বড় পর্দায় হিন্দী ছবি (১৬শ পর্ব):
উদর সমস্যা নিয়ে ছবি
(এই পর্বের ছবি দুটি একে অপরের পরিপূরকঃ প্রথমটিতে ‘লুজ মোশান’, দ্বিতীয়টিতে ‘কন্সটিপেশান’!)
দিল্লীর
এক জরাজীর্ণ ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকে তিন অবিবাহিত বন্ধু তাশি (ইমরান খান), নীতিন (কুণাল
রায় কাপুর), আর অরূপ (বীর দাস)। সাংবাদিক তাশির বাগদত্তা, বিমানসেবিকা সোনিয়া (শেনাজ
ট্রেজারিওয়ালা) বিমানবন্দর থেকে তার সহকর্মিনীর হয়ে ভ্লাদিমির নামক জনৈক বিদেশীর কাছ
থেকে একটি প্যাকেট গ্রহণ করে যেটি ডেলিভারি দিতে হবে রাজেশ ভাটিয়া ওরফে ‘কাউবয়’ (বিজয়
রাজ) নামের অপরাধ প্রধানকে। বিক্ষিপ্তমনা সোনিয়া অম্লানবদনে প্যাকেটটি হস্তান্তর করে
তাশিকে, বলে সে যেন সেটি যথাস্থানে পৌঁছে দেয়। তাশি প্যাকেটটি চাপায় অনিচ্ছুক নীতিনের
ঘাড়ে। নীতিন ফটোগ্রাফার হওয়ার সুবাদে নিষিদ্ধপল্লীতে যায়, তিন বন্ধুর বাড়িওয়ালা মনীশের
পরকীয়ার ছবি তুলতে। উক্ত এলাকায় সে রাস্তা থেকে কিনে খায় টেংরি কাবাব, যার বিক্রেতা
খাদ্যবস্তুটি নীতিনকে দেবার আগে আচ্ছা করে নিজের হাত দিয়ে নিজের যৌনাঙ্গ চুলকে নেয়।
ফলে, নীতিন ছবি তুলতে সক্ষম হলেও অচিরে তার হয় ডাইরিয়া। অতএব প্যাকেটের ভার শেষ অবধি
চাপে কার্টুনশিল্পী অরূপের ঘাড়ে। তৎসহ আরেকটি কৌটোয় নীতিন নিজের বিষ্ঠা ভরে আরেকটি
প্যাকেট অরূপকে দেয় পরীক্ষাগারে পৌঁছে দিতে।
এবার
আপনারা আন্দাজ করে নিন ‘ভ্রান্তিবিলাস’ কোন পর্যায়ে গেল! ‘কাউবয়’ তার অধস্তন সাঙ্গোপাঙ্গদের
সামনে টেবিলে দামী কাপড় পেতে প্রাপ্ত কৌটোটি উপুড় করে – আশা, এবার ঘটবে হীরকবৃষ্টি!
‘থপ’ করে যা পড়ে তা দেখে কাউবয়ের এক অধস্তন বিমূঢ়ভাবে বলে, “ইয়ে তো টাট্টি হ্যায়, স্যর!”
তার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে কাউবয়ের উত্তরঃ “থ্যাঙ্ক ইউ!”
যে
ফ্ল্যাটে তিনমূর্তি থাকে, সেখানে রোজ কলে জল আসে সকালে শুধু কিছুক্ষণের জন্য। ঘটনার
দিন সকালে প্রত্যেকে মনে করেছে যে কলের তলায় বালতি পেতে রাখার দায় অপর জনের। অতএব ফ্ল্যাট
জলবিহীন। ডায়রিয়া-আক্রান্ত নীতিন আদ্যিকালের ‘ফ্লাশ’-এ থাকা একবারের জল ব্যবহার করার
পর, পরবর্তী মলত্যাগের পর হাত বাড়ায় ‘ফ্রিজ’-এ রাখা অরূপের ‘অরেঞ্জ জুস’-এর দিকে। ফিরে
এসে অরূপ খালি ফ্রিজ আর শয্যাশায়ী নীতিনকে দেখে দুয়ে-দুয়ে চার করে চিৎকার করে ওঠে,
“তুই আমার জুস দিয়ে তোর পেছন (অনেক বেশী ইতর শব্দ ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে) ধুয়েছিস! আমি
জীবনে আর অরেঞ্জ জুস খেতে পারব না!”
ইতিমধ্যে
নীতিন নিষিদ্ধপল্লীতে তার তোলা বাড়িওয়ালার পরকীয়ার ছবি ভদ্রলোককে বেনামে পাঠিয়ে তাঁকে
‘ব্ল্যাকমেল’ করার কাজ শুরু করে দিয়েছে; উদ্দেশ্য, তিন বন্ধুকে আর মাসিক ফ্ল্যাটভাড়ার
ঠেলা সামলাতে হবে না। কিন্তু জলবিহীন পুরনো দিনের সু-উচ্চ ‘ফ্লাশ’-এর শেকল অগণিতবার
মলত্যাগের পর সজোরে টানার ফলে লোহার ‘সিস্টার্ন’ ভেঙে পড়ে নীতিনের মাথার ওপর। তাকে
সংজ্ঞাহীন অবস্থায় দেখে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা করান সেই হতভাগ্য বাড়িওয়ালাই!
এদিকে
দলবল নিয়ে ‘কাউবয়’ হাজির হয় ভ্লাদিমিরের হোটেলের ঘরে। তাকে যৎপরোনাস্তি প্রহার করে,
অবশেষে তার মলদ্বারে জ্বলন্ত ডাইনামাইটের স্টিক গুঁজে দিয়ে তার কাছ থেকে আদায় হয় সোনিয়ার
মোবাইল নম্বর। সোনিয়া কাউবয়কে জানায় যে তার ‘শপিং’-এর তাড়া থাকায় সে প্যাকেট তাশিকে
দিয়েছে। তাশি ফ্ল্যাটে ফিরতেই তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কাউবয়ের অধস্তনেরা। গলায় ফাঁস বেঁধে
টুলের ওপর দাঁড়ানো অরূপ সব শুনে কবুল করে ভ্রান্তিবিলাসের কথা এবং বলে যে প্যাকেট আছে
পরীক্ষাগারে। কিন্তু হাসপাতাল-সংলগ্ন পরীক্ষাগারের কর্মী তো বাড়িওয়ালা মনীশের সঙ্গে
চিকিৎসা করতে আসা নীতিনকে সেই প্যাকেট – যার মধ্যে এক বিচিত্র-দেখতে কৌটোয় ভরা আছে
হীরে – ইতিমধ্যেই নীতিনকে ফেরত দিয়ে দিয়েছে!
নীতিন
ফ্ল্যাটে ফিরে দেখে অরূপের গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সিলিং ফ্যান থেকে, পায়ের
তলায় একটা টুল। তাশি ক্ষতবিক্ষত চেহারা নিয়ে বসে। নীতিনের হাত থেকে হীরের কৌটো নিয়ে,
হীরেগুলো চাক্ষুষ করে কাউবয় অধস্তনদের নিদান দেয় তিন যুবককে নিকেশ করতে। অরূপের পায়ের
তলা থেকে টুল সরিয়ে নিতেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দোদুল্যমান অরূপকে নিয়ে জীর্ণ ছাত থেকে
পাখা ধসে পড়ে আর ভাঙা চাঙড়ের ঘায়ে সাময়িক জ্ঞান হারায় দুষ্কৃতির দল এবং তিন যুবক। নিজেদের
সামলে নিয়ে তাশি, অরূপ, আর নীতিন ফ্ল্যাট ছেড়ে পালায়, তাশির গাড়ি আর নীতিনের দু-চাকার
যান ব্যবহার করে। নীতিন বেরিয়েও ফ্ল্যাটে ফিরে হীরে ভর্তি কৌটো হস্তগত করে তবে পালায়।
তিরিশটি হীরে জনৈক স্বর্ণকারকে নব্বই লক্ষ টাকার বিনিময়ে বেচে যখন তারা রঙিন দিবাস্বপ্ন
দেখছে, তখনই তাশির ফোন বেজে ওঠে, শোনা যায় সোনিয়ার আর্তনাদ। কাউবয় গম্ভীর গলায় বলে,
“হীরে নিয়ে হোটেলের ৫০৭ নম্বর ঘরে (ভ্লাদিমিরের কামরা!) – নইলে বান্ধবীকে পার্সেল করে
পাঠাব!”
কিন্তু
টাকা ফেরত দিয়ে হীরে চাইতে গেলে স্বর্ণকার সহাস্যে বলেন যে তিনমূর্তি হীরের আসল দামই
জানত না! তিনি কিনেছেন নব্বই লাখে, ফেরত দিতে লাগবে ঠিক ডবল!
মরিয়া
তাশি নিজেকে ও বাকি দুজনকে বোরখা পরিয়ে নিয়ে যায় স্বর্ণকারের দোকানে, সঙ্গে নেয় ‘টাইমস
অব ইন্ডিয়া’-তে কর্মরতা মেনকা নাম্নী এক মহিলা সাংবাদিককে (পূর্ণা জগন্নাথন) যার সঙ্গে
তাশির ইতিমধ্যে বন্ধুত্ব – নাকি তার চেয়ে কিছু বেশি – গড়ে উঠেছে। নীতিন তাশির শ্বশুরের
উপহার দেওয়া গাড়ি নিয়ে দোকানের কাছে অপেক্ষা করবে (আর অপেক্ষারত অবস্থায় ‘দিল্লী বেলি’
আবার চাগাড় দেবে, সম্পূর্ণ অপরিচিত এক গৃহস্থের বাড়ীর দরজা খোলা পেয়ে নীতিন তাদের শৌচাগারে
সশব্দে মলত্যাগ করবে!)। মেনকা বোরখার ঢাকা সরিয়ে দুর্বিনীত স্বর্ণকারকে কথার খেলায়
তার ‘সেফ’ খোলায়, তাশি স্বর্ণকারকে অতর্কিতে আক্রমণ করে সেফ থেকে হীরের কৌট নিয়ে নেয়,
ব্যাগ ভর্তি টাকা ফেরত রাখে, আর বদ মালিকের হাত-পা-মুখ বেঁধে চম্পট দেয়। অকুস্থলে গয়না
কিনতে আসা পুলিশ অফিসার তাদের ধাওয়া করে হোটেল অবধি পৌঁছে যান, এবং বেতারে তাঁর ডাক
শুনে তাশিদের বাড়িওয়ালা মনীশকে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন মনীশের পুলিশ ভাই (তিনি মনীশের
পরকীয়া-জনিত ব্ল্যাকমেলের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে নিষিদ্ধ পল্লীতে যাচ্ছিলেন)। মনীশকে
হোটেলের নীচে রেখে সমস্ত পুলিশেরা তিন যুবককে ধাওয়া করে ৫০৭ নম্বর ঘর অবধি। তাশি তার
দুই বন্ধুকে সঙ্গে আসতে বারণ করেছিল – সমস্যাটা তাশির আর সোনিয়ার, তাদের নয় – কিন্তু
বন্ধুত্বের মর্যাদা রেখে অরূপ আত নীতিন (যারা ইতিমধ্যেই কাউবয়দের আক্রমণ সহ্য করেছে
নিজেদের ফ্ল্যাটে) তাশির সঙ্গে ঘরে ঢোকে। এরপর গোলাগুলি চলে তাশি, কাউবয়, এবং পুলিশের
মধ্যে, যার মাঝখানে নীতিনের ডাইরিয়া আবার চাগাড় দেয় এবং তাকে বাথরুমে ঢুকতে বাধ্য করে।
ফলে গোলাগুলি থেকে সে অনেকটাই বেঁচে যায়। দুষ্কৃতিরা সবাই মারা পড়ে, নীতিন যথারীতি
হীরের কৌটোটি তুলে নিয়ে অরূপের দিকে ছুঁড়ে দেয়। সেটি অরূপের মাথায় লেগে ছিটকে বেরিয়ে
যায় জানালা দিয়ে, আর গিয়ে পড়ে নীচে রাস্তায় অপেক্ষারত মনীশের মাথায়!
গল্পের
শেষঃ নিজেদের ফ্ল্যাটে তিন বন্ধু তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। নব্বই লক্ষ টাকা
পাবার পর অরূপ তার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু সে টাকা তো ফেরত দেওয়া হয়ে গেছে! অরূপ
আর ফ্ল্যাটের ভাড়ার ভাগ দেবে কোথা থেকে? হঠাৎ তাশি আলমারি খুলে দেখে রাশি রাশি নোটের
তাড়া! নীতিন স্বর্ণকারকে টাকা ফেরাবার সময় হাতে গোনা কিছু নোটের তলায় রেখে দিয়েছিল
বেশ কিছু থান ইঁট!
প্রতারক
স্বর্ণকারের টাকায় তিন বন্ধুর জীবনে আসে সচ্ছলতা। পাচার করা হীরে কৌটো সমেত স্থান পায়
মনীশের শো-কেসে, কোনদিন তার মধ্যে কী আছে তা মনীশ কি জানবে? পুলিশ তাশির গাড়ির খোঁজ
পেলেও কিছু করতে পারবে না। (প্রাক্তন) শ্বশুর – তাশি যে সোনিয়ার নির্বুদ্ধিতায় যত সমস্যার
উৎপত্তি (বিমানবন্দরে অপরিচিতের দেওয়া প্যাকেট নেওয়া যে কতটা গর্হিত কাজ, এক বিমানসেবিকা
হিসেবে সে জানে না?) তার সঙ্গে বিয়ে ভেঙে দিয়েছে – গাড়ি চুরি হয়েছে বলে পুলিশকে জানিয়েছেন,
গাড়ির কাগজপত্রও তাঁরই নামে। ছবি শেষ হচ্ছে তাশি আর মেনকার মধ্যে ভালোবাসার দৃশ্য দিয়ে!
পেটে
খিল-ধরানো ‘ব্ল্যাক কমেডি’, যার খুবই নির্বাচিত অংশের বর্ণনা দেওয়া গেল। মনে দাগ কেটেছে
প্রাণ সংশয় জাগানো বিপদের মুখে তিন বন্ধুর পরস্পরের প্রতি আনুগত্য। এছাড়া যে নীতিন
মনীশকে ব্ল্যাকমেল করছিল, মনীশ তাকে আহত অবস্থায় চিকিৎসা করানোতে নীতিন অনুতপ্ত হয়ে
মনীশের পরকীয়ার ছবির যাবতীয় ‘নেগেটিভ’ ছবির মতোই বেনামে মনীশকে ফেরত পাঠায়। মনীশ সেগুলো
‘কমোডে’ ফেলে ‘ফ্লাশ’ করতে যাচ্ছিল, শেষ মুহূর্তে সেগুলো পকেটে পুরে রেখে দেয়! বিবাহ-বহির্ভূত
সুখের দৃশ্য কেইবা ফেলে দিতে চায় যখন সেগুলো আর বিপজ্জনক নয়!
পরিচালক
অভিনয় দেও, কাহিনিকার আক্ষাত বর্মা, এবং প্রয়োজক আমির খানকে অজস্র ধন্যবাদ এই ছবির
জন্য। অভিনয় দেও নিজেকে অতিক্রম করবেন ২০১৮ সালে ব্ল্যাকমেল-এর মাধ্যমে, যে ছবি নিয়ে আলোচনা থাকবে শেষ পর্বে।
পিকু
(২০১৫) (৮ম পর্বে সংক্ষেপে আলোচিত)
দিল্লীর
চিত্তরঞ্জন পার্কে একত্রে বাস করেন সত্তর বছর বয়সের ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (অমিতাভ
বচ্চন) এবং তাঁর তিরিশ বছর বয়সের অনূঢ়া কন্যা পিকু (দীপিকা পাড়ুকোন), পেশায় স্থপতি।
দুজনেই একরোখা, বাবার দাপটে বাড়ীতে কাজের লোক টেঁকে না (আর কিছু না পেয়ে ভাস্কর ঝিয়ের
বিরুদ্ধে ফিনাইল চুরির অভিযোগ আনেন), মেয়ের মেজাজের ফলে যে গাড়ি-ভাড়া সংস্থা থেকে পিকু
রোজ গাড়ি নিয়ে অফিস যায়, তার ড্রাইভারেরাও পিকুকে নিয়ে গাড়ি চালাতে চায় না।
স্নায়বিক
রোগী/হাইপোকন্ড্রিয়াক ভাস্কর তাঁর যাবতীয় শারীরিক সমস্যার জন্য দায়ী করেন নিজের কোষ্ঠকাঠিন্যকে
– যে রোগের যা উপসর্গ, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে তিনি মেয়ের কর্মক্ষেত্রে ফোনে
এস-এম-এস করেন, অথবা পিকু যখন কোন পুরুষের সঙ্গে সান্ধ্যভোজে রয়েছে, ঠিক তখন মেয়েকে
বাধ্য করেন ডাক্তারকে ফোন করে তাঁর মলের রং ও গ্রথনের ব্যাখ্যা দিতে – যা শোনার ফলে
পুরুষ সঙ্গীটির আহারে রুচি নিমেষে অন্তর্হিত হয়!
আসলে
বাবা একেবারেই চান না মেয়ে বিয়ে করুক। “তোকে কি আমি কখনও তোর শৈশবে ছেড়ে গেছি? আজ আমার
দ্বিতীয় শৈশব, তুইও আমাকে ছেড়ে যাবি না!” এই হলো ভাস্করের ঘোষিত নীতি। তাঁর তিনবার
বিবাহিত শ্যালিকা, পিকুর ছবিমাসীর (মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়) পার্টিতে অত্যধিক মদ্যপান
করে ভাস্করের রক্তচাপ সাময়িকভাবে পড়ে যায় আর তাঁকে অক্সিজেন-থেরাপী দিতে হয়। পার্টিতে
ছবির আনা যুবককে পিকুর প্রতি আগ্রহী দেখে অবশ্য তিনি ছোকরাকে তার আগেই স্পষ্ট জানিয়ে
দিয়েছেন, “দেখো বাপু, আমার মেয়ের জীবনে অগ্রাধিকার আমার, আর মেয়ে কিন্তু নিজের কৌমার্য
রক্ষা করেনি!”
এরপর
এক আত্মীয় প্রস্তাব আনেন ভাস্করের কলকাতায়-অবস্থিত তাঁর পৈতৃক বাড়ি চম্পাকুঞ্জ বিক্রী
করার। ক্ষিপ্ত ভাস্কর সিদ্ধান্ত নেন তিনি কলকাতায় যাবেনঃ প্লেনে নয়, তাঁর শ্বাসকষ্ট
হয়, আর ট্রেনের দুলুনিতে তাঁর কোষ্ঠকাঠিন্য বেড়ে যাবে! অতএব, সেই গাড়ি-সংস্থার মালিক
রাণা চৌধুরী (ইরফান খান), যেহেতু তাঁর কোন ড্রাইভার পিকুর কাজ করবে না, নিজেই গাড়ি
নিয়ে হাজির হন। দিল্লী থেকে কলকাতা, এই সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করবে – সময় লাগবে অন্তত
দু দিন – রাণার মাল-বোঝাই গাড়ি যার ছাদে সগর্বে বিরাজ করবে ভাস্করের ‘কমোড-চেয়ার’,
যার সাহায্যে তিনি যেখানে যখন ইচ্ছে কোষ্ঠসাফে বসতে পারেন! ব্যাপার চরমে পৌঁছোয় বেনারসের
হোটেলে রাত্রিযাপনের পর। অন্ত্রের গতিতে অতৃপ্ত ভাস্করকে রাণা বলে পশ্চিমীর বদলে দেশী
রীতিতে চেষ্টা করতে, অর্থাৎ কমোডের ওপর উবু হয়ে চড়ে বসে মলত্যাগ করতে! ভাস্কর তা করেনও!
কলকাতায়
পৌঁছে আস্তে-আস্তে পিকু আর রাণার মধ্যে সদ্ভাব বাড়তে থাকে। দর্শকও আশা করেন এবার একটা
গতানুগতিক রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। গঙ্গাতীরে বেড়াতে বেড়াতে রাণা পিকুকে প্রশ্ন
করে সে কতদিন নিজের বাবার জন্য নিজের জীবনকে অবহেলা করবে। প্রত্যুত্তরে পিকু তাকে বোঝায়
যে বৃদ্ধ হলে বাবা-মায়েরা একা বাঁচতে পারেন না। তাদের বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এবং সে কাজ
করতে হয় সন্তানদেরই। রাণা বলে যে যেহেতু ভাস্করের কোন আসল রোগ নেই, তিনি তো অনায়াসে
নব্বই বছর বাঁচবেন! তাহলে পিকুকে যে বিয়ে করবে – পিকু রাণার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে,
“তাকে আমার ওই নব্বই বছরের শিশুটাকেও মেনে নিতে হবে? কি? করবে বিয়ে?” কিছুক্ষণ তাকিয়ে
থেকে রাণা সহাস্যে বলে, “আমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?”
রাণা
পিকুকে ইঙ্গিত দেয় চম্পাকুঞ্জ বিক্রি না করতে। পিকুও জানিয়ে দেয় যে বাড়ি বিক্রি হবে
না।
রাণা
দিল্লীতে ফিরে যাওয়ার পর একদিন ভাস্কর একটি সাইকেল নিয়ে, কাউকে কিছু না জানিয়ে চম্পাকুঞ্জ
থেকে বেরিয়ে পড়েন। অনেক ঘুরে, মহাকরণ, ড্যালহাউসি ইত্যাদি ঘুরে ঠোঙাভর্তি কচুরি জিলিপি
নিয়ে তিনি ফেরেন। পিকু, তাঁর ভাই, ভ্রাতৃবধূ সবাই দুশ্চিন্তার জেরে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট
হয়। খাবার টেবিলে পিকু ফেটে পড়ে বলে যে বাবার জন্য সে বাড়িতে সারাজীবন কুমড়ো আর করলা
খেয়ে কাটিয়েছে, আর এখন হঠাৎ এইসব খাবার! ভাস্কর তাঁর খেয়ালমতই চিরকাল চলেছেন, কোনদিন
ভেবেছেন পিকু কী চায়? সর্বসমক্ষে পিকু যে অক্ষতযোনি নয় তাও ঘোষণা করার মানে কী?
এই
ক্ষোভ-উদ্গীরণের মাঝখানেই শৌচালয় থেকে সজোরে ‘কমোড ফ্লাসের’ আওয়াজ আসে। ভাস্কর বেরিয়ে
পরম তৃপ্তির সঙ্গে সকলকে জানান যে তাঁর কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে গেছে। রাণার উপদেশমতো
তিনি এখন যা প্রাণ চায় তাই খাবেন আর রোজ সাইকেলে বেড়াবেন!
পরদিন
সকালে সবাই দেখে ভাস্কর ঘুমের মধ্যে পরম শান্তিতে দেহত্যাগ করেছেন!
পিকু
সবাইকে জানায় যে তিনি যেমন চেয়েছিলেন, তেমনই মৃত্যু লাভ করেছেন। তাঁর একমাত্র সমস্যা
– কোষ্ঠকাঠিন্যও মৃত্যুর ঠিক আগে দূর হয়ে গিয়েছিল!
দিল্লী
ফিরে পিকু তাদের হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছ থেকে এক গূঢ় তথ্য জানতে পারেঃ অফিসে পিকুর
পার্টনার সৈয়দ আফরোজও (যীশু সেনগুপ্ত) কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে!
রাণার
সঙ্গে পিকুর সখ্যতা গড়ে ওঠে। ছবির শেষে আমরা দেখি তারা পিকুর বাড়ির বাইরে – বাড়ির নতুন
নাম ভাস্কর ভিলা, ইংরেজীতে তার বানান হবে ‘Bhaskor’, ‘Bhaskar’ নয়, তারা বাঙালী – ব্যাডমিনটন
খেলছে।
ছবির
শেষ কথা এক ফাঁকে ভাস্করই বলে গেছেন – মানুষের ‘ইমোশান’ তার ‘মোশান’ বা মলত্যাগের বেগের
সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত!
জানি
না, সন্তান, বিশেষ করে ছবির কন্যাসন্তানের বৃদ্ধ বাবার প্রতি কর্তব্য নিয়ে যে বক্তব্য
পিকু রেখেছে তার জন্য কোন কোন নারীবাদী গোষ্ঠীর বিজাতীয় অসূয়ার উদ্রেক হয়েছে কিনা!
৬৩তম
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে পিকু-র
জন্য অমিতাভ বচ্চন শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে তাঁর চতুর্থ জাতীয় পুরস্কার পান, আর ৬১তম
ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অনুষ্ঠানে তিনি তৃতীয়বার সমালোচকদের বিচারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা নির্বাচিত
হন। দীপিকা পাড়ুকোন ঐ একই অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কার পান। পরিচালক সুজিত
সরকার অস্ট্রেলিয়া ও রাশিয়ায় শ্রেষ্ঠ পরিচালক নির্বাচিত হন।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন