![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
নিউটনের প্রথম গতিসূত্র
শেষ পর্যন্ত কিছুটা সময়, শ্যামল একান্ত নিজের করেই চায়। এই চাহিদায় তো আপাতভাবে কোন দোষ নেই। অনেকেই এমন একটা আড়াল চাইতেই পারে যেখানে সে নিজের মতো করে অবকাশ পাবে, একটু চাপমুক্ত হবে। কেউ কেউ অবশ্যই বলতে পারে, এটা পলায়নবৃত্তি। সরাসরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় অসমর্থরা এরকমটা ভাবে। কিন্তু পরিস্থিতি প্রবল প্রতিকুল হলে, অথবা একই অতি অপ্রিয় ঘটনার ক্রমাগত পুনরাবৃত্তিতে এ রকমটা হতে পারে। একঘেয়ে যাপন থেকে মুক্তি পেতে কিংবা ক্রমাগত মনের চাহিদার বিরুদ্ধে ঘটতে থাকা নানা ঘটনার অভিঘাতে। যা ঘটছে সেটা সহ্য করা যাচ্ছে না অথচ নিজেরও কিছু করার নেই।
কিন্তু অতি সাধারণ (গায়ের রং মাঝারি,
উচ্চতা মাঝারি, সাহস প্রায় নেই, সমাজে তেমন কোনো গুরুত্ব নেই, মুখের মধ্যেও আহামরি কোন আকর্ষণ নেই, অর্থাৎ
কিনা চমকে দেয়ার মতো কিচ্ছুটি নেই) এই মানুষটির ব্যাপারটা একটু ভিন্ন রকম। সে চায়
এমন সময় যেখানে তার ব্যক্তিগত সময় থেকে কেউ
হাত মারতে আসবে না, সব পরাজয় ভোলা যাবে নিজের মতো করে। তার একা থাকার অনুভবে
সাময়িক বিস্মরণে কোন ব্যাঘাত ঘটবে না। এমন কী কোন মানুষ, প্রাণিকে সে দেখতে পাবে না।
অসীম ব্রহ্মাণ্ডে সে একা, অপরিসীম প্রকৃতির মাঝে অন্য কেউ নেই। ফলে যা ঘটছে সেটা মিথ্যা,
অন্তত বাস্তবটা চোখের আড়াল হয়ে যাবে।
মাঝেমধ্যে কোন কোন খন্ডকালকে জমাট
বাঁধা স্থির বরফের টুকরোর মতো মনে হয় তার। সময়টাকে স্পর্শ করলে শীতের অনুরণন হিল্লোল
তুলে হাতের আঙুল থেকে লঘু মস্তিষ্ক পর্যন্ত ওঠানামা করতে থাকে। শরীরের মৃদু কম্পন ক্রমে
আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখন খেয়ালই থাকে না, অন্য কারও উপস্থিতি। উপলব্ধিতে আসে বিশাল
চরাচরে একটিই মাত্র জীবিত সত্তা সে। যেন অনন্ত মহাকাশে গাঢ়তম অন্ধকারে একাই একটি রহস্যকে
কেন্দ্র করে পাক খাচ্ছে। তীব্র বেগে সমস্ত পরিচিত জগত সংসারকে অবলীলায় পিছনে ফেলে
প্রচন্ডভাবে একক একটা বিচিত্র ঘূর্ণন। এ রকমটা তার মনে হয়, হয়তো বা তখন বাস্তবে
সূর্যালোকিত মধ্যাহ্ন, গ্রীষ্মকালের অন্তিম পর্ব। সে সব বর্হিবিশ্ব যেন ম্যাজিকের জাদুকাঠির
ছোঁয়ায় ভ্যানিশ হয়ে যায়। এটা অবশ্যই তার আরোপিত ব্যাপার। নিজের ভিতর কল্পনায় তৈরি
করা।
অনেক মানুষ এটা পারে, হঠাৎই বহুজনের
মাঝখান থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ একা করে ফেলে। এরা কথা বলতে বলতে অন্যমনস্ক হয়ে যায়,
যেন দূরবর্তী কোন অপার স্থানে নিমেষে চলে গেছে। এসব কোন কিছুরই ক্ষমতা নেই শ্যামলের।
বরং তার ব্যাপারটা ঠিক উল্টো, যখন যেখানে সেখানেই সে একশো শতাংশ। নিজেকে গুটিয়ে নিতে
সে পারে না। জীবনে কয়েকবার সে মিছিলে হেঁটেছে, কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎই সম্বিত ফিরে
উপলব্ধি করেছে আশেপাশে যারা তাদের সকলের থেকে সে বেশি উত্তেজিত, সবথেকে জোরে চিৎকার
করে স্লোগান দিচ্ছে। অথবা ফুটবল মাঠে টিকিট কেটে গ্যালারিতে বসে খেলা শুরু হওয়ার
একটু পরে এমন করে হাত-পা ছুঁড়তে আরম্ভ করত, যে পাশেরজন অবধারিত ভাবে বলতই - দাদা,
একটু আস্তে। বহুজনের মধ্যে থেকে নিজের মনকে কপালের মাঝখানে নিয়ে স্থির হও নিজের এতে
কনসেন্ট্রেশন বৃদ্ধি হয়। নিজেকে বাহ্যিক ভালোমন্দের থেকে আলাদা করা যায়, তারা নিশ্চিত
ভাবে বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনায় অবিচলিত থাকতে পারে। কিন্তু শ্যামলের মন অস্থির, সে
এসব পারে না।
এই ধরনের কৃত্রিম একাকিত্ব সে চাইছে না। শ্যামল ভালোভাবেই জানে তার এলোমেলো স্বভাবের কথা। যখন যেখানে সে জুতে যায় সেখানেই দাপাদাপি, হুল্লোড় করতে থাকে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিষয়টিকে সে চাটতে থাকে। উপভোগ করতে করতে একটা আবিলতায় আচ্ছন্ন হয়েও তার স্বাদ মেটে না। শ্যামলের এই নাছোড় স্বভাবের জন্য অনেকের তীর্যক কৌতুকের সামনে গুটিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। শুনেছে, ‘লেগে গেছে শালা চিটে গুড়ে পিঁপড়ে, এখান থেকে আর নড়াচড়া করবে না।’ শুনেছে আর কষ্ট পেয়েছে, অশান্তিতে অস্থির হয়েছে কিন্তু নিজেকে পাল্টাতে পারেনি। যে কোন পরিবর্তন মানুষের ইচ্ছের উপর নির্ভর করে না। কোনটা ঘটে, কোনটা ঘটে না। আসলে মানুষ জন্ম থেকেই কিছু স্বভাব নিয়েই আসে, যার উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। শ্যামলের ব্যাপারটা সেইরকম।
এই যে, সে যখন
মোবাইল ঘাটে না, ফোন করা আর ধরা ছাড়া এই যন্ত্রটার যে অন্য কোন ভূমিকা আছে
তা ওর মনেই থাকে না। দিন যায়, রাত যায়, সময় যায়, এরকমভাবেই। তারপর হয়তো বা, কোন
এক কালে ধীরে, অতি ধীরে সে ঢুকে গেল সোস্যাল মিডিয়ার জগতে। বলা চলে, যেন বা নিজের
অজান্তেই। প্রথমে একটু একটু করে, পরে নাছোড়ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে ফেলে সেই ভার্চুয়াল
জগতটাকে। তখন শ্যামলের কাছে রিয়াল, আনরিয়ালের পার্থক্য থাকে না। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে
আঠেরো ঘন্টাতেই অন্যরা মোবাইল খুললেই দেখতে পায় শ্যামল মিত্রের নামের পাশে সবুজ আলো
জ্বলছে। অর্থাৎ সে অনলাইন। যতক্ষণ জাগরণে ততক্ষণই মোবাইলে। অথবা, ধরাযাক কোন এক বন্ধুর
বাড়িতে যেতে শুরু করলো সে, তো রোজই তার বাড়ি, দিনক্ষণ নেই, সাঝসকাল নেই। বন্ধুর বাড়িতে
উপস্থিত সে। বন্ধু বিরক্ত হচ্ছে, বন্ধুর বউ রেগে টং হয়ে যাচ্ছে। নিজেদের ব্যক্তিগত
সময়ে সব সময়ে একজন বহিরাগত! কার বা ভালো লাগে। যদিও সে চট করে অন্যের সাংসারিক ব্যাপারে
নাক গলায় না। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, শ্যামলের সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা এতোই তীব্র
যে অনেক সময়ই তার উপলব্ধিতে আসে না, সে অন্য সংসারের একজন বহিরাগতমাত্র। দিন কুড়ি
পরে ওই বাড়ি থেকে শ্যামল হাওয়া, হাওয়া তো হাওয়াই। বন্ধুটির সঙ্গে রাস্তায় দেখা
হলে এমন ভাবে চলে যেতেই পারে শ্যামল, যেন সে বন্ধুটিকে চেনেই না। ডাকলে, কথা বললে স্পষ্ট অস্বস্তিতে, এড়িয়ে
যাওয়ার চেষ্টা। এরকমই অদ্ভুত মানুষ শ্যামল মিত্র। কখন যে কী মতি হবে তার, তা বলা
মুশকিল। ছোট থেকেই নিজের নামটা নিয়ে খুবই অস্বস্তিতে। যে বয়সে তার বোধ জেগেছে, সেদিন
থেকেই ভেবেছে, কেন তার নামটা তার বাবা এরকম দিলেন? এটাতো ঠিক, বাবা বিধান মিত্র-র নিজেদের
পদবী পাল্টাতে পারতেন না, কিন্তু ছেলের নামটা তো নিজেই ঠিক করেছিলেন। এও জানতেন, নামের
পরে তাদের অপরিবর্তনীয় পদবীটা যুক্ত হবেই। এর অন্যথা কিছুতেই হতে পারে না। এমন নয়
যে তিনি সংগীত সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন ছিলেন। তিনি বিলক্ষণ শ্যামল মিত্রের গান শুনতেন এবং পছন্দ করতেন। মাঝেমধ্যে তিনি কিঞ্চিত বেসুরে
গলায় নিজের মনে মনে গাইতেন– ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যায়‘ অথবা ‘ঝিরি ঝিরি বাতাস কাঁদে,
তোমায় মনে পড়ে’। তবু তিনি সচেতনভাবে নিজের
ছেলের এই বিড়ম্বনা সৃষ্টি করলেন। এরকমটা অনেক সময় হয়, বাবা অতশত না ভেবে সন্তানের
জীবনে বিড়ম্বনা তৈরি করেন। শ্যামলের একমাত্র বোনের নাম বিধান মিত্র দিয়েছিলেন, ইলা
মিত্র । তার তো গোলাম কুদ্দুসের ওই কবিতাটাও বড় প্রিয় ছিল। কোন দুপুরে অথবা মধ্যরাতে
গলা ছেড়ে তিনি বলতেন, একটা কবিতা। তার পুরোটা শ্যামলের মনে না থাকলেও একটা অংশ মনে
আছে – ইলা মিত্র স্ট্যালিন নন্দিনী, ইলা মিত্র ফুচিকের বোন। আজ শ্যামল বুঝতে পারে,
বিধান মিত্র-র একটা গোপন স্বপ্ন ছিল, সমাজ বদলের। কিন্তু সাহস ছিল না। ফলে ঘরে তিনি
মাঝে মাঝেই উত্তেজিত হয়ে উঠতেন। অস্থির হতেন। কিঞ্চিত অশালীন ভাষায় শাসকদের গালাগালি দিতেন। ছোট্ট ফ্ল্যাটটার বসার ঘরে বাঘের
মতো পায়েচারি করতেন। বোধহয়, তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলে-মেয়ে এমন একটা কিছু করুক যাতে
সমাজের অনেকে তাদের চেনে। এবং মোহিত বিস্ময়ে
তারা বলে, ‘এরা বিধানবাবুর ছেলে-মেয়ে’।
মনে পড়ে ছোটবেলায় অনেকে তাকে
দেখলে জিজ্ঞেস করতেন – খোকা তোমার নাম কী? ছেলেটি বলতো শুধু নামটা, শ্যামল। তারপর
অবধারিত দ্বিতীয় প্রশ্ন, টাইটেল কী? অগত্যা বলতে হত, পুরো নাম, শ্যামল মিত্র। সঙ্গে
সঙ্গে - বাঃ, বাঃ বলে তারিফ এবং মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা ‘নিশ্চয় গান গাইতে পারো?’ মাথা
নেড়ে না বললে, প্রশ্নকর্তা কিঞ্চিত মজা করে বলতেনই, ‘সে কী শ্যামল মিত্র গান গাইতে
পারে না!’ তারপর একটা হাসি। গা জ্বলে যেতো শ্যামলের। মনে হতো, গোটা পৃথিবীটা তার গান
গাইতে না পারা নিয়ে রসিকতা করছে।
ঠিক তখন থেকেই কিনা বলা যায় না,
শ্যামল অন্য অনেকের থেকে অনেকটাই ইন্ট্রোভার্ট। সহজে তার মনের গতিপ্রকৃতির সন্ধান পাওয়া
মুশকিল। আকাশে মেঘ দেখলেই যেমন বলা যায় না, বৃষ্টি হবে কিনা, তেমনি এই মানুষটিকে দেখে
বোঝার উপায় নেই, আপাতত সে ঠিক কী ভাবছে। বছরের সব সময়ে যে এমনটা, তাও নয়। হঠাৎ করে
শ্যামল অনেক কথা বলে, হৈ চৈ করতে থাকে, তারপরেই হয়তো চুপ। একেবারে পাথরের নীরবতায়,
চূড়ান্ত ভাবলেশহীন।
প্রশ্ন হল, শ্যামল কেন একান্ত করে
নিজেকে একা করতে চায় । কেনই বা নিজে, অন্য মানুষদের মুখোমুখি হতে চাইছে না এখন।
অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই তার এই মুড সুইং-এর তেমন কোন বাহ্যিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়
না। কিন্তু এবারেরটা ঠিক সেরকম নয়, বহিঃপরিবেশে এমন কিছু ঘটছে যে শ্যামল যারপরনাই
অস্বস্তিতে। এরকমটা যে ঘটতে পারে এবং ঘটার পর চারদিকে এ হেন নীরবতা, সবকিছু মেনে নেয়া,
বেঁচে যে আছি সেটাই অনেক - গোছের মনোভাব যে দেখতে হতে পারে তা সে আগে থেকে ভাবতেও পারেনি।
কোন ছোটকালে একটা গল্প পড়তে হত, খরগোশ বালির মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে ভাবে, তাকে কেউ দেখতে
পাচ্ছে না, অতএব সে নিরাপদ। আর একটা কবিতার লাইন তার মনে পড়ে, “অন্ধ হলে কি প্রলয়
বন্ধ থাকে,” কিন্তু এতদিন পরে এই অব্যর্থ পংক্তিটি কার লেখা সেটা মনে করতে পারে না।
তবে সত্যি বলতে কী, শ্যামল বেশ কিছুদিন ধরে এরূপ চেষ্টা করেছে। যখন খুব বেশি অপছন্দের
কিছু ঘটছে, একটানা ঘটেই যাচ্ছে। তখন সে নিজেকে পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রভূত
চেষ্টা করেছে। কয়েক সেকেন্ডের পরই মনটা চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। ফাঁকা জায়গা থেকে মনটা
ধীরে ধীরে আবার বহুজনের মধ্যে ফিরে আসে। এরকম
পরিস্থিতিতে নিজের মনের উপর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাধ্যতামূলক বিচ্ছিন্ন
হওয়ার জন্য বেশ কয়েক দিনের জন্য বাড়িতে ঢুকে দরজায় খিল দিয়েছ। খবরের কাগজ, টেলিভিশন
থেকে দূরে ঘরটাকেই অনন্ত সমুদ্রের মধ্যে একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত তৈরি করে সে।
কিন্তু তাতে কী আর কাজ হয়! মনটা সব সময়ে ছোঁক ছোঁক করতে থাকে। দম বন্ধ করে জলে ডুব
দেওয়ার মতো। একটু পরেই যেমন বাপরে, মারে করে ভুস করে ভেসে ওঠা তেমনই অবস্থা হয়
শ্যামলের। আর না পেরে টি.ভি-টা চালিয়ে খবরের চ্যানেল দেখতে বসে যায়।
এইবার শ্যামল মিত্রের বাড়ি ও পাড়া সম্পর্কে জানাটা বিশেষ প্রয়োজন, নচেৎ এ আখ্যান আর এগোতে পারবে না। এক জায়গায় ঘুরে ফিরতে হবে। ওদের জায়গাটা প্রাচীন, বেশ প্রাচীন। আগে এখান দিয়ে বহে যেত, সোনাই নদী। নদীটার নাব্যতা ছিল এমন যেখান দিয়ে বড় নৌকা গিয়ে পড়তো ভাগীরথীতে। কাব্য - পুঁথিতে পাওয়া যায় এই নদী পথ দিয়ে একদিন শ্রীচৈতন্য রওনা হয়েছিলেন শ্রীধামের দিকে। সেই নদী এখন স্মৃতি মাত্র। এই অঞ্চলের কোন কোন জায়গায় বড় বড় ঝিলগুলোকে কাল্পনিক রেখায় যুক্ত করে এখনও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে অতীতের একটা নদীর উপস্থিতি অনুমান করা সম্ভব। এমনকী মিত্র বাড়ির আশেপাশে প্রায় অট্টালিকা সদৃশ্য দুটি ভগ্ন প্রাসাদের পাশেই কিছুটা বসবাস যোগ্য দোতালা দালান বাড়িতে এখনও যারা থাকেন, তারা নিজেদের সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বংশধর বলে দাবি করেন। যদিও এই অঞ্চলের একদল মানুষের কাছে এ দাবির তেমন কোন গুরুত্বই নেই, তারা জানেই না কে সাবর্ণ রায়চৌধুরী। বরং কোনো টিভি সিরিয়ালের শিল্পী অথবা ক্রিকেট খেলোয়াড়দের কথা, তাদের বংশলতিকা নিয়ে এরা অনেক বেশি উৎসাহী। যেকোন পুরনো স্মৃতি, ধীরে ধ্বংসস্তুপ বা বিস্মরণে হারিয়ে যায়। অতীতের কতটুকুই বা পাঠ্যপুস্তকে লেখা থাকে। বাকিটা হয়তো বা কিছুকাল থেকে যায় ব্যক্তিগত স্মৃতিতে। তারপর ব্যক্তির সঙ্গে হারিয়ে যায় অনন্তের মধ্যে।
মিত্র বাড়ির বয়সও অনেক। সামনের
রোয়াকের ইঁট খসে গেছে অনেক জায়গায়। বাড়ির এক দিকটা যাদের ভাগে, তারা এখন দক্ষিণ
কলকাতা হয়ে বর্তমানে নিউ টাউনে। ওদিকটা মেরামতের অভাবে ভগ্নপ্রায়। কিন্তু শ্যামলদের
অংশটা এখনও মোটামুটি বাসযোগ্য। বিধানবাবু নিজের ভাগের অংশটাকে নিয়মিত সারিয়ে সুরিয়ে
এখনও টিকিয়ে রেখেছেন।
শ্যামলের ঘরটা এমনকী ছোট্টো বাথরুম
যুক্ত। এটায় শেষ জীবনে থাকতেন বিধান মিত্র। তার ছিল বেপরোয়া হাঁটুর ব্যথা, ফলে ঘর
সংলগ্ন বাথরুম না থাকলে তিনি অচল। ফলে এলাকার নামী রাজমিস্ত্রি শুক্কুর আলিকে ডেকে
বিশাল ঘরের একটা অংশে একটা বাথরুম - পায়খানা বানিয়ে জীবনের শেষ দশটি বছর এই ঘরেই
প্রায় গৃহবন্দি হয়ে কাটিয়ে ছিলেন।
সেই ঘর আপাতত শ্যামলের। এই ঘরে
নিজেকে আবদ্ধ করে সে দেখেছে তার মন শান্ত হয় না। উল্টো দিকে ক্রমেই মনের মধ্যে অস্থিরতা
বাড়তে থাকে। ঘুম আসে না, পাতলা পায়খানা হতে থাকে, ক্রমাগত চোঁয়া ঢেঁকুর। হাঁটু আর
কোমরের ব্যথা বাড়তে থাকে। নিজেকে আড়াল করে কিছুতেই শান্তি পাওয়া যায় না। এমনটা
নয়, শ্যামল একজন বিপ্লবী চরিত্রের মানুষ, প্রতিবাদী। সে চায় অনেক কিছু। সে চায় বন্ধুত্ব,
পরিস্থিতির বদল, সহযোগিতা। কিন্তু চাইলেই তো আর হয় না, পাওয়ার জন্যে উদ্যোগ চাই,
সেখানেই মিত্র বাড়ির ছেলেটির খামতি। এ তার একার বিষয় নয়, তার বাপ ঠাকুর্দার এই রোগ
ছিল। যে কোন সূচনায় তাদের দোনামনা, বিলম্ব। সর্বক্ষেত্রে একটা দ্বিধা, করবো কি করবো
না ভাব, যাব কি যাব না তা নিয়ে দোলাচল। বলা চলে এটা মিত্র পরিবারের একটা পারিবারিক
বৈশিষ্ট্য। বিধানবাবুর বাবা যখন মারাত্মক অসুস্থ
তখন তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন না বাড়িতে রেখে চিকিৎসা তা নিয়ে দোটানায় এমন অবস্থা
হল যে, শ্যামলের পিতামহ প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছিলেন।
চারপাশে এখন যা ঘটছে তাতে শ্যামলের দমবন্ধ হয়ে আসছে। সোচ্চার প্রতিবাদ হয়তো বা নেই বা থাকলেও অতি সামান্য তেমন কার্যকর নয়। পুরনো দেয়ালে সে নিজের পছন্দের জগত তৈরি করতে তার পছন্দের পোস্টার, ছবি সেঁটে দিয়েছে। সচেতনভাবে তৈরি করেছে একটা বিভ্রম। চারপাশের দেয়ালগুলোর বহু পুরনো পোস্টার বা লেখায় যেন বলতে চাইছে, সময় থমকে আছে। নতুন কিছু ঘটছে না। যেন, সেই অতি চাপা স্বরে চোর চোর ধ্বনি, কিংবা তোলাবাজ অথবা চাকরি চোর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে না। কোথায় যেন পড়া ছিল, না বলিয়া পরের দ্রব্য হরণ করাকে বলে চুরি। বর্তমানে পরের দ্রব্য বা অর্থ না বলিয়াই শুধু লওয়া হয় না, রীতিমতো জানান দিয়ে, দাবি জানিয়ে আদায় করাটাই এখনকার সময়ে স্বাভাবিক। তোমার জিনিস তোমাকে বলে কয়ে আমি তুলে নিলাম। শ্যামল ভাবে, এভাবে তুলে নেয়া হয় বলে কী, একেই তোলা বলে? তার থেকে এসেছে তোলাবাজ শব্দটা।
এই যেমন মিত্রবাড়ির পিছনে দুকাঠা জমি। ইঁটের পাঁচিল অনেক জায়গায় নড়বড়ে হয়ে গেছে। আগে ছোটরা ওই পাঁচিলের এপাশ ওপাশ থেকে লুকোচুরি খেলতো, পাঁচিলের বেয়ে উঠতো। শীতকালে ওখানে টোপাকুল গাছের ঢিল ছোঁড়াছুঁড়ি খেলা ছিল প্রতি বিকেলের ঘটনা। অযত্নে ওখানে এখন নানা ঝোপঝাড়। বেশকিছু পার্থেনিয়াম গাছ সাদা ছোট ছোট ফুল দুলিয়ে হালকা করে বিষ ছড়াচ্ছে। অনেক দিন আগে ওই জায়গায় শ্যামলের পিতামহ কয়েকটা সেগুন গাছের চারা লাগিয়েছিলেন। ষাট সত্তর বছর পরে গাছগুলোর গোড়া বেশ মোটা, ডালপালা মেলে দিব্যি চোখে পড়ার মতো। এই তো কিছুদিন হল, এলাকার কাউন্সিলর লোকজন দিয়ে একটা গাছ মেশিন করাত দিয়ে কেটে নিয়ে গেল। দোষের মধ্যে দোষ, গত কালবৈশাখী ঝড়ে গাছটা রাস্তার লাইট পোস্টের দিকে কিছুটা হেলে গেছিল। তা বলে কী, বিষয়টা শ্যামলকে এক্কেবারে বলা হয়নি? হয়েছিল, কাউন্সিলর বলেছিল, “শ্যামলবাবু গাছটা সোজা করে দিন”। বিস্মিত শ্যামলের প্রশ্ন, গাছ সোজা করব কি করে?
“সেটা আপনার ব্যাপার। আর একবার
ঝড় ছাড়লেই আপনার গাছ এলাকার সকলের ট্রান্সফরমার উপর পড়বে । আপনার একার সখের জন্য
সকলের ক্ষতি তো করতে দিতে পারি না। আমি মোটামুটি দিন দশেক সময় দিয়ে গেলাম।” শুধু
বাঁশি ফুঁ দিয়ে বলল না, টাইম স্টার্ট নাও।
সাত দিনের মধ্যে যখন গাছটা কাটা
হচ্ছে তখন নিকট প্রতিবেশী জনার্দন চ্যাটার্জি ফিস ফিস করে বললেন, “শ্যামল তোমার এই
গাছটার তো হেভি দাম। ভাবা যায়! একটা বড়োসড়ো সেগুন”।
এই যে ডাকাতিটা হল, সেটা কি মিত্র
বাড়ির লোককে না জানিয়ে? রীতিমতো জানিয়ে, ওয়ার্নিং দিয়ে তবেই না গাছটাকে তুলে নিয়ে
গেল ওরা। এও এক ধরনের তোলা। মনে মনে শ্যামল সেদিন ভেবেছিল অনেক দিন আগেকার একটা
কথা, বাবা একদিন বিকেলে তাকে বলেছিলেন, “তোকে এই বাড়িটা ছাড়া আর কিছু তো দিয়ে যেতে
পারলাম না। এই গাছগুলো আমি যে করেই হোক বাঁচিয়ে রেখেছি, তোর সন্তানের পড়াশুনার জন্যে
গাছের কাঠটা কাজে লাগাস। খুব দামী কাঠ। বিক্রি করলে অনেক টাকা পাবি।”
মাঝেমধ্যে শ্যামলের মনে হয়, এই
রাজ্যটা আশ্চর্য জাদুতে অনেক আগেকার সময়ে চলে গেছে। এখন এই অঞ্চল অসংখ্য অলিখিত অংশে
বিভক্ত। অংশগুলো দেখভালের জন্য ছোট ছোট জায়গীরদারদের মধ্যে ভাগাভাগি করা আছে। পুরোপুরি
মোগল আমলের মতো ব্যবস্থা। ওখানে থেকে কর আদায় কর, নিজে বেশ কিছুটা নাও, মূল ক্ষমতার
কাছে বাকিটা পৌঁছে দাও। যদি সামান্য গন্ডগোল কিছু হয়, তার মীমাংসা, সেখানেও অর্থের
খেলা, যে বেশি দেবে – রায় তার পক্ষে। যেকোন ব্যাপারে, যেকোনো কাজে একটা গোপন নিঃশব্দ
নিলামের ব্যবস্থা।
যে যত বড় জায়গীর পেয়েছে তার
তত প্রতাপ। নবাবের কাছে যে যত দামি উপঢৌকন পৌঁছে দিতে পারে তার তত আদর। এই ব্যবস্থার
বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারও নেই, শ্যামল মিত্র কোন ছাড়। মাঝেমধ্যে জায়গীর নিয়ে
খুনোখুনি, বোমাবাজি, খোলাখুলি অস্ত্রের ঝনঝনানি চলে। সাধারণ মানুষ আরও গুটিয়ে যায়।
খোলসের মধ্যে ঢুকে পড়ে। মনে মনে ভাবতে বাধ্য হয়, এখনও যে বেঁচেবর্তে আছি সেটাই যথেষ্ট।
বেঁচে আছিই তো এদের অনুকম্পায়। ইচ্ছে হলে হাতের চেটো দাবড়ে মশা মারার মতো মেরেও ফেলতে
পারে। অতএব চুপ থাকাই নিরাপদ, ঝামেলা এড়িয়ে সম্মতিসূচক ঘাড় কাৎ করে টিকে থাকা।
নচেৎ ওই দলে ঢুকে পড়া, ওদের সঙ্গে
সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে হবে। চোখ কান বুজে হ্যাঁ-তে হ্যাঁ, না-তে না মেলাতে হবে। ভাগ বাটোয়ারাতে
অংশ নিলে তুমি ওদের কাছে নিরাপদ। কিন্তু এমতাবস্থায়তেও শ্যামল মিত্র আর তার মতো অনেকেই
খাপ খাওয়াতে না পেরে আপাতত চুপ। সমস্ত পরিস্থিতি ছেড়ে বা অপ্রিয় পরিস্থিতির থেকে
পালিয়ে নিজেকে একা করতে চাইছে।
কোথায় যাবে শ্যামল, এই চিন্তা নাছোড় চেপে বসেছে তাকে। দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সামর্থ (একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া) তার নেই। আজকাল ওই দেশে যা চলছে সেটাও অসহ্য সুতরাং প্রথমেই বিদেশ বাদ। একাকী তাদের পুরনো বাড়ির ছাদে পায়ে চারি করতে করতে সে ভেবেছে, তাছাড়া দেশের মধ্যে কোথায় যাওয়া যায়? প্রায় সব রাজ্যেই একরকম অবস্থা। কোনটা উনিশ, কোনটা বিশ। আসলে দেশটা ক্ষমতার ভাগাভাগিতে বহু অংশে বিভক্ত হয়ে গেছে। নানা রকম ক্ষমতা, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থ, প্রতিপত্তি ইত্যাদি ইত্যাদি। শ্যামল সেদিন সন্ধেবেলায় ছাদের পাঁচিল ঘেঁষে ঘনায়মান অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে এই সত্যে উপনীত হলো। এমনকী কয়েকদিনের জন্য নিশ্চিন্তে পালাবার মতো জায়গা তার মাথায় এলো না। অথচ সে চোখ চেয়ে এই অনাচার (তার বিশ্বাসে) সে দেখতে পারছে না। সহ্য করতে পারছে না । সব সময়ে দেহের মধ্যে একটা অস্থিরতা, বমিভাব, মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকা। কিচ্ছুটি ভালো না লাগা।
কোন কিছু সন্ধানরত মানুষ অতি দ্রুত
ক্লান্ত হয়ে যায়। এটা এমন একটা সন্ধান যা সহজে সে খুঁজে পাচ্ছে না। চট করে খুঁজে
পাবে এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। আর সে সন্ধান যদি এক জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে
মনে মনে হয় তবে ক্লান্তি চেপে ধরে আরও তাড়াতাড়ি। মানসিক ক্লান্তি। পাড়ার লোকজনদের
সঙ্গে দেখা হয়, কারও সঙ্গে কথা বলতে প্রাণ চায় না। অন্য প্রান্তের লোকটিও যেন অবসন্ন,
পরাজিত। সেও অন্যদের থেকে পালাতে চায়। দোকান বাজারে জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য। কেন? কোন
উত্তর নেই। বেঁচে থাকাটাই ক্রমে অতি মূল্যবান হয়ে উঠছে।
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে বড় শপিং
মলটার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হঠাৎই শ্যামলের মনে হল, লম্বা সময়ের জন্য না হলেও সিনেমা
হলের অন্ধকারে, একটা চলমান কাহিনির অন্দরে ঢুকে পড়তে পারলে অন্ততঃ ঘন্টা তিনেকের
জন্য এই অসহ্য, অসহায় অবস্থা থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া যেতে পারে। নরম গদির চেয়ারে
বসে অজস্র লোকের মধ্যে সে একা হয়ে পারে। সিনেমার মধ্যে জড়িয়ে গেলে রুদ্ধশ্বাস তিনঘন্টা
কেটে যাবে।
নিজের কাছে প্রস্তাবটা দিয়ে নিজেই
চরম উত্তেজনায় সম্মতি জানিয়ে ফেলল সে। কতদিন সিনেমা দেখেনি শ্যামল! এমনকী এখন এইসব
মাল্টিপ্লেক্সে টিকিটের দামে সে রীতিমতো চমকে গেল সাময়িকভাবে। কিন্তু তার মানসিক
বিপর্যয়ের থেকে তিন ঘন্টার মুক্তির কাছে এই অর্থ কিছুই না। মাল্টিপ্লেক্সটার শীর্ষ তলে নামী চেইনের সিনেমা
হল। চারটে হল পাশাপাশি। এক, দুই, তিন, চার। প্রত্যেক হলের দরজার সামনে থোকা থোকা ভিড়।
শো শুরু হতে তখনও কুড়ি মিনিট দেরি। লোকজনের ছোঁয়াচ এড়িয়ে মাল্টিপ্লেক্সের গোলকধাঁধা মত অলিগলি দিয়ে চলতে চলতে শ্যামল একটা বিশাল ঘর সাজানোর দোকানের সামনে এসে
দাঁড়ালো। এদিকে একজনও লোক নেই। একা একা দাঁড়িয়ে শ্যামল সিদ্ধান্ত নিল সিনেমা হলের
আলো নিভে গেলে তবেই সে ভিতরে ঢুকবে। অন্ধকারে কোন মানুষকে দেখতে হবে না।
সিনেমাটা চলছে অন্ধকারে অস্পষ্ট, আবছায়া মাখা কতগুলো মানুষের মাথার মতো গোলাকার আকৃতি। আশেপাশে কেউ আছে কিন্তু কে সে তা অজানা। হলে বেশি দর্শক নেই। ফাঁকা ফাঁকা সিটগুলোকে দেখে শ্যামলের ভালোই লাগছিল। মাঝেমাঝেই কাহিনি থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল সে। হলের অর্ধেকটা ফাঁকা। শ্যামলের যেমন সিনেমা হলে প্রবেশ প্রধানতঃ বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি থেকে নিজেকে কিছুটা সময়ের জন্য বিচ্ছিন্ন করতে, সে লক্ষ করছিল সিনেমা হলের অন্ধকারকে বেশ কয়েক জোড়া নর-নারী অন্যভাবে ব্যবহার করছে। আবছায়া অন্ধকারে দুটো মাথা বিপজ্জনক রকম কাছাকাছি চলে আসছে। সেসব দৃশ্য এবং মূল সিনেমার কাহিনি তাকে অন্য জগতে নিয়ে গেল। আপাতত অজস্র অপছন্দের ঘটনা, অসভ্যতা, অস্বস্তিকর পরিস্থিতির থেকে তাকে কোন ইন্দ্রজাল মুক্তি দিয়ে দিল। কিন্তু সত্যি বলতে কী বাংলা কাহিনিচিত্রটা তাকে তত আকর্ষণ করতে পারছিল না। মেয়েটিকে গাড়ি নিয়ে চরম গতিতে ফলো করছে একদল বদলোক। তাদের সর্দারের মুখটা চেনা চেনা লাগলেও নামটা মনে করতে পারছে না শ্যামল। কিন্তু এই তাড়া করার দৃশ্যটা চরম উত্তেজক, কাহিনিটা ঠিকঠাক মনোযোগ দিয়ে না দেখলেও এই দৃশ্যটা তাকে গ্রাস করে নিল। গাড়ি থামিয়ে, একটা পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে নায়িকা প্রাণ বাঁচাতে একটা খাদের দিকে ঝাঁপ দিল। আর সঙ্গে সঙ্গে দামি প্রেক্ষাগৃহের আলোগুলো দপ্ করে জ্বলে উঠলো। হাফ টাইম, বিশ্রাম।
এই বিড়ম্বনাটার কথা শ্যামলের মনেই ছিল না। আলো জ্বলতেই স্বাভাবিক ভাবেই সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। অন্ধকার থেকে আলোতে আসলে যেমনটা হয় আরকি। চোখ বন্ধ করে শ্যামল ভাবছিল, চোখ খুলেই সে দেখবে অনেক লোক আবার সেই অসহ্য পরিস্থিতি ধেয়ে আসবে। যে পরিত্রাণ সে পাচ্ছিল সেটা মুহূর্তে উধাও হয়ে যাবে।
একবার শ্যামল মনে করল, এই আলোকিত
সময়টা চোখ বুজেই কাটিয়ে দেবে। কিচ্ছুটি দেখবে না। কিন্তু তা তো আর হয় না, ফলে সে
চোখ খুলল। আর চোখ খুলেই সে দেখলো তার পাশেই বসে আছে শ্রীমন্ত বসু। তার মতই এই মানুষটি
বর্তমান অবস্থায় অস্থির। চোখে চোখ পড়তেই উভয়ের মুখটা অসহায়, যেন চুরির দায়ে ধরা পড়ে গেছে। সামনে পরপর বসে অধীর কর্মকার, প্রশান্ত
মুখার্জি। এরা শ্যামল মিত্রর সঙ্গে দেখা হলেই বলেন, ‘এই অনাচার আর সহ্য হচ্ছে না’।
পাশের সারিতে, পিছনে, ডাইনে, বাঁয়ে সর্বত্র অজস্র চেনা লোক। ঐ যে বসে আছে, ঘাপটি
মেরে, পরিস্থিতির থেকে, অসহায় অবস্থা থেকে, ভয় থেকে, মানসিক যন্ত্রণার থেকে পালাতে
শ্যামলের পাড়ার অতীনবাবু, সুদর্শন, বিচিত্র মন্ডল, পাশের পাড়ার রামবাবু, পুলক ভট্টাচার্য,
হরিহর কুন্ডু, আক্রাম, তফাজ্জল। এঁরা সকলেই
একা হওয়ার জন্যে, পরিস্থিতি থেকে সাময়িক পরিত্রাণ পেতে সিনেমা হলের তিন ঘন্টার অন্ধকারে
গা ঢাকা দিয়েছে। সকলেই বিস্মিত দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে দেখছে। হকাররা হেঁকে যাচ্ছে
চিপস, চিপস, পপকর্ণ, পপকর্ণ। পরাজিত, ভয়ে কম্পমান পালিয়ে থাকতে চাওয়া অজস্র লোকদের
চোখের সামনে সিনেমা হলের উজ্জ্বল আলো ধীরে ধীরে নিভে আসছে। আলো থেকে আবার অন্ধকার।
দু’ একটা বিজ্ঞাপনের পর পুনরায়
শুরু হল সিনেমা। দেখা যাচ্ছে একটি মহিলা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়াতে গড়াতে অতল গহ্বরে
নেমে যাচ্ছে। নামছে আর নামছে। অবনমনের যেন
শেষ নেই। কেউ নেই সেই গড়িয়ে যাওয়ার থেকে তাকে বাঁচায়, সাহায্য করতে এগিয়ে আসে
বা পতনে বাধা দেয়। শ্যামলের মনে হচ্ছে, আলো
থেকে আবছায়া হয়ে গাঢ় অন্ধকারে চলে যাচ্ছে
একটা সময়। চারিদিকে চরম চুপচাপ, মানুষের মহাসমুদ্রের মতো অনিঃশেষ সহ্যক্ষমতা, আর পিনপতনের
নিস্তব্ধতা। একটি মানুষ, আসলে একটা সময় ক্রমে
নিচের দিকে চলে যাচ্ছে, কোন কার্যকর বাহ্যিক বল প্রযুক্ত হচ্ছে না, যে তার পতনশীল গতিকে
কমায়। অন্তত বর্তমানে সে রকমটা দেখা যাচ্ছে না।
সময় আর সমাজ গভীর অন্ধকারে আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন