![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
শ্যুটিং
সক্কালবেলা বেরোনোর সময়েই নোটনের মুখোমুখি পড়ে গেল সুবীর। ব্যাস্! আজ দিনটার তেইশ মারা গেল! নোটনকে এ বস্তির সবাই ‘অনামুখো’ বলে। ওর মুখ দেখে যাত্রা করলে সেদিন নাকি বিপর্যয়, বিভ্রাট, ব্যর্থতা অনিবার্য! সুবীর অবশ্য আগে কোনদিন এসব বোঝেনি। ওর ঘরটা এমন জায়গায় যে ওর সঙ্গে নোটনের দেখা হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না বললেই চলে। রাতে ও যখন গাড়ি গ্যারেজ করে ফেরে তখন মাঝেমাঝে দেখা হয়ে যায় বৈকি। কিন্তু তখন সুবীর এক অন্য জগতে বিচরণ করে। হাতে ঝোলানো রুটি আর তড়কা বা ডিম ভুজিয়া বা তরকারী বা চিকেন কারির প্যাকেটটা এমনভাবে দুলতে থাকে যে মনে হয় এই বুঝি ছিঁড়ে পড়ে গেল। কিন্তু পড়ে যায় না। সার্কাসে ট্রাপিজের খেলা দেখানোর মতই সুবীর অনেক ভেবেটেবে হয়ত বিচক্ষণতার সঙ্গেই পা ফেলল এবং ভুল ফেলল, ফলে টলে গেল, প্রায় পড়ে যাওয়া থেকে কোনক্রমে ভারসাম্য রক্ষা করে নিতে পারল। আবার পা ফেলল, আরেকটা আধখানারও কম সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য কষ্টকর সংগ্রাম শেষে জয়ী হল এবং এভাবে ফুটপাত বদল করতে করতেই রোজ রাতে সুবীরের বাড়ি ফেরার চেনা সিলেবাসের সঙ্গে পরিচিত এখানকার প্রায় সবাই। দরজার সামনে এসে ও কিছুতেই একবারের চেষ্টায় চাবি দিয়ে তালা খুলে উঠতে পারে না। সময় ক্ষয় হতে হতে অবশেষে কিভাবে যেন হয়ে যায়। অন্ধকার ঘরে ঢুকে ও টিউব জ্বালায়, ফ্যান চালায়। ফ্যানের হাওয়ায় দেয়ালে ক্যালেন্ডারটা দুলতে শুরু করে। হুকে ঝোলানো লুঙ্গি, স্যান্ডো গেঞ্জি নড়তে থাকে। একটা প্লাস্টিক প্যাকেট ফড়ফড় করে ওঠে হাওয়ায়। ঘরটা জ্যান্ত হয়ে ওঠে। তারপর গামছা পড়ে কুয়োতলায় গিয়ে স্নান সেরে এসে রাতের খাবার খেতে বসে। নেশা তখন অনেকটা আলগা হয়ে এলেও ধুনকি একটা রয়েই যায়।
কোনদিন দেখা হয়ে গেলে নোটনই কথা
বলে। সুবীর সেভাবে কিছু বলে না। নোটন হয়ত এমনিই জিজ্ঞেস করল, “ফিরলি এখন?” সুবীরের
মুড ভালো থাকলে উত্তর মেলে, না হলে নয়। অবশ্য নোটনের উত্তর পাওয়ার তেমন কোন প্রয়োজনও
আছে বলে মনে হয় না। সুবীর চলে যায় ওর মত। নোটনও চলে যায়।
আজ একটা অন্যরকম দিন। মায়ের মৃত্যুদিন আজ। সুবীর সকাল সকাল উঠে স্নানটান সেরে একটা রজনীগন্ধার মালা ঝুলিয়েছে মায়ের ফটোতে। ধুপ জ্বালিয়েছে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে ফটোর দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। ও অনুভব করে এসময় মায়ের সঙ্গে ওর একটা দূরজাগতিক অতীব সূক্ষ্ম কিন্তু অনপনেয় যোগসূত্র তৈরীর প্রক্রিয়া চলতে থাকে। মা যেন ডুকরে ওঠেন – “ভালো নেই রে, সুবু। আমি একটুও ভালো নেই। তোর যে কি হবে ভেবে মরেও শান্তি পাচ্ছি না।” সুবীর চমকে ওঠে, কিন্তু চমকে ওঠার সঙ্গতে কিছুই নেই বলে ওর ঘোর ছিঁড়ে যায় সঙ্গে সঙ্গেই। সবাই যা বলে, ও নিজেকে সেটাই বলে ওঠে –“কাল রাতে গলা পর্যন্ত গিলে এখনো খোয়ারি কাটেনি নাকি?” কখনো একান্তে ওর জানতে খুব ইচ্ছে হয় – মা এখন কেমন আছে? অথচ ওর জানা যে মৃত্যুর পর কিছু নেই! মাকে যেদিন দাহ করা হল, সেদিনই প্রিয় শরীরটার দেহকণিকারা পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে গেছে। এমনটাই তো হয়।
কালো খোঁড়া বেড়ালটাকে ও রোজ সকালবেলা
বেরোনোর সময় কয়েকটা বিস্কুট খেতে দেয়। বেড়ালটা কোনদিনই কারো রাস্তা কাটেনি। কাটবেও
না। শারীরিক ত্রুটির কারণে বেড়ালটা বেশ সহানুভূতিই পায়। তাই হয়ত সুবীরকে দেখে একটা
আলতো মিঠে মিঁয়াও শব্দে ডেকে ওঠে। কালো কুচকুচে, সবুজ চোখ, লেজটা স্বাভাবিকের চেয়ে
বেশ বড়। সুবীর একেকসময় ভাবে রাত্রিবেলা বেড়ালটাকে কী ভয়ঙ্কর দেখায়! সেসময় কি ও আর দেখার
মত অবস্থায় থাকে! ও নিজেও জানে!
আজ নাড়ুদার চায়ের দোকান বন্ধ। চা
খাওয়াও হল না আর বেড়ালটারও বিস্কুট জুটল না। সকালটা শুরুই হল যেন কেমনভাবে! বেড়ালটা
আজ ওকে দেখে তো রোজকার মত ডেকে উঠল না! সুবীর নিশ্চিত হল, আজ একটা অন্যরকম দিন।
গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করে ও প্রথমে
ভেজা ঝাড়ন দিয়ে ভালোভাবে মুছে চকচকে করে। তারপর গাড়িতে উঠে ধুপ জ্বালায়। একটা জবার
মালা জড়িয়ে দেয় স্টিয়ারিংয়ের সামনে সেট করা কালীমূর্তির পুতুলের গলাতে। সবই হল, শুধু
চা জুটল না। বেড়ালটা বিস্কুট পেল না। অথচ অহেতুক নোটনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
আজ গাড়ি একবারেই স্টার্ট নিল। সুবীর
বড় রাস্তার দিকে এগোতে থাকল। ও স্ট্যান্ডে দাঁড়ায় না। কারণ এখানে অনেক নিয়মকানুন, খবরদারি,
জুলুম চলে, এসব ওর পোষায় না। নিজের গাড়ি, গায়ে গতরে খেটে ইনকাম করতে হয়, অন্য কারো
দাদাগিরি মানতে যাব কেন? বাকী ড্রাইভাররা ওকে বোঝায়, “বিপদে আপদে কে দাঁড়াবে রে তোর
পাশে?”
সুবীর হেসে বলে, “নিষেধ আছে যখন
আসবি না। তোদের কিছু হলে আমি কিন্তু যাব। তখনও কি পারমিশন নিতে হবে?” সবাই চুপ করে
যায়। ওরা জানে, এ পাগল যা বলবে, তাই করবে। ওরা এও জানে, কারো প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়তে
সুবীর এক মুহূর্ত ভাববে না পর্যন্ত।
অন্য দোকান থেকে চা খেয়ে একটা গোটা
সিগারেট শেষ হয়ে গেল। সুবীর কিসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ এক নারীকন্ঠ্যের
জিজ্ঞাসায় ওর সম্বিত ফিরল।
“যাবেন?” এক সুন্দরী দাঁড়িয়ে রয়েছে।
“কোথায়?” সুবীরের স্বাভাবিক জিজ্ঞাসা।
“জানি না। যেখানে ইচ্ছে হয় নিয়ে
চলুন।”
“মানে!” সুবীর অবাক না হয়ে পারল
না।
মেয়েটি কিছু বলছে না। মনে হচ্ছে
কিছু একটা ভাবছে। সুবীর ঠিক উত্তরের জন্য অপেক্ষাও করছে না। আবার যেন করছেও। সিগারেটের
শেষাংশটা ফেলে দিয়ে ও গাড়ির দরজা খুলে বাইরে এল। পেছনে গিয়ে ডিকিটা খুলে দেখল কাল জারে
ভরে নেওয়া এক্সট্রা তেলটা রয়েছে কিনা। এটা ওর বিপদের ভরসা। আজ একবার সময় করে কর্তার
সিংয়ের গ্যারেজে গিয়ে গাড়িটা দেখিয়ে নিতে হবে। মনে হচ্ছে পেছনের একটা চাকা মেরামতির
প্রয়োজন আছে। আগের দিনই রবীন বলেছিল, “যে তোকে খেতে দেয়, তাকেও কিছু খেতেটেতে দে।”
এই বলে রবীন দেখিয়ে দিয়েছিল চাকাটায় একটা ফাটল। আস্তে আস্তে ওটা বাড়তে থাকবে এবং একদিন
গাড়ি বসিয়ে দিয়ে সারাতে হবে। চালু অবস্থায় কাজ করালে এদিক সেদিক করে হয়ে যাবে।
আবার এসে সুবীর স্টিয়ারিংয়ে বসল।
ঠিক করল এখানে না থেকে কলেজ মোড়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। স্টার্ট দিয়ে কিছুটা যেতেই পেছনের
সিট থেকে মাথা তুলে বসল মেয়েটি। সুবীর আয়নায় দেখে বেজায় চমকে গেল।
“আপনি! বলা নেই কওয়া নেই, উঠে পড়লেন
যে?”
“গাড়ি থামাবেন না প্লীজ। চলুন,
বলছি সব ঘটনা।”
সুবীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ি চালু
রাখল। সুন্দরী বলল, “আজ একটা অন্যারকম দিন।” সুবীর চমকে উঠল। ও কিভাবে যেন জিজ্ঞেস
করে ফেলল, “কেন?” মেয়েটি শান্ত ও স্তিমিতভাবে উত্তর দিল, “আজ আমার মায়ের মৃত্যুদিন।”
সুবীর আরও আশ্চর্য হয়ে গেল।
“জানেন, আজ কি ঘটেছে?” মেয়েটির
এ কথায় সুবীরের মনের একটা তল ভাবছে - আমার জানার কোন দরকার নেই। কিন্তু অপর তল থেকে
অদম্য জিজ্ঞাসাটা নিয়ন্ত্রণহীন উঠে এল, “কি?” গাড়ি চলছে।
“বেরোতে যাব, ঠিক এসময় নকুলদার
মুখোমুখি পড়ে গেলাম। নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন না, নকুলদা কে? স্বাভাবিক। পারার কথাও নয়।
নকুলদাকে আমাদের পাড়ায় সবাই ‘অনামুখো’ বলে। ওকে দেখে কোন কাজে বেরোলে, সে কাজ নাকি
সেদিন পন্ড হবেই।” সুবীর এতটাই অবাক হয়ে গেছে যে এক্ষুণি যেন ফেটে পড়বে।
“আমি যদিও এর আগে কোনদিনও বুঝিনি,
জানেন? তাই একটা সংশয় ছিলই। এমনি এমনি তো কথাটা রটেনি? তাই না?”
সুবীরের একটু মজা করতে ইচ্ছে হল,
“আজ কি বুঝলেন?”
“না না এসব বাজে কথা। এই তো আপনার
সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আপনি আমাকে নিয়ে চলেছেন তো চলেইছেন।”
“কোথায়!”
“আপনার হাতে স্টিয়ারিং। আপনি যেখানে
নিয়ে যাবেন আমি সেখানেই যেতে রাজী।”
সুবীরের মনে হল, মেয়েটা পাগল নয়ত?
কিংবা কোন গ্যাং আছে ওর পেছনে। এভাবে ফুসলে কোন একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে ওকে বেহুঁশ
করে গাড়ি নিয়ে চম্পট দেবে।
“আমি আপনাকে কোথাও নিয়ে যেতে রাজী
নই। নামুন গাড়ি থেকে।” সুবীর হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে বলে উঠল।
“আমি এখানে নেমে কি করব?”
জায়গাটা দৌলতপুর বাজার থেকে কিছুটা
দূরে। আরেকটু এগোলেই চৌমাথা মোড়, বাঁদিকে দিল্লী রোডের ক্রসিং এবং ডানদিকে সোজা কোনা
এক্সপ্রেসওয়ে।
“জানি না। আপনি তো বলতেই পারছেন
না কোথায় যাবেন। সক্কালবেলা এসব ইয়ার্কি ভালো লাগছে না।”
“তাহলে প্রথমেই কেন বলেননি? এতদূর
নিয়েই বা এলেন কেন? কি মতলব আপনার?”
সুবীর তটস্থ হয়ে গেল। আরিব্বাস!
এ তো সহজ মেয়ে নয়! সত্যিই তো প্রথমেই ফিরিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। আসলে সুবীরের খেয়ালই ছিল না, মেয়েটা জোর করেই
গাড়িতে উঠে বসেছিল। কিন্তু গন্তব্য, ভাড়া এসব ঠিক না করে সুবীরই বা কেন ওকে এতদূর নিয়ে
আসতে গেল! নোটনের সঙ্গে দেখা হয়েই তো কাল হল।
সুবীর গাড়ি থামিয়ে ভেবেই চলেছে
কিভাবে রেহাই পাবে। কিন্তু অনেক ভেবেও কোন কুলকিনারা পাচ্ছে না।
“আপনি কি চাইছেন বলুন তো?” সুবীর
সোজাসুজি জিজ্ঞেস করল।
“আপাতত খুব খিদে পেয়েছে। কোথাও
খাওয়াবেন চলুন।”
“আরে আমার ভাড়া খাটার সময়, কেন
ঝামেলা করছেন? সকাল থেকে এক পয়সা পকেটে ঢোকেনি। আমি ওনাকে নাকি খাওয়াতে যাব!” সুবীর
গাড়ি থেকে নেমে গেল। মেয়েটি গাড়ির ভেতরেই বসে আছে।
পকেট থেকে ফোন বের করে সুবীর রবিনের
নাম্বারে কল করল। কিন্তু স্যুইচড অফ বলছে। দু তিনবার করার পরও যখন কিছুতেই কলটা ঢুকল
না, সুবীরের ইচ্ছে হচ্ছিল ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
“আপনি কেন এমন করছেন? আমি খেটে
খাওয়া মানুষ। আমার একদিনের রোজগার বন্ধ হয়ে গেলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। প্লীজ আমাকে ছেড়ে
দিন।” সুবীর জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে কাতর অনুরোধ করল মেয়েটিকে।
কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। খিলখিল করে
গা জ্বালানো হাসিতে মেয়েটি বলল, “আমি আপনাকে ধরে রাখলাম কই?”
“তাহলে গাড়ি থেকে নেমে যান। আমাকে
ভাড়া ধরতে দিন। আপনি গাড়ির ভেতর বসে থাকলে সবাই ভাবছে প্যাসেঞ্জার রয়েছে।”
“আমি কি প্যাসেঞ্জার নই?”
এ কথার কোন উত্তর হয়? সুবীর বিড়বিড়
করে বলল, “আজ একবার যাই এলাকায়, তোকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলব, নোটন।”
“কিছু বলছেন?”
“নাঃ আপনাকে আর কি বলব? আপনি তো
সব বলার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন।” সুবীর সামনে একটা দোকানে নিয়ে গিয়ে মেয়েটাকে কচুরী, জিলিপি
খাওয়ালো। নিজে কিছুই খেল না। রাগে ওর গা চিড়বিড় করছিল। সকালবেলা থেকে এক পয়সা ইনকাম
হয়নি, বেফাল্তু চুয়াল্লিশ টাকা খসে গেল।
“আপনি খাবেন না?” তৃপ্তি করে খেতে
খেতে যখন মেয়েটি একথা জিজ্ঞেস করল, সুবীরের ইচ্ছে করছিল ঠাঁটিয়ে একটা চড় মারে। কিন্তু
এ মেয়েছেলে ডেঞ্জার, তাই ইচ্ছেটার গলা টিপে ধরল সঙ্গে সঙ্গে।
“এবারে চলুন।” মেয়েটি যেন মিনিটে
মিনিটে রূপ বদলে ফেলছে। হুকুমের মত শোনালো কথাটা। সুবীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট
খাচ্ছিল। শেষ করে এসে সটান বলল, “আপনি ঝামেলা চাইছেন তো? চলুন আপনাকে দেখানো যাক ঝামেলা
কতদূর গড়াতে পারে।” সুবীরের হঠাৎ মনে পড়ে গেছিল বিপ্লবদার কথা। বিপ্লবদা কাছেই গোলবাড়ি
থানায় আইসি ছিল। অনেকদিন যোগাযোগ নেই। দেখাই যাক না। ও আর কোন কথা না বলে গাড়ি স্টার্ট
দিল।
হঠাৎ একদল ছেলে এসে ওকে স্টার্ট
বন্ধ করালো। মেয়েটাও নেমে এল। ওরা সবাই মিলে হাসছিল। মেয়েটাও যোগ দিয়েছে ওদের সঙ্গে।
সুবীর অবাক হয়ে দেখল ওদের কারো হাতে ভিডিও ক্যামেরা, কারো হাতে আরও কতরকম যন্ত্রপাতি,
এসব ও একবার টালিগঞ্জ স্টুডিয়োতে দেখেছিল।
“দাদা, এই গোটা ব্যাপারটাই একটা
সাজানো নাটক। সত্যিকারের সংকটে পড়লে একজন মানুষের ভেতর থেকে যে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া
বেরিয়ে আসে, তাকেই শ্যুট করা হচ্ছিল। আমরা সবাই রিক্রিয়েশন টিভির স্টাফ। এটা একটা পর্ব,
যেটা আমাদের দর্শকদের দেখানো হবে।” পান্ডা গোছের একজন পুরো ব্যাপারটা বিবৃত করল সুবীরকে।
“এসব করে আপনাদের লাভ? শুধু আপনাদের
দর্শকদের আনন্দ দিতে আজ আমার মত একজন খেটে খাওয়া মানুষের সারা দিনের রোজগারটা নষ্ট
করে দিলেন? এটা কি ঠিক করলেন?”
ছেলেমেয়েগুলো থমকে গেল। ওদের হাসি
মিলিয়ে গেছে। ওরা কি উপলব্ধি করতে পারছে, আজ একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল?
“আমাদের জীবনে অনেক ক্রাইসিস, দাদা।
এভাবে যদি সবাইকে কিছুটা হলেও নির্মল আনন্দ দিতে পারা যায়, তারই চেষ্টা আর কি।”
“আমার এত টেনশন হচ্ছিল, কি করব
বুঝে উঠতে পারছিলাম না, শুধু মনে হচ্ছিল এ আপদের হাত থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাবো? আর
এ দেখে লোকের আনন্দ হবে! বাঃ! ভালোই বলেছেন। এই তো সমাজ! বিপদে পরে একজন ছটফট করছে,
এও নাকি বিনোদন! হায় রে সভ্যতা!”
ওই মেয়েটি সুবীরের দিকে হাজার টাকা
আর একটা মিষ্টির বাক্স এগিয়ে দিল। “এটা আপনার জন্য। আজ আপনার রোজগার নষ্ট করেছি, পয়সা
ধ্বংস করেছি, সত্যিই যথেষ্ট বিব্রত করেছি আপনাকে, এজন্য আন্তরিক দুঃখিত।”
“টাকা দিয়ে কিনতে চাইছেন, ম্যাডাম?”
“এভাবে বলছেন কেন, দাদা? আপনাকে
তো সবটাই খুলে বলা হল।”
“টাকা নিতে পারি একটাই শর্তে।”
ওরা অবাক হয়ে গেল।
সুবীর বলল, “কথা দিতে হবে, এই অনুষ্ঠান
আপনারা বন্ধ করে দেবেন। আপনারা আমার চেয়ে অনেক শিক্ষিত, ভদ্র বাড়ির ছেলেমেয়ে সবাই।
একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন তো, একজন মানুষকে নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলে অন্যকে
আনন্দ দেওয়া কি মানবিক কাজ? আপনাদের খারাপ লাগে না?”
সবাইকে হতবাক করে দিয়ে টাকা, মিষ্টির
বাক্স না নিয়েই সুবীর গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল…

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন