![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৫ |
বিষাদ গম্বুজ
নতুন টার্মিনাস থেকে একের পর এক লাল ও সবুজ রঙের বাস চলে যাচ্ছে পুরনো শহরগুলির দিকে। সংবহন শিরা ধমনীর মতো সেই সব শহরের পেরিফেরাল পথ। রোদেলা আকাশ অথচ ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর দুচোখে বিজাপুর শহর দেখার ঘোর নিয়ে কর্নাটকের স্টেট বাসের জানালার পাশে বসে আছে সুরভি। পাশের সিটে চোখ বন্ধ করে বসে আছে মৃগেন। সে বড় হিসেবী। অকারণে বোধ করি দৃষ্টিও খরচ করে না।
জীবনের কত না গোধূলি তাকে বিষণ্ণ করেছে, এ-একদিন এমন সব গোধূলিবেলার স্মৃতির ভেতর থেকে রক্ত ঝরে পড়ে। আজ ভিন শহরের চলন্ত বাসে মৃগেনের পাশে বসেও ভারি একলা লাগে সুরভির। আটবছর আগের এক বিকেল মনে পড়ে। সুরভীর চোখের কোণে দুটি বিন্দু জল জমে ওঠে। ইদানিং সুরভির মনে হয় যেন, প্রতিটি যাত্রা তাকে বাবার কাছে নিয়ে যাবে। যেন পৃথিবীর সমস্ত পথের গন্তব্য মুকুন্দপুর। আরএন টেগোর হসপিটাল। আই-সি-সিউ-ওয়ান। তার মনে হয়, এখনো সেখানে গেলে সে তার বাবাকে দেখতে পাবে। মাথার পিছনে মনিটর। চোখ দুটি আধবোজা।
সন্ধ্যে নামছে। মনে মনে গৈরিক গোধূলির সঙ্গে ধূসর সন্ধেকে সেলাই করে সুরভি।
'সুরভী সুরভি বুকের বাঁ দিকটায় বড় কষ্ট হচ্ছে মা'… তারপর সেই বিশালকায় অ্যাম্বুলেন্সের
উত্তর থেকে দক্ষিণে ছুটে চলা। প্রায় অচৈতন্য বাবাকে স্ট্রেচারে শুইয়ে রেখে পায়ের
কাছে বসেছিল সুরভি। তীব্র হুটারের শব্দ পথের চলমানতার শব্দকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল। নিজের
সমস্ত চেতনা দুটি চোখে জড়ো করে শুধু বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
এম্বুলেন্সের ভিতরে একজন মেডিকেল
স্টাফ সুরভির পাশেই বসে আছে। হঠাৎই খেয়াল করল যে, ছেলেটি ক্রমশ তার শরীরের সঙ্গে সেঁটে
বসছে। তার আঙুলগুলো ঘৃণ্য আরশোলার মত হেঁটে বেড়াচ্ছে সুরভির শরীর জুড়ে। সুরভি কোন
শব্দ করতে পারছে না। কাঠ হয়ে বসে আছে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে। এখন কোনো ধরনের কথা কাটাকাটির শব্দ বাবার পক্ষে মারাত্মক
হবে। আবার সেকেন্ড অ্যাটাকটা হয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। হাসপাতালে নিতে নিতেই সব
শেষ হয়ে যেতে পারে। অথচ লোকটা ক্রমশ শরীর ঘেঁষে বসছে। সুরভি নিঃশব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে
তীব্র ভর্ৎসনার চোখে তাকায় লোকটার দিকে। লোকটার কোন হেলদোল নেই। সে যেন ক্রমশ অক্টোপাসের
মতো আঁকড়ে ধরছে সুরভিকে।
একসময় গাড়ি থামে গন্তব্যে। অ্যাম্বুলেন্স
হাসপাতালের গেটের কাছে থামতেই গাড়ির দরজা খুলে যায়। লোকটা উঠে দরজার সামনে এগোতেই সুরভি
নিঃশব্দে উঠে গিয়ে লোকটাকে পিছন থেকে সজোরে এক লাথি মারে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই
লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে রাস্তায়।
তারপর আঠের দিনের যমে-মানুষের কুরুক্ষেত্র।
বাবাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি সুরভি। এমনই এক গোধুলি মেখে বাড়ি ফিরে এসেছিল তাঁর নিথর
দেহ।
আজও চলন্ত বাসের জানলা থেকে আকাশের
গম্বুজের মত মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে সুরভি। এই পথ তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। যদিও
সুরভি জানে না, সে আর কোথাও ফিরবে কিনা!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন