প্রতিবেশী সাহিত্য
কানাডীয় কবি অ্যালিস মেজরের কবিতা
(ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত)
কবি পরিচিতিঃ অ্যালিস মেজর একজন বিশিষ্ট
কানাডীয় কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের অন্তর্লীন সম্পর্ককে কাব্যে রূপায়িত
করার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে স্কটল্যান্ডে জন্ম নিয়ে পরবর্তী সময়ে কানাডায়
সুস্থিত হন এবং সমকালীন কানাডীয় কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
তাঁর কবিতায় পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের ধারণা কেবল উপমা নয়,
ভাবনার কাঠামো নির্মাণের উপাদান। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও মানবিক অনুভূতির মেলবন্ধন
তাঁর কাব্যের প্রধান শক্তি। Welcome to the Anthropocene ও Standard Candles গ্রন্থে
মহাজাগতিক সময়, আলো, স্মৃতি ও মানবঅস্তিত্ব নতুন ব্যঞ্জনা পেয়েছে। তিনি এডমন্টন শহরের
প্রথম কবি-লরিয়েটের সম্মান অর্জন করেন এবং কবিতাকে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্রিয়
ভূমিকা পালন করেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি University of
Alberta-এর সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন। বিজ্ঞানচেতনা দীপ্ত
কাব্যভাষা ও গভীর চিন্তাশীলতার জন্য অ্যালিস মেজর পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত
করে চলেছেন। দৈত্যরা ও নিয়তিদেবীরা Corona Radiata (2000) এবং লাল আকাশ যখন
Standard Candles (2015) কাব্য থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
দৈত্যরা
মেডিক্যাল ভ্রূণতত্ত্বের পাঠ্যবইয়ের উজ্জ্বল পৃষ্ঠা,
টেরাটোলজির অ্যাটলাস—
বিস্ময়করতার এক উপাখ্যান।
এ স্থানে বাস করে দৈত্যরা।
ভয়ংকর ও মোহময়—
আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় তাদের।
নিম্ন অঙ্গ জড়িয়ে গেছে মৎস্যকন্যার লেজে।
একচোখা সাইক্লপস।
বৃহত্তর ভ্রূণ থেকে পুতুলের মতো ঝুলে থাকা
এক যমজের মমি।
গন্নাকাটায় বিভক্ত মুখ,
কেরাটিনে বহুবর্ণিল।
নরখাদক ও
মানুষের মাথা
তাদের কাঁধের নিচে জন্মায়।
মার্জিনে অঙ্কিত এসব প্রাণী
সেইন্ট ব্রেন্ডানের দ্বীপ থেকে দূরের ভূখণ্ডের
অধিবাসী—তিমি সমুদ্রপৃষ্ঠে এত দীর্ঘকাল ভেসে থাকে
যে তার পিঠে গাছপালা, ঝোপঝাড় জন্মায়।
এক বিস্ময়—
এ আবিষ্কারের অভিযাত্রা থেকে
আমরা একটি মানবশিশুকেই
ফিরিয়ে আনতে পারি।
নিয়তিদেবীরা
এবং ডিমের ভেতরে সুরক্ষিত
শুধু জন্ম নয়,
মৃত্যুও: নিয়তিদেবীরা, সেই তিন অদ্ভুত বোন,
ক্ষুদ্র ও পরিমিত, হাতে তাদের কাঁচি।
প্রতিটি ক্রোমোজোমে আবর্তিত প্রান্ত
নিরাপদ—অতি সূক্ষ্ম এক পাকানো বন্ধনী
হেলিক্সকে ধরে রাখে স্থির। তার দৈর্ঘ্য
প্রথম কোষেই কাটা হয়েছিল এবং প্রত্যেক বিভাজনে
বছর ঘুরে তা একটু একটু করে
ছোটো হয়ে আসে। যতক্ষণ না কাটার মতো
কিছুই অবশিষ্ট থাকে এবং সব আলগা হয়ে
কোষগুলো বিলীন হয়ে যায়।
নিয়তিদেবীরা সমস্ত সমুদ্রের নিচে
শুয়ে থাকা পৃথিবীকে
এ প্রতিশ্রুতি দেয় :
এ শিশু একদিন ফিরে আসবে প্যাঁচানো নাড়ির কাছে,
যা তার জন্মের সময় তার লোকেরা মাটিতে পুঁতে রেখেছিল,
তাদের অঙ্গীকার সে তোমার কাছেই ফিরে আসবে;
তাদের আর্তি তুমি যেন তাকে অবধারিত সময়ের আগে দাবি
না করো।
জাহাজকে ঘরে ফেরাবার জন্য
নিয়তিদেবীরা লিখে রাখে চুক্তিপত্র ও মানচিত্র।
লাল আকাশ যখন …
জানুয়ারি। ধূসর ভোরের আকাশ।
বাতাস উষ্ণ,
অসময়োচিত
গতকাল যে তুষার ছিল অজেয়,
তা নরম হচ্ছে। কাকেরা
মৃদু বিস্ময়ে কর্কশ স্বরে
ডাকে যেন তুষার দ্রাবণের দেবতাকে জানায় কৃতজ্ঞতা।
চুল্লি
থেমে যায়,
এবং তার নীরবতার
প্রভাবে, ভাবনাগুলো
পরিশ্রুত ও আন্দোলিত হয়ে ওঠে,
নিঃশব্দ বাতাসে সরে যাওয়া
বিড়ালের লোমের মতো।
ভাবনা, অবশ্যই
কৃতজ্ঞতার,
বরফের মুক্তি, এবং
চিকাডিদের সুরেলা কণ্ঠে কুহরিত
পরম সুখের জন্য—
“ধন্য আমরা,
বিগত নিষ্ঠুর সপ্তাহগুলোর
ঋণাত্মক বিশ ডিগ্রি শীত পেরিয়ে
টিকে থেকেছি।”
কিন্তু ধীরে,
আকাশ লাল হয়ে ওঠে—
এবং তার অর্থ ‘সতর্কবার্তা’।
এ মুহূর্তে নয়,
এ কোমল সকালে নয়।
বিপদ তার মতো এতটা
আসন্ন নয়। কিন্তু কিছু
ঘটনা ও কিছু পূর্বলক্ষণ
রয়েছে যা পূর্বাভাসে
পরিবর্তনকে
দৃশ্যমান করে। শীত
অদ্ভুত হয়ে উঠছে।
ভবিষ্যতের জন্ম-নাড়ি
পাক খেতে খেতে
আবির্ভূত হচ্ছে এবং আমরা
ঘূর্ণির ভেতর
জড়িয়ে আছি
চুল্লি আবার জ্বলে ওঠে,
এবং আমিও।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন