![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
কুয়াশার কথা
এখনও টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। তবে ধরে এসেছে প্রায়। বৃষ্টি কিম্বা বৃষ্টি নয় বোঝা যায় না এই সময়। আকাশ থেকে পড়ছে ফোঁটায় ফোঁটায় জলবিন্দু নাকি গাছের পাতা থেকে নাকি দোকানের শেডে জমা জল গড়িয়ে নামছে তা অস্পষ্ট। রাস্তায় কাদা আর আবর্জনা মিলেমিশে আছে। রাজু দেখল আকাশ নিকষ। আজ তেমন আয় হয়নি। একটা পার্মেন্ট কাজ এই চল্লিশ বছর বয়সেও জোটাতে পারল না সে। আপাতত রাস্তার কাজ চলছে মেন রোডে পাতিপুকুরের দিকে। ঠিকাদার ভাল লোক তাকে বলেছে কেরালার কাজে পরিযায়ী শ্রমিক করে পাঠাবে। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব নয়। সেজন্য পিচঢালা কাজে খর দুপুরে তাকে দেখা যায় এই রাজ্যের পথে ঘাটে। গরিব হতে ঘেন্না করে। কবে থেকে একটা ভালো মোবাইল কেনার শখ। মনটা খারাপ লাগে। মনটা খারাপ লাগে বলে রাতে দু এক পাঁইট বাংলা খেতে হয় সেদ্ধ ছোলা আর পেঁয়াজ দিয়ে। রামচরণের ঠেকে সুজয় শ্যামল নিতাই গণেশ সুশিলরা থাকে। যেদিন ইচ্ছে করে না রাঁধতে সেদিন রুটি সবজি গণেশের দোকান থেকে। যদি মিনতি রান্না করতো ঠিকমতো সংসার করতো... কিন্তু আবার ওর জন্যই তো বাসার দিকে পা বাড়ায় রোজ রাতে। নাহলে আর তার মত চালচুলোহীন মা বাপ মরা লোকের আর নোঙর কৈ। মাল খেলে শ্যামল অজিত সুজয় নিতাই সকলেই খুব খিস্তি খেউর করে। কিন্তু রাজু কেমন চুপ মেরে যায়। উদাস হয়ে বসে থাকে পা ছড়িয়ে। হুড়মুড় করে শুরু হয়ে যায় পথের পাঁচালি। যত মদ খায় তত সে দুঃখ পেতে থাকে। শালা। ভগবানের যত খার যেন তার ওপরে। কী করেছে সে। মোটে চারটে বছর তখন তার বয়স। বাপের চটকল লকআউট হয়ে গেলো। অভাবে ছিঁড়ে কুটিকুটি সংসার। একদিন রাতে পাড়ার লোক খবর দিল রেলে কাটা পড়েছে বাপ। কাটা পড়েনি আসলে ঝাঁপ দিয়েছিল তার মতো বাচ্চাও বুঝে গেলো। মা তবু বুঝতে চায়নি। এই সেই পাড়া।
জীবন একটা আশ্চর্য দূরবীন মাইরি।
গণশারা জানে এরপর রাজু কী বলবে। বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই মাই তাকে পিসির কাছে এক সন্ধ্যায়
জমা করে ভেগে গেল ওপাড়ার সমর মিস্ত্রীর সঙ্গে। থুতু ফেলে একদলা রাজু। তবে পিসে লোকটা
ভাল ছিল। ব্যাভার ভালো ছিল। কর্পোরেশনের ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। ডালটা পান্তাটা
যা জুটতো দিতো। এই সামনের বস্তিতেই তো ধীরে ধীরে একটু বড়ো হয়ে গেল। আট ক্লাস পড়ার
পরে পিসি বললে পড়াশোনা ছেড়ে কাজকর্ম কর। বলবে নাই বা কেন। পিসের টিবি হলো। তবে তার
পিসতুতো দাদা কলকাতার মেসে থেকে কলেজে পড়ে তখন। টিউশনি করে। এখন অবশ্য সে আর এদিক
মারায় না। তাকে চেনে না। পিসি তার কাছেই থাকত পিসে চলে যেতে। মুখাগ্নিও সেই করেছে। প্রথম দিকে ভজাকাকার চা দোকানে চা দিত,কাপ ডিস মাজত।
তারপর নানাবিধ কাজ। এমনকি ট্রেনে কখনও সখনও পকেটমারি। ওকাজে ভয় আছে পুলিশের ঠেঙানির।
তাছাড়া আজকাল লোকের পকেটে নগদ টাকা পয়সা বিশেষ থাকেও না। রাজু টলমল পায়ে ঘরপানে
হাঁটে। মিনতির জন্য ফেরা। মিনতির সঙ্গে কখনও তার ঝগড়া নেই। সবসময় হাসিমুখ। কোনও অভিযোগ
নেই।
মনে পড়ে, সেও এমন একটা বর্ষার
রাত ছিল। কয়েক বর্ষা আগের একটা রাত। মার্কেট পেরিয়ে শেষ কাপড়ের দোকানটার কাছে কুকুরগুলো
জটলা করে পরিত্রাহি ডাকছিল সে রাতে। খোবলা ওঠা রাস্তার গর্তেগর্তে জলভরা তালশাঁসের
মত চাঁদের ফিকে আলো। নেশাগ্রস্থ চোখে রাজু দেখল কাপড়বিহীন নগ্ন ভাঙাচোরা কাদামাখা
এক নারী পড়ে আছে ঝোপের ধারে। নারী নয় প্লাস্টিকের ম্যানিকুইন। মনসা বস্ত্রালয় নতুন
ম্যানিকুইন রেখেছে এটা পুরনো। বাতিল। ভাঙা। রাজু অসংলগ্ন পায়ে আরো এগিয়ে গেল। চোখ
কচলে ঝুঁকে পড়ে দেখল। কুকুরগুলো তফাতে। ছুঁতে গিয়ে হাত কেঁপে গেল রাজুর। ভয়ে নয়
মদের ঘোরে। চাঁদ নেই আর। জঞ্জালের মধ্যে পেত্নীর মতো শুয়ে আছে বডিটা। রাজু পেছিয়ে
আসে। পেছন ফিরে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। বুকের ভেতর হাতুড়ি। কিন্তু কে যেন ডাকে আবার
কান্নার মতো। রাজু স্পষ্ট দেখল এক জোড়া জীবন্ত চোখের আর্তি তার দিকে। পরিস্কার শুনল,
ঝোপের ওখান থেকে কেউ বলছে, "আমাকে নিয়ে যাও এখান থেকে, প্লিজ।" কেমন অসহায়
দৃষ্টি নিষ্প্রাণ চোখ দুটোয়। সেই থেকে তার ঘরে মিনতি। তার-ই দেওয়া নাম। রাজু কাউকে
বলেনি মিনতির কথা। লুকিয়ে রাখে ওকে শোবার ঘরে। পিসির রেখে যাওয়া শাড়ি জামা পরে মিনতি
এখন খাটে ঠেস দিয়ে বসে থাকে। রাজু এখন ঘর
থেকে বের হলে বাইরে থেকে তালা দিয়ে টেনেটুনে দেখে নেয়। স্পষ্ট দেখতে পায় গণসা আর
শ্যামল, সুজয়, ওরা সক্কলে হো হো করে হাসছে আর বলছে, "ওরে, নেশার ঘোরে শেষে মা
মনসা বস্ত্রালয়ের ভাঙা ম্যানিকুইনটাকে তুই বউ করে নিলি পাগলা রাজু।" রাত হলে
রাজু গলা জড়িয়ে সোহাগ করে মিনতির সঙ্গে এখন। তখন মিনতি নাক ভাঙা ভাঙাচোরা বাতিল ম্যানিকুইন
নয়, হয়ে যায় সত্যিকারের নারী। এই কথাটা কাকপক্ষী জানে না। মিনতি তাকে সুখ দেয় এই
কথা গোপন থাকে রাতের অন্ধকারে। একটা প্যাঁচা তারস্বরে ডেকে উড়ে গেল। রাজু পৌঁছে যায়
দরজায়। বৃষ্টি শুরু।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন