কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

কাজল সেন

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৫


প্রেমপত্র

পাড়ার পোস্টঅফিস এখনও আছে বড় রাস্তার মোড়ে। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ডাকব্যবস্থার সঙ্গে দৈনন্দিন যে আত্মিক সম্পর্ক ছিল সবার, সেই সম্পর্ক ক্রমশ ম্লান হয়ে এসেছে। সেদিন প্রতাপাদিত্যবাবু দুঃখিত গলায় তাঁর মনোবেদনা ব্যক্ত করছিলেন ক্লাবঘরের তাসের আড্ডায় বসে। সমরেশবাবু সান্ত্বনা জানাতে বললেন, বুঝতে পারছি তোর কষ্টটা কোথায়! কিন্তু কী করবি বল, প্রযুক্তি যেমন যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীটাও তেমন তেমন বদলে যাচ্ছে। আগে আমরা চিঠি লিখে ডাকবক্সে দিতাম, তারপর অপেক্ষা  করতাম কবে পোস্টঅফিস থেকে পিওন বাড়িতে এসে সেই চিঠির উত্তর পৌঁছে দেবে। কিন্তু সেদিন তো আর নেই! এখন কেউ আর কাগজে-কলমে চিঠি লেখে না। একটা মোবাইলফোন থাকলেই সব কাজ হয়ে যায়। চিঠি লেখা, কথা বলা, টাকা পাঠানো, ফোনের পর্দায় পরস্পরকে চাক্ষুষ দর্শন! সবকিছু।

প্রতাপাদিত্যবাবু সমরেশবাবুকে থামিয়ে বললেন, আরও দুঃখের কথা কী জানিস, এখনকার ছেলেমেয়েরা প্রেম করে, কিন্তু প্রেমপত্র লেখে না। মোবাইলফোনে কি আর প্রেমপত্র লেখা যায়! তুইও তো প্রেম করেছিস। বল, কাগজে-কলমে প্রেমপত্র লেখা আর টাচস্ক্রিনে লেখা কি কখনও এক হতে পারে?

প্রতাপাদিত্যবাবুর কথায় সমরেশবাবু উদাস হলেন। তাঁরা দুজনে একই অফিসে চাকরি করতেন। বছর দশেক আগে একইসঙ্গে অবসরগ্রহণ করেছেন। দুজনে দুজনের জীবনের সুখ-দুঃখের কথা সবই জানেন। মনে পড়ে, সেইসময় চিঠি লেখায় কী আশ্চর্য উৎসাহ ছিল প্রতাপাদিত্যবাবুর। দেশের বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে মা-বাবা, দাদা-বৌদি, দিদি-জামাইবাবুকে আলাদা আলাদা করে চিঠি লিখে পোস্ট করতেন। চিঠি লিখতেন বিভিন্ন আত্মীয়পরিজন আর বন্ধুবান্ধবদের। পোস্টকার্ড, ইনল্যান্ড লেটার, এনভেলাপ সব আধারেই। তাছাড়া ছিল প্রতিমাসে দেশের বাড়িতে মানিঅর্ডারে টাকা পাঠানো। তবে মজাটা আরও জমে উঠল সেবার পুজোর ছুটিতে দেশের বাড়ি থেকে ফেরার পরে। প্রতাপাদিত্যবাবু সমরেশবাবুকে জানিয়েছিলেন, একটা পুজোপ্যান্ডেলে অতসী নামে এক মেয়ের সঙ্গে তাঁর আলাপ ও তাকে ভালোলাগার কথা। ব্যাস, এবার শুরু হলো প্রায় প্রতিদিন অতসীকে প্রেমপত্র লেখা আর পোস্ট করা। তার আগে অবশ্যই সমরেশবাবুকে পড়িয়ে বানান ঠিক করে নেওয়া। উত্তরে অতসী যেসব রিটার্ন প্রেমপত্র লিখতেন, সমরেশবাবু পাশে না থাকায়, ভুল বানানেই তা পাঠাতে হতো। অতসীর চিঠিও সমরেশবাবুকে পড়াতেন প্রতাপাদিত্যবাবু। সমরেশবাবুর মনে পড়ে, প্রতাপাদিত্য ও অতসীর বিয়ের আগের জীবনের সেই রঙিন দিনগুলোর কথা। কিন্তু তারপরেই নেমে এলো বিষাদ। কেননা বিয়ের পর তাঁরা দুজনে তো একসঙ্গেই থাকতেন! প্রেমপত্র লেখার আর সুযোগ  কোথায়!

প্রতাপাদিত্যবাবু ভুল কিছু বলেননি, সমরেশবাবুও প্রেমে পড়েছিলেন। তবে যৌবনের শুরুতে নয়, বরং যৌবন যখন প্রায় অস্তমিত হতে চলেছে, তখন। উপায়ও ছিল না। বাড়ির দায় ও বোঝা ছিল তাঁর কাঁধে। ছোট তিনবোনের বিয়ে দেওয়া আর ছোটভাইয়ের পড়াশোনা তাঁকেই সামলাতে হয়েছে। সেইসঙ্গে সামলাতে  হয়েছে প্রবীণ মা-বাবাকে। উপার্জন ছিল সামান্য। বনলতা চিঠিতে সমানেই অনুযোগ করেছেন, আর কতদিন আমাকে অপেক্ষা করতে হবে? কবে আমরা সংসার শুরু করব? সমরেশবাবু উত্তরে লিখতেন, আরও কিছুদিন ধৈর্য ধর লতা, প্লিজ! সমরেশবাবুর লেখা চিঠিগুলো কি প্রেমপত্র ছিল! নাকি নিছকই অজুহাতপত্র!

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন