![]() |
| কবিতার কালিমাটি ১৫৮ |
মুকুন্দপুরের পথ
মুকুন্দপুরের পথ দীর্ঘতর বাক্যের শৈলীর ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে। শব্দের ঘুঙুর বাতাসের কম্পনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।
মেঘের ওপরে শৈত্য সিল-শিকারী শ্বেতভল্লুকের ধৈর্য
নিয়ে অপেক্ষা করে। দৃষ্টির ভেতরে টিকে থাকা আলোককণাগুলো রক্ষার জন্য আমি আকাশের ঠান্ডা,
সরল পথ অনুসরণ করি।
অতিরিক্ত শৈত্য আলোর জ্যামিতিকে মুছে ফেলতে চায়।
পথ সম্পূর্ণ শীতল হয়ে গেলে অপ্রচলিত ভাষার সাথে সূর্যালোক সন্ধিবদ্ধ হয়।
আমি দেখতে পাই, ডাক্তার চন্দনা দত্ত আমার চোখের
দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়তো সেখানে তিনি আবিষ্কার করবেন নিদ্রাহীন রাতের একটি সংকীর্ণ
করিডর যার প্রতিটি জানালা সূর্যের স্মৃতি ভুলে গেছে।
গতবার উমাদার সঙ্গে দেখা হয়নি। গেস্ট হাউসের টেবিলে
এবার বিস্তৃত হবে চতুর দশপদীর উত্তরঙ্গ আলো।
এবার তিনি আসবেন, কবিতা সড়ক ধরে কারা তাঁর কাছে
এসেছিল, জানাবেন। আমরা গভীর সন্ধ্যা পর্যন্ত কথা বলব, আর ক্ষীণ আলোর ভেতর জেগে থাকবে
ওয়েটারের চোখ।
আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতে চাই, শব্দের ভেতর কীভাবে
আগুন লুকিয়ে থাকে। নীরবতা থেকে কখন বেরিয়ে আসে স্ফুলিঙ্গ?
বাইরে উৎকর্ণ বৃক্ষের নৃত্য থেমে যাবে। তারা জানে
ঝড়ঝঞ্ঝা, অন্ধকার ও নির্বাসনের দীর্ঘ ঋতু পেরিয়ে কীভাবে কবিতা বেঁচে থাকে।
কাজলদা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পূর্ণেন্দুশেখরদাকে
সঙ্গে নিয়ে আসবেন। তাঁরা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পৌঁছবেন, তাঁদের উজ্জ্বল হাতে থাকবে কবিতা
আর গল্পের প্রবাহ—চন্দনজলের সৌরভে আলোড়িত।
কাজল সেনের গভীর কাজ আমাকে বিস্মিত করে; পিচ-রাস্তা
থেকে তিনি তুলে এনেছিলেন শব্দের হারমোনিয়াম। বাসব-দীপ্তির প্রেম বা সম্ভোগের আখ্যানকে
তিনি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন, পাঠককে তা অসাংসারিক করে তুলতে পারে!
আমি যখনই তাঁর দিকে তাকাই, জলধর সেন ক্ষণিকের জন্য
তাঁর ভেতরে দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন; তাঁর ত্বকের নিচে প্রোজ্জলিত চন্দ্রোপল রুখে দেয় অমানিশার
পরিকল্পনা।
কাজল সেন উত্তরাধিকারসূত্রে কল্পনার সোনালি শস্যের
অধিকারী। পূর্বপুরুষের চিন্তার জলবায়ু তাঁকে দারুণ সতেজ রেখেছে।
হিমালয়ের পৃষ্ঠাগুলো খুললে আমি শুধু পার্বত্য
লোকালয় দেখি না, রশিনির্মিত ব্রিজের ওপর আতঙ্কিত যাত্রীকে দেখি। জলধর সেনের শ্রান্ত
কণ্ঠে শুনি রবীন্দ্রনাথের গান।
হিমালয়শৃঙ্গের সৌন্দর্যের পাশে ভেসে যায় জলধর সেনের
দৃপ্ত ছায়া। কাজল সেনের স্বপ্নের লালটালির ভেতর সে ছায়া রেখে যায় অলৌকিক শুভ্রতা।
আমি মুকুন্দপুরের দিকে এগিয়ে চলি—আমার ভঙ্গুর
দৃষ্টি ও কম্পিত চেতনার সহচর হতে চায় কবিতার উষ্ণতা, যাকে পেরোতে হয় ভয়ঙ্কর শীতলতা।
স্যানাটরিয়াম
সূর্য অস্তোন্মুখ, অস্বচ্ছ স্মৃতিকে অনুসরণ করছে
আকাশ। বিমানের নিচে চারণভূমি—ভেড়ার পালের অস্থিরতা।
কখনো মেঘগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়, নদীগুলো দীর্ঘ
ক্ষতের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ঝলসে ওঠে। গ্রামগুলো অস্পষ্ট বিকেলের নিচে প্রতীক্ষমাণ।
ক্রুরা একঘেয়ে কণ্ঠে কিছু ঘোষণা করে, ধাতব শব্দের
নিচে তা ডুবে যায়।
আমার করোটির ভেতর আরেকটি বিমান উড়ে চলে। তার কোনো
পাখা নেই, দৃশ্যমান কোনো চালকও নেই। সেখানে এক নিঃসঙ্গ যাত্রী অসহনীয় বোধ নিয়ে বসে
আছে, তার শিরায় নাইটজার পাখির আহ্বান।
তার চেতনার ভেতর জেগে আছে সুগন্ধি নিশিপদ্ম, অন্ধকারে
দ্রুত পাপড়ি খুলে প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করে।
একদিন সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছিল; প্রতিটি ধাপে
কোমল শব্দের শিহরন জেগেছিল।নিভন্ত প্রদীপের গন্ধে অধীর ছিল করিডর।
তারপর সে অদৃশ্য হয়ে গেল, রেখে গেল নিশিপদ্মঘ্রাণ।
সুগন্ধ তার শেষ ভাষা, সিঁড়ির রেলিং জুড়ে সঞ্চলিত।
আমার ভেতরে আকাঙ্ক্ষা যখন তীব্র হয়ে উঠেছে, সে
ফিরে এসেছে। পৃথিবীতে জেনেছি শুধু আমি তার গোপন পথ।
সে আমাকে নিয়ে গেছে এক নারকেল বাগানে, যেখানে
গোধূলির স্বপ্ন নতুন দৃশ্যের দেহরেখা এঁকেছিল। গাছগুলো বাকলের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল
প্রাচীন সাক্ষ্য।
কয়েকটি গাছের ক্ষতস্থানের দিকে সে আমার দৃষ্টি
আকর্ষণ করেছিল। ক্ষতগুলো ভয়াবহ আঘাতের স্মৃতি বহন করে। গাছ ভুলে যেতে পারে না সহিংসতা।
“একাত্তরে,” সে নিচু স্বরে বলল, “এ গাছগুলো গুলিবিদ্ধ
হয়েছিল।” পাতাগুলো সহসা কেঁপে উঠল, যদিও বাতাসের প্রবাহ অনুভবগম্য ছিল না।
বাগানের দক্ষিণ প্রান্তে এক দল সৈন্য দৃশ্যমান
হল। নারকেল কাণ্ডের নিম্নাংশে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল গুলির শব্দ। আতঙ্কে নারকেলের প্রাণরস
রক্তাভ হয়ে উঠল।
মেঘের চারণভূমির উপর দিয়ে উড়ে চলল বিমান। নিচে
ধোঁয়ার সাথে জেগে উঠল যুদ্ধের ইতিহাস।
প্রতিটি ভূদৃশ্যেরই থাকে গোপন দেহতত্ত্ব—নদীর নিচে
স্নায়ু, গাছের নিচে ক্ষত, সৌগন্ধের নিচে অদৃশ্য শরীর।
অস্বচ্ছ আকাশের ভেতর জেগেছিল সূর্যের মুখ। মেঘ
ও স্মৃতির ওপারে পৃথিবী কোথাও খুঁজে চলেছে সর্বজনীন স্যানাটরিয়াম।

ভালো লাগল আপনার কবিতা দুটি। মুকুন্দপুরের প্রসঙ্গ, শব্দের সুন্দর ব্যবহার ও চিত্রকল্প নির্মাণ মুগ্ধ করলো।
উত্তরমুছুন