কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৫


স্বর্ণপদক

অনেকদিন ধরেই অসুস্থ কবি আদিত্য মারুফ। দেশের অন্যতম সেরা কবি। চারদিকে কত নাম-ডাক। কবি জীবনে পেয়েছেন অসংখ্য সাহিত্য-পুরস্কার, সম্মাননা ও সংবর্ধনা। বাড়ির একটা রুমে সেলফ ভর্তি বইপত্র, অগণিত পদক, সম্মাননা ক্রেস্ট আর মানপত্রগুলো থরে থরে সাজানো। নিজের হাতে সাজিয়েছেন। ওর সন্তানের মতোই প্রিয় এই বই আর পদকগুলো।

যখন মন ভালো থাকে না তখন এ রুমটায় আসেন। বই আর পদকগুলোর দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে থাকেন। এগুলো ওর জীবনের শ্রেষ্ঠ অজর্ন। অনেক কষ্ট করে এগুলো অজর্ন করতে হয়েছে। মানুষ টাকা-পয়সা কামাই করে, বাড়ি-গাড়ি করে, আর তিনি লিখেছেন বই। তার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন এসব পদক। সোনার পদক, রূপোর পদক, ব্রোঞ্জ পদক, আরো কত রকমের পদক।

আদিত্যর এসব নিয়ে অহংবোধ থাকলেও ওর স্ত্রী সাবরিনা সুলতানার একবারেই আগ্রহ নেই। অভাবের সংসারে পদক দিয়ে কী হবে? পদক নয়, ভাত চাই। এখন বেঁচে থাকাটাই মূখ্য। ওসব পদক-টদক সব গৌন। এ নিয়ে স্বামীর সাথে মাঝে-মধ্যেই ওর বচসা হয়।

পদক বেচার কথা উঠলেই অদিত্য বলেন- দেখ সাবরিনা, এ সব পদকের কী মূল্য তুমি কী বুঝবে! ক’টা টাকা দিয়ে এর দাম পরিমাপ করতে পারবে না। আমার কাছে এই পদকগুলো মহামূল্যবান।

আদিত্যর শরীরের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যেতে থাকে। সুগার লেবেলটা কিছুতেই নামছে না। কিডনির অবস্থাও খারাপ। সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালোসিস করতে হচ্ছে। জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। একসময় বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হলো না। হসপিটালাইজ করতে হলো। বলতে গেলে কোমায় চলে গেছেন।

এতবড় একজন কবি, চারদিকে এত নাম-ডাক, কিন্তু হাসপাতালের দিনগুলোতে কেউ ওর একটা খবরও নিলো না। প্রতিদিন কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ হচ্ছে। সে টাকার জোগাড় করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাবরিনা সুলতানাকে। হাত পাততে পাতকে এখন আর হাত পাতারও লোক-ও নেই।

এখন স্বামীর সোনার পদকগুলো বেচা ছাড়া গত্যন্তর নেই। যদিও আদিত্যর তাতে সায় নেই। কিন্তু কিছু করার নেই। এ ছাড়া আর কোনো পথ-ও নেই। কিছু টাকা যদি আসে। মানুষটাকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টাটা তো করতে হবে! পদকগুলো বিক্রির জন্য একটি চেনা জুয়েলারিতে নিয়ে গেলেন সাবরিনা সুলতানা। মানুষই যদি না বাঁচলো তাহলে পদক দিয়ে কী হবে?

স্বর্ণকার দিলীপ বমর্ন। সাবরিনার অনেক দিনের চেনা মানুষ। খুব বিশ্বস্ত। পদকগুলোকে ভালো করে কষ্টিপাথরে ঘষে-টসে দেখলেন দিলীপ বমর্ন। বললেন- দিদি, এগুলোতে কোন সোনা নেই।

- কী বলেন দাদা, সবগুলোই তো স্বর্ণপদক।

- না দিদি, এগুলো স্বর্ণপদক নয়, এগুলো হচ্ছে গোল্ডেন মেডেল। সোনালী পদক। সোনার পানির ধোয়া। সেটাকেই স্বর্ণপদক বলে মানুষকে ঠকায়।’

সাবরিনা সুলতানার চোখের সামনে পৃথিবীটা দুলতে থাকে।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন