![]() |
| কবিতার কালিমাটি ১৫৫ |
দৃষ্টি ও প্রবৃত্তি
দৃষ্টির ভেতর এক অদ্ভুত ঐশ্বর্য অনাবিষ্কৃত থাকে। চোখের আলোকরাজ্য মুহূর্তের জন্য খুলে দেয় প্রচ্ছন্ন ফটক।
একজন রমণী আজ আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। ব্যক্তিগত
ইতিহাসে তার নাম মুদ্রিত নেই, অভিন্ন ভাষার সংকেতও কোনো দিন হয়নি উন্মোচিত— শুধু দুটি
চোখের ভেতর জেগে উঠেছিল একটি সেতু, গোপনতার গিরিখাতের ওপর কম্পমান।
তার নাম জানি না, তার অস্তিত্বের ভূগোল অজানা।
তবে তার চোখের ভেতর আমি দেখেছিলাম জলজ ফুলের প্রশান্ত রূপ।
আমার কাছে এ রূপ অসামান্য— নিরলংকার এক সৌন্দর্য
দ্রুত দৃশ্যপট থেকে মিলিয়ে গেল।
আমি রোদে হাঁটছিলাম। সূর্য আমার স্যাঁতসেঁতে ত্বকের
শুশ্রূষায় অকৃপণ হয়ে উঠেছিল।
আমার শরীরে ডি ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু দেহের
দীনতা ও দৃষ্টির অভাব অভিন্ন নয়।
চোখের ভাষা পড়বার ক্ষমতা আমি হারাইনি। পল্লবের
ক্যালিগ্রাফি, দূরের স্পন্দনের দিকে ঘুরে যাওয়া চোখের প্রতীকতা আমার কাছে দুর্বোধ্য
নয়।
আমার অদূরে দাঁড়িয়েছিল একটি যুবতী কুকুর; দুপুরের
উত্তাপ তাকে ভস্ত্রিকা অনুশীলনের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল।
হঠাৎ এক বলিষ্ঠ কুকুর তার দিকে ছুটে এলো; বাতাসের
প্রবাহ ভেঙে টুকরো হলো।
যুবতীটি দ্রুত একটি পার্ক করা গাড়ির নিচে ঢুকে
পড়ল— ধাতু ও ধুলোর আশ্রয় তার কাছে অর্থময় হয়ে উঠেছিল ।
তার পেছনের পা দুটি আংশিক প্রসারিত— ঝুঁকি ও প্রবৃত্তির
নির্মম ব্যাকরণের সামনে উন্মুক্ত।
পুরুষটি ঝুঁকে তার যোনি চাটতে লাগল— বংশগত তাড়নার
একাগ্রতায়।
চতুষ্পদী প্রাণীর কামনা রূপকাশ্রিত নয়। তাদের আকাঙ্ক্ষার
ভেতর নিজের গলিত মোমে ক্ষয়ে যাওয়া মোমবাতির ইতিবৃত্ত নেই, বিগত দিনের স্মৃতি বা ভবিষ্যতের
ভয় নেই।
কিছুক্ষণ পর সে বসে পড়ল; হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিল,
তার জিভ ডানে-বামে দুলে ক্লান্তি পরিমাপক দোলক হয়ে উঠেছিল।
আমার সূর্যদগ্ধ ত্বকে দৃষ্টিনিয়ন্ত্রিত রাজ্যের
ধুলো লেগে থাকল; জলে প্রক্ষালন-অযোগ্য।
সিকাডা
সিকাডার তীব্র গানে কেঁপে ওঠে অপরাহ্নের রোদ। তাদের সুর মানুষের মগ্নতা স্পর্শ করে না। তবে তাদের সঙ্গীত-মগ্নতা বিস্ময়কর।
শ্রুতদেবীর আবির্ভাবের আগে পৃথিবীতে সিকাডার অস্তিত্ব
ছিল না। কিছু প্রশস্ত গুহার ভেতর শ্রুতদেবী কিন্নরীদের নিয়ে বৃন্দগানের আয়োজন করেছিলেন।
কিছু মানুষ সংগীতের ভেতর খুঁজে পেল নির্বাণসূত্র। তারা অস্তিত্বের স্থূল দাবিকে অস্বীকার
করল।
তারা সুগন্ধী ধোঁয়ায় সুর মেশাতে থাকল— গীতল ধোঁয়ার
অনিঃশেষ ঘূর্ণির দিকে তাকিয়ে তারা ক্ষুধা ভুলে গেল। মৃত্যুদূত ছিনিয়ে নেয় তাদের উষ্ণ
নিশ্বাস। তবে তাদের করোটি থেকে প্রসূত হয় সিকাডা— তাদের চেতনায় অন্তহীন গানের অঙ্গীকার।
শ্রুতদেবী সঙ্গীতে সোমরস মিশ্রিত করেছেন বলে সিকাডাদের
আহার্যের প্রয়োজন নেই; সংগীতই তাদের অন্নজল। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি তারা অবিরাম গান
গায়, আনন্দে থাকে।
তারা সময়কে সুরের সমার্থক বলে চিহ্নিত করে। বর্তমানই
তাদের উদযাপনকাল; অতীত ও ভবিষ্যৎ তাদের কাছে মূল্যহীন।
আমরা অতীত ও বর্তমানের ভেতর আন্দোলিত হতে থাকি
এবং ভবিষ্যতের নকশা প্রস্তুত করি। আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিয়ত জীবন্ত রাখি। সিকাডারা কখনো
দূরদর্শী হতে চায় না।
তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন নেই— ক্ষণিকতার স্পন্দনের
ভেতর তারা জাগ্রত। কালপ্রবাহের দর্শন তাদের কাছে জ্ঞাতব্য নয়। নিজেদের মৃত্যুও তারা
টের পায় না— আকস্মিকভাবে থেমে যায় তাদের গান।
সতর্ক নাগর নিরাপত্তা খোঁজে, অগ্নি স্পর্শ না করে
শৃঙ্গার ও শান্তি চায়। সিকাডার রীতিচরিত্র ভিন্ন: তারা অগ্নিগৃহে নিজেদের উৎসর্গ করে।
তারা অপচয়ী, কোনো দিন অনুসন্ধান করেনি জীবনের
নতুন অর্থ। তাদের কাছে স্থায়িত্বের ধারণা অমূলক।
তারা আর মানুষ নয়, স্মরণ করতে পারে না পূর্বজন্মের
ইতিবৃত্ত। ক্ষুধা, কর্ম, বিশ্রামের চক্রগতি ভুলে বাসনা ও জিজীবিষার দ্বন্দ্বে তারা
বাসনাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে।
আমরা তাদের অনুসরণ করতে পারি না। আমরা লিখতে লিখতে
ফোনকল ধরি, কফি পান করি। আমাদের শরীরে ঘড়ির কাঁটার অনিবার্য ধ্বনিময়তা— সূর্যাস্তের
দীর্ঘ ছায়ায় কাঁপে আমাদের অস্পষ্ট পদধ্বনি।
সিকাডারা কখনো কখনো মানুষকে ঈর্ষাপরবশ করে তোলে।
মানুষের চেয়ে তাদের রয়েছে সীমা অতিক্রমণের অদ্ভুত সামর্থ্য।
সিকাডাদের গান শ্রবণমধুর নয়। তাদের স্বরের ভেতর
তীক্ষ্ণ যন্ত্রধ্বনির আধিপত্য লক্ষণীয়। গানের ভেতর দিয়ে সিকাডারা রিতোর্নেলের উপযোগিতা
প্রচার করে।
তাদের ভেতর মানবত্বের লেশমাত্র নেই। জন্মস্মৃতি
ভুলেছে বলে তারা মানুষের কাছাকাছি থাকে না। মানুষের যুক্তির প্রতি তাদের ঔদাস্য প্রবল।
সন্ধ্যায় পৃথিবী শীতল হলে তাদের স্বর ক্ষীণ হয়ে
আসে। শেষ সুর ও প্রথম আলোর মাঝখানে একটি জীবন বর্তমানের ভেতর পূর্ণ হয়। আমরা ভাবি এবং
আশ্চর্য তৃষ্ণা নিয়ে নিশ্চুপ থাকি। তারা গাইতে গাইতে স্তব্ধতার ভেতর চলে যায়।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন