ধারাবাহিক
উপন্যাস
স্বর্গ এসেছে নেমে
(১৩)
শেষপর্যন্ত রাজী হল কুন্তলা। বলল মেয়েকে ডেকে, ‘এত শখ যখন আমাকে নিয়ে যেতে, চল তবে দেখে আসি বাপমেয়ে মিলে কি ঘটনা ঘটাতে চলেছিস তোরা’। চোখেচোখে কথা হয়ে গেলো বাপ মেয়ের। দু’জনই খুশী। মনস্বিনীই মাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিল। কুন্তলা কালো হতে পারে কিন্তু চোখ নাক দেখলে কারও সাধ্য নেই তাকে কুৎসিত বলে। সে কোন কালে যায়নি শ্বশুর বা স্বামীর গ্রামে। গ্রামের মানুষ আজই প্রথম দেখবে তাকে। খবরটা পৌঁছে গেছে তাদের কাছে। মনস্বিনী তেমন করেই মাকে সাজিয়ে নিল যাতে গ্রামের মানুষ একবাক্যে স্বীকার করে, হ্যাঁ সান্যাল কর্তার যোগ্য গৃহিনী বটে।
গাড়িতে চড়বার আগে কি
ভেবে দাঁড়িয়ে গেল কুন্তলা। অনঙ্গবাবু প্রমাদ গুনলেন, শেষ মুহূর্তে আবার বেঁকে বসবে
না তো! দেখা গেল, ভাবনাটা মিথ্যে নয়। মনস্বিনী জানতে চাইলো মায়ের দাঁড়িয়ে যাওয়ার কারণ।
অনায়াসে বলে ফেলল কুন্তলা, সে যেতে পারে একটি শর্তে, বাইরের রান্না করা কোন খাবার সে
গ্রহণ করবে না। মনস্বিনী বলল, ‘আমি জানি তো মা, তোমার উপোস আজকে’। অবাক চোখে তাকালো
কুন্তলা মেয়ের দিকে, বলে কি মেয়ে, আজ আবার কিসের উপোস! মনস্বিনী বলল কৌতুক করে, ‘বাঃ
রে! তুমি শ্বশুর ভিটেয় মানে তীর্থস্থানে যাচ্ছ, তা উপোস থাকতে হবে না! তাইতো আমি আগে
থেকেই সে ব্যবস্থা করে রেখেছি, এই দেখো’, বলে, নানা রকম ফলে ভরা একটি থলে খুলে দেখালো
মাকে। চমৎকৃত হলেন অনঙ্গবাবু মেয়ের বুদ্ধিমত্তা দেখে। ভাবলেন, মেয়ে তার কেবল বুদ্ধিমতী
নয়, দূরদর্শীও বটে। এমন যে কিছু ঘটতে পারে সে ব্যাপারে কোন ধারণাই ছিল না তার। কি অভাবনীয়
কৌশলে পরিস্থিতি সামলে নিল মনস্বিনী! আর বাধা রইল না যাত্রায়। মেয়ের হাত ধরে গাড়িতে
উঠে বসল কুন্তলা।
গাড়ি প্রবেশ করছে গ্রামের
ভিতর। রাস্তার দু’পাশে উৎসাহী গ্রামবাসীরা দাঁড়িয়ে। কারও হাতে মালা কেউবা অঞ্জলি ভরে
ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। গাড়ি এগিয়ে গিয়ে থামল যেখানে মঞ্চ বাঁধা হয়েছে বৈশ্বানরের সম্মাননার
জন্য। গাড়ি থেকে নেমে এলেন সপরিবার অনঙ্গ সান্যাল। তিনি জানতেন, একই গাড়িতে বৈশ্বানরের
অবস্থান কিছুতেই মেনে নেবে না কুন্তলা তাই তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী একদিন আগেই গ্রামে
পৌঁছে গিয়েছিল বৈশ্বানর। মঞ্চের পাশেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল বৈশ্বানর। তার মাও তার
মনিব পরিবারকে আপ্যায়নের জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। এগিয়ে এল সে। বৈশ্বানর পরিচয় করিয়ে
দিল তার মাকে সান্যাল গিন্নির সাথে। সান্যাল গিন্নির বিস্ময়ের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে ধাপে
ধাপে। আরও একধাপ বেড়ে গেল যখন তাদের মাথায় বৃষ্টির মত ঝরে পড়ল ফুলের পাঁপড়ি। ভিড়ের
মধ্যে থেকে তিনটি সুসজ্জিত কিশোরী এগিয়ে এসে একে একে তিনজনের গলায় পরিয়ে দিল হাতে গাঁথা
মালা। স্ত্রী কন্যা সহ মঞ্চে আসীন হলেন অনঙ্গ সান্যাল। এবার তিনি ডেকে নিলেন বৈশ্বানরকে
যাকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে এত বড় আয়োজন। যে মা এমন একটি সন্তানের গর্ভধারিণী তাকেও
যে সম্মানিত করা হবে! এ ব্যাপারটা জানা ছিল না কারও। যখন তাকেও সান্যালকর্তা মঞ্চে
ডেকে এনে চেয়ারে বসতে বললেন তখনই দেখা দিল বিপত্তি। সে তো কিছুতেই কর্তাবাবুর সামনে
চেয়ারে বসবে না। তখন বৈশ্বানর নিজেই দাঁড়িয়ে পড়লো মায়ের পাশে। অনঙ্গ সান্যাল বড় ভূমিকায়
গেলেন না। তিনি পুস্পস্তবক উত্তরীয় আর বৈশ্বানরের
নাম, তার বাবা মায়ের নাম, কেন তাকে সম্মান
দেওয়া হল ইত্যাদি খোদাই করা একটি রূপোর থালা তুলে দিলেন বৈশ্বানরের হাতে। পায়ে হাত
দিয়ে পরম শ্রদ্ধায় প্রণাম করল বৈশ্বানর অনঙ্গবাবুকে, তারপর কিছু বলার অনুমতি চাইলো
অনঙ্গবাবুর কাছে। অনঙ্গবাবুর অনুমতি পেয়েই সে সুদক্ষ বক্তার মত সকলকে যথাযথ সম্ভাষণ
জানিয়ে শুরু করল তার কথা। ভাষণের মূল অংশ জুড়ে থাকল অনঙ্গবাবু ও কুন্তলার প্রতি তার
অসীম কৃতজ্ঞতা। এবার পাশে দাঁড়ানো মাকে জড়িয়ে ধরে আবেগ জড়ানো গলায় বলল বৈশ্বানর, ‘এই যে আমার মা, যাকে আপনারা জানেন মাত্র
বিশুর মা বলে, তিনি কেবল আমার মা-ই নন তিনি অসাধারণ এক মহিলা, যাঁর মনে অসীম শক্তি
আর হৃদয়ে গভীর মমতা। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমি অনেক বড় হবো, বাবা অকালে চলে গেলেন
তারপর শুরু মায়ের লড়াই। আমি বলবো, মা আমার জিতে গেছেন লড়াইটা। সকল কষ্ট উপেক্ষা করে
সন্তানকে তার লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছেন মা। আমার মায়ের পর যাঁর কথা না বললেই নয় তিনি হলেন
আমাদের স্কুলের হেডমাস্টার মশাই যাঁর শিক্ষা এবং দীক্ষা ছাড়া মাধ্যমিক পরীক্ষায় অত
ভাল ফল করা আমার পক্ষে সম্ভব হত না। আজ যে আমাকে সম্মানিত করা হল এর উদ্যোগ নিয়েছেন
আমার কাছে দেবতার মত মানুষটি, আমার সান্যালকাকা। এখানে আমার কিছু বলা ঠিক হবে না কিন্তু
আজ এই সভায় মাস্টারমশাই উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাকে যদি আমি সম্মান না জানাই তবে আমার
নাম লেখা থাকবে অকৃতজ্ঞের তালিকায়’। কথা শেষ করেই মঞ্চ থেকে নেমে সোজা দাঁড়ালো গিয়ে
হেড মাস্টারমশায়ের পাশে। দর্শকাসনের প্রথম সারিতেই বসেছিলেন তিনি।
(১৪)
সভার সকলের নজর তখন বৈশ্বানরের দিকে। কি করতে চলেছে বৈশ্বানর দেখার জন্য এ ওর ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বৈশ্বানর মাস্টার মশায়ের সামনে। গড় করে প্রণাম করল তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় তারপর অতি যত্নে নিয়ে এল মঞ্চের উপর। তাঁকে বসানো হল অনঙ্গবাবুর পাশে একটি চেয়ারে। একটি দামী কাশ্মিরী শালের প্যাকেট মঞ্চের এক কোণে একটি পুষ্প স্তবকের সঙ্গে আগে থেকেই রেখে দিয়েছিল বৈশ্বানর। সে শালটি খুলে জড়িয়ে দিল মাস্টারমশায়ের গায়ে। না, একখানা শাল উপহার দিলেই যদি সব ঋণ শোধ হয়ে যেত তবে ঋণী কথাটিই যে তার গুরুত্ব হারায়। এবার দর্শক শ্রোতাদের উদ্দেশে বলল বৈশ্বানর, ‘মাস্টারমশাইয়ের কাছে আমার যে ঋণ তা কোন উপহার দিয়েই শোধ করা সম্ভব নয় তবু কেন এই শালটি দেওয়া হল তাকে, সে প্রসঙ্গে বলি, যত দিন এই শালটি ব্যবহার করবেন তিনি তত দিন আমাকে ভুলে যাওয়া সম্ভব হবে না তাঁর পক্ষে, আর সেটাই হবে আমার পরম পাওয়া’। হেডমাস্টারমশাই হেসে বললেন, ‘ওরে বৈশ্বানর, তুই কি কারো মন থেকে হারিয়ে যাওয়ার ছেলে রে! সারা গ্রাম , জেলার সমস্ত লোকের মনে তুই যে আসন পেতেছিস তা হারিয়ে যাবার নয়। আমরা সকলে মনে প্রাণে প্রার্থনা করি তুই যেন সারা রাজ্য শুধু নয় সারা দেশের মনে চিরস্থায়ী আসন লাভ করতে পারিস’। হাততালিতে সরগরম হয়ে উঠল সভা। বৈশ্বানর মাস্টারমশাইকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে এনে তাঁর আসনে বসিয়ে দিয়ে মঞ্চে উঠে গেল আবার। কথা যে শেষ হয়নি তার। এবার এলো সে মনস্বিনীর কথায়। বলল আবেগভরে, ‘এই যে দেখছেন আপনারা আপনাদের সান্যাল কত্তার মেয়েকে, উনি কিন্তু সাধারণ কেউ নন, উনি দেবী, ওঁর বরাভয় না হলে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম আমি! আমার চোখে উনি যে কি সেকথা আপনাদের বুঝিয়ে বলতে পারবো না’। সভায় ক্ষীণ গুঞ্জন শোনা গেল। কথা বলতে বলতে লক্ষ্য করছিল বৈশ্বানর, মনস্বিনী কিছু বলার জন্য উসখুস করছে। নিজের কথা শেষ করে সে সভাকে জানালো, মনস্বিনী কিছু বলতে চায় তাদের। মনস্বিনী এগিয়ে গেল মাইকের কাছে, কোন ভনিতা না করেই সোজাসুজি বলল সে, ‘যে ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে জন্মেছে তার মানুষের আশীর্বাদের প্রয়োজন হয় না। আমি দেবীও নই, আপনাদের ঘরের মেয়েদের মত সাধারণ একজন মেয়ে আমি। হ্যাঁ, বৈশ্বানর যদি মনে করেন আমি কিছু করেছি তার জন্য, সে মানুষের জন্য মানুষ যেটুকু করে থাকে, তার বেশী নয়’। কথা ক’টি বলেই সভাকে নমস্কার জানিয়ে নিজের আসনে বসে পড়ল মনস্বিনী। অনঙ্গ সান্যাল দেখলেন, বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে, এরপর আছে নাচ গানের ব্যবস্থা, তারপর খাওয়া দাওয়া। তিনি ঘোষণা করলেন এবার বসবে নাচ গানের আসর। শিল্পীরা তৈরীই ছিল। শুরুতে ধামাইল গান ও নাচ। ধামাইল কন্যা দিতি দাসের বিখ্যাত গান ‘বাইজ্জোনারে শ্যামের বাঁশি জয় রাধে বলিয়া’ দিয়ে শুরু হল নাচ গানের অনুষ্ঠান। মেয়েরাই প্রথাগত ভাবে এ নাচে শামিল হল। নাচের ছন্দ টেনে নামালো মনস্বিনীকে মঞ্চ থেকে। আনন্দোল্লাসের ঢেউয়ে সারা গ্রামটিই ভেসে গেল যেন। নৃত্যরতা শিল্পীদের সঙ্গে সমান তালে নেচে গেল সে। কেবল যে গ্রামবাসীরাই বিস্মিত হল তাই নয় অনঙ্গবাবু নিজেই মেয়ের পারদর্শিতায় বিস্ময়বিমুগ্ধ হয়ে গেলেন। মনস্বিনী যেন এ গ্রামেরই কোন একটি ঘরের মেয়ে। সামান্য ক্লান্ত দেখালো মনস্বিনীকে। নাচের শেষে মেয়েরা জড়িয়ে ধরল তাদের রাজকন্যা দিদিকে, তারপর সকলে মিলে তাকে পৌঁছে দিল মঞ্চে। ধামাইলের পর ভাওয়াইয়া। একটি গানে আবার বৈশ্বানরের গুণকীর্তন। বাদ যায়নি অনঙ্গ সান্যালের পরিবারও। গানে অনঙ্গ সান্যালের প্রতি গ্রামের মানুষদের কৃতজ্ঞতার কথা সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন রচনাকার শিল্পী। এ গানের পর খাওয়ার আয়োজন। সান্যাল মশায়ের উদারতায় নানা ব্যঞ্জন সহকারে উদরপূর্তির পর বিদায় নিল গ্রামবাসীরা। ধন্য ধন্য রব উঠল সান্যাল পরিবার ও বৈশ্বানরের নামে। সন্ধ্যা নামছে। যেতে হবে অনেকটা পথ। বৈশ্বানর থেকে যাবে মায়ের কাছেই। সে ফিরবে পরদিন। অনঙ্গবাবু ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন যত দ্রুত সম্ভব শহরের সীমানায় পৌঁছে যাওয়া যায় তেমন গতিতে গাড়ি চালাতে। সঙ্গে রয়েছে কুন্তলা এবং বিশেষ করে মনস্বিনী। দুর্বৃত্তদের নজর তো রাতের অন্ধকারেই জ্বলে ওঠে শ্বাপদের মত। অনঙ্গবাবু, বেরিয়ে পড়লেন বিশুর মাকে আশ্বস্ত করে যে তার ছেলে তারই থাকবে সে যেখানে যত দূরেই থাকুক না কেন। যেতে যেতে মনস্বিনী কৌতূহল বশে জানতে চাইল মায়ের কাছে, কেমন লাগল তার সমস্ত ব্যাপারটা। কুন্তলা কোন রকম প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেনি সারাদিন। এখনো মেয়ের প্রশ্নের জবাবে কিছুই বলল না সে। কুন্তলার এই মৌনতা শঙ্কার নেঘ ছড়িয়ে দিল মনস্বিনী আর অনঙ্গবাবুর মনে।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন