কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / চতুর্থ সংখ্যা / ১৪৩

শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প


না-ঘটা গল্প

হেমব্রম সাহেবের গল্পটা যে একটা দারুন গল্প হতে পারে, সেটা জানতে পারলাম আজ, একটা বিদেশি সিনেমা দেখার পর। সেটা আমেরিকার জঙ্গলে দাবানল সৃষ্টি নিয়ে গল্প। যেটাকে হেমব্রম সাহেবের ঘটনাবলির সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে একটা সাসপেন্স থ্রিলার বানানোই যায়!

এটাও আমার চাইবাসার মেস জীবনের গল্প। আমরা বেশ কয়েকজন থাকতাম চাইবাসার সদর বাজারের ত্রয়ী লজে। অনেকগুলো ছোটো ছোটো কামরা। সিংগেল বেড। কয়েকটা কমন বাথরুম। আমরা সেই ছোট্ট ঘরের একপাশে জনতা কেরোসিন স্টোভে রান্না করতুম। একটা ঘর ছাড়া বাকি সব ঘরেই আমার মতো ব্যাঙ্ক কর্মচারী। শুধু একটা ঘর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকজনের জন্য বরাদ্দ। ফরেস্ট অফিসাররা জঙ্গলের মধ্যে তাদের কোয়ার্টারে থাকতে চাইতেন না। ঐ নির্জন জায়গায় কেনই বা থাকবেন! সে তুলনায় ছোটো হলেও ত্রয়ী লজের ঘর স্বর্গ সমান।

কেরকেট্টা সাহেব চলে যেতেই সেখানে থাকতে এলেন হেমব্রম সাহেব। একদিন উনি বললেন, ঘরকে অন্দর ইসতরহ কেরোসিন স্টোভমে খানা পকানা বহত রিস্কি হ্যায়। কবি ভি স্টোভ পল্টি হো কর আগ লগ সকতা হ্যায়।

আমরা কিন্তু তার কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছি। কখনো তো তেমন এক্সিডেন্ট ঘটেনি! তবে পরে হেমব্রম সাহেব আমাদের জানিয়েছিলেন, মৈ অলগ টাইপকা ফরেস্ট অফিসার হুঁ। জঙ্গল সে নহি, জঙ্গল কা আগ সে মুকাবিলা করনা মেরা কাম হ্যায়।

চাইবাসাকে ঘিরে যে বিশাল সারান্ডা ফরেস্ট, সে ফরেস্টে অনেক দামি দামি গাছ আছে। আগে রাঁচী জামশেদপুরের অসাধু ব্যবসায়ীরা আদিবাসীদের ভুলিয়ে সেই সব মূল্যবান গাছ হাসিল করতো। পুলিশের সাথে তাদের সাঁটগাঠ থাকতো। তাই তাদের এই বেআইনি কারবার বেশ ভালো ভাবেই চলতো। একসময় সরকার গোটা সারান্ডা ফরেস্টকে রিজার্ভ ফরেস্ট ডিক্লেয়ার করে দিল। এবং তার প্রটেকশনের জন্য আরো কড়া ব্যবস্থা করলো। সেজন্য স্পেশাল ফোর্সও নিয়োগ করা হলো। তাই জঙ্গল থেকে কাঠ চুরি অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন হয়ে গেল।

কাজ যতো কঠিন হয়, আমাদের দেশের চোরাকারবারিরা ততো বেশি চতুর হয়ে ওঠে। এখানেও তাই হলো। এবার তাদের হাতিয়ার হলো জঙ্গলের আগুন। এইসব পাহাড় জঙ্গলে ‘পতঝড়’ মৌসমে আগুন লাগে। আগুন লাগে গাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতার স্তুপে। ব্যবসায়ীরা সেটাকেই নিয়ন্ত্রিত আগুনে পরিবর্তন করে কাঠ চুরির ব্যবস্থা করে নিল। ব্যবস্থাটা সহজ এবং ওদের ভাষায় ফুল প্রুফ।

হঠাৎ আগুন লাগতে শুরু করলো দামি দামি গাছের এলাকার কাছে। তখন কিছু দামি দামি গাছের গায়েও আগুনের আঁচ লাগতো। তারপরেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট পোড়া গাছ রিমুভ করার জন্য টেন্ডার ডাকতো। আভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ায় সে টেন্ডার হাসিল করতো চোরাকারবারিরা। তখন জঙ্গল থেকে পোড়া গাছ সরানোর আড়ালে চালান হয়ে যেতো দামি দামি গাছও।

এইসব আমরা জানতে পেরেছিলাম হেমব্রম সাহেবের কাছ থেকে। আমাদের দেশের ‘নৌকার শাহী’র পুরোটাই বেইমান নয়। হেমব্রম সাহেবের মতো কিছু সৎ অফিসারও আছেন। তারাই ঠিক করলেন জঙ্গলের এই চোরাকারবারি যথা সম্ভব আটকাতে হবে। আর তাই হেমব্রম সাহেবের চাইবাসাতে আসা। হেমব্রম সাহেব বলেছিলেন, মৈ ইসকা অন্ত দেখ কর ছোড়ুঙ্গা।

কিন্তু তার আগেই তার নিজেরই অন্ত হবার উপক্রম হয়েছিল। শরীরে প্রায় পঞ্চাশ ষাট পার্সেন্ট বার্নিং নিয়ে আমরাই চাইবাসা সদর হাসপাতালের এম্বুলেন্সে করে তাকে জামশেদপুরের টাটা হসপিটালে নিয়ে গেছিলাম। সেরে উঠলেও উনি আর চাইবাসায় ফিরে আসেননি। তাঁর জায়গায় আর কোনো ফায়ার ফাইটার অফিসারও আসেনি। আমার গল্প তাই এখানেই শেষ।

কিন্তু বিদেশি সিনেমাটা এতোদূর পর্যন্ত একভাবে এসে শেষটা কিন্তু এভাবে শেষ হয়নি। এক অসীম সাহসী বনরক্ষক আর একজন মহিলা ফায়ার অবজার্ভারের রুদ্ধশ্বাস এ্যকশনে সেখানকার ফরেস্ট বেঁচেছিল আর দুষ্কৃতীরা প্রাণ হারিয়েছিল। যদিও তাতে শহীদ হয়েছিলেন সেই অসীম সাহসী বনরক্ষক।

এখানে একটু ফায়ার অবজার্ভারের কাজের ব্যাপারে বলে নেওয়া দরকার। ফায়ার সেন্সেটিভ ফরেস্ট জোনে উঁচু টাওয়ার থাকে। ফায়ার অবজার্ভাররা দিনের পর দিন সেখানেই থাকে। সেখানে থেকে নজর রাখে বনের কোথাও আগুন লাগলো কি না। সে জন্য তাকে চোখে শক্তিশালী দূরবীন লাগিয়ে অবিরাম তাকিয়ে থাকতে হয় ফরেস্টের চারদিকে। এ ছাড়াও বাতাসে উড়ন্ত ছাই দেখেও বুঝে নিতে হয় দূরে কোথাও আগুন লেগেছে কি না। আগুন লাগলে বাতাস চঞ্চল হয়। তারাই আগুনের ছাই এদিক ওদিক উড়িয়ে নিয়ে যায়। বনের আগুন আবার সহজে নেবে না। ছাইচাপা আগুন অনুকূল পরিস্থিতি পেলে চাগিয়ে উঠে নুতন করে দাবানল সৃষ্টি করে। সিনেমায় সেই সব কিছুর বিরুদ্ধে ফাইট করে তারা দুস্কৃতিদের সাজা দিয়েছিল এবং ফরেস্টের আগুনকেও নিয়ন্ত্রণ করেছিল।

সিনেমাটা দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, আমাদের দেশের জঙ্গলে এমন ডেডিকেটেড এবং দক্ষ মানুষজন কখনো হবে কি? না হলে অরণ্য সম্পদ বাঁচবে কী করে! দুর্ভাগা দেশে এখন তো উল্টো কথাই শুনতে পাই। বিশাল বিশাল জঙ্গল তুলে দেওয়া হচ্ছে কর্পোরেট হাউসের হাতে। এ তো নিছক কাঠ চুরি নয়, গোটা গোটা জঙ্গল চুরি। দেশের শাসকও এখন কর্পোরেট হাউসের নিয়ন্ত্রণে। আমরা তাই এরকম বিদেশি সিনেমা দেখেই আত্মসন্তুষ্ট থাকবো। সেটা আত্মসন্তুষ্টি না আত্ম প্রতারণা কিংবা আত্মসমর্পণ, কে জানে!


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন