কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

মৌসুমী মুখোপাধ্যায়

 

সমকালীন ছোটগল্প


আকাশ কারো একার নয়

চিলেকোঠার জানালাটা সেই কবে থেকে খোলে না। তবু আজ সন্ধেবেলা অনিরুদ্ধ সেটাকে ঠেলে একটু ফাঁক করেছিল। বাইরে আকাশের রঙ অদ্ভুত—নীল না ধূসর, বোঝা যায় না। যেন কারও ভেতরের দোটানা উঠে এসে মেঘ হয়ে গেছে।

রেডিওতে শব্দ ভাসছিল, কিন্তু কোনো নাম স্পষ্ট নয়। কেবল বলা হচ্ছে—“উত্তেজনা বাড়ছে”, “নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত”, “সীমান্তে গোলাগুলি”— শব্দগুলো একেকটা অদৃশ্য বুলেটের মতো ঘরে ঢুকছে। অনিরুদ্ধ শব্দ কমিয়ে দেয়। সে জানে, নাম উচ্চারণ না করলেও ইতিহাস নিজের পথ খুঁজে নেয়।

তার মা ভেতর ঘর থেকে ডাকেন, “এইসব খবর শোনা বন্ধ কর। যুদ্ধ হলে কি তুই থামাতে পারবি?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দেয় না। সে জানে, যুদ্ধ কেউ একা থামাতে পারে না। আবার এটাও জানে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই মানুষের ভেতরে তার ছায়া জন্মায়।

এই শহরটা সমুদ্র থেকে অনেক দূরে, তবু আজ বাতাসে নোনাধারা গন্ধ। যেন দূরের কোনো বন্দরে আগুন লেগেছে। অনিরুদ্ধের ফোনে বার্তা আসে— একজন লিখেছে, “প্রতিরোধের প্রতীক শেষ।” আরেকজন লিখেছে, “গুজব, বিশ্বাস করো না।” সত্যি কোথায়? সত্যি কি কেবল ঘোষণাপত্রে থাকে?

অনিরুদ্ধ পেশায় অনুবাদক। সে বহুদিন ধরে এমন ভাষা অনুবাদ করে, যেগুলো সংবাদে আসে না— কারাগারের চিঠি, নির্বাসিত কবির ডায়েরি, এক তরুণীর অসমাপ্ত উপন্যাস। সে জানে, রাষ্ট্রের ভাষা সংক্ষিপ্ত; মানুষের ভাষা দীর্ঘশ্বাসে ভরা।

রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে সে মোম জ্বালায়। আলোয় তার ছায়া দেয়ালে বড় হয়ে ওঠে। ছায়াটাকে দেখে মনে হয়, আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে— যে প্রশ্ন করে, “তুমি কাকে সমর্থন করো?” অনিরুদ্ধ ভাবে, সমর্থন কি এত সরল? একজন মানুষ একসঙ্গে অত্যাচারীও হতে পারে, আবার কারও কাছে প্রতিরোধের প্রতীকও।

তার বন্ধু সায়ারা দূরের এক শহরে থাকে। সে ভিডিও কল করে জানায়, “এখানে সবাই আতঙ্কে। কেউ বলছে আকাশে কিছু দেখা গেছে। কেউ বলছে কিছুই হয়নি। আমরা জানালা বন্ধ করে বসে আছি।”

অনিরুদ্ধ জানালার বাইরে তাকায়। তার আকাশ শান্ত। কিন্তু সে বুঝতে পারে, আকাশ কখনও নিরপেক্ষ নয়। কোথাও না কোথাও সে কারও মাথার ওপর নেমে আসে।

পরদিন সে বইয়ের দোকানে যায়। দোকানের ভেতর এক তরুণী পুরনো আইনপত্র খুঁজছে। তার নাম মীরা। গবেষণার বিষয়— “শরীর ও শাসন।” মীরা বলে, “কোনো রাষ্ট্র যখন মানুষের পোশাক ঠিক করে দেয়, তখন সে কেবল কাপড় নিয়ন্ত্রণ করে না, স্বপ্নও নিয়ন্ত্রণ করে।”

অনিরুদ্ধ তাকিয়ে থাকে। মীরার চোখে একধরনের ক্লান্ত সাহস। সে জানায়, তার এক আত্মীয়া বহু বছর আগে রাস্তায় নেমেছিলেন। ফিরে এসেছিলেন, কিন্তু আর কখনও জোরে হাসেননি। আরেকজন আত্মীয় সাম্প্রতিক এক বিক্ষোভের পর থেকে নিখোঁজ।

অনিরুদ্ধের মনে হয়, ইতিহাস আসলে পরিবারের ভেতর ঢুকে পড়ে। আমরা ভাবি, সেটা বড় মঞ্চের নাটক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা রান্নাঘরের চুলোর পাশে এসে দাঁড়ায়।

দুপুরে খবর আসে— মৃত্যুর যে গুজব ছড়িয়েছিল, তা নিশ্চিত নয়। তবু উত্তেজনা কমে না। সামাজিক মাধ্যমে শব্দের ঢেউ। কেউ শোক জানায়, কেউ উল্লাস, কেউ সন্দেহ। অনিরুদ্ধ দেখে, সত্যের চেয়ে দ্রুত ছুটে যায় আবেগ।

সন্ধ্যায় সে নদীর ধারে বসে। নদী বহমান, উদাসীন। তার পাশে এক বৃদ্ধ বলছেন, “যুদ্ধ হলে বাজারে আগুন লাগবে।” বৃদ্ধের চোখে রাজনীতি নেই, আছে হিসেব। এই হিসেবই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে নির্মম।

অনিরুদ্ধ ভাবে, তার দেশ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে দূরের আগুনের তাপ এসে লাগে পেট্রলের দামে, চাকরির বাজারে, কূটনৈতিক ভারসাম্যে। যুদ্ধ কেবল মানচিত্র বদলায় না; মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাস বদলায়।

রাতে সে লিখতে বসে। গল্পের নাম দেয় না। গল্পে একজন তরুণী— নাম ইলা। সে বিজ্ঞান পড়তে চেয়েছিল, কিন্তু বারবার তাকে বলা হয়েছে, “এভাবে পোশাক পরো না”, “এভাবে কথা বলো না”, “এভাবে হেঁটো না।”  ইলা একদিন ছাদে উঠে মাথার কাপড় খুলে বাতাসে ধরে রাখে। কাপড়টা উড়ে যায় না; বাতাসও ভয় পায়।

গল্পে আরেকজন— রাশেদ। সে দূরের মরুভূমি-ঘেরা শহরে শ্রমিক। তার ভয়, যুদ্ধ হলে সে ঘরে টাকা পাঠাতে পারবে না। সে রাজনীতি বোঝে না; বোঝে মাসের শেষে হিসেব মেলাতে না পারার লজ্জা।

আর আছে অধ্যাপক অয়ন— যিনি ইতিহাস পড়ান। তিনি ক্লাসে বলেন, “প্রতিটি যুগ নিজেকে চূড়ান্ত মনে করে। তবু সভ্যতা ভাঙে, আবার গড়ে।” কিন্তু ঘরে ফিরে তিনিও টেলিভিশনের সামনে বসে আতঙ্কে চ্যানেল বদলান।

অনিরুদ্ধ বুঝতে পারে, তার নিজের ভয়ও গল্পে ঢুকে পড়ছে।

মাঝরাতে সে এক পুরনো উক্তি মনে করে— যদি তৃতীয় বৃহৎ যুদ্ধ হয়, চতুর্থটি হবে আদিম অস্ত্রে। সে কল্পনা করে, সভ্যতার চকমকে মুখোশ খুলে গেলে আমরা কেমন হব? আমরা কি তখনও কবিতা লিখব? নাকি কেবল খাদ্যের জন্য লড়ব?

পরদিন মীরা আবার আসে। সে বলে, “একজন মানুষকে নিয়ে আমরা হয়তো দুই বিপরীত ছবি দেখি। কেউ তাকে নায়ক বানায়, কেউ খলনায়ক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তার আমলে যারা হারিয়ে গেছে, তাদের নাম কে উচ্চারণ করবে?”

অনিরুদ্ধ বলে, “আর যুদ্ধ শুরু হলে যারা মরবে, তাদের নাম?”

মীরা চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “তাই হয়তো আমাদের নামহীন গল্প লিখতে হবে।”

দিন যায়। যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় না, আবার শেষও হয় না। গুজব, বিশ্লেষণ, নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা হুমকি— সব মিলিয়ে এক ঝুলন্ত সময়। বাজারে দাম বাড়ে। মানুষ সঞ্চয় শুরু করে। কেউ বিদেশে থাকা ছেলেকে ফোন করে বলে, “ফিরে আয়।” কেউ বলে, “এখন নয়।”

একদিন অনিরুদ্ধ একটি চিঠি পায়— অচেনা কারও কাছ থেকে। লেখা, “আমরা এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু প্রতিদিন মনে হয়, বেঁচে থাকাটাই যেন সংবাদ।”

এই বাক্য তার বুকের ভেতর কাঁপন তোলে।

গল্পের শেষ দৃশ্যে ইলা ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকায়। সে জানে না, কোনটি তারা, কোনটি নজরদারির যন্ত্র। তবু সে ফিসফিস করে বলে, “আকাশ কারও একার নয়।”

রাশেদ ফোনে মায়ের কণ্ঠ শোনে। সে কিছু বলে না, শুধু শোনে। অয়ন তার বইয়ের প্রান্তে লিখে রাখেন— “যুদ্ধ মানে স্মৃতির পুনর্লিখন।”

আর অনিরুদ্ধ, চিলেকোঠার জানালার পাশে দাঁড়িয়ে, ভোরের আলো দেখে। আকাশে হালকা রঙ ছড়িয়ে পড়ছে। এখনো বিস্ফোরণ নেই, কিন্তু ভয় আছে। তবু আলোও আছে।

সে জানে, নাম উচ্চারণ না করলেও সত্যি মুছে যায় না। আর মানুষ, যত ভঙ্গুরই হোক, কেবল গুটি নয়। তাদের আছে পরিবার, স্বপ্ন, অপূর্ণতা।

পৃথিবী হয়তো দাবার ছক। কিন্তু ছকের প্রতিটি ঘরে একেকটা হৃদস্পন্দন।

অনিরুদ্ধ মোম নিভিয়ে দেয়। ভোরের আলো যথেষ্ট। বাইরে পাখির ডাক। যেন পৃথিবী এখনও শুরু করতে চায়— আবার, নতুন করে।

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন