কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

ড. শিবশঙ্কর পাল

 

বিশ্বনীতি দেশভাবনা ও জীবনানন্দ

                                  

                                  


       
                          

                                  

                                         

                                        ‘সুচেতনা, তুমি এক দূরতর দ্বীপ

                                        এই পৃথিবীর রণ রক্ত সফলতা

                                        সত্য; তবু শেষ সত্য নয়’ (সুচেতনা)

কর্মময় জীবনে তথা ব্যক্তিগত জীবনে অস্থিরতা ছিল জীবনানন্দের কর্মচ্যুত হয়েছিলেন এক সময় আইনের পড়াও শেষ করেননি জোটেনি খুব ভালো চাকরি ইনসিওরেন্স কোম্পানিতেও চাকরি করতে চেয়েছিলেন একদা ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রীকে নিয়ে ছিল টানাপোড়েন পিছনের প্রেমাঘাত ছিল অন্তরে এসব নিয়ে কর্মে ও জীবনে কবির অস্থিরতা একটা ছিলই ছিল বিষণ্ণতা, হতাশা, একাকিত্ব শান্তির খোঁজ ছিল নিরন্তর  জীবনানন্দের জীবন-অক্ষ বহু চর্চিত বহুদিকে তিনি আলোচিত কখনও অন্ধকারের কবি নির্জন কবি কখনও নীরব কবি তিনি অথচ জীবনের সঙ্গে বিশ্বময়, বঙ্গময়, স্বদেশময় যে অস্থিরতা তা কি কবিতায় ছাপ ফেলেনি? ওসবের চিহ্ন কি কবিতার শব্দে ধরা ছিল না? ছিল না সময়কালীন রাজনীতি বিশ্বনীতির উত্তাপ? সময়কে কোন্ কবি ধরেননি! সমাজকে কোন্ কবি আঁকেননি! তা সে সময় বা সমাজ যতো চুপ করেই কবিতায় স্থান পাক না কেন

জীবনানন্দের কবিতায় প্রত্যক্ষ-প্রকট রাজনৈতিক চঞ্চলতার অবস্থান স্বল্প অনেকেই মনে করেন সমসাময়িক রাজনীতি বিশ্বনীতি দেশীয় আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন তিনি দূরের পারে আপন ভাবরাজ্য তাঁর অবস্থান বলে অনেকেই মনে করেন আন্দোলনের হাত ধরে স্থায়ী মানবতা গঠিত হবে বা হয়েছে বা হতে পারে এ ধারণা পোষণ করতেন না জীবনানন্দ তা বলে তাঁর কবিতায় কি সমসাময়িক অস্থিরতা, বিশ্বব্যাপী পালাবদল, মানুষকে অবমাননার ছবি নেই? খুব স্পষ্ঠভাবে সবক্ষেত্রে না থাকলেও তার আভাস কি নেই? জীবনানন্দ চর্চায় এ-দিকটা আমরা প্রায় ভুলেই যাই অথচ তাঁর ভিতরেও যে জাতীয়তাবোধ, মানবতাবোধ,  বিশ্বজাতির শুভকামনা ছিল তা বহু কবিতা প্রমাণ করে যেমন বহু কবিতায় পাওয়া যায় দেশ বিদেশ বা মহাদেশে ঘটে চলা ঘটনার টুকরো ছটা জীবনানন্দের বাড়ি বরিশাল বরিশাল ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটা অন্যতম কেন্দ্র ছিল বরিশাল নানা কর্মকাণ্ডে জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিল নিজের কাজ ও নাম সেখানে অবদান রেখেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশবন্ধু, সতীশচন্দ্র  মুখোপাধ্যায়, অশ্বিনীকুমার দে প্রমুখ বরিশালের স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাপ জীবনানন্দে লাগার কথা তাছাড়া ১৯০৫-এ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ১৯০৬-এ বরিশালে দুর্ভিক্ষ, ১৯১৪-তে জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের যুদ্ধ ঘোষণা, ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব, ভারতের উপর ইংরেজের অধিকার, দক্ষিণ আফ্রিকায় দলিত নির্যাতন, চীনের উন্মেষ এসব গোটা বিশ্বে আলোড়ন তুলছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে কোনও কবিই চুপ থাকতে পারেন না যদিও তার কাব্যশব্দ খরচ কম হোক, তার অন্তরে বিশ্বশান্তির বীজ ছিল ছিল জীবনানন্দেও তৎকালে ভারতবর্ষ, বঙ্গদেশ তথা গোটা বিশ্বে যে পালাবদল চলছিল তার কথা জীবনানন্দও উল্লেখ করেছেন কিন্তু অতি সন্তর্পণে, জীবনবেদের নিরিখে জীবনানন্দে এ-কারণে এসেছে মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ তাঁদের কাজের নিরিখে, চিন্তাভাবনা, দেশভাবনার নিরিখে যেসব কথা জীবনানন্দ খরচ করেছেন তাই তো কবির সমাজচিন্তা, দেশকল্যাণ তথা মানবতাবাদ

জীবনানন্দের জাতীয়তাবাদ, বিশ্বচিন্তা, কল্যাণকামনা যে কতখানি কবিতায় নিহিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় মাহাত্মাজী বিষয়ক কবিতাগুলিতে (অন্যান্য কবিতায়ও পাওয়া যায়) গোটা বিশ্বের আন্তর্জাতিক ঘটনা সেখানে যেমন এসেছে তেমন এসেছে স্বদেশচেতনা মানবসাধনা মানুষের মঙ্গলকামনা যে হিতসাধনায় মাহাত্মাজী আত্মনিয়োগ করেছিলেন, তাতে তিনি শেষ অবধি সফল হয়তো হতে পারেননি দেশ সেই তিমিরেই থেকে গেছে নানা আন্দোলন, নানা চার্টার, কনভেনসন হয়েছে, তবুও পৃথিবীময় আত্মস্বার্থে সবাই ব্যস্ত থেকেছে আর এসবে যারা সর্বসাধারণের চিন্তা করেছিলেন গান্ধীজি তাঁদের অন্যতম তাই হয়তো তাঁকে রেখে-দেখে-বুঝে কবি নিজের অন্তরের গোপন কামনা বা বর্তমান যুগ পরিচয়ের স্বরূপটি রেখেছেন কবিতায়  পূর্বাশায় প্রকাশিত (ফাল্গুন ১৩৫৪) ‘মহাত্মা গান্ধীকবিতায় মানুষের আশা-কামনাকে তুলে ধরেছেন বলছেন—

ঈশা এসে কথা বলে চলে গেল — মনে হল প্রভাতের জল

কমনীয় শুশ্রূষার মতো বেগে এসেছে এ পৃথিবীতে মানুষের প্রাণ

আশা করে আছে বলে— চায় বলে,—

নিরাময় হতে চায় বলে

মানুষের শুভকামনা এভাবেই তুলে ধরেছেন কবি একই কবিতায় দেখি মানুষের তরে মানুষের আন্তরিক হিত, ভয়াবহ পৃথিবীতে প্রেম শান্তি আলো, মানবীয় মহানুভবতার কামনা আছে গান্ধীজির হাত ধরে এ-কামনা জীবনানন্দেরও কেননা তৎকালের দেশীয় আন্তর্জাতিক চলমানতায় মানবতার স্খলন দেখেই গান্ধীজিকে বেশ কয়েকবার স্মরণ করেছেন কবি যে রাজনৈতিক বৈপ্লবিক আবহে গান্ধীজি দেশবাসীকে আলোর দিশা দেখাতে চেয়েছিলেন, শুভ্র মানবতাবাদের সাধনা করেছিলেন, সে সাধনা জীবনানন্দেরও সাধারণ অগণন মানুষের কথা বলতেও ভোলেননি কবি তাদের উদ্ধার করতেই যুগে যুগে কালে কালে আসে সমাজসংস্কারকরা, দেশসেবকরা আর এটাই তো জীবনানন্দের দেশচিন্তা—

তোমাদের চারপাশে সাম্রাজ্য রাজ্যের কোটি দীন সাধারণ

পীড়িত রক্তাক্ত হয়ে টের পেত কোথাও হৃদয়বত্তা নিজে

আত্মঘাতী মানুষের নিকটে নিজের

দয়ার দানের মতো একজন মানবীয় মহানুভবকে

পাঠাতেছে, - প্রেম শান্তি আলো

এনে দিতে - মানুষের ভয়াবহ লৌকিক পৃথিবী

ভেদ করে অন্তঃশীলা করুণার প্রসারিত হাতের মতন’ (মাহাত্মা গান্ধী)

সে সময় মহাত্মা গান্ধীর দেশচিন্তা, কল্যাণকামনা, স্বাধীনতা, সাধারণ মানুষের প্রতি সমবেদনা, সত্য প্রতিষ্ঠা, শান্তি রচনা, ক্লান্তিহীন পথ চলা সব নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের আবহে জীবনানন্দও উদাসীন ছিলেন না সচেতন ছিলেন বিপ্লব অন্ধকার রক্ত পেরিয়ে শান্তি-সত্যর সাধনা তাঁরও ছিল—

মানুষের প্রাণ থেকে পৃথিবীর মানুষের প্রতি

যেই আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ফিরে আসে, মাহাত্মা গান্ধীকে

আস্থা করা যায় বলে;

হয়তো বা মানুষের সমাজের শেষ পরিণতি গ্লানি নয়;’ (পূর্বের কবিতা)

গান্ধীজির মতো বিক্ষুব্ধ দেশ-বিদেশের সামাজির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জীবনানন্দও আস্থা রেখেছিলেন কল্যাণ শান্তি সত্য প্রতিষ্ঠার প্রতি আবার চারিদিকে অন্ধকার বেড়ে যাওয়া, রক্তের পিপাসা, রিরংসা নিয়ে পৃথিবীময় যে সংকটের পরিস্থিতি তার কথাও বললেন একই কবিতায়

হয়তো-বা অন্ধকারই সৃষ্টির অন্তিমতম কথা;

হয়তো-বা রক্তেরই পিপাশা ঠিক, স্বাভাবিক—

মানুষও রক্তাক্ত হতে চায়;’ (পূর্বের কবিতা)

পৃথিবীতে কয়েকটি জাতির উত্থান, আধিপত্য, আগ্রাসন নিয়ে সেসব জাতির মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ, প্রতারণা, শান্তি কামনার মিথ্যে প্রচেষ্টা সবই এসেছে তাঁর কবিতায় সেসব জাতি সর্বদা রিরংসারক্তিম হয়ে থেকেছেশান্তি-কল্যাণের আনন্দসৃষ্টির যে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান তা থেকে প্রায় প্রতিটি জাতি থেকেছে দূরে বিনিময়ে দিয়েছেস্খলনের রক্তাক্তের বিয়োগের পৃথিবী’ বিজ্ঞান, চার্টার, অ্যাক্ট, কনভেনশন মানুষকে প্রতরণা করে নানা দেশ হয়েছে ক্ষমতাধারী

চারিদিকে অন্ধকার বেড়ে গেছে — মানুষের হৃদয় কঠিনতর হয়ে গেছে;

বিজ্ঞান নিজেও এসে শোকাবহ প্রতারণা করেই ক্ষমতাশালী দেখ;…

বিশ্বাসের পরম সাগররোল ঢের দূরে সরে চলে গেছে;

প্রীতি প্রেম মনের আবহমান বহতার পথে

যেইসব অভিজ্ঞতা বস্তুত শান্তির কল্যাণের

সত্যিই আনন্দসৃষ্টি

সে সব গভীর জ্ঞান উপেক্ষিত মৃত আজ, মৃত,

জ্ঞানপাপ এখন গভীরতর বলে;’ (মহাত্মা গান্ধী : বেলা অবেলা কালবেলা)

এ থেকে বোঝা যায় জীবনানন্দ শুধু সময় সচেতন ছিলেন না, ততোধিক ছিলেন আবহমান কালের হিসাবরক্ষক অতীত থেকে আজ অবধি বিশ্বময় মানবতাবোধ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্ঠা ও নানা রাজনৈতিক কারণে  তার স্খলনের কথা বারবার বলেছেন তিনি আর এসব যাঁতাকলে সত্য শান্তিকামনা থাকলেও সাধারণ মানুষের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি তাই সমসাময়িক সময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আর শান্তি কামনার আশাবাদ বারবার তাঁর কবিতায় হাজির হয়েছে — ‘মানুষ ক্ষয়িত হয় না জাতির ব্যক্তির ক্ষয়ে।’ (যতদিন পৃথিবীতে) এ-থেকেও কি বলা যায়, সময় সম্পর্কে, রাজনৈতিক চলমানতা বিশ্বনীতি থেকে তিনি বিমুখ ছিলেন? বিশৃঙ্খল সমাজ দেখে চিন্তিত ছিলেন না? ব্রিটেন জার্মানি রোম রাশিয়া চীন নিয়ে গোটা বিশ্বময় যে চঞ্চলতা তার ঝলকও আছে আবার সেই পরিপ্রেক্ষিতে মানবসাধনার জন্য দেশ বিদেশের মনীষীদের স্মরণ করেছেন আত্মমগ্ন বলে খ্যাত এই কবি সময়ের উত্তাপ কিভাবে এসেছে তার বেশ কিছু উদাহরণ আছে কবিতায় কবিতায় সেসময় বিশ্বের নানা জাতি আপন আপন স্বার্থে খেলছিল রাজনীতি আপন জাতির আধিপত্য রচনার টানাপোড়েনে পিষে মরছিল শুধু মানুষ তাতে UNO হোক বা হোক জেনিভা কনভেনশন বা কোনও চার্টার প্যাক্ট বা চুক্তি কবি ইঙ্গিত করছেন সেসব দিক—

লন্ডন রুশিয়া গ্রীসদ্বীপপুঞ্জ কলকাতা চীন,

অগণন কনফারেনসে বিকীর্ণ য়ুরোপা,

আমেরিকা— যেন বীতবর্ষণের কৃষ্ণমেঘ নক্ষত্রের পথে;

ক্ষণিক উজ্জ্বল হয়ে ক্লান্তি ক্লেদ ভয় অন্ধকার হতে চায়

এখুনি আবার তবু’ (পৃথিবী ও সময়)

এই সময়চেতনা কাল্পনিক নয় এটা বাস্তব সমাজ সময়ের ছবিস্মৃতি-শান্তি হননের ঘোরে উদ্বেলিতহয়ে আছে গোটা পৃথিবী শান্তি প্রতিষ্ঠা কল্যাণ সৃজনের মন্ত্রজপ থাকলেও পৃথিবী চলেছে হননের পথে অন্ধকার হতে আঁধারে একই ভুলে চলেছে সময় একই হনন, ইচ্ছা, রক্তপিপাশা, মানবতার ক্ষয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে সমাজ অন্ধকারে, ক্ষয়ে, ভয়ে নিষ্পেষিত হয়েছে মানুষ সত্যর অবমাননা হয়েছে চলেছে প্রতারণা আর এসব টানাপোড়েন নিয়েই এগিয়ে গিয়েছে সাধারণ জনগণ এ-কথা শুধু বঙ্গদেশ বা ভারতবর্ষ নয়, গোটা বিশ্বের কথা গোটা পৃথিবীর চলমানতায় নিরাশ্রয় সাধারণ জনমানসের কথা উঠে আসছে সেখানে সেখানে শুভ উদযাপনের প্রচেষ্টা থাকলেও মানুষের আত্মার ধীক্কার আছে শুধু অভিনয়, শুধু প্রতিষ্ঠানের স্তুতিবাক্য যে কতবড়ো শঠতা তাও দেখিয়েছেন জীবনানন্দ—

মানবের কথা বিরচিত হয়ে চলে—

সেই সব দূর আতুর ভঙ্গুর সুমেরীয় দিন থেকে আজ

জেনিভায়মস্কৌইংল্যান্ডআতলান্তিক চার্টারে,

ইউ. এন. ওয়ের ক্লান্ত প্রৌঢ়তায়সতর্কতায়,

চীন— ভারতেরসব শীত-পৃথিবীর

নিরাশ্রয় মানবের আত্মার ধীক্কারেঅন্তর্দানে’ (অনেক মৃত বিপ্লবী স্মরণে)

 

জীবনানন্দ দেখেছেন প্রথম মহাসমরের আগের সময় দেখেছেন দুটো মহাযুদ্ধ দেশ বিদেশের রাষ্ট্রনীতি, রাষ্ট্রনায়কদের চলমানতা, কাজকর্ম, অভিসন্ধি সম্বন্ধেও বিশেষ অবগত ছিলেন তিনি প্রথম মহাসমরের পর উত্থান হয় ইউরোপ ও আমেরিকার ছিল রাশিয়া সংস্থান তৈরী করে দেশে দেশে যে মৈত্রী সম্বন্ধ করার প্রচেষ্টা সেখানেও ছিল রাজনীতি কূটনীতি তাদের সেসব প্রচেষ্টা কখনই আন্তরিক হতে পারেনি না আফ্রিকা, না এশিয়ার নানা দেশের সঙ্গে সেখানে ভারতে অবস্থাও ছিল তাই কালো মানুষদের উপর সাদা মানুষের আধিপত্য, সাম্রাজ্য বিস্তার ও অর্থিনৈতিক রাজনৈতিক সুবিধাভোগ প্রতিটি জাতি আপন আপন আখের গুছিয়ে আজও পা ফেলছে সামনে UNOকে রেখে আমোরিকা ইউরোপের দাপাদাপি আজও বহাল তবিয়তে চলছে অন্যদিকে আছে রাশিয়া যার সাথে ওই দুটি উচ্চকোটির দেশের মতের ও নীতির মিল সেদিনও হয়নি, আজও হচ্ছে না সেখানে স্বাধীনতা লাভের পর নেহেরুজীও ভারতের সমাজকে কোনও দিকে চালনা করলে সর্বলোকের কল্যাণ হবে তা নিয়ে সুনিপুণ কূটনীতি ও রাজনৈতিক পারদর্শিতা প্রদর্শন করতে পারেননি বিশ্বময় চলেছে যুদ্ধের পর যুদ্ধ মহাযুদ্ধ, ছোটখাটো বিবাদ মন্বন্তরের পর মড়ক জাতিবিদ্বেষ,  দেশে দেশে সংঘর্ষের যে ছবি জীবনানন্দ তৎকালে দেখেছিলেন, তা নিয়ে কোথাও কোথাও মতামতও প্রকাশ করেছিলেন, সেই একই ধারা আজও বহমান ইতিহাস ও বর্তমানে দাঁড়িয়ে জীবনানন্দ নীরব হতে পারেননি কবিতায় যেমন তার উষ্ণতা অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনই প্রকাশ পেয়েছ নানা প্রবন্ধে মহাবিশ্বের রাজনীতি বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কূটনীতি সমাজনীতি স্বার্থনীতির যে চলমানতা তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করেছেনপৃথিবী ও সময়প্রবন্ধে তা পাঠ করে বোঝা যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রনীতি বিষয়ে জীবনানন্দের সচেতনতা ওই  প্রবন্ধে রূপসী বাংলার গ্রামীণ কবি বলছেন —মানবমৈত্রীর পরিবর্তে জাতিবিদ্বেষ, দেশে-দেশে সংঘর্ষ, নিরবিচ্ছিন্ন রক্তান্ধকার — আধুনিক ইতিহাসের পৃষ্ঠা অশুদ্ধ ভাবনার ও বিমিশ্র বাসনার শূন্যতায় ও নিষ্ফলতায় আড়ষ্ঠ করে রাখছে; পরের জিনিসে লোভ, নিঃসহায়কে নিংড়ানো, শোকাবহ স্বৈরাচার, বার-বার যুদ্ধ; মন্বন্তর ও কালোবাজারের অন্ধ বিমূঢ়তা সৃষ্টি ক'রে চলেছে

জামার্নির রাত্রিপথে: ১৯৪৫কবিতায় জীবনানন্দের সমাজনীতি রাজনীতি বিশ্বনীতির বীক্ষা দেখা যাচ্ছে সেখানে নানা মনীষীকে স্মরণ করছেন কেন রূপসী বাংলার কবিকে জগতমুখী হতে হচ্ছে? তা কি সময়ের উগ্রতা, চলমানতা? তা কি কবিকে কোথাও নাড়িয়ে দিচ্ছিল? যে কবি নির্জনতম, আত্মমগ্ন, একাকী বলে পরিচিত তার কলমে কেন আসছে সেসবজড়-রীতির-অর্থনীতির’, সমাজনীতির কথা! তাহলে এ-কবি যে রাজনীতি বিশ্বনীতি সম্পর্কে একেবারে উদাসীন তা বলা ভুল দেশীয় প্রেক্ষাপটে তিনি যেমন গান্ধীজি দেশবন্ধুকে স্মরণ করেছেন, বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তেমনি ভেবেছেন কনফুসিয়াস, হোমার, গ্যেটে, টোলার, রিলকে, মার্কস, হেগেল, হ্যোল্ডারলিন, কান্ট, গ্রিমকেতাদের যে পথ সে পথে তো পৃথিবী হাঁটেনি! পৃথিবী চলেছে আপন গতিতে সেই অতীত থেকে আজও শতাব্দীর পর শতাব্দী সেসব মনীষী পৃথিবীকে যে পথে পরিচালনা করতে চেয়েছিল সে পথে হাঁটেনি বিশ্ব তাই তো বলছেন—

সে সব হৃদয়গ্রাহী টোলার রিলকে হ্যোল্ডারলিন

সবংশে কি হারিয়ে গেছে রাইখশরীরের থেকে?—

ব্যক্তি স্বাধীনতায় ঘুরে অনাথ মানবতার লেনদেন

শুধতে ভুলে গিয়ে কি ভয় রক্ত গ্লানি রিরংসা ফুঁপায়ে

রেখে গেছে অমোঘ বর্বরতার বেলজেন?’

 

বর্বরতা কোথায় তবু নেই?—…

ইতিহাসের ভূমায় সীমাস্বল্পতাকে যাচাই করার রীতি

গ্যেটের ছিল;— তবুও সীমার কি ভয়ঙ্কর বৈনাশিকী দাবি!’ (জার্মানির রাত্রিপথে : ১৯৪৫)

-থেকে গোটা বিশ্বের সমাজনীতি রাষ্ট্রনীতির যে চলমানতা তা কিছুটা অনুমান করা যায় মহাপুরুষের চেষ্টাও বিফল হয় যেখানে যেখানে মানবতার নামে ব্যক্তিহীনতা ব্যক্তিশবের কারবার চলে ভাই বোন স্মৃতি শান্তির হনন চলে তাঁর কবিতায় দান্তের ইতালি, শেকসপীয়রের ইংল্যান্ড, কলকাতা, নতুন দিল্লী, আফ্রিকা, মানবীয় ঋণ, রিরংসা অন্যায় মৃত্যু আঁধারের যে অবস্থান তা শুধু ক্ষয়ের প্রতীক তা মানবতাকে পুষ্ট করতে, বিশ্বমৈত্রী সৃজনে সেভাবে আজও অবদান রাখতে পারেনি পারেনি বলেই ওসব কবিতায় মহাপুরুষ পণ্ডিতদের এনেও জগত যে স্থির শান্তির দিকে যাবে তাতেও ভরসা করতে পারছেন না কবি আর তাই বার বার আশা করেছেন যাতে কল্যাণ শান্তি সুষ্ট সমাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয় আশাবাদে নিরাসাও আছে

আমি দুই তিন চার পাঁচ ছয়টি এরোপ্লেন গুনে

নীলিমা দেখার ছলে শতাব্দীর প্রেতাত্মাকে দেখেছি অরুণে’ (ভোর ও ছয়টি বোমার : ১৯৪২)

আছে শুভবোধের প্রার্থনা

একদিন পৃথিবীর হিংসাব্যথা শেষ হবে, সেই অনিবার

আনন্দের চিন্তার মতন প্রেম আলো

সবার ওপরে সত্য হয়ে আছে, আছে মনে হয়’ (মহাত্মাজি)

রাষ্ট্রনীতি বিশ্বনীতি রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতির সাপেক্ষে মানবতার যে পথ সে পথে শুধু বৃথা স্বপ্ন শুভ্র-মানবিকতা তবুও কোথাও নেই মহামানবদের চিন্তাচেতনা নিয়ে যতই শান্তি খুঁজতে যাওয়া হোক, নবীনভাবে সবার শ্রীবৃদ্ধি, সবার কল্যাণ, সামুহিক উন্নতির কথা ভাবা হোক না কেন, তা শেষে বৃথা হয়ে যায় বা যাচ্ছে কালে কালে ইতিহাস থেকে বর্তমান বা ভবিষ্যতেও এ-ছবির খুব একটা পরিবর্তন হবে না মনে হয়হয়তো মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ থেকেই যাবে তাই কবির মূল্যায়ন, আশা ও জিজ্ঞাসা—

তবুও কোথায় সেই অনির্বচনীয়

স্বপনের সফলতানবীনতা— শুভ্র মানবিকতার ভোর?

নচিকেতা জরাথুষ্ট্র লাওৎ-সে এঞ্জেলো রুশো লেলিনের মনের পৃথিবী

যতই শান্তিতে স্থির হয়ে যেতে চাই ;

কোথাও আঘাত ছাড়াতবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই

নব-নব মৃত্যুশব্দ রক্তশব্দ ভীতিশব্দ জয় করে মানুষের চেতনার দিন

অমেয় চিন্তায় খ্যাত হয়ে তবু ইতিহাসভূবনে নবীন

হবে না কি মানবকে চিনে—’ (সময়ের কাছে)

জীবনানন্দের যে জগতবীক্ষা, মানবভাবনা, অতীত ভুলে নবীন হয়ে জেগে ওঠাতে আছে সংশয় আছে ভয় মানুষ কি আদৌ পাবে সুস্থ পৃথিবী সমাজ? আদৌ কি রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকরা সাধারণ মানবের তরে পৃথিবীকে হতে দেবে শান্ত! এ-ভাবনা জীবননানন্দের মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, বেলা অবেলা কালবেলা কাব্যে দেখা যায়

এশিয়া কি এশিয়াবাসীর

কোথাও নবীন দিন আসে;

কে জানে সেখানে সৎ নবীনতা রয়ে গেছে কিনা;…

বহুকাল কেটে গেছে বহুতর শ্লোগানের পাপে

এ রকম ইতিহাসে উৎস রক্ত হয়ে

এই নব উত্তরাধিকারে

স্বর্গতি না হোক— তবু মানুষের চরিত্র সংহত হয় না কি?’ (লোকসামান্য)

 

   অন্যদিকে, এশিয়া আফ্রিকার উপর রাশিয়া ইউরোপের যে প্রভাব-বিস্তার তার কথাও কি একজন সচেতন কবির পরিচয় নয়! যেখানে প্রতিটি জাতি তার আপন স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে বদ্ধ পরিকর আবার দেশে দেশে একটা অন্তঃমিল থাকবে মানবতার নিরিখে, এটাই তো চেয়েছিলেন নানা দেশের জ্ঞানী পণ্ডিত, দার্শনিকরা চেয়েছিলেন জীবনানন্দও নিভৃতে, আপন আঙ্গিকে। ‘চিন্তা-দুশ্চিন্তাপ্রবন্ধে জীবনানন্দ বলছেন— ‘সভ্যতার এ-সবের গতি ও পরিণাম নিয়ে মনীষীদের ভিতর নানা রকম বিভিন্ন মতের প্রচলন ও প্রতিষ্ঠা রয়ে গেছে কিন্তু একটা কথা ঠিক যে-সুবৈজ্ঞানিক অর্থব্যবস্থায় সকলের সংসারের সাধ আস্বাদ মোটামুটি মিটে যাবে এক কল্যাণকৃৎ ভাবগ্রাহী রাষ্ট্রের পরিধির ভিতরে বাস করে, সেই অর্থব্যবস্থার প্রচলন নিয়ে সেই রাষ্ট্র আজও পৃথিবীতে কোথাও তেমন পরিচ্ছন্ন ভাবে দেখা দেয়নিইতিহাস বুঝে, বর্তমান দেখে, নানা দেশের চলমানতা দেখে কবির এই মতামত যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উন্নত, উন্নয়নশীন, পিছিয়ে পড়া দেশগুলির মধ্যে অতীত থেকে আজও বৈষম্য থেকেই গেছে শুভ্র মানবিতার উদয় না হলে ওসব আইন-চার্টার লোকদেখানো অভিনয় মাত্র জীবনানন্দ তা জানতেন এবং সে কারনেই অন্ধকার অবক্ষয় ভয় ভীতি রক্ত প্রভৃতি শব্দের অবস্থান কেননা যতই আন্দোলন বিপ্লব সংগঠিত হোক না কেন সাধারণ মানুষের তাতে পরিবর্তন হয় নাহয়ও নি এসব নিয়ে বিশ্ববোধের যে ছবি তাঁর কবিতায় আছে সেটা স্বীকার করতেই হয়—

নগরীরপৃথিবীর মানুষের চোখ থেকে ঘুম

তবুও কেবলই ভেঙে যায়

পশ্চিমে প্রেতের মতন ইউরোপ;

পুব দিকে প্রেতায়িত এশিয়ার মাথা

আফ্রিকার দেবতাত্মা জন্তুর মতন ঘনঘটাচ্ছন্নতা;

ইয়াঙ্কির লেন-দেন ডলারে প্রত্যয়;—

এই সব মৃত হাত তবে

নব-নব ইতিহাস-উন্মেষের না কি?— ’ (রাত্রির কোরাস)

এখানে বিশ্বের মুখ তো স্পষ্ট লেন-দেনে নব নব ইতিহাস যাই আসুক তা উন্মেষের নয় তা চিরাচরিত ধারাবাহিকতা আপন আখের গোছানো শোষণ তোষণের বিশ্বনীতি শান্তিকল্যাণের ধ্বজা তুলে যুদ্ধের লীলা ধ্বংস আর মানুষের দুর্দশার কথা আমাদের ইতিহাসের স্রোত জীবনানন্দ তা বহুরকম ভাবে বলেছেন কবিতায় কবিতায়

জীবনানন্দ মহাদেশ বা নেশনের যেসব কথা বলেছেন, সেখানে আগ্রাসন যুদ্ধ অধিকারের ছবি স্পষ্ট জামার্নি  বা ব্রিটেনের অবস্থান, ইউরোপ বা আমেরিকার অধিপত্য, এশিয়া আফ্রিকার পিছিয়ে পড়া নানা দেশ, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসব নিয়ে তৎকালের নানা অস্থিরতা, মূল্যবোধহীনতা, মানবতার অবসান আছে জীবনানন্দে তাঁকে একেবারেই উপেক্ষা করা যায়না বলতে গেলে জীবনানন্দ বলতে চেয়েছেন, শতাব্দী প্রাচীন আগ্রাসন যুদ্ধ অবক্ষয় রক্তের যে ইতিহাস তা আজও বদলায়নি বদলায়নি এই একবিংশ শতাব্দীতেও জীবনানন্দের কাল হোক বা হোক আমাদের কাল, দেশে দেশে সেই একই অভ্যেস আজও চলে আসছে একদিকে ইউরোপ আমেরিকা, অন্যদিকে রাশিয়া, মধ্যপথে চিন ভারত আফ্রিকার অবস্থান সেই আগেকার মতই প্রতিটি জাতি শুধু নিজে বলীয়ান হতে চেয়েছে একে অপরকে আধিপত্যের জালে চেয়েছে জড়াতে এই বিশ্বনীতি চলছে আজও তাই হয়তো জীবনানন্দ বারবার বলেছেন শতাব্দীর পর শতাব্দী সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি একটিই অস্ত্রকে কাকে পিছনে রেখে এগিয়ে যাবে কে কাকে করবে গ্রাস এই পরিপ্রেক্ষিতে মানবের সাধনা করে যাওয়াটা হয়তো বৃথা প্রচেষ্টা -কথাও জানাতে ভোলেননি কবি বা স্পষ্ট করে না বললেও স্থানে স্থানে তার আক্ষেপ আছে আছে ভীতি ভয় দুশ্চিন্তা নিরাশা

মানুষের সভ্যতার মর্মে ক্লান্তি আসে;

বড়ো-বড়ো নগরীর বুকভরা ব্যথা ;

ক্রমেই হারিয়ে ফেলে তারা সব সঙ্কল্প স্বপ্নের

উদ্যমের অমূল্য স্পষ্টতা’ (মিতভাষণ)

উত্তরপ্রবেশকবিতায় বলছেন বছরের পর বছর কেটে গেল সূ্র্য অস্ত গেল তবুও বসন্তের সাড়া পাওয়া যায় না শুধু পড়ে থাকে অগণন এয়ারোড্রাম জরাথ্রুষ্ট বুদ্ধের সময় পেরিয়ে আজও রাজনীতি আর রুগ্ন নীতির যাঁতাকলে পৃথিবী ত্রাসিত ইতিহাস থেকে বর্তমানেও শুধু যুদ্ধ আর তার ফলাফল মন্বন্তর মহামারি দুর্বিক্ষ মহাপুরুষরা পণ্ডিতরা এসেছে, চলে গেছে তবু পৃথিবীর চলমানতা বদলায়নি আসেনি জ্যোতি এসবের মাঝে স্থানে স্থানে সুস্থ সার্বজনীন জীবনের আশাবাদ থাকলেও সেখানেও সংশয় আছে কবির আছে টানাপোড়েন আছে অস্থিরতা ও জিজ্ঞাসা শতাব্দী হোক বা হোক আড়াই হাজার বছরের সংস্কৃতি, পৃথিবীর রীতি নীতি থেকে গেছে এক—

সে অনেক রাজনীতি রুগ্ন নীতি মারী

মন্বন্তর যুদ্ধ ঋণ সময়ের থেকে

উঠে এসে এই পৃথিবীর পথে আড়াই হাজার

বছরে বয়সী আমি;…

আজ ভোরে বাংলার তেরোশো চুয়ান্ন সাল এই' (তবু)

জীবনানন্দের কবিতায় সমগ্র বিশ্ব তথা বাংলার যে ছবি সেখানে কবির চিন্তা, মূল্যায়ন আমাদের ভাবতে বাধ্য করে জীবন মানে ভালো করে জীবনযাপন সবার কল্যাণ সবার উন্নয়ন সকলের শুভকামনা কিন্তু শঠতা হিংসা রাজনীতি সমাজনীতি মৃত্যু নিয়ে চারিদিকে ন্ধকার নরকের সৃজন মানুষের লালসার শেষ নেই জাতিতে জাতিতে, দেশে দেশে, একই সমাজের ভিতরের যে রূপ তা কবিকে ভাবিয়েছে সবসময় মিতভাষী  কবিকেও অনেক কথা, অনেক আপ্তবাক্য রচনা করতে বাধ্য করেছে বলতে গেলে জীবনানন্দের জগতচিন্তা হাজার বছরের চলমানতার উপরে মানবতাবাদের মূল্যায়ন মানুষের স্বরুপ উন্মোচন সেখানে সাধারণ মানুষ, মধ্যশ্রেণী, নিম্নশ্রেণীর জনগণরা থাকলেও তারা মৃতবৎ শ্রমজীবি তারা, শ্রমিক তারা কিন্তু তাদের অবস্থা ও অবস্থান—

অনেক শ্রমিক আছে এইখানে

আরো ঢের লোক আছে

সঠিক শ্রমিক নয় তারা

স্বাভাবিক মধ্যশ্রেণী নিম্নশ্রেণী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝরে

এরা তবু মৃত নয়; অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে’ (এই সব দিনরাত্রি)

ওই একই কবিতায় ইতিহাস-বর্তমানের চলমানতা ও মানবমূল্যায়ন করতে গিয়ে কবি বলছেন—

ইতিহাস অর্ধসত্যে কামাচ্ছন্ন এখনো কালের কিনারায়

তবুও মানুষ এই জীবনকে ভালোবাসে; মানুষের মন

জানে জীবনের মানে : সকলের ভালো করে জীবনযাপন

কিন্তু সেই শুভ রাষ্ট্র ঢের দূরে আজ

চারিদিকে বিকলাঙ্গ অন্ধ ভিড়—অলীক প্রয়াণ

মন্বন্তর শেষ হলে পুনরায় নব মন্বন্তর;

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে নতুন যুদ্ধের নান্দিরোল;

মানুষের লালসার শেষ নেই;

উত্তেজনা ছাড়া কোনো দিন ঋতু-ক্ষণ

অবৈধ সংগম ছাড়া সুখ

অপরের মুখ ম্লান করে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ

নেই’ (এই সব দিনরাত)

সত্যিই তাই মানুষকে নিয়ে কেও ভাবেনি মানবসাধনা মেকি অভিনয় রাষ্ট্রনেতাদের কাছে মানুষকে যা জানানো হয় তা অর্ধসত্য৷ শুভবোধের দেশগঠন শুধু খেলা চর এসব মারপ্যাঁচে পিষে মরে মানুষের আশা বাড়ে দুঃখ কষ্ট ব্যথা যুদ্ধের পর যুদ্ধ শুরু হয় মন্বন্তরের পরে আসে আরেক মহামারি চক্রবৎ কালের খেলা, ভোগবিলাস অধিকার আগ্রাসন লালাসার বাড়বাড়ন্তে সকলকে পিছনে ফেলে সকলেই এগিয়ে যেতে চাই আবার পৃথিবীর কোনও নগরী বা কোনও দেশ শুধু নিজেকে বলিষ্ঠ করতে, শক্তিশালি করতে মানবাজাতির ক্ষয়ের বলয় রচনা করে চলেছে আজও কুরুবর্য বেবিলন ট্রয় হোক বা হোক আজকের রাশিয়া ইউক্রেন, ইজরায়েল গাজা, আফ্রিকার নানা দেশে অশান্তি, UNO বা আমেরিকার অবস্থান, চীন ভারতের উত্থানের যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব তাও তো জীবনানন্দের ইতিহাস ও বর্তমান সময় চেতনারই ছবি সেখানেও মানবভ্রাতাবোনকে বুকে টানার ছলে তাদের নিকেশ করে অনির্বচন রক্তে ভড়িয়ে দেওয়া হয় নদীর জল পৃথিবীর নানা গোষ্ঠী পরস্পরের সঙ্গে ভাই-ভাই সম্পর্ক রেখে কি আমাদের মানবসভ্যতা ব্যতিক্রমী হয়ে জেগে উঠেছে কোনওদিন? জেগে ওঠেনে বরং আরও রিরংসায় মেতেছে স্বত্বাধিকার কামনায় প্রতিটি দেশ আপন স্বার্থে আপন আঙ্গিকে গ্রাস করতে চেয়েছে অপরকে—

তুমি কি গ্রীস পোল্যান্ড চেক প্যারিস মিউনিখ

টোকিও রোম ন্যুইয়র্ক ক্রেমলিন আটলান্টিক

লণ্ডন চীন দিল্লী মিশর করাচি প্যালেস্টাইন?

একটি মৃত্যু, এক ভূমিকা, একটি শুধু আইন’ (অনন্দা)

এরই সারাংশ জীবনানন্দের কবিতায়—

কোথায় সমাজ, অর্থনীতি?...

নারীপুরুষ, মানবতা, অসংখ্য বিপ্লব

অর্থবিহীন হয়ে গেলে,...’ (যতিহীন)

আবার পৃথিবীর নানা নেশনের স্বরুপ তুলছেন এভাবে—

সকল নেশন আজ এই এক বিলোড়িত মহা-নেশনের

কুয়াশায় মুখ ঢেকে যে যার দ্বীপের কাছে তবু

সত্য থেকেশতাব্দীর রাক্ষসী বেলায়

দ্বৈপ-আত্মা-অন্ধকার এক-একটি বিমুখ নেশন’ (উত্তরসামরিকী)

জীবনানন্দ বিশ্বআন্দোলন, বিশ্বখেলা, রাজনীতি, অর্থনীতি ইতিহাস, বর্তমানকে পর্যালোচনা করে বারে বারে মানবতার কথা এনেছেন নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন কখনও আস্থা রেখেছেন মানুষের প্রতি কখনও আশাভঙ্গের ক্লান্তি আছে আছে সমাজ সময়ের চলমান ঘটনার টুকরো ঝলক মানুষে মানুষে হিংসা দ্বেষ দেশে দেশে লোকদেখানো নানা প্যাক্ট মন্বন্তর থেকে মৃত্যু ভয় গ্লানি গোটা জগতের শান্তিকামনায় আছে গৌতম বুদ্ধের স্মরণ

কোথায় চার্টার প্যাক্ট কমিশন প্ল্যান ক্ষয় হয়;

কেন হিংসা ঈর্ষা গ্লানি ক্লান্তি ভয় রক্ত কলবর;

বুদ্ধের মৃত্যর পরে যেই তন্বী ভিক্ষুণীকে এই প্রশ্ন আমার হৃদয়

করে চুপ হয়েছিল— আজও সময়ের কাছে তেমনই নীরব‘ (মহাগোধূলি)

সময়কে বুঝে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখে, মানুষের অবস্থা পর্যালোচনা করে যে শান্তির সাধনা জীবনানন্দের ছিল, তা কখনও আশাহত হয়েছে কখনও প্রশ্ন করেছে মানুষকে কখনও আত্মপ্রশ্নে জড়িয়েছেন নিজেই আবার সেখানে আশার আলোও দেখতে চেয়েছেন এসব থেকে বোঝা যায় ইতিহাস বা বিশ্ব রাজনীতি বা সাম্প্রতিক সমাজ-সময় বিষয়ে এই কবি ভেবেছেন অনেক ভাবিয়েছেন, জানিয়েছেন অনেক ইতিহাস থেকে বর্তমান এঁকেছেন এভাবে—

ইতিহাস শেষ হয়ে গিয়ে তবু অজর অনড় চোখ মেলে দেখে গেছি

আমাদের হৃদয়ের আশা

নদীর জলের মতো মিশরের, দিল্লির, মাদ্রিদের, লন্ডনের পথে নেই বলে

নেই-নেই— মেটেনি পিপাশা

অগণন অ্যান্টি-এয়ারক্র্যাফট্ গান, সার্চলাইট ঘুরায়ে-ঘুরায়ে দেখা যায়’ (শ্রতি-স্মৃতি)

 

দেশীয় প্রেক্ষাপটে তখন চলেছিল নানা কর্মকাণ্ড স্বদেশী আন্দোলন বঙ্গভঙ্গ ১৯৩০ ১৯৪২ এর আন্দোলন স্বাধীনতা লাভ পঞ্চাশের মন্বন্তর কালোবাজার ব্ল্যাক আউট উদ্বাস্তু সমস্যা এসব জীবনানন্দের সামনেই ঘটেছিল তার টুকরো টুকরো উল্লেখ আছে জীবনানন্দেইঙ্গিত আছে আছে মড়ক দুর্ভিক্ষ মহামারি মানুষের অসহয়তা বেদনা নিদারুণ জীবন ১৯১৭ থেকে জীবনানন্দ দেখেছেন কলকাতাকে প্রাণে ছিল গ্রাম বাংলার সখ সাধ ও দুর্দশা বঙ্গদেশের দারিদ্র পীড়িত জনগণ তাদের অবস্থার উল্লেখ আছে তাঁর কবিতায় দেশীয় স্বদেশী আন্দোলনে তাঁর প্রত্যক্ষ অবদান না থাকলেও সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ওয়াকিবহাল ছিলেন জীবনানন্দ নগর ভেঙেছে ঘর ভেঙেছে পতন হয়েছে গ্রাম এসেছে মৃত্যভয় ক্ষয় ক্ষতিমানুষের সংসার সংকটদারিদ্রতা কবি সেই সময় উল্লেখ করে খুব স্বল্পশব্দে বুনেছেন তাঁর কথা—

উনিশশো-চল্লিশের কত গ্রাম, নগর গিয়েছে;

সে সবের জনসাধারণ

উনিশশো বেয়াল্লিশ খৃষ্টাব্দের অপরাহ্নে নেই

উনিশশো অনন্তের ভূখণ্ডে, আকাশ

মাঝে-মাঝে অনুভব করে নিতে চাই;

শান্তি নেই;’ (বাতাসের শব্দ এসে)

কবি এসব দেখে আঘাত পেয়েছেন নগর কলকাতা বা গ্রামবাংলার দুর্দশা পরিণতি দেখে অন্ধকারে বিকল হয়েছেন বলছেন—

এখানে বিশেষ কিছু হয়নি অনেকদিন

ক্রমাগত মানুষের মরণ হয়েছে

গরিব, বেচারা, বুড়ো, বিকলাঙ্গ, মহৎ পার্ষদ সব

কি করে কেবলই খসে ধুলোসাৎ হয়ে যায়

দেখেছি উদাস, ক্লান্ত— অন্তরঙ্গভাবে;

দেখে-দেখে ঘরে ফিরে অন্ধকারে বিকল হতাম,—’ (নিরীহ, ক্লান্ত ও মর্মান্বেষীদের গান)

বঙ্গদেশের সামগ্রিক দুর্গতি, অবক্ষয়, রাজনৈতিক চলমানতায় জীবনের অবনতি এঁকেছেন এভাবে—

কখনও ধানের ক্ষেতে— কখনও নদীর ভুয়ো জলে

নিরন্ন বছর নামে;—

বর্গাদারমহাজন—প্রজার মহলে

হুলুস্থূল পড়ে যায়;…

চারিদিকে সর্বগ্রাসী দারিদ্রতা;

জনমানবের মুখে নিজ-নিজ শোকাবহ গোপনীয় কথা;

নিজেরই ঘরের জন্য ঘরন্তী শক্তির নির্মমতা;

মূর্খ দেশ, মেয়ে দেশ, প্রভু দেশ, ভৃত্য দেশ, পাগলের দেশ রয়ে গেছে,’ (নিরীহ, ক্লান্ত ও মর্মান্বেষীদের গান)

দেশীয় পরিস্থিতি দেখে কবি এতই হতাশাগ্রস্থ যে দেশকে মূর্খ পাগলের দেশ বলতেও কসুর করলেন না কেননা সাধারণ জনগণ রাজনৈতিক খেলা বিষয়ে আজও মূর্খ আজও তারা ভৃত্যপ্রায় তাছাড়া এ-দেশের মাঝেও আছে মিডলম্যান। ‘আমাদের শস্য তবু অবিকল পরের জিনিস / মিডলম্যানদের কাছে পর নয়’ (সোনালি সিংহের গল্প) -দেশে আছে প্রভুমহাজন, বর্গাদার চারিদিকে গোপন ষড়যন্ত্র বেকারত্ব দারিদ্রতা নাগরিক জীবনে বা গ্রাম্যজীবনে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা স্বচক্ষে দেখেছিলেন দেখেছিলেন ফুটপাথের মানুষদের হাসপাতালের অচলাবস্তা স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে কলকাতায় মানুষের নানা কারবার দেখেছিলেন তিনি কে কাকে কীভাবে ফাঁকি দেবে! কীভাবে জলের দরে পরের বাড়ি নিলাম করবে কীভাবে তারা সুদ খাটায় কীভাবে কতিপয় মানুষের হাতে থাকে টাকার হুণ্ডি যারা নারীকেও নিয়ে যায় কলকাতা কেন্দ্রিক  চলমানতার যে ছবি সেসব দেখেও ভীত সন্ত্রস্ত কবি পথে ঘাটে ফুটপাথে দিনের আলোয় একটা অস্পষ্ঠ ব্যস্ততা তথা মানুষ নিজেও জানে না তারা কোন দিকে চলছে কি তাদের পরিণতি রাষ্ট্রনায়করা আশা করলেও তার সুফল কবে ফলবে তা বলা মুশকিল সকলের মঙ্গলকামনায় সকলের দুর্দশায় চোখে ঠেকে সেখানে নগর কলকাতার রূপ ফুটে উঠছে এভাবে—

আমরা মানুষ ঢের ক্রূরতর অন্ধকূপ থেকে

চোখ বুজে নিরবে থেমেছি

ফ্যাক্টরির সিটি এসে ডাকে যদি,

ব্রেন কামানের শব্দ হয়,

লরিতে বোঝাই করা হিংস্র মানবিকী

অথবা অহিংস নিত্য মৃতদের ভিড়

ওরা যদি কালোবাজারের মোহে মাতে,

নারীমূল্যে অন্ন বিক্রি করে,

মানুষের দাম যদি জল হয়,…

পিপাশা মেটাতে,…

আমরা ওদের হাতে রক্ত ভুল মৃত্যু হয়ে হারায়ে গিয়েছি?’ (মৃত্যু স্বপ্ন সংকল্প)

তৎকালীন সমাজ বা আজকের সমাজ, সমাজের রূপ ও চলমানতা সেই আগেকার মতই কালোবাজার শঠতা হিংস্র মানবিকতা নিয়েই এগিয়ে চলেছে সাধারণ মানুষ দুটো অন্নের জন্য ঘুরে মরেছে এমন কি স্বাধীনতার পরেও তার সেরকম কোনও পরিবর্তন হয়নি দরিদ্র বাঙালির কথা বলতে গিয়ে মাঝে মাঝে চলে এসেছে নিম্নশ্রেণী, নিম্নমধ্য শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের কথা বলেছেন তারা কেউ শ্রমিক কেউ শ্রমিকের মতো কেউ থাকে ফুটপাথে অনেকে বস্তিতে তারা সঠিক করে জীবনের মানে আজও জানে না জল তেল খাদ্য সংস্থান করতেই তাদের জীবনে মৃত্যু এসে যায় তাদের সন্ততিরা শিক্ষা পায় না স্বাস্থ্য তাদের নেই তারা পায় না তাদের পারিশ্রমিক পায় না শ্রমের বিধানআলোকপাতপ্রবন্ধে জীবনানন্দ বলেছেন, খুব কম মানুষ আছে যারা স্বচ্ছল ও সুখী তার থেকে অনেক অনেক বেশি মানুষ নিঃসম্বল, অনাথ, অসুস্থ আমরা যারা সুষ্ঠ সুন্দর সমাজ গঠনের আশা রাখি, সে স্বপ্ন বহুদূর বলছেন— ‘প্রায় গোটা মানবজাতিই খেতে পরতে একটু অবসর উপভোগ করতে গিয়ে অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে প্রবঞ্চিত খেলার পুতুলের মতো ফিরছে।… আমাদের নিম্নমধ্য শ্রেণীরএমন-কী মধ্য শ্রেণীর কোনও-কোনও পরিবার অন্য দেশের বস্তি-মানুষের চেয়ে বেশি সুবিধায় থাকবার সুযোগ পায়না আমাদের এই বিভিন্ন শ্রেণীগত দারিদ্র্য আমাদের জীবন নিরাশ নিঃস্বাদ ও কুশ্রী ক'রে রেখেছে খুবই’ (আলোকপাত) আমাদের সমাজের শ্রেণীবৈষম্যর জন্য সমাজনীতির যতটা দোষ, ততটা আমারাও নিজেদের সম্বন্ধে সচেতন নই শুধু আশার আশায় পথ চলে মানুষ সামাজিক অবস্থার হয় না উন্নতি রাষ্ট্রনেতারা যতই আশা পোষণ করুক সমাজে বৈষম্য থেকেই গিয়েছে শ্রেণীগত মানুষের স্বরূপ তুলতে গিয়েএই সব দিনরাত্রিকবিতায় বলছেন—

শরীর বিবশ হলে অবশেষে ট্রেড-ইউনিয়নের

কংগ্রেসের মতো কোনো আশা-হতাশার

কোলাহল নেই

অনেক শ্রমিক আছে এইখানে

আরো ঢের লোক আছে

সঠিক শ্রমিক নয় তারা

স্বাভাবিক মধ্যশ্রেণী নিম্নশ্রেণী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝরে

এরা তবু মৃত নয়; অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে

জানে না কোথায় গেলে জল তেল খাদ্য পাওয়া যাবে;’ (এই সব দিনরাত্রি)

মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তদের সাথে সমাজে আছে মিডলম্যান সুদখোর মহাজন ঠিকাদার কপট, শঠ যারা পরের ক্ষেতের ধানে মই দেয় পরের শস্য তাদের নিজের কালোবাজারিতে তারা ওস্তাদ নগর সমাজের রূপে নগরের চলমানতা ব্যস্ততা থাকলেও তার পরিণতি কি, সে বিষয়ে কবিও চিন্তিত অন্যদিকে দিকে আছে গ্রাম ধ্বংসের কথা গ্রাম পতনের শব্দ গ্রামের পুরনো ছবি হারিয়ে যায় গ্রামের সেই গঠনটাই হারিয়ে যায় সময়ের ধাক্কায় শহর হোক বা হোক গ্রাম অন্তহীন গোলকধাঁধায় ঘুরতে থাকে মানুষ বাঁচার আশা করে মৃত্যুতে ভয় পায় বাঁচা-মরা আর ভালো থাকার জীবানবর্তে সঠিক নিশানা পায় না খুঁজে জীবনানন্দ গ্রামকে যেমন দেখছেন, তেমন দেখেছেন নগর কলকাতা আর সবক্ষেত্রেই দেখেছেন অধঃপতনের সূচনা, চলমানতা, আর্তি, পীড়া, কায়িক পরিশ্রম, মানসিক যন্ত্রণা, আশা-স্বপ্ন সেখানে মানুষের জন্য শুভবোধ বা শুভকামিতাও আছে আছে তা নিয়ে সংশয় বিদেশনীতি, দেশীয় নীতি থেকে বাংলার গ্রাম্যমানুষ সব এসেছে তার কবিতায় যুগান্তর পত্রিকায় (শারদীয়া ১৩৫৩) প্রকাশিতনবপ্রস্থানকবিতায় কবির চিন্তাচেতনার মূল্যায়ন পাওয়া যাচ্ছে এভাবে—

মানুষের এক জাতি এক দেশ এক মৃত্যু একটি জীবন এক

গহন আলোকে দেখি না কি? প্রেতের রোলের ভিতরে বাঙালির

ঘর ভেঙে ঝরে গেলে জেনিভার অমেয় প্রাসাদ

মরে যায় ;— ফ্ল্যান্ডাস, ভাডুন, ভিমি রিজ, উক্রেইন

হোয়াংহো নীপার রাইন চিনদুইনের পরে সব শব

কলকাতা হাওড়া মেদনীপুর ডায়মনহারবারে বাংলায়

অগণন মানবের মৃতদেহ প্রমাণিত হয়ে

কিরকম শুক্ল সৌভ্রাত্রের মতো, চেয়ে দেখ, ছড়ায়ে রয়েছে’ (নবপ্রস্থান)

-থেকে বোঝা যায় গোটা বিশ্বের সঙ্গে গ্রামবাংলা, নগর বাংলায় একই চলমানতা দেখেছিলেন তিনি রূপসী বাংলায় গ্রামের যে ছবি তা সময়ের সাথে সাথে মহাপৃথিবী বেলা অবেলা কালবেলার সময়ে এসে অনেকটা রূপ বদলেছে দারিদ্রতা, শঠতা, দুর্ভিক্ষ, মড়কের পর গ্রামের করুণ অবস্থাও উঠে এসেছে সে কারণে যেখানে আন্তর্জাতিক ঘটনা, দেশীয় অবস্থা নগরের সাথে গ্রামকেও স্পর্শ করেছে থেকে থেকে গ্রামভাঙার কথা এসেছে সে কারণে যুগান্তর পত্রিকায় (শারদীয়া ১৩৫৮) প্রকাশিতমহাপতনের ভোরে'  কবিতায় নগর-গ্রামের প্রসঙ্গে বলছেন—

কেবলই স্বপ্নের ক্ষয় হয়;

তার কোনো ক্ষয় নেই, চারিদিকে চলেছে সময়:

বন্দরের কুয়াশায় কোলাহলে,

পৃথিবীর কোল থেকে অবিরাম উৎসারিত জলে,

এরিয়েল ধ্বনির প্রবাহে,

অন্ধকারে অন্তহীন মানুষ বা মাছির পতনে,

কনফারেন্সে প্ল্যানে কমিশনে

নগরীর শক্তি নষ্ট হয়ে যায় চারিদিকে,—

কেবলই গ্রামের ধ্বংস হয়;’ (মহাপতনের ভোরে)

 

মহাযুদ্ধ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা, ব্ল্যাকমার্কেট, কর্মসংস্থানের অভাব, ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী সুস্থ সমাজনীতির সঠিক দিশা পাওয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে বঙ্গদেশের অবস্থা মোটেও সুখকর ছিল না দেশনায়করাও যে স্বপ্ন দেখছিলেন তা ফলপ্রদ করার জন্য বহুদিকে উদ্যমের ও স্বদিচ্ছার কিছুটা অভাব ছিল— ’-পৃথিবীর রাজনীতিবিদ যোদ্ধা নেতারা এখন / ডুবে যাক সমুদ্রের পুরুভুজ-পাললিক মনের ভিতরে,’ (এখন রাতের শেষে) গ্রাম থেকে নগরেও কোনও যুগান্তকারী পরিবর্তন আসেনি যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে দেশ স্বাধীন হলো, তাতে সাধারণ জনগণের কোনও উন্নতি সেভাবে হল না তার উপর মন্বন্তরের প্রভাব ছিলই নগরমুখী জনতাকেও অন্নসংস্থানের জন্য রীতিমতো লড়াইয়ে নামতে হয়েছিল কলকাতা হোক বা হোক বাংলার  অন্যান্য প্রান্তর, দারিদ্রের দশা একই থেকে গিয়েছিল— ‘চারদিকে সর্বগ্রাসী দারিদ্রতা; / জনমানবের মুখে নিজ-নিজ শোকাবহ গোপনীয় কথা;’ জীবনানন্দ সেদিকের কথা ভোলেননি কবিতার মাঝে সেসবের উল্লেখ জীবনানন্দের সময় চেতনা ও দেশচেতনার পরিচয় রেখেছে কবিতায় বারবার এসেছে ফুটপাথের প্রসঙ্গ অন্ধকারে দিশা খুঁজে ফেরা কর্মঠ জনগণ এসেছে ক্রেন, মাস্তুল, ফ্যাক্টরির সিটি, বন্দরের কোলাহল, শ্রমিক, গুনচট, বস্তি, চালানির মাল, চলতি বাজার দর

চারিদিকে কলকাতা টোকিও দিল্লি মস্কৌ অতলান্তিকের কলরব,

অগণন মানুষের সময় ও রক্তের যোগান

ভাঙে গড়ে ঘর বাড়ি মরুভূমি চাঁদ

রক্ত হাড় বসার বন্দর জেটি ডক;

প্রীতি নেই,’ (চারিদিকে প্রকৃতির)

সমগ্র বিশ্বের চলমানতা তথা ইতিহাসকে কবি ভালোভাবে বুঝেছিলেন তার বিশ্লেষণ করেছিলেন চারিদিকে মানুষের অবক্ষয় দেখেছিলেন কঠিন জীবনযাপনের ছবি দেখেছিলেন সর্বত্র তা সে দিল্লি হোক কলকাতা হোক বা হোক গ্রাম বাংলা সেই সময় পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামবাংলারও অবক্ষয় হচ্ছিল রাজনৈতিক অর্থনৈতিক তথা দেশস্বাধীনের কোলাহলে নগরের সঙ্গে গ্রামেরও পতন হচ্ছিল

বাংলার লক্ষ গ্রাম নিরাশার আলোহীনতায় ডুবে নিস্তব্ধ নিস্তেল

বাংলার লক্ষ গ্রামরাত্রি একদিন

আলপনার, পটের ছবির মতো সুহাস্য, পটলচেরা চোখের মানুষী

হতে পেরেছিলো প্রায়; নিভে গেছে সব’ (১৯৪৬-৪৭)

নগরের কোলে অজস্র শ্রমিক কাজ করে গেছে অজস্র মানুষ থেকেছে ফুটপাথে গ্রামেরও অবস্থা তাই কৃষক কাজ করে গেছে আপন পেট মেটাতে—একটি কৃষক শুধু ক্ষেতের ভিতরে / তার বলদের সাথে সারাদিন কাজ করে গেছে;’ (ক্ষেতে-প্রান্তরে) গ্রাম শহর বা দেশের যে রূপ জীবনানন্দ দেখেছিলেন, বুঝেছিলেন, চিন্তা করেছিলেন তাতে কোথাও সামাজিক উন্নতি দেখতে পাননি কবি বরং দেখেছিলেন অবক্ষয় মানুষের জীবনযুদ্ধ সমাজকে সুষ্ঠ পথে নিয়ে যাওয়ার পথে বহু বাধা ছিল বহু অসঙ্গতি ছিল ছিল বৈষম্য নৈরাজ্য

যেইখানে রাষ্ট্র নেই— সেই নৈরাজ্যের দিকে যায়

যেখানে মানুষ নেই— অপমানুষের ভিড় মরা-আধমরা

হাড় আছে রক্ত আছে বালি ফণিমনসার কাঁটা

নিয়ন টিউব গ্যাস বিদ্যুৎবাতির বিহ্বলতা

মানুষকে অতিক্রম করে ফেলে নবীন মানব

নব শীত নব রাত্রি বিপদের দিকচক্রবাল

লক্ষ্য করে অবিরল জলকল্লোলের রক্ত, জল,

আর মরুভূমি আর মানব চলেছে অবিরল’ (কখনও মুহূর্ত)

এই চলাচলই তো জীবনানন্দের সমাজবীক্ষা সমাজকে দেখা তার মূল্যায়ন জীবনানন্দ জানতেন স্বাধীনতা লাভের উপরই ব্যক্তি জাতি বা শ্রেণীবৈষম্য লোপের বিষয়টি নির্ভর করে না সেখানে দরকার সুচিন্তিত অর্থব্যবস্থা, সমাজনীতি ভারতের জনগণের দুঃখ দুর্গতি ঘোচাতে সঠিক ও উপযুক্ত অর্থবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন কবি তাঁর সে মতামত প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রবন্ধে—

-দেশে কোটি-কোটি লোকের দিনে একবেলা অন্ন জোটে মাত্রআরও কোটি-কোটি দিনের-পর-দিন উপবাস করিয়া কাটায়রাজনীতিকে প্রগতিশীল জনহিতৈষী ধনবিজ্ঞানের কল্যাণসত্তার দ্বারা বিশোধিত করিয়া না লইলে আজকালকার দিনে সুশাসন ও সুস্থ উন্নত সমাজের অভিব্যক্তি কোনও ক্রমেই সম্ভব নয়’ (অর্থনৈতিক দিক

জীবনানন্দ মানুষের মূল্যাঙ্কন করেছেন এভাবে মানুষের জীবনযাত্রায় নেমেছেন। সেখানে শুভবোধের আশাও আছে আছে সংকল্প তবে সেদিন কবে আসবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও আছে জিজ্ঞাসা আছে নিজের মধ্যে সকলকে সচেতন করার প্রয়াস আছে আর আছে তৎকালীন মানবসমাজের প্রত্যক্ষ রূপ—

যারা শুধু বাঁচবার পথ চেয়েছিল

শিশিরে নিঃশব্দ হয়ে আছে

অন্ধ অন্নসমস্যার ঢেউ

এসে সব মুছে ফেলে গেছে

ঘর বাড়ি সাঁকো মাঠ পথ

একদিন আধ দিন ভাঙাগড়া হতে-না-হতেই

চিহ্ন নেই— সে সব মানুষ কেও নেই

রাত্রিদিন কাজ করে চলেছে লোকের ইতিহাস;

মানুষ সমাজ দেশ ধ্বংস করে তবু

জ্ঞান শান্তি বাস্তবতা প্রেমের আভাস' (নব-নব সূর্যে)

আবার দেশে-বিদেশে, নগরে-গ্রামে মানবতার অবক্ষয় রোধে নানা ইঙ্গিতবাহী কথা বলেছেন জীবনানন্দ সুষ্ঠ সমাজ যাতে গঠিত হয়, যাতে মানুষের শুভবোধ জাগ্রত হয় সেকথাও বলেছেন বহুবার সমাজ পরিস্থিতির নানা দিক তুলে ধরে মানুষের শান্তি কামনা আছে জীবনানন্দে তবে সেসব করতে গেলে মানুষকে সচেতন হতে হবে দেশীয় অর্থবিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞানকে আরও সচেষ্ট হতে হবে প্রতিটি মানুষ যাতে শান্তি কল্যাণ সুখের পথে এগিয়ে যেতে পারে সে বিষয়ে আমাদের আরও সক্রিয় হতে হবে মানবসভ্যতার অবক্ষয় চললেও সুস্থ জীবনের আশা-কল্পনা পূরণে আমাদের প্রত্যেকে সৎ আন্তরিক হতে হবে সুগঠিত সুসম্পর্কিত বিশ্বসমাজ যাতে অদূর ভবিষ্যতে রচিত হয়, সেটাই ছিল জীবনানন্দের অন্যতম উদ্দেশ্য মানুষ যাতে তার নূন্যতম মূল্যটুকু পায়, দেশ যাতে এগিয়ে যেতে পারে সর্বলোকের হাত ধরে, বিশ্ব যাতে অগ্রসর হয় বিশ্বভাতৃত্ব বিশ্বমৈত্রীর আলোকে তবেই কবির মনোবাঞ্ছা সফল হবে, শুভবোধের সূর্যদয়ে মানবতার আলোকে তাই কবির আশাও শেষ হয়নি

ইতিহাস-সঞ্চারিত হে বিভিন্ন জাতি, মন, মানব-জীবন

এই পৃথিবীর মুখ যত বেশি চেনা যায়চলা যায় সময়ের পথে,…

সফল মানব-প্রেমে উৎসারিত হয় যদি, তবে

নব নদী নব নীড় নগরী নীলিমা সৃষ্টি হবে

আমরা চলেছি সেই উজ্জ্বল সূর্যের অনুভবে’ (অন্ধকার থেকে)

 

 

  

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন