কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

তপনকর ভট্টাচার্য

 

সমকালীন ছোটগল্প


মুখ

বাথরুমের ছোট গোল আয়নাটা দাড়ি কামানোর জন্য। তারপর ছোট কাঁচিতে গোঁফছাটা। জয়দীপ প্রতিদিন শেভ করে। সে-কারণে অফিস যাবার আগে স্নানের পূর্ব মুহূর্তে সে প্রতিদিন এই আয়নার সামনে, যেখানে একটা মুখ, ব্রাশ দিয়ে ঘসে ঘসে শেভিং ক্রিমের ফেনা মাখা মুখে সেফটি রেজার চালাতে চালাতে এবং তা অতি অবশ্য দ্রুত ও নিখুঁত, দু’আঙ্গুলে আঁকড়ানো সেই রেজারের চাপের কমবেশি তারতম্য — কিন্তু এর ফাঁকে গত কু্ড়ি বছরে নিজের মুখ যৌবন থেকে প্রৌঢ়ত্বে যে স্বাভাবিকতায়, সময়ের নিয়মে — সেই মুখের পরিবর্তন, দাড়ি কামানো, গোঁফ ছাঁটার ফাঁকে জয়দীপের চোখে কোনদিন ধরা পড়েনি।

আয়না ছাড়া মুখের ছবি ফটো থেকে — এ ব্যতীত প্রতিদিনের কাজকর্মের ব্যস্ততা, মেলামেশা অথবা নানাবিধ কথাবার্তার ফাঁকে তার চোখে অন্যদের মুখ লেগে থাকলেও নিজের মুখের আদল যে কেমন জয়দীপ কিছুতেই ধরতে পারে না। হয়তো কিছুক্ষণ আগেই দাড়ি কামানোর ফাঁকে তার নিজমুখ দর্শন, যদিও তা নেহাতই প্রাত্যহিক এবং নজর গালের মসৃণতার দিকে অথবা গোঁফ ঠিকমতো ছাঁটা হ’ল কি না — সেখানে নাকের গড়ন, চোখের আকার ও গভীরতা বা রং ধরা পড়ে না, সুতরাং সেই দেখা মোটেই যথেষ্ট নয় অন্তত নিজের মুখ ঠিক কেমন তা বোঝার জন্য।

অথচ প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যখন নিজের মুখের আদলে খাপে খাপ একজনের মুখ — যেটুকু এই তিন-চার দিনে সে শুনেছে — সে এখন পুলিশের হেফাজতে। তার মদতে তারই অফিসে একজন মহিলা কর্মচারিকে  ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তা নিয়ে শহর উত্তাল। এই গণরোষ, গণজাগরণ তার জ্ঞান হওয়া পঁয়তাল্লিশ  বছরে জয়দীপ দেখেনি। প্রতিবাদে রাত দখলের আহ্বানে লক্ষ মানুষ রাত জেগেছে, নানা পেশার হাজার হাজার মানুষ মিছিল করছে প্রায় প্রতিদিন। ইচ্ছে থাকলেও সে যায়নি।

সাদৃশ্যটা প্রথম বলেছিল তার অফিসের পিওন সুকুমার — স্যার, আপনার সঙ্গে রাজদীপের মুখের মিল আছে। রাজদীপ পাল। আপনি জয়দীপ পাল। আপনার কেউ হয়?

ততদিনে রাজদীপ পুলিশ হেফাজতে। রাজদীপকে আড়াল করার ঘোরতর চেষ্টা ছিল ওপরতলার কেষ্টুবিষ্টুদের। কয়েকশো কোটি টাকার দুর্নীতি এর পিছনে। তখন পর্যন্ত ওই একজনই পুলিশের হাতে, পিছনে আরো আছে সন্ন্দেহ, আরো সন্দেহ যে একটা বড় চক্রান্তের খবর জানতে পেরে মেয়েটা খুন।

যেটুকু জানা গেছে, কর্মক্ষেত্রের পদাধিকারবলে একটা জবরদস্ত ও কার্যকরী নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেছিল রাজদীপ। প্রথমে বলা হচ্ছিল, একশো কোটি, দিন যত এগিয়েছে, হাজার কোটির ঘাপলা। মেয়েটা খুন ও ধর্ষণ না হলে এসব জানাই যেত না।

হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়। সবার মুখে ‘আমরা বিচার চাই’ স্লোগান। সে এক জনজোয়ার।

রাত মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়, রাতের ডিউটিতে তাদের না থাকাই ভালো।

কিছু কিছু মহলের এই ধরনের কথার প্রতিবাদে মহিলারা রাতজাগা আন্দোলনে। হাজার, লক্ষ মহিলা, সারারাত জেগে বিচার চাই শ্লোগানে। শুধু তার শহর নয়, জেলা শহরগুলোতে — সে এক অভূতপূর্ব, কেউ দেখেনি আগে, এরকম একটা ব্যাপার। অথচ ধর্ষণ, তারপর খুন তো রাজ্য জুড়ে, দেশ জুড়ে, এমন কী পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে।

এখন তার শহরে হইচই মাত্রাছাড়া। সেটাই স্বাভাবিক। লোকজন অর্থাৎ জনগণ বলতে যাদের বোঝায়, নারীপুরুষ নির্বিশেষে, একটা অরাজনৈতিক লড়াই চালানোর জন্য মরিয়া। তাতে আবার রাজনীতির নেতা কর্মীদের মধ্যে গোঁসা, কারণ এমন সুযোগ তো বললেই আসে না।

রাজনৈতিক না অরাজনৈতিক — কাদের হাতে রাশ থাকবে, মূল ইস্যু ছেড়ে মাঝে মাঝেই চাপান উতোর ছিল, বেশ একটা গুলিয়ে যাওয়া কেস, জন্ডিসের গন্ধ।

গুরুত্ব বিচারে বিষয়টা সাংঘাতিক, এবং যতই খুন ধর্ষণ হোক চারপাশে, এরকম এই প্রথম — এই ব্যাপারটাই প্রথম থেকে জনগণকে সংগঠিত করেছিল।

যদিও এরই মধ্যে গ্রামে, শহরতলীতে, মফস্বল বা আধা মফস্বলে বেশ কয়েকটি নাবালিকা — নয় থেকে পনের বছরের — কিছু ধর্ষণ — কিছু ধর্ষণ ও খুন — কিন্তু তার জন্য যা কিছু, সবই ছিল স্থানীয় আর শহরের ঘটনাটা নাকি তুলনায় কেন্দ্রীয়। মিছিল আর প্রতিবাদে শহুরে মানুষের উচ্চকিত শ্লোগান, ওদিকে মিডিয়ার দম ফেলার সময় নেই, টিভির অ্যাঙ্কাররা বাথরুমে যেতে পারছে না, ঘু্ম, খাওয়া সব মাথায় উঠেছে।

সাগরিকা ঘুমোচ্ছে। এখন সকাল আটটা। কাল সারারাত জেগেছে। শহর জুড়ে মেয়েদের রাতজাগা কর্মসূচী ছিল। হাজার হাজার মহিলা রাস্তায় নেমে তাদের নিরাপত্তার প্রতীকী প্রতিবাদে মুখর। বিচারের জন্য দাবি তুলে তাদের সঙ্গে পুরুষেরা। সব বয়সের মানুষ, বলতে গেলে নাগরিক সমাজ, যার রেশ ছড়িয়ে গিয়েছিল শহর ছাড়িয়ে জেলা শহরে, এমনকি মহকুমা শহর পর্যন্ত।

জয়দীপ যায়নি। যেতে পারেনি।

ওই নির্মম ঘটনা ঘটার তিনদিন পর এই রাতজাগার আন্দোলন, যদিও দু'দিনের মাথায় মূল সন্দেহভাজন গ্রেফতার। আর সেখানেই জয়দীপের বিপত্তির শুরু।

তার মুখ অবিকল সেই গ্রেফতার হওয়া লোকটির মতো, তার উপর নামে অদ্ভুত মিল — যা থেকে অনুমান, ভাই হতে পারে, কারণ পদবী এক।

সাগরিকা, সংসারে তার এতদিনের সাথী পর্যন্ত অবাক। তার উপর দুই মেয়ের চোখের চাউনিতে বিস্ময়, পাড়া প্রতিবেশী থেকে বাজারের মাছ বিক্রেতা, অফিসের সহকর্মীরা, বাসের সহযাত্রী, সে এক দীর্ঘ তালিকা।

খবরের কাগজে হুবহু তার মুখের ছবি।

টিভির চ্যানেলে চ্যানেলে, সেই মিলে যাওয়া মুখের মিল, জয়দীপ যা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল প্রথম দিন। হো হো করে স্বভাব বিরুদ্ধ হাসি আর ততোধিক বলিষ্ঠ উচ্চারণে এই সাদৃশ্য নিয়ে মজায় মেতেছিল, কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে অস্বস্তির কাঁটায় বিদ্ধ হওয়ার পর্ব  শুরু। লোকটা তার ভাই, এমন কী যমজ ভাইও হতে পারে এই সন্দেহে দু একটা মন্তব্য অফিসের আনাচে কানাচে, তার আগে বাসের নিত্য সহযাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ — কেসটা কী বলুন তো, সত্যিই কি ভাই না দাদা — এমন কী যখন ক্যান্টিনের বাচ্চু নামের ঘাড় গুঁজে টেবিলে টেবিলে চা দেওয়া মিতবাক ছোকরা পর্যন্ত ফিক ফিক করে হেসে ফেলায়  চায়ের কাপ থেকে প্লেটে  চা চলকে পড়েছিল, জয়দীপ  সেই প্রথম বিপর্যস্ত বোধ করেছিল এবং হাসতে চেষ্টা করে টের পেয়েছিল হাসি আসছে না। রসিকতা করার মৃদু চেষ্টাও মাঠে মারা গেল। কারণ সেই স্বর—  যা দিয়ে আগের দিনও খুল্লম খুল্লা হইহই, গমগমে আওয়াজ গলা থেকে, সেদিন, সেই দ্বিতীয় দিন ওই মুহূর্তে এবং সেই শুরু — তখন থেকে গলায় পাথর, এবং তার কন্ঠরুদ্ধ , যার প্রকাশ ছিল তার স্বাভাবিক দৃষ্টির পরিবর্তনে। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যেত জয়দীপের দৃষ্টিতে একটা ফ্যালফ্যালে ঘোর তৈরি হচ্ছিল।

সাগরিকার বোন, তার ছোট শালি — অ্যাক্টিভিস্ট। লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই। বছর ভোর সেমিনার, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক, এই বিষয়ে সে বা তারা এক ইঞ্চি জমি ছাড়তে রাজি নয়।

সেই ছোট শালির অ্যক্টিভিস্ট চোখেও মুখের মিল ধরা পড়েছিল এবং যথারীতি হাসি। তবে গড়িয়ে যায়নি, যথেষ্ট পরিশীলিতএবং ঝকঝকে তার আচরণ।

উত্তেজিত টিভি অ্যাঙ্কররা চ্যানেলে চ্যানেলে প্যানেল ডিসকাশনে যেভাবে গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তর ক্লোজ আপ টিভির পর্দায় ঘন ঘন দেখিয়ে যাচ্ছিল এবং এখনও দেখিয়ে যাচ্ছে— এক অভূতপূর্ব নারকীয় ও জঘন্য ঘটনার ব্যাখ্যায় সারাদিন ও রাত — জয়দীপের কাছে ব্যাপারটা ক্রমেই বিরক্তি থেকে অস্বস্তির পর্যায়ে। এর সঙ্গে তাল রেখে স্বাভাবিকের অতিরিক্ত ফোন, সবই জয়দীপকে, আর সবই মুখের সাদৃশ্য সম্পর্কিত।

ঘটনার পঞ্চম দিনে সন্ধে শেষ হওয়ার আগেই জয়দীপ বমি করে। পেটের প্রাণঘাতী মোচড়ে বারবার কমোডে, বার পাঁচেক এরকম,তারপর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে সে বিছানায়।

শেষপর্যন্ত সেই তুমুল জনরোষের জোয়ার আর পৈশাচিক ধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদের আবহ তার ব্যক্তিগত সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। সে বুঝেই পায় না, তার সঙ্গে কেন, কেনই বা তার সঙ্গে এই সব।

বস্তুত সে ভাবতে চাইছিল না, কিন্তু মনের প্যাঁচানো অলিগলির মধ্যে ঢুকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জয়দীপের স্মৃতির আবর্তে তোলপাড় শুরু হয়। সুতো অথবা তার থেকেও সরু, চোখে দেখা যায় না অথচ আঁকাবাঁকা সেই স্মৃতিপথে তার সঙ্গে জন্মানো এক যমজ ভাইয়ের অনুষঙ্গ এসে পড়ে। মনে পড়ে গিয়েছিল তার ছোট বয়সের এক যমজ ভাইয়ের কথা। তাদের স্কুলের এক ক্লাস নিচে পড়া সেই দুই ভাইকে আলাদা করা যেত না। রামকে শ্যাম আর শ্যামকে রাম — অহরহ সেই গোলমেলে অসংখ্য মুহূর্তের কথা জয়দীপের মনে পড়েছিল। সে নিজের ব্যপারটা এরকম কিছু একটা ভেবে নেয়। তার মনে হয় ব্জন্ম মুহূর্তে সেই ভাইকে  চুরি করে এক সন্তানহারা দম্পতিকে কেউ বিক্রি করে দিয়েছিল। এই সম্ভাবনা, মুখের মিল সংক্রান্ত সমাধানে  স্বস্তির কারণ হলেও অপরাধী মনের ব্যাখ্যা থাকে না তার মধ্যে। যমজ মানে সব একরকম, সে ক্রিমিনাল হলে তুমিও তাই, সে খুনি হলে তুমিও, এরপর জয়দীপ ঘেমে নেয়ে একাকার। এই সম্ভাবনাও তাকে স্বস্তি দিল না। সে তার এই ধরনের ভাবনার সবটুকু নাকচ করতে চায় এই বলে যে, এরকম গল্প  তো তার জীবনে এতদিন, না সে শোনেনি — মা বাবা, আরো কত আপনজন, কেউ বলেনি। এর ফলে তার সামনে কোন বিকল্প  থাকল না,যা তাকে এই সংকট থেকে মানসিক ভাবে রেহাই দেবে।সে ভেবে নিয়েছিল, বা বলা ভালো বাধ্য হয়েছিল ভাবতে যে এটা সম্ভব, একমাত্র এটাই, না হলে এই মিল — এতখানি, ফটোকপি, যার ব্যাখ্যা ওই যমজ ভাই — সেটাও টিকিয়ে রাখতে পারল না।

প্রথম দফার দাড়ি কামানো শেষ করে দ্বিতীয় বারের জন্য শুরু করতে গিয়ে সেভিং টিউব হাতে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল জয়দীপ। আয়নায় এক ঝলক যেটুকু৷ সেখানে তার মুখটা আরো স্পষ্ট। একজন ক্রিমিনালের মুখ। একজন ধর্ষক এবং খুনি।

কানে স্পষ্ট হয় সাগরিকার ঘুম জড়ানো স্বর। ফোনে কথা বলছে। আরো একটা রাত জাগার পরিকল্পনা। শেষ দেখে ছাড়ার সংকল্প। দেশ জুড়ে আই টি হাবে মেয়েদের নাইট ডিউটি। মহিলা ডাক্তার, মহিলা নার্স ছাড়া হাসপাতাল, নার্সিংহোম অচল।প্রতি মিনিটে একটা রেপ, শিশুদের পর্যন্ত রেহাই নেই। সাগরিকার কন্ঠস্বরে ঘুম নেই, দৃপ্ত ও তেজি তার উচ্চারণ।

— মেয়েদের রাতে কাজ করার অধিকার কাউকে কেড়ে নিতে দেব না আমরা।

আজ অফিসে তাকে কেন্দ্র করে সে এক শোচনীয় হাসি ঠাট্টা।

— ইন্টারেস্টিং কী বল তো? ওদের হাসিটা আইডেন্টিকাল।

— কেন হাঁটা?

— দেখেছ?

-দেখব না? টিভিতে কতবার?

—- এটা কিন্তু গুল মারলে।একবার দেখিয়েছিল। কোর্টে নিয়ে যাওয়ার সময়।

— আর গলার স্বর?

— ওটা কী করে বলব?

— তা বলে এতটা মিল?

মহিলা সহকর্মীদের মধ্যে ইতি জানা আন্তরিকভাবে হেসে বলেছিল, অত বিচলিত হচ্ছেন কেন? ইতি জানা। তার সঙ্গে রিক্রিয়েশন ক্লাবে নাটক করে প্রতিবছর। তাকে সমীহ করে। সঙ্গে শ্রদ্ধা। জয়দীপের বস্ ডি জি এম। আজ চেম্বারে ডেকে খাতির করে বসতে বলেছিল। মুখোমুখি। জয়দীপ ততক্ষণে বিধ্বস্ত ও ক্লান্ত।

— সবাই বলছে, অবিকল ওই লোকটার মুখের ছাঁচে আপনার মুখ। আমার তো মাথায় আসেনি।এখন দেখছি ইট ইজ ফ্যাক্ট।

জয়দীপ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিল বসের দিকে। এসির সঙ্গে পেডেস্টালের হাওয়ায় বসের পাতলা হয়ে আসা অবিন্যস্ত চুল ফরফর করলেও পারিপাট্য বজায় রেখেছে। এটা ফ্যাশন মনে করা যেতে পারে অথবা পদমর্যাদার কেয়ারলেস আভিজাত্য। রিমলেস চশমার নিচে নিখুঁত কামানো গাল।গোঁফ নেই।

— আপনি কি ঘাবড়ে গেছেন?

জয়দীপের তেষ্টা পেয়েছিল। টেবিলের ও প্রান্তে, বসের আয়ত্তে ঢাকা দেওয়া জলভরা গ্লাস। চেয়ে নেওয়ার প্রশ্ন ছিল না। নিয়মের বাইরে বলে ঢোঁক গিলেছিল।

— ওই ক্রিমিনালটা কি আপনার বায়োলজিকাল ভাই বা টুইন, যে আপনি এত সিরিয়াস? চোখে লাগছে অন্য কারণে, আপনি এত ঝকঝকে, ম্যাচিওরড,তার উপর এসোসিয়েশনের কালচারাল সেক্রেটারি, মহিলা সহকর্মীরা পর্যন্ত অবাক  হয়ে গেছে। বলছে,আপনি ম্যাদা মেরে গেছেন।

ম্যাদা মারা শব্দ বসের মুখে বেমানান, তবু বললেন, তার মানে কি অবস্থা খুবই সঙ্গীন? সিস্টেমে গোলমাল হলে শব্দ প্রয়োগের এলোপাতাড়ি ভাব চলে আসতেই পারে। জয়দীপ তখন তার ভাবনার গভীরে।

— কিছুদিনের জন্য গোঁফটা ছেঁটে দিন।আর যদি পারেন, ন্যাড়া হয়ে যান।

— ন্যাড়া?

— চেনাই যাবে না। আরো ভালো হত যদি ভ্রু দুটো কামিয়ে নিতেন। তবে প্লাক করতে পারেন। মহিলারা তো করে। ম্যাডামকে বললে হেল্প করবেন। তারপর বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবেন। কেউ টুঁ শব্দটি করতে পারবে না।

দ্বিতীয়বার সাবান ব্রাশ করতে করতে অনিবার্যভাবেই জয়দীপ গোঁফে সাবান লাগিয়ে ব্রাশ বুলিয়ে যায়। একটানা, সময় নিয়ে। রেজারে নতুন কার্টিজ ভরে কয়েকটি আঁচড়ে গোঁফ উড়িয়ে দেয়। আবার সাবানের প্রলেপ দিয়ে সাবধানে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলার মানসিকতায় প্রায় চেঁচে চেঁচে গোঁফের বংশ নির্বংশ করে।

মুখে বেসিনের জলের ঝাপটা, তারপর তোয়ালে দিয়ে ঘষে ঘষে গাল মুছে আয়নায় চোখ রেখে চমকে ওঠে জয়দীপ। চেনা যাচ্ছে না। সে নিজেকে চিনতে পারে না।

এই সময় তার যা করা উচিত ছিল, সে করতে পারে। আরো কিছু বাকি আছে। তাকে ন্যাড়া হতে হবে। সাগরিকা ফের ঘুমে। যা করার এর মধ্যেই। কাঁচি দিয়ে চুল কেটে এই রেজার দিয়েই ক্ষুরের কাজ।

হঠাৎই সামনের বন্ধ জানলাটা খুলে যায়। অনেক দূরে একটা মুখ, অনেক উপরে, আকাশের নিচে মেঘ হয়ে ভাসছে। আবছা মুখটা পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে। জয়দীপ নিজের অজান্তে দু হাত প্রসারিত করে দিল। ওখানে তার নতুন মুখ মেঘ হয়ে ভাসছে। তার আগের মুখের সঙ্গে এই মুখের কোন মিল নেই। ন্যাড়ামাথা, গোঁফহীন, ক্লিন শেভড।

জয়দীপ আয়নায় চোখ রাখলো। কামানো মাথা চকচক করছে। এমন কী ভ্রু জোড়া উড়ে গেছে।

জয়দীপের মনে হয় কী যেন তার চলে গেল।

—- আমরা সবাই যে জীবন নিয়ে বেঁচে আছি, তার লাগোয়া অনেকগুলো জীবন আছে।

— আমি এখন কোন জীবনে প্রবেশ করব?

—- ফিরে আসবে তোমার জীবনে আবার।

— আর এখন?

— চুপচাপ গ্রহণ কর।

— আমাকে নিয়ে এত কিছু?

— কেউ তোমাকে কখনো বলেনি?

— কী?

— তোমাকে একজন টিভি স্টারের মতো দেখতে?

— অনেকেই বলেছে। বেশি বলেছে ইতি জানা।

— তোমার নাটকের নায়িকা?

— হ্যাঁ।

— খারাপ লাগেনি?

— কেন? খারাপ লাগবে কেন?

— তুমি তো তা নও।

-তবে গর্ব হয়েছিল। ইতির যে কোনো কথাই আমার ভালো লাগে। আমাদের সম্পর্কের রসায়ন মানে আন্ডারস্ট্যান্ডিং, খুব ভালো।

— এগুলো না সাংঘাতিক ব্যাপার। একবার শুরু হলে থামতে চায় না।

—- কোনগুলো? ইতির ব্যাপারটা?

—- এখানে ইতি আসছে কোথায়?  তোমার মুখ। জনগণকে ভুলতে দাও। ততদিন অপেক্ষা কর।

হঠাৎই বাজ পড়ে। তারপর ঝোড়ো হাওয়া। তারপর বৃষ্টি।

কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র।

জয়দীপ অবাক হয়ে দেখে জানলাটা গায়েব হয়ে গেছে্। সে আবার বাইরে তাকালো। জানলা থেকে ফ্রেমটা খুলে অনেক উঁচুতে আকাশের নিচে ঝুলছে। সেই ফ্রেমে তার মুখের পাশে তারই পুরনো গোঁফ জোড়া নিয়ে, একমাথা চুলে ভরা আর একটা মুখ, আবছা থেকে স্পষ্ট হয়। আগের জয়দীপ! একই ফ্রেমে দুটো মুখ, দু'জনে দু'জনের দিকে তাকিয়ে আছে।

জানলাহীন ফোকর গলে সূর্যের রশ্মি জয়দীপের চোখে পড়ে। কোনরকমে দু হাতে রোদ সরিয়ে সে তাকানোর চেষ্টা করে।

একটা ফ্রেম। আর সেখানে এখন দুটোর বদলে একটা মুখ। একটা অন্য মুখ।টিভি সিরিয়ালের এক হিরোর মুখ।

এর কথাই কতদিন ধরে তার সঙ্গে মিলিয়ে সবাই। কতলোক। অফিসে, পাড়ায়, বাসে, চায়ের দোকানে। কী হ্যান্ডসাম। বেশি অ্যাট্রাকটিভ গোঁফটা। টিভি সিরিয়ালের নায়ক, সিনেমার নায়ক, একরকম দেখতে।

ইতি তো সবসময় তার লুকের প্রশংসায়। কতদিন গঙ্গার পাড়ে সে আর ইতি জানা। ইতিও সুন্দরী। তাকালে মুখ ফেরানো যায় না।

হুহু করে হাওয়া ঢুকছিল খোলা জায়গা দিয়ে। জানলার সেই খোঁদলের সামনে দাঁড়াতেই জয়দীপ দেখেছিল আকাশ থেকে জানলার ফ্রেমটা কাটা ঘুড়ির মতো ভাসতে ভাসতে তার দিকে। সে দু হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে। নির্দিষ্ট জায়গায় বসাতেই ফ্রেমটা এঁটে বসে আর ফ্রেম থেকে মুখটা জয়দীপের মুখে সেঁটে গিয়েছিল।

আয়নায় নায়কোচিত একটা মুখ। টিভি সিরিয়ালের হিরো। হিরোর একটা সিনেমা রিলিজ করবে সামনের সপ্তাহে। ইতির সঙ্গে কথা পাকা। একসঙ্গে প্রথমদিন। অফিস ফেরত ইভনিং শো।

সাগরিকা ঘুমোচ্ছে। ঘুমোবেই তো। গতকাল সারারাত, সামনে আবার একদিন মেয়েদের রাত জাগার পরিকল্পনা।

তারই মধ্যে ইতির সঙ্গে সিনেমা দেখার প্রোগ্রামটা সেরে ফেলতে হবে।

অফিসে বেরোনোর আগে ড্রেসিং টেবিলের বড়ো আয়নায় নিজেকে সে যখন দেখছিল, চেহারার মধ্যেও বেশ একটা নায়ক নায়ক ভাব। মুখটাতো অবিকল সেই টিভি সিরিয়ালের… খাপে খাপ। ফটোকপি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন