বেরঙিন দোল
ফাগুনে রঙের উৎসবে দোল পূর্ণিমায়
সারা ভারতের আকাশ, বাতাস রঙিন হয়ে ওঠে। পলাশ, শিমূল, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়ার আধিক্যে
রাঙামাটির দেশ রানীর সাজে সুসজ্জিত হয়। পূর্ণিমায় চলে রঙের উৎসব জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে।
প্রধানত হিন্দুধর্মে এই রঙ উৎসব। ইতিহাস ও পুরাণ অনুসারে খ্রীস্টের জন্মের অন্ততঃ তিনশ
বছর আগে শুরু এই দোল উৎসবের। অবশ্য তা শিবকে পাওয়ার জন্য পার্বতীর মদন ও রতির উপাসনা।
আবার দেখা যায় অসুররাজা হিরণ্যকশিপু
যখন তার অগ্নিজয়ী বোন হোলিকাকে ধ্বংস করার জন্য পুত্র প্রহ্লাদকে তার কোলে বসিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে
চান, তখন অশুভ শক্তির প্রতিনিধি হোলিকাই পুড়ে বিনাশিত হন এবং শুভ শক্তির জয়লাভ হয়। আর এই কাহিনী
সূত্রে দোল পূর্ণিমার দিন বিজয়োৎসব হিসেবে দোলখেলা শুরু হয়। তার আগের দিন হয় 'হোলিকা
দহন' বা বাংলায় 'ন্যাড়া পোড়া', যা আজও প্রচলিত আছে। পুরাণ বিশেষজ্ঞদের মতভেদে শ্রীকৃষ্ণের
মেধাসুর বধের স্মৃতি, ব্যতিক্রমী স্কন্দপুরাণ; আবার প্রচলিত আছে সত্যযুগের রঘু রাজা
ও ঢুণ্ঢারাক্ষসের কাহিনী।
এছাড়াও পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে
রাধা কৃষ্ণের মিলনোৎসব দোল পূর্ণিমা হিসেবে খ্যাত, যেখানে প্রকৃতি ও ঈশ্বর এক হয়ে
আনন্দ বিচ্ছুরণ করে রঙিন করেছিলেন চরাচর। বাংলায় প্রেমের ঠাকুর শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মদিন
এই দোলপূর্ণিমায়। সংস্কৃত সাহিত্যে প্রেম আর বসন্ত সমার্থক। যে কারণে বসন্তোৎসব মদন-
মহোৎসব নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন কবি শূদ্রক 'মৃচ্ছকটিক' নাটকে এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
'মালবিকাগ্নিমিত্র' নাটকেও আছে। আবার শকুন্তলার বিরহে রাজা দুষ্যন্ত বসন্তোৎসব বন্ধ
করেন রাজপুরীতে। হর্ষবর্ধনের রত্নাবলীতে, কবি হাল-এর লেখায় তৎকালীন সমাজের দোলে রঙ
মাখামাখি, কাদাছোঁড়াছুঁড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়।
নারদ পুরাণ, ভবিষ্য পুরাণ ও জৈমিনি
মীমাংসায় রঙের উৎসবের বিবরণ পাওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে জয়দেবের গীতগোবিন্দ
কাব্যে শ্রীকৃষ্ণের বসন্তরাস উল্লেখ্য। শ্রীজীব গোস্বামীর 'শ্রীগোপালচম্পূ', কবি কর্ণপুরের
'আনন্দবৃন্দাবনচম্পূ' থেকে জ্ঞানদাস-উদ্ধবদাসের পদ, এছাড়াও একাধিক বৈষ্ণব কবির রচনায়
রাধাকৃষ্ণের বসন্তলীলার কথা উজ্জ্বল হয়ে আছে রাগাত্মিকা ভক্তির রঙে।
আবার কিছু কিছু নৃতত্ত্ববিদদের
মতে আদিম যুগের কিছু কিছু উপজাতির কৃষি সম্পর্কিত আচারের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই উৎসবের
সঙ্গে। অনার্য সংস্কৃতিতে এই দোল উৎসব একসময় 'শূদ্র-উৎসব' হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে
কালের স্রোতে সংস্কৃতিগত ও সামাজিক ভেদাভেদ দূর হয়ে গেছে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে
দোল উদযাপন শুরু করেছিলেন পলাশের পাপড়ি ও
আবীর দিয়ে। ভারতীয় ইতিহাসে বিভিন্ন রাজবংশে বিভিন্ন রীতিতে এই দোল উৎসব বা হোলি পালনের
কাহিনী পাওয়া যায়। যেমন মুঘল রাজবংশীয়রা ফুলের পাপড়ি ভেজা জলে দোল খেলতেন। রাজপুত
রানীদের সঙ্গে মুঘল বাদশাহদের হোলি খেলার কাহিনীও আছে। বলাই বাহুল্য সেগুলি রাজনৈতিক
সম্প্রীতি রক্ষায় বা কৌশলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। হুমায়ুন পারস্যের নওরোজ এবং ভারতের
বসন্তোৎসব মিলিয়ে দীর্ঘ উনিশ দিনের উৎসব করেন মহাসমারোহে। আধুনিক সাহিত্য ও চলচ্চিত্রেও
দোলের ব্যবহার আছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়, 'তিতাস একটি
নদীর নাম', ‘বালিকা বধূ’তে হোলির গান, ‘বসন্তবিলাপ’ প্রভৃতিতে দোলের উল্লেখ পাওয়া
যায়। সর্বধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে দোল উৎসব পালিত হয়।
কিন্তু 'প্রদীপের নীচে থাকে অন্ধকার'।
এ বাক্য যেন চিরাচরিত সত্য। প্রকৃতির সেই নিয়মেই ভারতের আকাশ বাতাস রাঙিয়ে যখন মুখরিত
হয়ে ওঠে জনজীবন, সেই একই সময়ে ভারতেরই কিছু অংশের মানুষ থাকে উৎসব থেকে দূরে সরে,
থাকে ম্লানমুখে, বেরঙিন হয়ে। কোন না কোন প্রচলিত বিশ্বাসের বাধা বিপত্তি তাদের বেঁধে
রাখে। উৎসব বিমুখ করে রাখে। বিপদের আতঙ্কে তারা নিজেদের ঢেকে রাখে অন্ধকারে। অথচ একসময়
তারাও মেতে উঠত রঙিন হওয়ার খেলায়।
শোনা যায় ভারতের বেশ কিছু গ্রামে আজও বিশ্বাস যে, দেবীর নির্দেশে বা বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে সেখানে
দোল বা হোলি উৎসব পালিত হয় না। এর মধ্যে প্রধান হলো উত্তরাখণ্ডের খুর্জান ও কুইলি গ্রাম
(দেবী ত্রিপুরা সুন্দরীর নির্দেশে), ঝাড়খণ্ডের বোকারোর দুর্গাপুর গ্রাম (পুরনো অভিশাপের
কারণে) এবং গুজরাটের রামসান গ্রাম। লোকশ্রুতি অনুযায়ী উত্তরাখণ্ডতে (রুদ্রপ্রয়াগ)
কুইলি এবং খুর্জান গ্রামে প্রায় দেড়শ বছর ধরে হোলিখেলা নিষিদ্ধ, কারণ বিশ্বাস করা
হয়, সেখানকার স্থানীয় দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী
কোলাহল বা শব্দ পছন্দ করেন না।
ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত (বোকারো) দুর্গাপুর
গ্রামে হোলির দিন কোনো অনুষ্ঠান হয় না। কথিত আছে, বহু বছর আগে হোলির দিনে গ্রামের
রাজার বংশধর মারা গিয়েছিলেন, তাই শোক পালন করা হয়।
গুজরাটের রামসান গ্রামেও দীর্ঘদিন
ধরে হোলিখেলা বা হোলিকা দহন হয় না। একসময়ে হোলিকা দহনের ক্ষণে পুরো গ্রামে আগুন ছড়িয়ে
পড়ার ঘটনার পর থেকে তা নিষিদ্ধ।
দক্ষিণ ভারতে তামিলনাড়ুর অনেক
জায়গায় হোলি ব্যাপকভাবে পালিত হয় না, কারণ সেখানে এই দিনটি কামদেবের পূজার মাধ্যমে
শোকের দিন হিসেবে পালিত হয়। কেরালার মূল ধারার সংস্কৃতির সাথে হোলি সেভাবে মিশে নেই,
শুধুমাত্র কুড়ুম্বি সম্প্রদায়ের লোকেরা তা পালন করেন। মূলত দেবী-দেবতাকে তুষ্ট রাখতে
বা অতীতের দুঃখজনক ঘটনা এড়াতে ওই সব গ্রামের মানুষ এইসকল প্রথা মেনে চলেন। আরও বিশদে
বলতে গেলে বলা যায়, ঝাড়খণ্ডের বোকারো জেলার দুর্গাপুর গ্রামের স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস,
এই গ্রামের নির্মাণকার রাজা দূর্গাদেব তাঁর রাজত্ব চলাকালীন সমস্ত উৎসব বেশ আড়ম্বরের
সাথে পালন করতেন। কিন্তু এক হোলির উৎসবের দিন কোনও অজানা কারণবশত রাজপুত্রের মৃত্যু
হয়। শুধু তাই নয়, হোলির বিশেষ তিথিতে রাজা দূর্গাদেব শত্রুর আক্রমণে নিহত হন। এরপর
স্বামী ও পুত্রশোকে রানীও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাই গ্রামবাসীদের ধারণা, যে বছর
তারা রঙের খেলায় মত্ত হয়েছে, সেই বছরই খরা বা মহামারীর মতো দুর্ঘটনাগুলি তাদের জীবনে
ফিরে ফিরে এসেছে। এই ঘটনাগুলির পর গ্রামবাসীদের কাছে হোলির দিনটি অশুভই রয়ে গিয়েছে।
তেমনি উত্তরপ্রদেশের খাজুরি গ্রামে
যে রাজ্যকে ভারতের হোলিখেলার মূল পীঠস্থানের আখ্যা দেওয়া হয়, সেই উত্তরপ্রদেশের রায়বেরেলি
শহরের ডালমাউ অঞ্চলের খাজুরি গ্রামে হোলিখেলা নিষিদ্ধ। কারণ এই হোলির বিশেষ দিনেই,
মোগল আক্রমণের ফলে খাজুরির রাজা মারা যান। স্থানীয় মানুষের মতে, রাজার রং খেলার সুযোগ
নিয়েই বিনা যুদ্ধে রাজাকে পরাস্ত এবং হত্যা করে মোঘল সেনারা। অত্যাচারী মুঘলরা শুধুমাত্র
রাজাকে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা খাজুরির বিখ্যাত দুর্গটিকেও ধ্বংসাবশেষে পরিণত
করে।
আবার রাজস্থানের চৌতিয়া জোশি ব্রাহ্মণ
সম্প্রদায়ের মধ্যে হোলিখেলা অভিশাপস্বরূপ। চৌতিয়া জোশি সম্প্রদায়ের মতানুসারে, একসময়
হোলির আগের দিন রাতে হোলিকা দহন উৎসবে এক শিশু আচমকাই আগুনে পড়ে যায় এবং তাকে বাঁচানোর জন্য তার মা’ও অগ্নিকুণ্ডে
ঝাঁপ দেন। মৃত্যুর পূর্বে আগুনে দগ্ধ সেই মহিলার
আর্জি ছিল, ভবিষ্যতে এই সম্প্রদায়ের কোনও মানুষ যেন হোলির উৎসব পালন না করেন। এই ঘটনার
পর চৌতিয়া জোশি সম্প্রদায়ের মানুষজন রঙের খেলায় রঞ্জিত হওয়ার থেকে বিরত থাকেন।
উত্তরাখন্ডের কুইলি, কুরঝান এবং
জাউনদালি গ্রামে রুদ্রপ্রয়াগ অঞ্চলে অবস্থিত এই গ্রামগুলি বিগত ১৫০ বছর যাবৎ হোলিখেলা
থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন। এই হোলি না খেলার সম্ভবত কারণ হল এই গ্রামগুলির প্রধান
দেবী ত্রিপুরা সুন্দরী শান্তিপ্রিয় দেবী হিসেবে পরিচিত। এই দেবীর কোলাহল এক্কেবারেই
অপছন্দ। গ্রামবাসীদের মতে যে বছর তারা সাড়ম্বরে হোলি খেলেছেন, সেই বছরেই একই সঙ্গে
তিনটি গ্রামেই তারা কলেরা রোগের প্রকোপ লক্ষ্য করেছেন। আর তাই গ্রামবাসীরা নিজেদের
স্বার্থে তাদের আরাধ্য দেবীকে তুষ্ট করতে হোলিখেলা থেকে বিরত থাকেন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন