বর্ণমালার সাতকাহন
(পর্ব ৩৪)
...so we might talk of the old familiar faces,
How some they have died, and,
Some they have left me,
And some are taken from me;
All, all are gone, the old
familier faces...
(Charles Lamb)
"তারপর কী হলো", শোভা
সবার দিকে একবার জরিপ করে নেয়। গড়ে স্টেশন পার হলেই শুনশান পথ। দোকান পসার কিচ্ছুটি
নেই। অন্ধকার। একপাশে জঙ্গল একপাশে খাল। একটু যাবার পর কাঠ চেড়াই কল। তারপর আবার জঙ্গল।
বাবামশাইএর সাইকেলের দুদিকে বাঁধা দুটো বিরাট ইলিশ। চাঁদের আলোয় চকচক করছে।
হঠাত সাইকেলে লাগানো আলোয় উনি
দেখলেন সামনে একটা সাদা কাপড় জড়ানো বউ। ঢ্যাঙা প্রায় গাছের সমান। বাবামশাই তো বুঝতেই
পারলেন ব্যাপার। মন শক্ত করে সাইকেল চালাতে লাগলেন। একপাশে একটা কবরখানা পড়ে। অন্ধকার
গাছে তাকিয়ে দেখলেন এডাল থেকে সেডাল সেই সাদা বউটা পাশে পাশে ভেসে ভেসে ধাওয়া করেছে
তাকে। কানে কানে শুনলেন, "এঁই আঁমাকে এঁকটাঁ মাঁছ দেঁ না রেঁ"। বাবামশাই
তো ঘেমে উঠেছেন সাঁই সাঁই করে চোক্কান বন্ধ করে একদমে বোড়াল বাড়ির উঠোনে এসেই অজ্ঞান।
বাচ্চারা চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেছিল। "আর মাছটা?" সবাই আরও এগিয়ে আসে
কোলের কাছে। শোভা কুরুশ কাঁটা রাখে। মা সব মাছ পুজো করে জলে দিয়ে এলো। পরদিন ঠাকুরমশাই
এসে উঠোনে পুজো করলেন। শোভার ঝুলিতে এমন অনেক গল্পরা জমা ছিল। কোনটা সত্যি কোনটা বা
বানানো সেটা শ্রোতাদের কাছে জরুরী নয়।
দাঁত উঁচু কালো নিরক্ষর শোভার বিয়ের
সম্ভাবনা নেই জেনে দাদারা সেই প্রচেষ্টা করেনি। দাদাদের সংসারে সকলের হাতে হাতে মুখে
মুখে করে চললেন। তাতে তাঁর কোনও কষ্ট নেই, হীনমন্যতা নেই। সংসারের ঘটি বাটি সবই তার
আপনার। শুভ্র শাড়ি ছোট্ট মানুষটির কিন্তু দাঁত উঁচু নয় যখন আমরা দেখলাম। তাঁর ফুলরানী
নকল দাঁতের ব্যবস্থা করলেন। শোভাকে সাক্ষী করলেন। মনে মনে নয় কিন্তু গড়গড় করে গোটা
আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর পড়া চাই। স্নান সেরে জানলার রোদে বিরাট চুলের রাশি মেলে
শোভা কাগজ পড়তেন। কখনও তার মুখে দুঃখের কোনো রেখা কেউ দেখেনি।
সদা হাস্যময়ী শোভা মুখে মুখে ছড়া
বানাতেন যে কোনো সময় যে কোনো বিষয়ে। অসাধারণ তাঁর সূচীশিল্প পুরস্কৃত হয়েছিল, রন্ধন
প্রতিযোগিতায় পান্তুয়া, ডালপুরী বানিয়ে পেয়েছেন পুরস্কার সার্টিফিকেট। এসবের জন্য
বড়বৌদি ফুলরাণী নীরবে ইন্ধন। প্রতিভা বসু তাঁর বান্ধবী, আরো অনেকে হিন্দুস্থান পার্কের
বাড়িতে যাতায়াত, শরৎবাবু তাঁর ক্রাশ চিরকাল। পিসির ছড়া বাঁধা আর তা নিজের সুরে গাওয়ার
এই প্রতিভা যে অসাধারণ তা অনেক পরে আমরা বুঝেছিলাম কিন্তু অপামর জনসাধারণের সকলের পিসির
দিন ততদিনে অন্তিমে। এত তুচ্ছ তে কেউ খুশী হতে পারে এত? এত অপ্রাপ্তির জীবনে হাহাকারহীন
নালিশহীন এই মহিলার কাছে শিখি আনন্দ জীবন। "আর লাভ নেই বেঁচে" শুয়ে শুয়ে
চুপচাপ বললেন আর কয়েক ঘন্টা পর নিজের বিছানাটিতে শুয়ে পাড়ি দিলেন অনন্তে। কোন লাভের
কথা ছিল? আজ ভেবে কুল পাই না। এখনও কোথাও ধুলোমাখা সার্টিফিকেটগুলো পড়ে আছে।
একান্নবর্তী পরিবারে এসেছেন ইলা
শোভা সহ ছয় ননদ আঠারোটি দেওর ভাসুর জেনে। আজকাল পাত্রীর মা বাবা এক ছেলে মনস্থ করেন।
শাশুড়ি বিগত হলে আরো ভালো। একটা সময় মানুষ যখন মানুষের মতোই ছিলো, তারা বড়ো পরিবারে
বিয়ে দেওয়া বনেদিয়ানা মনে করত। শৈশবে পিতৃমাতৃহীনা ইলা ভবিষ্যতে অসাধারণ এক ব্যক্তিত্বময়ী
নারী হয়ে উঠবেন। যেন এপারের বেগম রোকেয়া। এই যাত্রা সহজ ছিলো না ।একজন স্নেহশীল পুরুষ
জরুরী পাশে তবে তার চেয়েও অনিবার্য মেধা ও মনের জোর। তাঁর স্বামী চিরকাল তাঁকে উৎসাহ
দিয়েছিলেন তাঁর সাহিত্য ও আপন পর নির্বিশেষে সেবা পরায়ণা দিকটি।
ইলার বাবা চা বাগানের ছোটো সাহেব।
বড় সাহেব সত্যিই সাহেব পরাধীন ভারতে। ছোটো সাহেবের সঙ্গে খুব হৃদ্যতা। একসঙ্গে শিকার
করতে যান তাঁরা। কোনোদিন হরিণ কোনোদিন অন্যকিছু বা পাখি। বাড়িতে বিরিয়ানি রান্না
হয়। নানা প্রকার খাওয়া দাওয়া। পার্টি। ইলা চা বাগানেরই স্কুলে পড়ে। প্রিয় বান্ধবী
নেপালি। বন্ধুকে শেষ উপহার একটি লকেট খুললে একদিকে ছোট্ট আয়না। সেই উপহার আমায় দিয়ে
গেছেন নবতিপর এবং অন্তিম সময়ে মাম্মাম_আমার মাতামহী।
শৈশবের এই পরিবেশ একজন মানুষের
ব্যক্তিত্ব ও মনন গঠনে বড় ভূমিকা নেয়। যেমনটি হয়েছিল ইলা দত্তর যেমনটি হয়েছে আমার
ক্ষেত্রেও। কথায় ফিরি, একটি কন্যা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর মায়ের।
বয়স মাত্র নয়। ইনি আমার মাতামহী। ছোটোবেলায় দেখেছি বিরাট একান্নবর্তী পরিবারের
"বড় বৌদি", চিনাবাঈ, দুপুরে খেয়ে এসে বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে লিখছেন।
পাশে নবকল্লোল, দেশ এবং খবরের কাগজ। মাতামহ কাজ করতেন বার্ণ স্ট্যান্ডার্ডে তাঁর সহকর্মী
এবং বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন ছবি বিশ্বাস, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা। মার্গ
সঙ্গীত তাঁদের ছিল প্যাশন। আজ আমার হাতে যে হারমোনিয়াম বাজে তা বিখ্যাত এক ওস্তাদের
কাছ থেকে তাঁর পাওয়া।
আসলে একজন মানুষ কেমন হবেন তার
অনেকটাই আকার দেয় তাঁর বেড়ে ওঠার জায়গাটা, দেবীর সঙ্গের চালচিত্রর মতো। প্রতিটি
মানুষই আসলে বহুরূপী, বহু পরত, বুকের ভেতর সুর এবং অসুরের বাস। সুরের পরিচর্যা বেশি
হলে সুরেলা হয়ে ওঠে জীবন, অসুরের পূজন হলে সে ক্রমশ জীবনকে করে দেয় বেসুর। সৎ এবং
অসৎ ফারাক আছেই। অসৎ মানুষ যতই পার্থিব সুখ ছিনিয়ে আনুক একজন সৎ মানুষের মনে যে শান্তি
তা সে কোনোদিন পায় না।
আমাদের গল্প ছোটো নদী। চলে এঁকে
বেঁকে। বৈশাখ মাসে তার...।
একসময় মাথার ওপর শুনশান চৈত্র-রোদ,
একবার স্নেহ করার লোকেরা হারিয়ে গিয়ে স্নেহ করার চেয়ার আমার হয়ে যায়। কথা এগোয়।
"misfortunes one can
endure__they come from outside ,they are accidents.But to suffer for one's own
fault___ah, there is the sting of life.(Oscar wilde)
স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া বেকারত্ব এবং অসামাজিক কাজের প্রবণতা যার সেই দীর্ঘ দেহ সুদর্শন এবং মিষ্টভাষী মানুষটির সঙ্গে ক্রমশ বাড়তে লাগল মানসিক দূরত্ব। একটা প্রাসাদের ভেতর দুটি দূরতম দ্বীপের মধ্যে বাস। প্রত্যেকটি মানুষের ভেতর বহু মানুষের বাস। সবকটিই সত্য। তবে এই মানুষটির মতো এত স্বাভাবিক অভিনয় কম দেখা যায়। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যে বিবাহ সেখানে প্রতিনিয়ত তাকে সংশোধনের প্রচেষ্টা যে ব্যর্থ হবেই তা বুঝতে ঢের বেলা কেটে যায়।
একতরফা সরল প্রাকৃতিক ভালোবাসা
হেরে যেতে থাকে চতুরতার কাছে। ক্রমশ লেখা এবং গান যা আমার আপন ভুবন সেখান থেকে আছড়ে
পড়ি ধূসর প্রেমহীন রুক্ষ মাটির ওপর। কাঁটার বনে। বিষ্ঠার আগাড়ে। মানসিক টর্চার, গ্যাসলাইটিং
শারীরিক অত্যাচার একদিকে অন্যদিকে একের পর এক ডিগ্রীর প্রস্তুতি আফিমের নেশার মতো টিকিয়ে
রাখে, দুটি শিশু তারই ভেতর বড়ো হতে থাকল। মায়ের পড়াশোনা বইয়ের স্তুপের পেছনে অশান্তির
কর্কশ ধ্বনি তাদের তাজা মনকে ম্লান করতে পারে না। তারা নতুন এক প্রজন্ম তারা
নূতন যৌবনেরই দূত। বালিগঞ্জ বাড়ি
ছাড়তে হয়েছিল। এখানে এই গ্রামও ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকল। ছোটোবেলার উজানকে বড়বেলায়
আর ভালো লাগে না। ছোটোবেলার সবকিছু কেমন হাস্যকর। বালিকা থেকে কিশোরী আর কিশোরী থেকে
যুবতী, ভালো স্ত্রী হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা এবং আদর্শ মা হতে হতে যে মনস্তাত্বিক পরিবর্তনের
ভেতর দিয়ে যাই তা একা আমি নয় জগতের বহু নারী ভুক্তভোগী। সরল সাদামাটা একটা মেয়ে
জীবনের পঙ্কিল আবর্তে ভূপতিত হয়।
সব পেয়েছির অনুভূতি থেকে হঠাত
প্রবঞ্চিত বোকা নারী হতে হতে একসময় এইসব নারীর মনে হয় ভাল মেয়ে এই ভূষণ ব্যঙ্গের সমার্থক। ভুগতে ভুগতে তাকালে
চৌকাঠে খারাপ হবার হাতছানি দেয়। আবার পরিবর্তন
চলতে থাকে ভ্রষ্ট এবং আদর্শচ্যুত সমাজ আর আরেকদিকে আমাদের পিসি, আমাদের মামমাম আমার
সরল বামপন্থী শশুর শাশুড়ি, আমাদের আবু, আমার দাদা...
আর সেই সেই ব্রহ্মদত্যি আর শাকচুন্নিরা
হারিয়ে যায় তবু রয়ে যায় মনের ভেতরের চিলেকোঠা যেখানে গেলে ভয় নেই। নদী আরও চওড়া
হলে ভাল এবং খারাপ শব্দ দুটোর রং এবং অর্থ বদলায়। বড়দের শেখানো অনেক নৈতিকতার পাঠ
বাতিল হয়ে যায়। যে ভালোবাসা এবং "অতি" ভালোর অভিনয় জাত দুই সন্তান তাদের
নতুন এক পুনরাধুনিক পদ্ধতিতে বড় করার এক্সপেরিমেন্টেশন চলতে থাকে।
তারপরে? একটা ছোট্ট আমি রাতে শুয়ে
থাকে দাদা, তার মাতামহের সাদা লোমভরা বুকের কাছটিতে। তারপর চলছে তো চলছে... হাতি ঘোড়া
শেয়াল আর বাইসন, হরিণ সবাই যাচ্ছে... আর সিংহ? হ্যাঁ সিংহ তো আছে। দাদার চোখ জুড়ে
আসে ঘুমে মেয়েটি চোখ বড় বড় করে উদগ্রীব অপেক্ষায়। অথচ এই একই গল্প প্রতিবার প্রতি
রাতে, একটা জঙ্গল থেকে আরেকটা জঙ্গলে চলে যাচ্ছে ওরা, কিম্বা নিচে মড়ি বাঁধা আছে পাঁঠা
বিস্তীর্ণ একটা জঙ্গলের রাত মাচায় বসে আছে সাহসী শিকারী… বাঘ আসবে... তার আগে আসে
নিদ্রাদেবী তাই রাতের অপেক্ষা থেকে যায় পরের দিনে গল্প শেষ হয় না।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন