তুঙ্গভদ্রার রাজকাহিনী
কিরণ বলেছিল, “জলের কাছে যেও”।
জলের কাছে গেছি, আমি নদীর কাছে গেছি। অহংকারী নদীটি বয়ে গেছে সুরের মতো, সুরার মতো, নারীর মতো। তুঙ্গভদ্রার গা ছুঁয়ে দাঁড়াই। ছলাৎছল ঢেউয়ের কানে শুধোই - “কোন পথে যাও”?
পাহাড়ের গহীন খাঁজ, ঘাসের বুকে হাজার পায়ের ছাপ, ছোটছোট কুঁড়েঘর, ভালমন্দের সাধারণ ধুলোপরত। তারই আঁকেবাঁকে নদীটি বয়ে যায় অবিরাম— কুলকুল তিরতির ঝরঝর। সময়ের গল্প বয়ে যায় স্রোতে।
হসপেট স্টেশনটা বেশ। ছিমছাম, বাহুল্য নেই কোথাও। কেমন এক মফস্বলী গন্ধ স্টেশনটার গায়ে। ভোরবেলায় এইসব স্টেশনের গায়ে নরম কুয়াশা লেগে থাকে। অমরাবতী এক্সপ্রেস নামিয়ে দিয়েছে একদম সকালেই। ঝিরঝিরে হাওয়া। সাথে যারা নেমেছে তার বেশিরভাগই স্থানীয়। কিছু হাতেগোনা মানুষ আমাদের মতো, বেড়াতে এসেছে।
ছোট স্টেশনগুলোর মজা হল ট্রেন স্টেশনে ঢুকলেই হুড়মুড়িয়ে ওঠানামা করে মানুষ, দেখতে দেখতেই ব্যস্ত পায়ে হাঁটা। ট্রেন গড়িয়ে যায় হুইসেলের ডাকে, অন্য ঠিকানায়। পাতলা হয়ে আসে ভিড়। হইচই টপকে আবার আলসেমির ঘুমে ঢুকে পড়ে স্টেশন। দুয়েকটা কুকুর ভাবলেশহীন মুখে ঘুরে বেড়ায় কিংবা রাজার হালে বসে থাকে ব্যক্তিগত দরবারে।
দক্ষিণের স্টেশনগুলো এমনিতেই বেশ পরিচ্ছন্ন। সারা চত্বরে বড়া, ইডলি আর ফুলের মিলেমিশে যাওয়া চেনা গন্ধটা নাকে এসে লাগে। একটু দূরে ধানক্ষেত, গুঁড়ো গুঁড়ো টিলা, সবুজ, সোঁদা হাওয়া। মোরাম ফেলা কাঁচা রাস্তার ধারে গোটা তিনেক গোলকচাঁপা গাছ। মাটিতে ডালে প্রচুর ফুল। গন্ধে ম ম করছে পায়ে চলা একফালি সরু রাস্তা।
ঘড়িতে প্রায় সাড়ে ছটা। রাস্তাঘাট অদ্ভুত রকমের ফাঁকা এখনও। শহরটার যেন এক্ষুণি বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। আমরা যাচ্ছি ঝকঝকে রাস্তা ধরে, বেশ অভিজাত এলাকা।
দুয়েকটা এডমিনিষ্ট্রটিভ বিল্ডিং পেরোতে না পেরোতেই অটো ঢুকে পড়ল একটা মাঝারি সাইজের গ্রিল-গেটের ভিতর দিয়ে। সাধারণ একটা বিল্ডিং, চারদিক থেকে চওড়া মাটির রাস্তা দিয়ে ঘেরা। বাগানে মরসুমী ফুল, একটা কৃষ্ণচূড়া। পিছনের অসংখ্য গাছে পাখিরা ভীষণ ব্যস্ত। হোটেল এখনও ঘুমে।
সকালের বাগানে জল দিচ্ছে এক বয়স্ক মালি। অটোর শব্দে মুখ তুলে তাকায়। ভাষার সমস্যা আছে বলেই বোধহয় চুপচাপ কয়েকটা লাগেজ তুলে নিয়ে সোজা হোটেলের লবিতে। লবিটা অন্ধকার। রিসেপশনে চেয়ারদুটো ফাঁকা। ম্যানেজার কিরণ। খবর পেয়ে ঘুমচোখে উঠে এসেছে। প্যাসেজে তখনও ভোরেলা অন্ধকার, পাশের ডাইনিং হল নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। কর্ণাটক স্টেট ট্যুরিজমের এই হোটেলটা ঝিমধরা, ঢিলেঢালা। সাদামাটা নিঝুমভাব লেগে আছে গায়ে, ঠিক যেমনটা কোনো দক্ষিণী বাড়িতে গেলে মনে হয়।
ছায়াছায়া হোটেলটার ঠিক উল্টো স্বভাবের দক্ষিণী সূর্য মার্চের মাঝসকালে যেন উবু ঝুঁটি, খ্যানেখ্যানে বুড়িটির মতো। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে হদ্দ করতে পারে যখন তখন। সকাল দশটায় রাস্তার পাশে ঝুড়িতে কলাপাতায় ঢাকা ফুল, মালা গেরস্তের বউ ঝি’রা কেনে। সম্বার চাটনির মোলায়েম গন্ধটা দোকান ছেড়ে নেমে এসেছে রাস্তায়। হাম্পির তাতালো ধুলোয় রোদ গড়াচ্ছে নিজের খেয়ালে। কিরণ ডেকে বলেছে, “নদীর কাছে যেও, জলের কাছে যেও। সন্ধের মুখোমুখি তুঙ্গভদ্রায় যেও।“
তুঙ্গভদ্রা নদীর ওপারে আনেগুণ্ডির দুর্গ, এপারে বিজয়নগর। হাম্পি গ্রামের বিজয়নগর হয়ে ওঠার গল্পটা জানে নদী। কবেকার সে কথা— আনেগুন্ডি তখন নেহাতই ছোট এক তালুক। তুঙ্গভদ্রার দক্ষিণ পাড়ে তিনদিক পাহাড় ঘেরা নিরিবিলি সমতল এক জমি, সেই জমিতেই আনেগুন্ডি দুর্গ। দুর্গের ফটক ঠেলে দলে দলে উঠে আসছে সুলতান তুঘলকের সেনা। তুঘলকের রেবেল ভাইপোকে আশ্রয় দিয়েছে আনেগুন্ডির দুর্গ। বাকিটা রাজার হেরে যাওয়ার সাতকাহন। তুঘলকের হাতে অনেকের সঙ্গে বন্দী হয়েছিল দুই ভাই হরিহর, বুক্কা – হেরে যাওয়া আনেগুন্ডির মহামন্ত্রী আর ট্রেজারার। সেই হরিহরই একদিন ফিরে এল আনেগুন্ডির রাজা হয়ে। সময়টা ১৩৩৬ খ্রিস্টাব্দ।
নদীর ওপারে হাম্পী গ্রাম, রাজা শিকারে গেছেন। রাজ- সারমেয়টিকে কামড়ে ধরল সামান্য এক খরগোশ। সাধু মাধবাচার্য ছিলেন তপস্যায়, তাঁর কাছে গেলেন রাজা। নতজানু রাজা,করজোড়
–
“এমন
ঘটনার অর্থ কী ভগবন্?”
–
“পবিত্র
এই ভূমি, এখানেই নতুন করে বসাও রাজধানী, এ শহর অজেয় হবে”।
সাধুর অক্ষয় বাণীখানি সম্বল
করে রাজা উঠে এলেন হাম্পি গ্রামে, দেখতে দেখতে রাজধানী শহর হল সেই গ্রাম।
চলেছি লাল মোরামের রাস্তা ধরে, মোরাম একসময় এসে মিলেছে পিচে। একটু আগেই ফেলে এসেছি ব্যস্ত রাস্তার ভিড়। পাতার ছাউনি দেওয়া দোকান, ছোটছোট ঘরবাড়ি, আর তারই ফাঁক গলে একটা দুটো মন্দির। ভেঙে পড়া ছাদ, দেওয়াল, থাম নিয়ে দাঁড়ানো কবেকার যে মন্দির সেকথা জানে বয়ে যাওয়া সময়, আর জানে হাম্পির ধুলোবালি, মানুষ। এ অঞ্চলটা এখনও গ্রাম। শহর পড়ে আছে একপাশে। লাল ধুলোমাখা রাস্তায় শুয়ে প্রাচীন এক সময়। এ রাস্তায় আজও যেন ঘোড়ার খুরের খুট খুট, রাজকীয় হাতির নিঃশব্দ চলাফেরা, অভিজাত শোভাযাত্রার ছায়া। ছায়ারা হেঁটে চলে বেড়ায়, ভেঙে পড়া খিলানের গায়ে হেলান দেয়, মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।
অজেয় এ শহরের ধুলোমাটি ইঁট কাঠ পাথর ছুঁয়ে দেখার আশায় কত যে আনাগোনা সে শুধু শহর জানে।
সঙ্গম, সালুভা, তুলভা বংশের নানান রাজার হাতে সেজেছে এ শহর। এসেছে বণিক, রাষ্ট্রদূত,বিদেশি পর্যটক। দুআর্ত বারবোসা, ডোমিঙ্গো পায়েজ, ফার্নাও নুনিজ, আব্দুর রজ্জাকের মতো মানুষেরা এসেছে রাজার কাছে। হেঁটেছে এই শহরের অলিগলি রাস্তায়, লিখে গেছে রাজার কথা, প্রজার কথা, অবাক করা এক শহরের কথা।
হাজার বছরের পারে আমিও চলেছি সেই একই রাস্তায়, একই ধুলো গায়ে মেখে, একই আকাশের নিচে তুঙ্গভদ্রার পিছু পিছু।
কমলাপুরমের হ্রদ শুয়ে আছে একরাশ নীলজল বুকে। সে বুঝি প্রহর গোনে আজ কাল আবহমান অনাদিকাল জুড়ে; পাশে দাঁড়ানো পাথুরে টিলাগুলোর সাথে ওর ঝগড়া, ভাব, আড়ি। সুপারিগাছের সারি, কলার বাগান ছড়ানো রাস্তায় আজও বুঝি সে শোনে ঘোড়ার খুরের খুটখুট, কুচকাওয়াজ, ষড়যন্ত্রের ফিসফাস।
উঁচু একটা পাহাড়ের ওপর উঠে দেখছিলেন পায়েজ। যতদূর চোখ যায় সবুজ আর টিলা। আম, কাঁঠাল, আনারস, লেবু, নারকেল, কলা , সুপারি বাগানের ঠাস বুনোটে জুড়িয়ে যাচ্ছে চোখ, ছায়ামাখা রাস্তার দুপাশ। পায়েজ তখন কেই বা? বিজয়নগরে আসা পর্তুগিজ দূতের সামান্য এক সঙ্গী মাত্র। পায়েজ ঘুরছেন শহরের অলিগলি আর ইতালি, রোমের সাথে তুলনা করতে গিয়ে হোচট খাচ্ছেন বারবার। চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে রাজদরবার, শহরের ঘরবাড়ি, উৎসব আর মহিলাদের সাজপোশাক। বিজয়নগর যেন এক আশ্চর্য নগরী।
উত্তর দক্ষিণ পূর্ব তিনদিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা বিজয়নগর সেদিন এক নিরাপদ রাজধানী। তুঙ্গভদ্রার ধনুকের মত বাঁকের ভেতর বেড়ে ওঠা শহরের বসতি ছড়িয়েছে নদীর দুধারে,শহর বেড়েছে দৈর্ঘ্যে আর ভিতরের দিক ক্রমশঃ দূরে গেছে নদীতীর থেকে। ওই যে ফসলি জমি, ফলের বাগান আর রাস্তা জোড়া সবুজ ছায়ায় জল যোগায় কে?
পায়েজ দেখছেন পাহাড়ের মাথায় সে এক মস্ত কাণ্ড! হাজার হাজার লোক বাঁধের কাজে ব্যস্ত, তাদের তদারকি করছে অভিজাত রাজকর্মচারীরা। পাহাড়ের মাথায় বেঁধে রাখা হচ্ছে বৃষ্টির জল, সেই জল পাথরের নালি বেয়ে আসছে শহরে, প্রাসাদ আর চানঘরে। সেদিনের জল বয়ে আনার এই যে ব্যবস্থা তার কিছুটা এখনও সচল, কমলাপুরম সাক্ষী।
কাজল কালো ছেলেটি পিছু নিয়েছে বহুক্ষণ। সে আমার মুখে কেবল আশ্বাস খোঁজে, শেষমেশ আমি রাজী। কিঞ্চপ্পা’র মুখে অনাবিল হাসি। এই মুখ, এই হাসির লোভেই বেরিয়ে পড়া।
অদ্ভুত এক ঝিম দুপুর। লালমাটির ধুলো রাস্তার দুপাশে ফসলী সবুজ, মাথার ওপরে নীলমণি আকাশ, কান পাতলেই পাখিদের কিচকিচ। এছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। গরম হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে কান, ইতিহাসের ফেলে যাওয়া রাস্তায় চুপচাপ গড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের ব্যাটারি গাড়ি। এ রাস্তার বাঁকে বাঁকে ঝিমোচ্ছে সময়, সেই ফাঁকে পৃথিবী যে বহুবার চক্কর কেটে ফেলেছে সূর্যের চারপাশে সে বুঝি তার হুঁশই নেই। মৃত এক সময়ের সন্ধানে চলেছে একদল জীবন্ত মানুষ আর গাইড কিঞ্চাপ্পা। রুক্ষ গুঁড়িগুঁড়ি পাথুরে টিলা আর নিটোল সবুজের কন্ট্রাস্টে দাঁড়িয়ে পড়েছে ইতিহাস আর আমাদের অবাক চাউনি। এ তল্লাটে কিঞ্চাপ্পা আসে রোজ, বারবার। ওর চোখ নিরপেক্ষ নির্লিপ্ত।
ছাড়িয়ে এসেছি বাজার, কিম্বা বাজারের স্মৃতি কাঁধে পড়ে থাকা বুড়ো জমিন। সার দেওয়া ঘর ছিল একসময়, ছিল পশু কেনাবেচার আড়ৎ। দেশ বিদেশের ব্যবসাদার আসত, ইরান পারস্য পর্তুগাল চীন। আরবী ঘোড়া সত্যি সত্যি সেদিন দাপিয়ে বেড়াত বাজারময়, বিকোত সোনার দামে। দ্রাবিড়িয়ান শৈলীর প্রায় ভেঙে পড়া গোপুরম পেরিয়ে প্রধান চত্বরে ঢুকতে ঢুকতে এক আবিষ্ট চলনে হেঁটে যাচ্ছি বিস্ময় থেকে বিস্ময় পরতে। গভীর মনোযোগ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছে কিঞ্চাপ্পা। মন্দিরের অলঙ্করণ, আর্কিটেকচার, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হিসেব নিকেশ।
পাথরের রথ, রঙ্গমন্ডপ, কল্যাণমণ্ডপ, মিউজিক্যাল পিলার সব একে একে বুঝিয়ে চলেছে। যা শুনি তার অনেকটাই ভুলি, তবু কিঞ্চাপ্পার এবিষয়ে পড়াশোনা রয়েছে যথেষ্ট, এটা বুঝতে ভুল হচ্ছে না কোনোভাবেই। গ্রাজুয়েট কিঞ্চাপ্পা। একটা ক্যুরিয়ার কোম্পানিতে কাজ করত।
নিজের কথা বলছিল কিঞ্চাপ্পা। এখন ও গাইডের কাজ করে। ইংরেজি ছাড়াও স্প্যানিশ আর ফ্রেঞ্চ শিখেছে, এতে সুবিধা হয়। বিদেশি ট্যুরিস্টদের আনাগোনা এখানে বেশীই। তখন রোজগারও খারাপ নয় তবে উটকো ঝামেলায় পড়তে হয় অনেকসময়। হিপিদের প্রিয় ঠেক হাম্পি। মাসের পর মাস কাটিয়ে যায় ওরা, গাঁজা চরসের অবৈধ কারবার এ শহরের অনাচেকানাচে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞ হয়েছে কিঞ্চাপ্পা, এখন ঝামেলার গন্ধ পেলে দূরত্ব মেপে চলে। মরসুমে দেশী পর্যটকের চেয়ে বিদেশি পর্যটকে তার লাভও বেশি। তবু মন্দির ঘুরিয়ে দেখাতে গিয়ে এএসআই আর ভারত সরকারের কথা বলতে গিয়ে মাঝেমাঝেই নিজের বুকে হাত রেখে বলছে “মাই গভর্নমেন্ট”, আওয়ার এএসআই”, বলতে বলতে কিঞ্চাপ্পা যেন একাই এক ভারতবর্ষ।
বিঠঠল মন্দিরের দুই গার্ড হনুমান আর প্রমীলা। ওরা গোপুরমের ছায়ায় বসে গল্প করে, জল টিফিন ভাগাভাগি করে খায়। এ দৃশ্য দেখলে বাল্মীকি রামায়ণ নতুন করে ভাবতেন কিনা জানিনা, তবে অযোধ্যার চেয়ে রামায়ণ যেন অনেকবেশী জুড়ে রয়েছে অনার্য কিষ্কিন্ধ্যা নগরীর আকাশে বাতাসে।
গোপুরম পার হতেই বুঝি কোন ময়দানবের দেশ। শিল্পীর ছেনিতে প্রাণ পেয়েছে পাথর। সূক্ষ্মতা নিজেই নিজেকে ছাপিয়ে গেছে পায়েপায়ে। মাথার উপর দাউদাউ সূর্য, ধূ ধূ মাঠ, হা হা বইছে হাওয়া। জনহীন পাহাড় ঘেরা হুহু শূন্যতা প্রশ্ন করে “কী চাও? কিসের সন্ধানে ঘুরে বেড়াও, হে পথিক? কী নিয়ে যাবে আঁজলায় ভরে? এস আমাতে অবগাহন কর, এই যে অপার মুগ্ধতা এতে আচ্ছন্ন হও, বিলীন হও। যা তুলে নিয়ে যাবে তা দুহাত ছাপিয়ে উপচে পড়বে এই অতীতগন্ধী ভূমিতে । তুমি রেশটুকু বয়ে যাবে আমরণ...”
সত্যিই বুঝি আঁজলা উজাড় করেই ঘরে ফেরে পথিক, মন পড়ে থাকে অলৌকিক উঠোনে। শিল্প, নৈপুণ্য, অলংকরণ, বিজ্ঞান, বাস্তুকলা, গণিত, সৌন্দর্য্য এবং এক রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই মুহূর্তে বিদ্ধ আমার স্বত্বা, অনুভূতি। পৃথিবী বিখ্যাত পাথরের রথখানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সব হিসাব ভুল হয়ে যায়, ফিকে হয়ে যায় আধুনিক দুনিয়ার গৌরব,পান্ডিত্য। বাঁদিকে কল্যাণ মন্ডপ, সামনে মহামন্ডপ।
কল্যাণ মন্ডপের পিছনে রঙ্গমন্ডপ। মহামন্ডপের ডানদিকে সার দেওয়া ঘরের অবশেষ যা একসময় অতিথিশালা হিসাবে ব্যবহার হত। অতিথিশালা চত্বরে ঢোকার মুখ থেকে মহালক্ষ্মী মন্দির পর্যন্ত সার দিয়ে দাঁড়ানো সেইসব ঘর। মহামন্ডপটি চারটি আলাদা মন্ডপে ভাগ করা... নর্তকী হাতি ঘোড়া এবং আরো নানান কারুকাজে মোড়ানো থামগুলি অল্প আঘাতে ছড়িয়ে দেয় সুরের তরঙ্গ। ছাদের দিকে মাথা তুলে তাকালে চিত্রকল্প চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।
কীভাবে হত এই বর্ণ অলংকরণ? নীচে রাখা থাকত জল, তা দেখে রঙ ভরতেন শিল্পী... মহাভারতের অর্জুনকে মনে পড়ে। অর্জুন যেন এক চরিত্রমাত্র নয়, কলা, দক্ষতা, শিল্প, কৌশলের এক বহুচর্চিত উত্তরাধিকারের নাম কি অর্জুন হয়ে যায়?
শিল্প চিরকাল জীবনের গল্প শোনায়। শিল্পীর আঁচড়ে পাথরের গায়ে ফুটে ওঠে ঘোড়া ব্যবসায়ীর ছবি, ঘোড়া চিনে নেওয়ার তত্ত্বতল্লাশ, এমনই আরও অনেক কিছু। শিল্প বুঝি এক অনায়াস ডুবসাঁতার – একই খোদাইয়ের ভাঁজে বাঘের মুখ হাতির শুঁড় ড্রাগনের মুখ! আর অলংকরণ? আজকের স্থাপত্যবিদ্যা, বাস্তুকলা চেয়ে থাকবে নির্বাক, নিশ্চুপ... জল গড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ও এত অনবদ্য হয়! হাতের কাঁকনের মত নকশায় অল্প ফাঁক, উপর থেকে ফলার মত নকশায় টুপিয়ে পড়বে জল, জল জমবে না পাথরের গায়ে। অথচ কি নীরব সেই দক্ষতা! মন্দিরের প্রাচুর্যের পাশে বড় সহজেই চোখ এড়িয়ে যাবে দর্শকের।
বিথথল মন্দির বুঝি তামাম দুনিয়ার দিকে চেয়ে মৃদু সুরে বিলিয়ে চলেছে বাস্তুকলার অপরিমেয় জ্ঞান। মন্দিরের গর্ভগৃহ অপেক্ষায় ছিল শেষ চমক দেবে বলে – কয়েকধাপ নীচে নেমে গিয়ে মাটির তলা দিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণের ব্যবস্থা। অন্ধকার সিঁড়ি। অন্ধকার ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে তিরতিরে এক আলো, প্রদীপের মতো। গর্ভগৃহের ছাদে হিসাব করে ঘর কাটা। সেই ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে নামছে আলো, এসে পড়ছে দেওয়ালের ভাস্কর্যের পায়ের ঠিক নীচে খোদাই করা পদ্মপাপড়িতে। প্রতিফলিত হয়ে মূর্তির গায়ে ছড়িয়ে পড়ছে নরম আলো নরমতর হয়ে... কী নির্ভুল গণিত, নিঁখুত জ্যামিতি; সব ছাপিয়ে শিল্পের কী মারাত্মক পরিমিতিবোধ, সূক্ষ্মতা!
পাথর খোদাই এ কাবিতায় ইউক্লিড কিংবা পিথাগোরাস এক অপিরিচিত নাম। এ বুঝি কোন ইন্দ্রপুরীর কারিগর তার ছেনি বাটালির টানে পাথরে এঁকেছে ভৈরবী টান মৃদু, গম্ভীর। অপার মুগ্ধতায় পা বাড়াই। প্রাচীন গোলকচাঁপা গাছের ছায়ায় নিজেকে থিতিয়ে নিই, ফুলের গন্ধে মাতাল হাওয়ায় তুঙ্গভদ্রা ফিসফিসিয়ে ওঠে...” আছে, আরো আছে বাকি... থেমো না... ওই যে সামনে প্রস্তরভূমি, হেঁটে যাও। রাজা রানী, দীর্ঘশ্বাস, ষড়যন্ত্র, রক্তের দাগ বুকে নিয়ে জেগে আছে এক রাজকীয় বিলাস ভূমি... বহু শতকের ঘুমে ক্লান্ত সে হিসাব... স্মৃতিভার আমার বুকে পাথর হয়ে জমেছে ... এসো, হাত ধরো ...”
ছাড়িয়ে যাচ্ছি বিঠঠল মন্দির, পেছনে পড়ে রইল মন্দিরের গার্ড প্রমীলা আর হনুমান, কিঞ্চাপ্পার হাসিমুখ, ঘোড়া নিমের ছায়া। সমাজ ও সময়ের বিচিত্র এক গলিপথে ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে কিঞ্চাপ্পা। ব্যাটারি-গাড়ি ধুলো উড়িয়ে ফিরে যাচ্ছে পুরনো রাস্তায়। পিছনে পড়ে রইল শেষের প্রহর গুনে চলা এক আর্কিওলজিক্যাল বিস্ময় আর ন্যাড়া পাহাড় ছুঁয়ে সুপারির সারি আর আগুন ঢালা আকাশ।
লিজা আর তার সই জেনি এসেছে ফ্রান্স থেকে, ভারতবর্ষ দেখতে। ঘুরতে ঘুরতে গোধূলি বেলার বিজয়নগরে। মহানবমী ডিব্বার কুড়িফুট চড়াই সিঁড়ি ভেঙে উঠতে গিয়ে হাঁফিয়ে উঠেছিল ষাট ছুঁয়ে যাওয়া লিজা। শেষের ধাপে অল্প টাল খেতেই খপ করে ধরে ফেলেছি তার হাত। উপরের ছড়ানো চত্বরে উঠেই একমুখ হাসি। গত তিনমাস ধরে ঘুরছে নানান রাজ্য।
মহানবমী ডিব্বার উঁচু চাতালে দাঁড়ালে এক নিঃস্ব করা শূন্যতা ঘিরে ধরে। নিজেকে ছোট থেকে আরো ছোট ভাবতে ইচ্ছে হয়। কানের পাশে ফিসফিস করে লিজা, "ইটস হিউজ, নো!"
– ইয়েস ইট ইস!
কিন্তু কী সেই বিশালত্ব? মানুষ,
রাজপাট নাকি সময়? বসে পড়ি লিজার পাশে।
লিজা জিজ্ঞেস করে, "কোন
দেশ?"
– এই তো আমার দেশ লিজা, যা
তুমি তিনটি মাস ধরে ঘুরেও ক্লান্তিহীন।
–তোমার দেশে তো সামনেই ইলেকশন। কেমন সরকার চাও তোমরা?
কী উত্তর দেব? মস্ত এই দেশ, বহুল তার মতামত, বিবিধ জীবনযাত্রা। এর সঠিক উত্তর কি আমি জানি? জানি না। তবু বলি, মতামত সবার আলাদা, চাহিদাও, তবু আমরা গণে আস্থা রাখি লিজা। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ'র মতই দেশের মত। লিজার ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি। বলে, " সরকার আসে সরকার যায়, শুধু মানুষই চিরস্থায়ী..."। শেষ বিকেলের আলো ছড়িয়েছে বিদেশিনীর মুখে। পায়ে পায়ে নীচে নেমে আসি ইতিহাসের সার কথাটুকু শুনে।
একসময় এই চত্বর ছিল অপরূপ কারুকাজের থামে ঘেরা হল; রাজা এসে বসতেন উৎসবে অনুষ্ঠানে, নবমীর দিন, দোল কিংবা দীপাবলিতে। উড়িষ্যা জয়ের পর রাজা কৃষ্ণদেবরায় এটি তৈরি করান বিজয়মহল হিসাবে। চোখের সামনে সারি সারি মহল, অধিষ্ঠান কক্ষ, দরবার হলের ভিতটুকু পড়ে আছে স্মৃতি আঁকড়ে।
সে ছিল এক দীপাবলির রাত। সারি সারি প্রদীপ জ্বলে উঠল বিরূপাক্ষ মন্দিরের কোণে কোণে, প্রাসাদের অলিন্দে। ঝলমল করে উঠল চারপাশ। সফেদ রেশমি কাপড় উড়ল থামের গায়ে। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেল চারপাশ। প্রধান ফটক দিয়ে একে একে এল নর্তকীর দল। গলায় গজমোতির মালা। কোমরে হিরে, চুনি পান্নার কোমরবন্ধ। হাতে কেয়ুর কাঁকন, পায়ে পাঁয়জোর। এল অতিথি, অভ্যাগত। এল মন্ত্রী, সান্ত্রী। এলেন রাজা। রাজ সিংহাসনের পাশটিতে মাত্র দুটি আসন। একটিতে রাজার শ্বশুরমশায় আর তার ঠিক নিচের ধাপে মহামন্ত্রী। সাদা সুতির কাপড় পড়েছেন রাজা। মাথায় সাদা রেশমের পাগড়ি। তারে সোনার জরি, দামী পাথর। গায়ে তেমনই সাদা রেশমি চাদর,কপালে তিলকের দাগ। মহামন্ত্রীর পোশাক সাধারণ। অথচ নিখুঁত আভিজাত্য। এল পুরনারীর দল। শুরু হল অনুষ্ঠান...
পায়েজ এই বর্ণনা দিতে দিতে বারবার রোম ইতালির সেরা জাঁকজমকের তুলনা টেনেছেন। বলেছেন সেসব দেশের চেয়ে ঢের বেশি সম্পদ বিজয়নগরের রাজার। দাসী, নর্তকীদের গয়না দেখে তিনি আর হিসেব করে উঠতে পারেননি। বিজয়নগরের ঘরবাড়ি দেখে লিখেছেন- এর চেয়ে সেরা, সুন্দর আর কোত্থাও নেই। আজ শুনশান সব। রাজছত্র, জয়স্তম্ভ মুছে গেছে। পড়ে আছে একলা, বুড়ো এক সময়।
রাজা ছিল সিংহাসনে, ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু রাণী? রাণীও ছিল। আলাদা তার ঘরবাড়ি, সুখদুঃখও বুঝি আলাদা। তার আনন্দ হলে বাতাসে উড়িয়ে দেয়, দুঃখ ভাসায় তুঙ্গভদ্রা জলে। তার গাছের ছায়ায় পর্ণকুটির। দিন শেষে টুকরো হাসির ভাগ নেই, মান অভিমান পাথরের দেওয়ালে লুকিয়ে কাঁদে। সে রাজঘরণী। রাজার বাড়ি থেকে কয়েকশ মিটার দূরে উঁচু পাঁচিল ঘেরা জেনানা মহল। ঢোকার মুখের মূল দরজাটি ছাড়া বাকি দরজাগুলি ইন্দো সারসেনিক শৈলীতে তৈরি। ছাদ নেই, দেওয়াল থাম সবই কালের বিপুল গর্ভে। উঁচু ভিতের উপর বিশাল চত্বর... এই অংশের সবচেয়ে বড় প্রাসাদের চিহ্নটি রাণীর মহল বলে মনে করা হয়। উল্টোদিকে পদ্মমহল। তবে রাজার একাধিক রাণীরা সবাই কি ওই এক মহলেই থাকত? কি জানি! দুপাশে পাঁচিলের গায়ে দুটি নজর মিনার আজও দাঁড়িয়ে। সম্ভবত রাজা ফিরলে কিংবা কোন শোভাযাত্রা দেখার জন্য এই ব্যবস্থা। প্রধান রাজপথের নাম পানসুপারি রাস্তা, রাস্তার দুপাশে ঝলমল করত মূল্যবান জিনিসত্র সাজানো দোকান। পদ্মপাপড়ির মত এক মহল পদ্মমহল। স্থাপত্যশৈলী ইন্দো সারাসেনিক। হয়ত কোনো এক সন্ধ্যায় আসর বসত... সুরের মূর্ছনায় ভেসে যেত চাঁদের আলো, মেঘেরা জিরিয়ে নিত আলোয় ভিজে... আজ শুধুই স্তব্ধতা। পদ্মমহল তুলনা টেনে আনে রানীর স্নানঘরের। একই শৈলী, ঘরের চারপাশ ঘিরে জল আনার গর্ত। পাথরের নালি বেয়ে জল গিয়ে পড়বে বড় এক বাঁধানো জায়গায়, চারদিক ঝুলবারান্দা ঘেরা। তবে ঘর ছেড়ে প্রায় আধমাইল দূরে, জনবহুল পানসুপারি বাজারের রাস্তা পেরিয়ে রাজপরিবারের জন্য পাঁচিল ঘেরা জায়গার এক্কেবারে পাঁচিলের গায়ে রাণী কি স্নান করতে আসতেন নাকি মনখারাপের বিকেল কাটাতে? সে উত্তর আজ কালের গর্ভে। আর হাতিশালা... তাও রাজার বাড়ির সাথে না থেকে রাণীর মহলের কাছে যে কেন তার উত্তরই বা কে দেবে! গম্বুজের মত ছাদওলা হাতিশালা নামের বাড়িটির পাশেই গথিক শৈলীর থামওলা ঘরের সারি, সম্ভবত প্রহরীদের ঘর। ইরান তুরস্ক পারস্য দেশের মেয়েরা ছিল বিশ্বস্ত রাজপ্রহরী।
রাজসুরক্ষায় নারী! সেই দক্ষিণেই যে আম্মা ডাব বিক্রি করবে সেটিই তো স্বাভাবিক। আরো এগোলে চন্দ্রশেখর মন্দির, রঙ্গ মন্দির, ধ্বসে পড়া পাঁচিলের অবশেষ, কিছু জৈন মন্দির। মহাকালের মর্মে বিলীন হবার অপেক্ষায় পড়ন্ত সূর্যের আলোয় রাজকীর্তির রেশটুকু নিয়ে পড়ে থাকে লালমাটি, পাথুরে হাঁটাপথ, অন্তহীন বিস্তার, পানসুপারি বাজার জনহীন নির্জন। রহস্য ছড়ায় কুয়াশার মোড়কে... "লক্ষ লক্ষ মহাদ্রুম, শিরা-উপশিরা নিয়ে জীবনের কত বিজ্ঞাপন। তবুও জীবন জ্বলে, সমস্ত অরণ্য-দেশ জ্বলে ওঠে অশোক আাগুনে। আমি চলে যাই দূরে, হরিণের ক্রস্ত পায়ে, বনে বনান্তরে,অন্বেষণ।"
আকাশের নীলিমায় সন্ধ্যার আয়োজন, একটি একাকী ডিঙা তীরে বসে অপেক্ষায় ..."কে আছো ক্লান্ত পথিক? এসো, পরপারে নিয়ে যাই।"
এ ডিঙা বুঝি আজ নয়,কাল নয়
এমনই বসে আছে আবহমান কাল,কোন সুদূর অতীতে পৌঁছে দেবে বলে।
বিরূপাক্ষ মন্দিরের চূড়ায় তখন বেলা শেষের গলানো সোনা ঢেলে দিচ্ছে সূর্য। গায়ত্রী মন্ত্রের মৃদু গুনগুন ছড়িয়ে পড়ছে সামনের রাস্তায়। ধীরে, খুব ধীরে সেই সুর মিলিয়ে হয়ে যাচ্ছে মন্দিরের সামনের সার সার ঘরে ঘরে, হামপি বাজারের অন্ধকার কোণে। বিরূপাক্ষ পম্পাপতি শিব, আজকের তুঙ্গভদ্রা সেদিনের পম্পা। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের, রাজপরিবারের কুল দেবতা। এ মন্দির অবশ্য তারও আগের সময়ের। চালুক্য যুগের। সামনে একটি মহামন্ডপ, অর্ধ মন্ডপ ও একটি অবরোধ। এই তিনধাপ পেরিয়ে দেবদর্শন। পরে রাজা কৃষ্ণদেবরায় তৈরি করেন মন্দিরের সামনের থাম, দুপাশে সারি দেওয়া অতিথিদের ঘর, গোপুরম ইত্যাদি। কোন এক বিস্মৃত সন্ধ্যায় জ্বলে উঠত হাজার হাজার প্রদীপের আলো, দেবদাসীর চরণে শিঞ্জিত হত নুপূরের ধ্বনি। রঙ্গ মন্ডপে দেবতার পাদস্পর্শ করে যেত রাগ রাগিনীর সঙ্গত। এই মন্দিরের পথ ধরে আরো এগিয়ে গেলে অচ্যূতরায় মন্দিরের রাস্তায় ছিল দেবদাসীদের পাড়া। সে প্রথা আজ নেই। নেই দেবদাসীরাও। তারা আজ শুধুই ইতিহাসের পাতায়। পায়ে পায়ে পেরিয়ে এসেছি নৃসিংহ মূর্তি, গণেশ। দিন রাতের সন্ধিকালে এসে থেমে গেছি ইতিহাসের বাঁকে, অতীত মিলেছে বর্তমানের স্রোতে। বিরূপাক্ষ মন্দিরের রাস্তায় এসে মিলেছে বুঝি সেই সময় সরণি তুমি আমি আমরা সবাই সেই আবহমান কালের যাত্রী।
তুঙ্গভদ্রার কালো বেণী বেয়ে সন্ধ্যা নামে বিরূপাক্ষ মন্দিরের রাস্তায়। প্রদীপ জ্বলে ওঠে মন্দিরের কোণে, দেওয়ালের গায়ে গায়ে। মন্দিরের সামনে ভেঙে পড়া বাজারের থামে, দেওয়ালে, মেঝেয় হা হা করে অন্ধকার। এই সেই বাজার যেখানে মণিমুক্তোর সওদা বসত এই সেদিন। দেশি বিদেশি ব্যবসায়ীরা আসত খরিদের সন্ধানে, ফুলেফেঁপে উঠত রাজকোষ।
মন্দিরের সামনের রাস্তায় পড়ে আছে সিমেন্টের পোল। ইসাবেল বসে আছে তারই ওপর। পা নীচে, হাঁটুদুটো মুড়ে বুকের কাছে জড়ো করা। সেটাই টেবিলের মতো ব্যবহার করে পড়ছে সে। ফুটফুটে ঝকঝকে পুতুলের মতো ইসাবেল। হামপির নীল অন্ধকার ছুঁয়েছে তার সোনালী চুলের গোছা। স্কুলের পড়া তৈরি করছে সে, পাশে ওর মা। মেয়ের ভ্যাকেশনে স্পেন থেকে এসেছে ওরা, ভারতবর্ষ দেখবে বলে। তিনমাসের ভিসা। কী দেখবে ইসাবেল?
'মানুষ'। মিষ্টি হাসি ওর মুখে। ইসাবেল তখন সাত কি আট। বেঁটে কালো রোগা মোটা লম্বা রঙিন এবং বিবর্ণ বাহারি সব মানুষ দেখতে দেখতে ইসাবেল রাস্তায় বসে হোমওয়ার্ক সারে, মায়ের সাথে ঝোলা কাঁধে হেঁটে যায় হাটে বাজারে, মন্দির কিংবা পাথরের গায়ে লেপ্টে থাকা মানুষের গল্প খোঁজে মায়ের হাত ধরে। ওর মা ইলিয়ানা। ইলিয়ানার হাতে হাম্পির বিভিন্ন বুকলেট।
এই তল্লাটে বিদেশি ট্যুরিস্ট প্রচুর। ভারতবর্ষ কম খরচে ঘোরার এক মোক্ষম দেশ। ওরা আঁটঘাট বেঁধে, হিসেবনিকেশ করে দেশ ঘুরতে বের হয়। তবুও ঠকে যায় মাঝেমাঝেই। ওদের চোখে ভারতবর্ষ সাধু ভিক্ষুক আর প্রতারকে গিজগিজ করা এক দেশ। অথচ রাস্তায় ঘুরেঘুরে ওরা মানুষ দেখে, মানুষ খোঁজে, প্রতিটি সৌধ মিনার তোরণ গম্বুজ খুঁটিয়ে দেখে। অবাক হয়। তারপর একসময় দেশটাকে চিনে ওঠার আগেই ফুরিয়ে যায় ওদের ভিসার মেয়াদ, ফিরে যায় ওরা।
"বসুধৈব কুটুম্বকম্" কথাটার মানে কি ইসাবেল জানবে কোনদিন? ইসাবেল কি সেই রাস্তায় যাবে যে রাস্তা থেমেছে পম্পা সরোবরের তীরে? তীরে পম্পা দেবীর মন্দির, বটের বাঁধানো বেদি। বেদির ওপর আম্মা, কোলের কাছে মস্ত গামলা। গামলায় সবজি চাল মিশিয়ে একধরণের হলুদ রঙের ভাত, দেখতে পোলাওয়ের মতো। পাশে রাখা একগোছা পাতার প্লেট। এই ভাতটা আসলে কোনও মন্দিরের প্রসাদ আর ব্যবস্থাটা প্রতিদিনের। চালচুলোহীন এক ভবঘুরে পাত পেড়েছে, বেদির ওপরেই গুছিয়ে বসা মুখে অদ্ভুত নির্লিপ্তি, মুখের বলিরেখা ঘন গভীর। খাবারের স্বাদে নাকি বটের হাওয়ায় আরামে চোখ বুজে আসছে তার। পাশেই এক ছাগল বটের পাতা চিবোতে ব্যস্ত, দু একবার শুঁকে গেছে মানুষটার পাত। লোকটি নির্বিকার।
রোদ বাড়ছে, ঝাঁঝ বাড়ছে হাওয়ায়। গামলার খাবারের গন্ধ ম ম করছে হাওয়ায়। ভবঘুরেটি মাঝে মুখ তুলে দেখে আমাদের, আম্মার কাছে গিয়ে প্রসাদ নিতে বলে। বলার ভঙ্গিটা খানিক সৌজন্য মেশানো আদেশ, যেন সেই এই গেরস্তের কত্তা। আধখোলা খাবার, ভিনভিন মাছি। কুকুর ঘুরছে আশেপাশে। কাজটা সহজ নয়। দূরত্বটা অভ্যাসের, দূরত্বটা ভাবনার। এগোইনা।
ভবঘুরেটি নিজেই এবার খাওয়া শেষে পাত গুটিয়ে আম্মার কাছে যায়, কী বলে বুঝি না। ইশারায় ডাকে আম্মা, হাতে কাগজের প্লেটে তোলা ভাত। এরপর আর এড়িয়ে যাওয়া চলেনা।
ওই গামলা থেকেই দুপুরের খাবার নিয়ে যায় ডিউটিতে থাকা কনস্টেবল, পাশের ঘরে থাকা পুরোহিত আসে স্টিলের থালা হাতে। টুকটাক ইতিউতি আসে আরও অনেকে। ভবঘুরেটিকে আর দেখিনা কোথাও।
ইসাবেলের কি দেখা হবে ওই ভবঘুরের? ওই আম্মার? কিম্বা ওই ছেলেটির, যার নাম কৃষ্ণ?
কৃষ্ণ, কৃষ্ণস্বামী বছর বাইশের ছোকরা। কামিনীঝোপের ফাঁক দিয়ে পায়ে চলা সরু এক রাস্তা।পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেই একটা ঘর। দক্ষিণী ধাঁচের। খোলা বারান্দা,কাঠের পিলার। খাবারের অর্ডার নিচ্ছিল কৃষ্ণ। চোখে এক নরম হাসি। পলিটিক্যাল সায়েন্সে এম.এ করছে কৃষ্ণ। সেকেন্ড সেমেস্টার। মাঝে একটা ব্রেক পেয়ে এখানে কাজ নিয়েছে। রিসার্চ করতে চায়, বাড়ি কাছেই কোনও গ্রামে। পশ্চিমবাংলার একমাত্র কলকাতা ওর চেনা নাম। কলকাতায় আসতে চায় কৃষ্ণ। ইডেনে ক্রিকেট দেখার ইচ্ছে, ইচ্ছে ট্রামে চড়ার। জোড়াসাঁকোর নাম শোনেনি কোনদিন। ব্যাঙ্গালোর শহরের ঠিক উল্টো খাতে বয়ে যায় কৃষ্ণ আর কৃষ্ণ'র মতো লক্ষলক্ষ ছেলেমেয়ের রোজনামচা। ফোন নাম্বার চেয়ে নেয় সে, কখনও এলে যোগাযোগ করবে বলে।
দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে নামতে ভুলে যাই কৃষ্ণ'র মুখ। কৃষ্ণ স্বপ্ন দেখে রিসার্চ করার। হয়ত পাবে সুযোগ, হয়ত পাবে না। তবুও সে স্বপ্ন দেখে, পাওনা টিপসগুলো হিসেব করে জমিয়ে রাখে ব্যাংকে। সন্ধ্যার মুখোমুখি ইসাবেল চলে যাচ্ছে তার মা ইলিয়ানার হাত ধরে। সূর্য ডুবছে তুঙ্গভদ্রার জলে।
বিজয়নগরের সূর্যও অস্ত গেছিল হয়ত এমনই কোন সন্ধ্যার। পরপর সাতখানা দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঘেরাটোপের সুরক্ষায় মোড়া বিজয়নগরের পতন মাত্র একটি যুদ্ধেই কীভাবে সম্ভব? কার অভিমান নিঃস্ব করে দিল তাকে, সেকি তুঙ্গভদ্রা নাকি দুই শতক ধরে জমানো প্রজার ক্ষোভ? কেমন ছিল সেদিনের হামপি শহর? পায়েজ, নুনিজ, রাজ্জাকের মতো পর্যটকরা জানিয়েছেন সেদিনের হামপি শহর ছিল প্রাচুর্যে মোড়া। এমন জিনিস ছিলনা যা নাকি বাজারে পাওয়া যেতনা। সম্পদে তুলনা হত রোম সাম্রাজ্যের সাথে। সবধরনের খাবার ,বিভিন্ন ধরনের পশুপাখির মাংস, ফল, দুধ পাওয়া যেত খুব অল্প দামে। অথচ ভেতরে তেমন কোন উৎপাদন নেই, সবই আসে বাইরের গ্রাম থেকে। দিনে প্রায় হাজার দুই গরুর গাড়ি বয়ে আনে সেই সব পসরা। পণ্য ভিতরে আনা কিংবা বাইরে নিয়ে যেতে হ'লে কর দিতে হয়। সেসময় এই শহরের লোকসংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষের বেশি। একই সময়ে গৌড়ের লোকসংখ্যা ছিল দুলক্ষ। হিন্দু মুসলিম জৈন বৌদ্ধ ছিল প্রজা হিন্দু প্রধান রাষ্ট্র কিন্তু হিন্দুরাষ্ট্রের তকমা বিজয়নগর কোনদিন চায়নি। রাজ কর্মচারী নিয়োগে জাতিভেদ ছিলনা, রাজা গরু মোষ ছাড়া সব ধরনের মাংস খেতেন, নারী স্বাধীনতা গুরুত্ব পেত।
কিন্তু এই সামাজিক ব্যবস্থার পাশে অর্থনীতির আলোতেও বিজয়নগরকে জানা দরকার। কী ছিল উপার্জনের মাধ্যম? কেমন ছিল জমির বন্টন ব্যবস্থা? পায়েজ, নুনিজ বলেছেন রাস্তা ছিল জনবহুল, সে রাস্তায় অনবরত বাইরের পসরা নিয়ে গাড়ির যাতায়াত, সাথে অগণিত মানুষ। অভিজাতদের তত্বাবধানে থাকত জমি ও সৈন্য। জমির আয়ের অর্ধেক ভাগ রাজার। এমন দ্বিমাত্রিক ব্যবস্থার শিকার কে হয়? ভূমিহীন প্রান্তিক চাষী। কর আদায়ের জন্য বেসরকারি চাপ তৈরি হয় প্রজার উপর। প্রতিরোধ গড়ে ওঠে,নীরবে নিভৃতে... গ্রাম ছেড়ে দলে দলে চলে যায় মানুষ। এতবড় শহরের কোন শহরতলী হলনা কেন? উন্নতি তো স্রোতের মতো বয়ে চলে, শহর থেকে শহরতলী, তার থেকে গ্রাম জনপদ সর্বত্র ছড়িয়ে যায় তার ফল। এক্ষেত্রে সমৃদ্ধি কি তাহলে শুধুই শহরে কেন্দ্রস্থ হল, বিনিময়ে দিল না কিছুই? দূর গ্রাম থেকে আসা পণ্য শহরে ঢোকার মুখে কর চুকিয়ে আসত, তবু অর্থনীতির কোন নিয়মে হাম্পি শহরের বাজার বাইরের বাজারের চেয়ে সুলভ হয়ে ওঠে? একমাত্র অভ্যন্তরীণ চাপ ও শাসনই বাধ্য করতে পারে এধরনের মূল্যনিয়ন্ত্রণে। ফলতঃ চাষি পেত না উৎপাদনের লাভ। এবং তা অর্থনীতির উপর এক পরোক্ষ আঘাত যা পরবর্তী সময়ে এক চূড়ান্ত অসন্তোষের পরিস্থিতি তৈরি করে। আর যুদ্ধের পরই যারা রাজ্য জুড়ে লুঠ করল তারা তো বিজয়নগরের নাগরিক। যুদ্ধে অভিজাতরা কি এসে দাঁড়িয়েছিলেন রাজার সুরক্ষায়? বোধহয় না, ইতিহাস সাক্ষী। পিরামিডের তল যখন দুর্বল তখন তার চূড়ায় বসা হামপি শহরের পতন তো সময়ের অপেক্ষা মাত্র। মহাকালের অমোঘ নিয়মে তা বিলীন হয়ে যায় ইতিহাসের গর্ভে। হামপিও সেই চূড়ান্ত পরিণতি থেকে অব্যাহতি পায়নি। আজও হামপির ধুলো সেই অতীতের আক্ষেপে রক্তিম। শুধু অনাদৃতা সেই নদীটি বয়ে চলে কুলকুল কুলকুল, আবহমান... মানুষের গল্প শোনায়। আর পায়ে হেঁটে ভারতবর্ষ খুঁজে বেড়ায় স্পেনের ছোট্ট মেয়ে ইসাবেল।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন