কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

মৌ চক্রবর্তী

 

ফ্ল্যাশব্যাকে থিয়েটারের পাঁচালি / এক প্রশংসাপত্র ও এক আলোকশিল্পী তাপস সেন

 


প্রতি,

হে পাঠক ও দর্শক, তাপস সেন আলোর জাদুকর, কে না জানেন! কিন্তু আলো, নাটকের কাজ কিভাবে অনুবাদ করা যায়? করেছি। অনেক সময় তাঁকে পড়ার মতো করে পড়েছিলাম। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে গেছি। কিন্তু তিনি বারবার ফিরে তাকাতে বাধ্য করছিলেন। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে জীবন। আর জীবনের আলোকে জানা। আর জানার আলোকে অনুবাদ, জানার মাঝে অজানারে সন্ধান। সেই তাড়নায় এই রিসার্চ ও ট্রান্সলেশন কাজ করার শুরু।

তাঁর জীবন যাপন কাহিনি অবলম্বনে রচিত হয়েছে অনুবাদ বই, প্রকাশ হয়েছে কলকাতা বইমেলায় সিস্টার নিবেদিতা ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। বইয়ের নাম "শ্যাডো অ্যান্ড স্পেকট্রা"। তাঁকে স্মরণ করি। প্রণাম জানাই সতত।

কিংবদন্তি শিল্পী তাপস সেন আলোর পথে পথে চলেছেন দীর্ঘ সময়। ১৬ আগস্ট ১৯৪৪ সালে শচীন সেনগুপ্ত তাঁকে এক  প্রশংসাপত্র দেন বা চিঠি। চিঠিতে লেখা ছিল— তিনি নাটকের দৃশ্য সম্পর্কে খুব পরিষ্কার ধারণা রাখেন এবং আলো ব্যবহার করে নাট্যপ্রযোজনায় তিনি খুব কার্যকর হতে পারবেন।

এই চিঠি তাপস সেন পরবর্তী জীবনেও সংরক্ষণ করেছিলেন। এই ঘটনা কয়েক কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

১. আলো নিয়ে প্রথম স্বীকৃতি, মানে এটাই ছিল আলো পরিকল্পনায় তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

২. নাট্য দর্শক থেকে কর্মী হওয়া, এই সময় তিনি শুধু দর্শক ছিলেন না। তিনি নাটকের কাজে যুক্ত হতে শুরু করেন।

৩. আলোকে নাটকের অংশ ভাবা, এই সময় থেকেই তাঁর ধারণা তৈরি হয়— আলো শুধু আলোকিত করার জন্য নয়, নাটকের পরিবেশ তৈরির জন্য।

নবান্ন থেকে অনেক অনেক সূত্র। তাপসের সঙ্গেও এরকম হ্য়। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন কলকাতায়। এই সময় তিনি কলকাতায় কাজ খুঁজছিলেন। তখনও তিনি বোম্বাইয়ের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। হ্যাঁ, বন্ধু সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি আসে। কিন্তু কলকাতায় স্থায়ীভাবে কাজ পাওয়া সহজ নাকি? সহজ নয় বরং কঠিন। এই ঘটনার পর থেকেই তাঁর নাট্যজীবনের প্রকৃত শুরু। তিনি পরে লিখেছেন— এই সময় থেকেই আলো ও মঞ্চ তাঁর জীবনের পথ তৈরি করে দেয়। এই অভিজ্ঞতাই তাঁর ভবিষ্যৎ আলো-পরিকল্পনার ভিত্তি হয়ে ওঠে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ — কারণ এখান থেকেই তাপস সেনের  আলোশিল্পীর জন্ম শুরু।

১৯৪৪ সাল তাপস সেন–এর নাট্যজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনাকাল হিসেবে ধরা যায়। এই সময় কলকাতায় ‘নবান্ন’ মঞ্চস্থ হয় এবং সেই প্রযোজনা তাঁর নাট্যভাবনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করে। তখন তিনি নিয়মিত  নাটক দেখতেন, কিন্তু কেবলমাত্র দর্শক হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকেননি; নাটকের আলো, মঞ্চসজ্জা এবং পরিবেশ নির্মাণ নিয়ে তিনি নিজস্ব চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে শুরু করেন। মঞ্চের আলো কেবল দৃশ্যমানতার জন্য নয়, নাটকীয়তার অংশ হিসেবেও ব্যবহার করা যায়— এই উপলব্ধির সূচনা ঘটে এই সময়েই।

এই সময় তিনি শচীন সেনগুপ্ত-এর একটা নাটক দেখেন, যার মঞ্চসজ্জা ও পরিবেশ তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। নাটকের বিভিন্ন দৃশ্য, বিশেষত রাজনৈতিক আবহের দৃশ্যগুলি তাঁকে আলো ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। নাটকের একটি বিশেষ দৃশ্যকে আরও নাটকীয় করে তোলার জন্য তিনি একটি অভিনব প্রস্তাব দেন। তাঁর ধারণা ছিল— একটি আর্কলাইটের সামনে একটি ছোট ছিদ্র তৈরি করা হলে সেই ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে পাক খেতে খেতে উপরের দিকে উঠবে, এবং এর ফলে দৃশ্যটির মধ্যে উত্তেজনা ও নাটকীয়তা আরও বৃদ্ধি পাবে। আলো এবং ধোঁয়ার এই সম্মিলিত ব্যবহার সেই সময়ের জন্য ছিল একেবারেই নতুন চিন্তা। না, এসব তথ্য জানান শুধু। নাটকের কাজ কল্পনা করাও দুঃসাধ্য। তাঁর এই প্রস্তাবটি পরিচালকের কাছে উপস্থাপন করা হলে তা প্রশংসিত হয় এবং তাঁর আলো-ভাবনার প্রতি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। এই ঘটনা ছিল তাঁর আলো-পরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রথম দিককার স্বীকৃত অভিজ্ঞতাগুলির একটা। পরবর্তীকালে এই কাজের জন্য তিনি চিঠি বা প্রশংসাপত্র লাভ করেন। যা দিয়ে এই লেখার সূচনা।  যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল যে নাটকের দৃশ্যমান বিন্যাস সম্পর্কে তাঁর ধারণা স্পষ্ট এবং আলো ব্যবহারের মাধ্যমে নাট্যপ্রযোজনায় তিনি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। এই সময়কাল তাঁর জীবনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই তিনি নাটকের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে যান। একজন আগ্রহী দর্শক থেকে ধীরে ধীরে তিনি নাট্যমঞ্চের কর্মী হয়ে ওঠেন। আলো যে নাটকের ভাষার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে, সেই উপলব্ধিই পরবর্তী সময়ে তাঁর সমগ্র কাজের ভিত্তি নির্মাণ করে। ১৯৪৪ সালের এই অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতে তাঁকে বাংলা এবং ভারতীয় নাট্যজগতে এক বিশিষ্ট আলোশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

প্রসঙ্গক্রমে, শচীন সেনগুপ্তের ‘রাষ্ট্র বিপ্লব’, এই নাটক তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। রাষ্ট্র বিপ্লব নাটকের মঞ্চসজ্জা তিনি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিলেন— রঙিন কাপড় ব্যবহার মঞ্চসজ্জার অভিনবত্ব, একটা ছোট জানালার ভিতর দিয়ে তাজমহল দেখা যেত। শাহজাহানকে কেন্দ্র করে নাটকের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। এই মঞ্চসজ্জা তাঁর কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়। তিনি পরে শচীন সেনগুপ্তের সঙ্গে আলোচনা করেন এবং তাঁদের মধ্যে এক ধরনের আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই যোগাযোগ থেকেই তিনি থিয়েটারে নিজের কাজের সম্ভাবনা খুঁজতে শুরু করেন।

আর্কলাইটের সামনে ছিদ্র করার ধারণা, রাষ্ট্র বিপ্লব নাটকের এক রাজনৈতিক দৃশ্য তাঁকে ভাবিয়ে তোলে।

তিনি এক ছোট আলো-পরিকল্পনার ধারণা দেন। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন— একটা আর্কলাইটের সামনে একটা ছোট ছিদ্র রাখা হবে। সেই ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া উঠবে। ধোঁয়া পাক খেয়ে উপরে উঠবে। এতে নাটকের পরিবেশ আরও তীব্র ও নাটকীয় হবে। এই ধারণা  সম্পূর্ণ নতুন ধরনের আলো ব্যবহার। এরপর পরিচালকের প্রতিক্রিয়া,  তিনি যখন এই ধারণাটি বলেন, তখন পরিচালক তা শুনে বলেন— "Ah! That's quite good."

অর্থাৎ ধারণাটি সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করা হয়। এটাই তাঁর আলো নিয়ে প্রথম স্বীকৃত কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম।

ওই নাটকে __ রঙিন কাপড়ের ব্যবহার, মঞ্চের বিন্যাস, ছোট একটি জানালার ভিতর দিয়ে দূরের দৃশ্য দেখানোর কৌশল— সবই তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। কিন্তু নাটকের এক রাজনৈতিক দৃশ্য তাঁকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়। সেই দৃশ্যে উত্তেজনা ছিল, সংঘর্ষের ইঙ্গিত ছিল— তবু তাঁর মনে হচ্ছিল, কিছু যেন কম আছে। তিনি বসে বসে ভাবছিলেন, কী করলে দৃশ্য আরও তীব্র হতে পারে। হঠাৎ তাঁর মনে  আর্কলাইটের ধারণা আসে।

...আর সেই ছিদ্র দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে পাক খেতে খেতে উপরে ওঠে— তাহলে কেমন হবে? এই দৃশ্যের জন্য তাঁর জীবনের কথা জানতে হবে।

তখন তিনি কেবল এক তরুণ দর্শক— নাট্যদলের কেউ নন। তবু সাহস করে তিনি নিজের কথা জানালেন।



পরিচালক মন দিয়ে শুনলেন। তারপর হেসে উঠলেন। "Ah! That's quite good." এই কয়েকটি শব্দ যেন তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল। মনে হল, তাঁর ভাবনাকে কেউ প্রথমবারের মতো গুরুত্ব দিল। এর কিছুদিন পরে তিনি এক প্রশংসাপত্র পেলেন। সেখানে লেখা ছিল— নাটকের দৃশ্য সম্পর্কে তাঁর ধারণা পরিষ্কার, এবং আলো ব্যবহারে তিনি নাট্যপ্রযোজনায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারবেন। যা ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ।

সেদিন হয়তো তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি— এই ছোট্ট ঘটনাটিই তাঁর জীবনের পথ বদলে দেবে। মঞ্চের অন্ধকারে বসে থাকা সেই তরুণ দর্শক ধীরে ধীরে আলোর মানুষ হয়ে উঠছিলেন। আলো তখন আর কেবল আলো নয়— আলো হয়ে উঠছিল ভাষা, অনুভূতি, নাটকের নিঃশব্দ সংলাপ।

আর ১৯৪৪ সালের সেই সন্ধ্যাগুলো— নাট্যমঞ্চের আধো-অন্ধকারে বসে থাকা— সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল তাঁর দীর্ঘ নাট্যপাঁচালি।

 __ইতি

একুশ শতকের এক ফ্ল্যাশব্যাক স্বত্বাধিকারী


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন