কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

নীতা বিশ্বাস

 

সমকালীন ছোটগল্প


হৃদয়হরণ

(এক)

ঝিনুক লক্ষ করেছে সে বাইরে এলেই চারপাশের লোকজন কেমন যেন ব্যাস্ত হয়ে ওঠে, ভদ্র হয়ে ওঠে!  রিক্সাওয়ালার সাথে ভাড়ার টাকা নিয়ে ঝগড়া করছিল এতক্ষণ, ওকে দেখেই সহসা শান্ত হয়ে ঝগড়া থামিয়ে পয়সা দিয়ে দেয়। দোকানে এলে দোকানি বাড়তি খাতির করে। অন্য গ্রাহক ছেড়ে ওকে খানিক পছন্দসই জিনিষ দিতে দিতে কথায় কথায় অনেক সময় নিয়ে নেয়। যারা দাঁড়িয়ে আছে দোকানে তারাও রাগ করে না। শান্ত হয়ে অপেক্ষা করে। কেউ হয়ত হাতপাতা ভিখারিছেলেটাকে হাত মুখ নেড়ে তাড়িয়ে দিচ্ছিল, ঝিনুককে দেখে একটা পাঁচটাকার নোট দিব্যি ভিখারির হাতে দিয়ে দেয়। ওঁচা পুলিশ, কারো সাথে মুখখারাপ করছিল, আশ্চর্য ভদ্র হয়ে ওঠে। ঝিনুক প্রথম প্রথম বুঝতে পারতো না কেন বা কি করে এমন হয়!

হুট করে মা মরে যাওয়ার পর পাগল পাগল বাবাটার জন্য ঝিনুককে বাইরে দোকানে বাজারে ডাক্তারখানায় আসতেই হয়! এই সময় ও একটা ভাই বা বোনের খুব অভাব বোধ করে। স্ত্রীর শোকে অসংলগ্ন বাবাকে কোথায় পাঠাবে! তাই মাটিতে ওকে পা ফেলেতেই হয়! ছোটতেও ও সবার এক্সট্রা মনযোগ অতি-আদর পেয়েছে। অত বুঝতে পারেনি। তুমুল খেলার মধ্যে থেকেও একটু তাড়াতাড়িই বড় হয়ে উঠতে হয়েছে ঝিনুককে। নিজেকেও একটু একটু করে চিনতে শেখা! নিজেকে বড় হতে দেখেছে আসপাশের কিশোর যুবক কাকু জেঠুদের চোখের তারায়। অথচ কারুর চোখেই হামলে পড়া ভাব দেখেনি। সে সময়টা মা বেঁচে। মা কিন্ত ভয় পেতো। মায়েদের পক্ষে এটাই স্বাভাবিক! ময়ের মৃত্যুর পর পাড়াতুতোদের সকলেরই শোক প্রকাশের অছিলায় ব্যাক্তিগতভাবে কাছে  আসা, কাজে সাহায্য করার অঙ্গীকার…। মা মারা গিয়ে একলপ্তে আরও অনেকটা বড় করে দিয়ে গেল ঝিনুককে। ঝিনুককে ঘিরে পাড়ার বেপাড়ার সকলের মধ্যে কত আলোড়ন! সবাই চুপিচুপি রক্ষক হয়ে উঠেছিল ওর। অনেকগুলি রক্ষক পেয়ে ভালোই হয়েছিল ঝিনুকের। ওর সাথে কেউ খারাপ কিছু করবার সাহস পেত না অন্যদের ভয়ে কি? ঝিনুকের কাছে এলে ছেলে-বুড়ো  সবাই অন্যরকম হয়ে যেত, যেন ওর গায়ে ধুপের গন্ধ, ফুলের গন্ধ, খানিক পুজো-পুজো! সকলেই যেন ঝিনুকের জন্য কিছু করে দিতে পেরে ধন্য। এমনকি পাড়ার কিছু ওঁচা ছেলে, রকবাজ, মেয়েদের দেখে বিশেষণ ছুঁড়ে দেওয়া, বিরক্ত করা ছেলেরাও কেমন বদলে যায় ওকে দেখলে! ঝিনুকের গল্পের এটাই ছিল ক্লাইমেক্স।

মৃতদার অপ্রকৃতিস্থ বাবাকে নিয়ে কলেজের পড়া ওই গ্র্যাজুয়েসনেই ইতি হয়েছে ঝিনুকের। মা চলে যাবার পর কিছুদিনের মধ্যেই বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝেই বাবা দেরি করে বাড়ি ফেরে। একটু-আধটু মদের গন্ধ পাওয়া যায় বাবার নিঃশ্বাসে। বাবা কি ইচ্ছে করেই এইসব করছে! ঝিনুক ভাবে, এগুলো কি সত্যিই বাবার শোক! না কি বাবা নাটক  করছে! দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার নাটক! ভবিষ্যতহীন সেই মেয়ে একদিন বুঝলো বাপ-মেয়ের সংসারে কিছু আয় না থাকলে আর কতদিন চলবে! ততদিনে ও বুঝতে পেরেছে ওর কাছে পূঁজি একমাত্র ওর রূপসৌন্দর্য, যা বেচলে ও খুব তাড়াতাড়ি আয় করতে পারবে। কিন্তু ও আসলে কারোর চোখেই কাম-লালসা দেখতে পায় নি। সিম্পল  গ্র্যাজুয়েশন করে আজকাল কোন অফিসেই ভদ্র কাজ পাওয়া যায় না। কিন্তু ও দেখেছে যেখানেই ওই সার্টফিকেট নিয়ে ও চাকরি খুঁজতে গেছে, ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছে, সব জায়গায়ই চাকরি পাবার অলিখিত, অনুচ্চারিত পরোক্ষ কথা হচ্ছে তার রূপ, ঝিনুক বেশ বুঝতে পেরেছে। পরীক্ষার রেজাল্ট তার এমনকিছু ভালো না  যে এককথাতেই চাকরি হয়ে যেতে পারে! বিশেষ করে কোনও বিশেষ লাইন ধরে না পড়া সাধারণ একটা গ্র্যাজুয়েট এককথায় এইসব পোস্টে চাকরি পেতে পারে না। এইভাবে সব জায়গায় চাকরি পেয়ে যাওয়ায়, চাকরিতে ঘেন্না ধরে গেছিল ঝিনুকের। আসলে চোখ দেখেই মানুষের মনের কথা কি আশ্চর্যভাবে পড়তে শিখে গিয়েছিল ও। অথচ কারুর চোখে লোভ দেখেনি ঝিনুক। করুণাও দেখে নি। দেখেছে কেমন একটা অভিভুত হয়ে যাওয়া ভাব, বা ঝিনুকের বশংবদ হয়ে থাকার ইচ্ছে। এরকম বশংবদ লোক ও চায় না। কেন সাধারণ মানুষ ওকে দেখে নিঃশব্দে বদলে যায়!

(দুই)

ঝিনুকের তৈরি ‘হৃদয় হরণ’ সংস্থা আজ একবছর পূর্ণ করলো। যেসব বৃদ্ধ অপারগ মানুষজনের  হয়ে ওরা প্রতিদিন কাজ করে চলেছ, তাঁদের সবাই এসেছেন ‘আস্থা’ আবাসনের খেলার মাঠটিতে।  তাঁদের উদ্যোগেই এই একবছরের জন্মদিন পালন। বরং ঝিনুক আর তার ‘হৃদয়হরণ’ সংস্থার সবাইকে আমন্ত্রণ করেছে ‘আস্থা’র আবাসিকরাই! না, খাওয়াদাওয়ার ভুরিভোজ নয়, তাঁদের শুকনো  জীবন কেমন ভাবে বদলে দিয়েছে ঝিনুকের সংস্থা, সেটাই জানানোর সুব্দর প্রয়াস তাঁদের এই  সমাগমে। এই মানুষগুলির সুপ্তপ্রতিভা এতদিন পরে আজ পরাণ খুলে বইছে কবিতায়, গানে, ছোট  ছোট  শ্রুতিনাটকে। কেউ ফুলদানিতে ফুল-পাতার ইকেবানা সাজাচ্ছেন। কেউ হারিয়ে যাওয়া ম্যাজিকের ব্যাগ খুঁজে এনে বিস্ময় দেখাচ্ছেন। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সেই সঙ্গসুখের হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখগুলো দেখে কি যে শান্তি! ওর শক ও শোকপ্রাপ্ত বাবাকেও এদের সাথে ভিড়িয়ে দিয়ে বেশকিছুটা স্বভাবিকতায় এনেছে ঝিনুক!

(তিন)

চাকরির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ঝিনুক। সারাদিনের কাজকর্মের মধ্যে একটা আনকমন চিন্তা  সেইসময় ওর মাথায় কাজ করছিল। মানুষ যদি ওর মতো একজন মেয়েকে দেখে বা তার  কাছাকাছি এসে বদলে যেতে পারে তবে এটাকেই পূঁজি করে ও দাঁড়াবে। দাঁড় করাবে কর্মহীন বেকার বয়েযাওয়া তার আসপাশের ছেলেমেয়েদেরও। ঝিনুক দেখেছে ওদের ‘আস্থা’ আবাসনের  বেশিরভাগ পরিবারে থাকেন শুধু নি;সঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। সেখান থেকেই ঝিনুকের অভিনব প্রোজেক্টের শুরু। এবার একদিন ঝিনুক পাড়ার সব কর্মহীন ছেলেমেয়েদের একটা মিটিং ডাকলো পাড়ার ডাকাবুকো স্মিতাবোউদির সাথে পরামর্শ করে।  ঝিনুক আর স্মিতা রায় দুজনে প্রচুর খেটেছিল এসব নিয়ে। প্রত্যেক পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে ‘আস্থা’র আবাসিকদের সকলকে আবাসনের করিডোরে এনে একসাথে সকলের মতামত নেওয়া। একটা পজেটিভ ভাইব পেয়েছিল ঝিনুক। আর দেরি করতে চায়নি। শুরু করে দিয়েছিল ওর প্রোজেক্ট। প্রোজেক্টের নাম ‘হৃদয়হরণ’। ঝিনুক কেমন বুঝতে পেরেছিল হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের মেলবন্ধন না হলে সমস্ত প্রোজেক্টই বৃথা হয়ে যায়। যত্নে-সুখে এইসব মানুষদের হৃদয় হরণ করতে পারার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিল।

ঝিনুকদের পাড়ায় এখন চাকরির সম্ভাবনাহীন তরুণ যুবকদের আর রাস্তার ক্যালভাটে বা চায়ের ঠেকে বসে বাজে আড্ডা দেবার, মেয়েদের দেখে গানে গানে বিশেষণ ছুঁড়ে দেবের সময় নেই আর। পাশের ‘আস্থা’ আবাসনে বা ওদের পাড়ার প্রাইভেট বাড়িগুলোতে এতদিন ধরে একা নি;সঙ্গ জীবন  বয়ে চলেছেন যাঁরা কষ্টে, সেই পেরেন্ট-পার্টির কাজে এখন এই ছেলে-মেয়েরা সহায়ক হয়ে উঠেছে।  লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ঘেমে নেয়ে তাঁদের আর জল-লাইট-টেলিফোনের বিল দিতে হয় না। অসুস্থতায় ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ, এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা, বাড়ির মেন্টেন্যান্স বিল জমা দিয়ে দেওয়া, মোবাইল রিচার্জ, গ্রসারি আনার ঝঞ্ঝাট, সব ওরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। এমন কি একসাথে সবাইকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাওয়া, মাঝে মাঝে ছোট খাটো ট্যুর প্রোগ্রাম এ্যারেঞ্জ করা! শীতে পিকনিক! নতুন টাটকা জীবন ফিরে পাওয়া এইসব মানুষদের হাসিখুশিমাখা মুখ দেখতে দেখতে আগের বেকার   জীবনের ডিপ্রেসন নেই আর। সবাই প্রত্যাশিত মাসমাইনে পাচ্ছে। সময়ও নেই বাজে সময় খরচ  করার। পিছুটানহীন মহিলা যাঁরা  আছেন তাঁরা অসুস্থ অপারগ আবাসিকদের সারাদিন-রাত তাঁদের সাথেই। এই মস্ত পারিবারিক সংগঠনটি চালাতে চালাতে ঝিনুক কেমন সকলের মা হয়ে উঠেছে। “কোনও মানুষের সৌন্দর্য যখন তার মনেও বাসা করে তখন সে ‘হেলেন অফ ট্রয়’ না হয়ে একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে পারে’—আজ ‘হৃদয় হরণ’এর বর্ষপূর্তিতে সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটি ‘হৃদয়ে’র সব ছেলে-মেয়েদের  উদ্দেশ্যে এই দামী বাক্যটি ওদের উপহার দিয়েছেন। আর বলেছেন, সত্যিই, এই একবছরেই তোমরা আমাদের হৃদয় চুরি করেছ বয়েজ অ্যান্ড গার্লস! থ্রী চিয়ার্স ফর ‘হৃদয়হরণ’…

এতখানি ভরসা পেয়ে আপ্লুত ওরা আজ শপথ নিয়েছে, এর মধ্যে কোনো দূর্গন্ধ রাজনীতি ওরা ঢুকতে দেবে না। আগামী পৃথিবীর শিশুদেরও ওরা হৃদয় হরণ করবার পাসোয়ার্ড জানিয়ে দেবে।

 

 

 

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন