![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৫ |
সেই লোকটা
নমাসে-ছমাসে একবার কলকাতা যাই। একটা ছোট ফ্ল্যাট আছে, মা থাকতেন। এখন কেউ নেই, তালা খুলে ঢুকতে হয়। দেয়ালে মা ও বাবার ছবি। এদিকে দিদা-দাদুর ছবিও আছে, তবে তা ভেতরে ভেতরে পোকায় খেয়ে যাচ্ছে। দুটো স্টীলের আর একটা কাঠের আলমারি। ভেতরে যা আছে তার দরকার অনেকদিন আগেই ফুরিয়েছে। টেবিলে এখনও মার কিছু ওষুধপত্রের শিশি, গরম জলের রবারের ব্যাগ। আছে একটা দেওয়াল ঘড়ি, প্রতিবার এসে দেখি তা বারোটা দশ বা তিনটে পঁচিশ বা কিছু একটা বেজে বন্ধ হয়ে গেছে। মন-কেমন করা ভাবটা কাটাবার জন্য ধূলোটুলো ঝেড়ে ইলেক্ট্রিক কেটলিতে চা বসাই।
চৈত্রমাস। গরমে হাঁসফাঁস করছে কলকাতা। কোথায় একটা যাবার ছিল - ভাবলাম এখন না, গরম কমলে বিকেলে যাব। খবরের কাগজ পড়ছিলাম, এমন সময় আওয়াজটা পেলাম – প্রথমে লোহার ওপর লোহার রডের ঠনঠন-ঠনঠন তারপর টানাটানা সুরে “পুরনো পিতল-কাঁসার বাসন, লোহার জিনিস, ঘড়ি, ল্যাপটপ, হারমোনিয়াম…” লোকটার গলাটা অদ্ভুত খনখনে, তবু যেন একটা চেনা কিন্তু না বুঝতে পারা সুর খেলা করে। লোকটার চেহারা কখনো দেখিনি।
জানালা দিয়ে ঘাড় কাত করে চোখে পড়ল লোকটার পা … একটা খড়ম ধরনের কিছু পরে ধীর পায়ে চলেছে। মুখ দেখতে পেলাম না, গরমের জন্য মাথায় ভেজা গামছা জড়িয়েছে। তবে ওর ভ্যানরিক্সা ধরনের চারচাকা ঠেলাগাড়িটা দেখতে পেলাম। আজ ব্যবসা ভালো হয়েছে। অনেক ভাঙাচোরা জিনিস।
বস্তার ফাঁক দিয়ে একটা পেতলের হাতা বেরিয়ে রয়েছে – সে কতদিন আগে বাড়ির বৌ হয়তো সাত-তাড়াতাড়ি ফ্যান গেলে বরকে আপিসের ভাত বেড়ে দিত। লোহার ফুলকাটা ফ্রেমে বাঁধানো ভাঙা আয়না একখানা। মনে হলো অল্প-বয়সী মেয়েটি তার সামনে দাঁড়িয়ে সাজছে – সাজা শেষ না হতেই আয়না ভেঙে গেছে। বেলো ফেটে যাওয়া হারমোনিয়ামটায় উই লেগেছে। তবু শুনতে পেলাম কে যেন সা রে গা মা পা চাবি টিপে সন্ধেবেলা গলা সাধছে। তেবড়ে যাওয়া তিনচাকা সাইকেল, তার লাল টুকটুকে রং জায়গায় জায়গায় এখনো রয়ে গেছে। দাদু-দিদিমা ভালোবেসে নাতিবাবুকে দিয়েছিল – শিশুটি সনসন করে এঘর সেঘর বারান্দা ঘুরে বেড়াত। সে হয়তো এখন কোন দূর দেশে সংসার পেতেছে। শৈশবের শেষ একখানা টুকরো যে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে তা সে জানে কী!
এত ব্যস্ততা, রূপটান, সুর, শৈশব সব নিয়ে লোকটা কোথায় যে চলে যায়। বিকেলে বেরোলাম। আবাসনের গেটে কমলাপ্রসাদ বসেছিল। চৌকিদার। বললাম, “আচ্ছা, কমল তোমরা ফেরিওয়ালদের আবাসনে ঢুকতেই দাও না, তবে ওই লোকটাকে তো কিছু বল না…”
স্মিত হেসে কমল বলল, “সময় ফুরোলে সব তো বাদ দিতেই হয় … ও লোকটাকে কি আটকানো যায় …”
আমার ট্যাক্সি এসে গেল। রাস্তায় যানজট। চৈত্রমাসের সেল চলছে, লোকে দুহাতে রাজ্যের জিনিস কিনে নিয়ে যাচ্ছে। এই ভীড়েও সে লোকটার খনখনে গলার ডাকটা যেন কানে বাজছিল। কোনো আবাসনের কোনো চৌকিদারই এ লোকটাকে আটকাতে পারেনি, পারবে কি?

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন