো গান শিখে বাউল সাজতে, বাওলা হয়ে ঘুরে বেড়াতে, তোমাদের দেখেই বুঝেছি।

বুঝলি বাবু, তাতেই রাজি হয়ে গেলাম। গাঁ গঞ্জের এই আড়াল আবডালে বাউল সাজায় অনেক সুবিধে রে খ্যাপা, কেউ তোকে বিরক্ত করবে না।

রাধে এতক্ষণ চুপচাপই ছিলো। বোমভাকাকু শেষ করতেই পুরোনো কথার রেশ টেনে এবার সে বেশ আগ্রহ নিয়েই বললো, আপনি আমাদের সঙ্গ দিলে আজই ফিরবো, তাই না ঠাকুর!

কাকুর প্রায় তৈরী উত্তর, বাউলানী যখন তোকে সঙ্গ দিতে চাইছে, আমি কে রে পাগল? তুই তো এক দেখাতেই জয় করে ফেললি। চলে আয়, দেরী করলে পৃথিবী ঘুরে দূরে চলে যেতে পারে।

আমিও কাতরতা দেখিয়ে বললাম, দিন সাতেকের মধ্যেই যাচ্ছি। রাধে বাউলানি ঠিকানা বুঝিয়ে দিলো যাতে মাথায় ঢুকে যায়। বাসে করে কোথায় নেমে কোনদিকে কতটা হেঁটে ট্রলি চেপে কতদূর গিয়ে নদী পেরিয়ে বনস্থলী পার করে পুবদুয়ারী দরমার বেড়ায় লতাছাওয়া ছোট আশ্রম। শুনেই তলপেট কিলবিল করে উঠছে গেরুয়া বৈরাগ্যে। বাউলানীর গাঁজার দমে গরম না উথলে উঠলে এত কথা একসাথে বলা যায়! পাশেই মেলার তেলেভাজা দোকান। গরম কটা চপ কিনে ঠোঙাটা বোমভাকাকুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, এটুকু তোমাদের সেবায় লাগলে বড় খুশী হবো গো কাকা। কাকার তেলেভাজার গন্ধে নেশা আগেই চেতে ছিলো, হাতে গরম পেয়ে আর ফেলে রাখতে পারলো না।

- নে রাধী, আগে তুই নে তুলে।

রাধী প্যাকেট নিজেই খুলে হাতে নিয়ে সবাইকে দিয়ে, আমাকে নজরে লটকে এমন দাঁত ঠোঁটের চটকানো কামড়ে কেটে নিলো তেলেভাজার ডগা, আমার শহুরে রুচিতে প্রায় মুতে দিলো আদিম জান্তবতা। তেলেভাজা দাঁতে নিয়ে আমিও পাশ কাটানোর খেলায় 'কাজ আছে'র অজুহাতে ছুট লাগালাম মেলা ফেলে রাতের রুটিনে। যাওয়ার আগে রাধের চপের কামড় মাথায় বসিয়ে পা ফেলবার ফাঁকেই মেয়ে গলায় উড়ে এলো, সময় করে বাউলের ঘরে পায়ের ধুলো একবার দিয়েন গো, ঠাকুর!

হাত নেড়ে না এগোলে কাদায় পা গিঁথে যাবে আজ। ঘরে ফিরে মাল খাবো। হোক ফেক, তবু গেরুয়া বাউলানী খেতে কোনো একদিন যাবো তো বটেই। আজ নয়, কারণ বান্ধবী তমসা ফোন মারছে বার বার। তার অসুখ শহরের আঁধার বিলাসের। নিজেকে আড়াল করতে করতে আজ মানসিক রুগী। বান্ধবী, বউ নয়, তবুও যাচাই করতে করতে নিজেই ভুলে গেছে জীবনের প্রাথমিক প্রবৃত্তি ও প্রায়শ্চিত্ত। একরাত মেলা ফিরে আবার যে যার নিজের পৃথিবী নিয়ে অন্ধকারে উথাল সাঁতার খেলবো। বাউলানী ডাকতে পারে আকস্মিক অমোঘ আদরে, তমসা নিয়তই সন্দেহের যাঁতাকলে ইঁদুর দৌড়ের মত বন্ধু থেকে বন্ধু নির্বাচনে ভাসছে অথৈ।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন