শেষের কবিতা: যে কাহিনির কোনও পরিসমাপ্তি নেই
জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন--
"অনেক মুহূর্ত আমি করেছি ক্ষয়
করে ফেলে বুঝছি সময়
যদিও অনন্ত, তবু প্রেম যেন অনন্ত
নিয়ে নয়।
তবু তোমাকে ভালোবেসে
মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এসে
বুঝেছি অকূলে জেগে রয়
ঘড়ির সময়ে আর মহাকালে যেখানেই রাখি
এ হৃদয় ।"
প্রেম কি কোনও নির্দিষ্ট গতিরেখায় প্রবাহিত হয়? জীবনের কোনও এক বিশেষ পর্যায়ে কি সে কেবল একজন মানুষের দিকেই অনিবার্যভাবে ধাবিত হয়? মানুষের মন তো কখনই সরলরেখায় আবর্তিত হয় না। একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি, আকর্ষণ ও দ্বন্দ্বে আলোড়িত হওয়াই তার অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য। সেই কারণেই ভালোবাসাকে কোনও নির্দিষ্ট ছাঁচে বন্দি করা যায় না।তাকে মুক্ত স্রোতের মতো বয়ে যেতে দিতে হয়।আকাশের পাখির মতো উড়তে দিতে হয়। অথচ দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতায় প্রেম প্রায়ই অভ্যাসের উপর নির্ভরশীল এবং অনেকাংশে আটপৌরে ও কাঠামোবদ্ধ। এই আটপৌরে প্রেমই হয়তো সংসার ও সামাজিক জীবনের স্থিতি রক্ষা করে। তার বিপরীতে অবস্থান করে আরেক ধরনের প্রেম যা বিস্তৃত, সীমাহীন, গভীরতায় পরিপূর্ণ যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে দেওয়ার বাসনা প্রবল, অথচ কোনও স্থির তটরেখার সন্ধান পাওয়া যায় না। সেখানে মানুষ কেবল ডুবে থাকে, সাঁতার কাটে। কিন্তু কখনই পৌঁছোতে পারে না কোনও নির্দিষ্ট অভিমুখে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’
এই দুই বিপরীত প্রেম দিগন্তের টানাপড়েনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক
উপন্যাস। একদিকে রয়েছে কলকাতার অভিজাত, শিক্ষিত ও আত্মসচেতন সমাজে বেড়ে ওঠা অমিত
রায়। অন্যদিকে শিলং পাহাড়ের প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বড় হয়ে ওঠে লাবণ্য। স্বভাবতই
সে অনেকাংশে মুক্ত ও সংবেদনশীল। এই দুই চরিত্র যেন খানিকটা আলো আঁধারের মিশেল। ভৌগোলিক
ও মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও আত্মিক আকর্ষণে
পরস্পরের কাছে পিঠে। মাঝখানে বিস্তৃত এক জটিল শিমুল পলাশের অরণ্য যেখানে মিলন ও বিচ্ছেদ শ্রাবণের ব্যাকুল জলরাশির মতো প্রভাবিত হয়।
এই উপন্যাসে রোমান্টিক আবেগ ও বাস্তববোধের
এক নিবিড় আলিঙ্গন লক্ষ করা যায়। অমিত ও লাবণ্য পরস্পরের প্রেমে মূর্ছিত হলেও সেই
সম্পর্ক কখনই আবেগসর্বস্ব বা দায়িত্বহীন হয়ে ওঠে না। তারা ভালোবাসে, কিন্তু জানে
কোথায় দু'দণ্ড দাঁড়াতে হয়। তাদের কতটা কাছাকাছি আসা সম্ভব তার কোনও নির্দিষ্ট দরপত্র
নেই। রবীন্দ্রনাথের কাব্যদর্শনের মতোই, এখানে শারীরিক বা সামাজিক নৈকট্যের চেয়েও হৃদয়ের
দূরত্ব ও অন্তর্গত সংলাপ সঙ্গত কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ।
অমিত ও লাবণ্য দু'জনই সাহিত্য-চেতনা সম্পন্ন, কিন্তু তাদের জীবনানুভব
ভিন্ন মেরুতে স্হিত। অমিত শহুরে উচ্চবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি। স্বাভাবিকভাবেই নারীমহলে
জনপ্রিয়, বুদ্ধিদীপ্ত ও আত্মবিশ্বাসী। তবু সে কেবল বাহ্যিক মোহে আচ্ছন্ন নয়। তার
অনুসন্ধান ফ্যাশনে নয়, স্টাইলে। ফ্যাশন তার কাছে সাময়িক মুখোশ, আর স্টাইল হল অন্তর্লীন
ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। যদিও সে নিজেই ফ্যাশনের জগতের অংশ, তবু তার অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষা
পৃথক। আর সেই কারণেই লাবণ্যের মতো স্বচ্ছ ও নিস্পৃহ চরিত্রের প্রতি তার আকর্ষণ রাঙা
রোদের মতো আছড়ে পড়ে।
অমিতের একজন ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ।
সে স্রোতের বিপরীতে চলতে বেশি পছন্দ করে। নিজেকে সাধারণ বলে দাবি করলেও মানুষের ভেতরে
অসাধারণ হয়ে ওঠার যে আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত থাকে- অমিত সেই আকাঙ্ক্ষাকে কিছুতেই আড়াল করতে পারে না। সে আলাদা হতে চায়,
চোখে পড়তে চায়। সবাই তা পারে না, কিন্তু অমিত পারে বলেই সে ব্যতিক্রমী। এই দিক থেকে
তাকে ইংরেজি সাহিত্যের বায়রনিক নায়কদের সঙ্গে তুলনা করা যায়। লর্ড বায়রনের
Childe Harold কিংবা শেলির Prometheus-এর মতো চরিত্ররা যেমন সমাজের ভিড়ে থেকেও বিদ্রোহী
ও আত্মসচেতন।
রবীন্দ্রনাথ উপন্যাসে তৎকালীন শিক্ষিতা
ও উচ্চবিত্ত নারীদের আচরণকে সূক্ষ্ম চিত্রকল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। পাশ্চাত্য
শিক্ষার প্রভাবে গড়ে ওঠা এই নারীরা আধুনিকতার এক নতুন ভাষা নির্মাণে সচেষ্ট। এই চিত্র
অনেকাংশে জেন অস্টেন-পরবর্তী ইংরেজ সমাজ কিংবা ভার্জিনিয়া উলফের প্রবন্ধে বর্ণিত আধুনিক
নারীমনের দ্বন্দ্বের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ যেখানে বাহ্যিক স্বাধীনতা অর্জিত হলেও অন্তর্গত
স্বাতন্ত্র্যবোধ অধরাই থেকে যায়
তবে অমিত যে নারীকে মনের উপত্যাকা
স্থান দিতে চায় সে যেন এক ধরনের মুক্ত বিহুঙ্গ, যেন উল্কা পিণ্ডেরর ক্ষণিকের দীপ্তি।
উপন্যাসের শুরুতেই তার এই আকাঙ্ক্ষা উন্মোচিত
হয়। তার প্রেম লাবণ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কেতকী ও শোভনলালের উপস্থিতিতে তা
এক জটিল চতুর্ভুজ রূপ ধারণ করে। দিঘির জল ও ঘড়ার জলের উপমায় রবীন্দ্রনাথ দেখান উভয়েরই
প্রয়োজন আছে। কিন্তু মানুষের মন স্বভাবতই বিস্তৃত দিঘির দিকেই প্রবাহিত হয়। এই দ্বন্দ্ব
অনেকাংশে টি. এস. এলিয়টের The Waste Land-এ দেখা যায়। আধুনিক মানুষের মানসিক শূন্যতা
ও টানাপড়েনের কথা কবি অপূর্ব ভাষায় ব্যাখ্যা করেছেন।
উপন্যাসের মধ্যে অনেক মনস্তাত্ত্বিক
জটিলতা আছে। তাসত্ত্বেও এই গল্পের কুশীলবরা দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে সক্ষম। কারণ আত্ম-সচেতনতাবোধ
গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়। তারা বুঝতে পারে তাদের গন্তব্যস্থল। ফলে কাহিনি কখনই ঝরা পাতার
মতো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে না বরং সংযমের
মধ্য দিয়েই গভীরতার পাঠ অর্জন করতে সক্ষম হয়। অমিত ও লাবণ্যের কাব্যিক প্রেম
পাঠককে শিলং-এর কৃষ্ণঘন পৃথিবীর কাছে নিয়ে
যায় যেখানে প্রকৃতি ও মানবমন প্রান্তর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকে।
লাবণ্যের মাসি যোগমায়া এই প্রজন্মগত
ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় নতুন প্রজন্মের অনুভূতি
আগের তুলনায় অধিক সূক্ষ্ম, অধিক আত্মকেন্দ্রিক। এই মনোভাব অনেকাংশে ইংরেজি সাহিত্যে
ডি. এইচ. লরেন্সের চরিত্রদের স্মরণ করিয়ে দেয় যারা সামাজিক বিধিনিষেধ ভেঙে আবেগ ও
শারীরিক চাহিদাকে মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত
করতে চায়।
কেতকী অমিতের জীবনে স্থিতিশীলতার
বাটখারা-নাগরিক জীবনের ভারসাম্য ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিনিধি। অপরদিকে লাবণ্য তার কাছে
এক অনাবিল বিশুদ্ধতা যা দৈনন্দিন জীবনের হিসেব-নিকেশে আবদ্ধ নয়। তাই উপন্যাসের শেষে
পাঠকের মনে এই বোধই জোরালো ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়- ভালোবাসা আর ঘর বাঁধা এক বিষয় নয়।
‘শেষের কবিতা’ কবিতা না উপন্যাস—
এই প্রশ্ন বারবার উঠে আসে। কারণ এর গদ্যের গভীরেই প্রবাহিত হয় কবিতার সুর। জন ডানের
প্রেম-কবিতার অনুবাদ, ছন্দময় সংলাপ ও কাব্যিক ভাষা মিলিয়ে এটি একটি সত্যি সত্যিই প্রকৃত কাব্যোপন্যাস। এমনকি নিবারণ
চক্রবর্তীর মতো রহস্যময় কবিচরিত্র পাঠকের মনে সন্দেহ জাগায়, সে কি সত্যিই পৃথক কোনো
সত্তা, না কি অমিতেরই আরেক অন্তর্গত রূপ? এই দ্বৈততা দস্তয়েভস্কির The Double কিংবা
অস্কার ওয়াইল্ডের The Picture of Dorian Gray-এর আত্মপরিচয় সংকটের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ।
অমিত জীবনে বহু সুন্দরী নারীর মুখোমুখি হয়েছে। তাদের সৌন্দর্য ছিল পূর্ণিমার রাতের মতো উজ্জ্বল, অথচ তার মধ্যে এক ধরনের মোহময় আবরণ জড়ানো। কিন্তু লাবণ্যের সৌন্দর্য ভোরের আলোর মতো স্বচ্ছ, নিরাবরণ, যেখানে কোনও অস্পষ্ট আকর্ষণের কুয়াশা নেই। তার সৌন্দর্যের প্রতিটি রেখা বুদ্ধির আলোয় উদ্ভাসিত। যেন তাকে নারী হিসেবে সৃষ্টি করার সময় স্রষ্টা তার মধ্যে পুরুষসত্তারও একটি অংশ সংযোজন করেছেন। লাবণ্যকে দেখলেই বোঝা যায় তার মধ্যে শুধু অনুভূতির গভীরতা নয়, চিন্তার দৃঢ়তাও সমানভাবে উপস্থিত। এই দ্বৈত শক্তিই অমিতকে গভীরভাবে টেনেছিল। অমিতের নিজের মধ্যেও প্রজ্ঞা ছিল, কিন্তু ছিল না সহনশীলতা। বিচারবোধ ছিল, কিন্তু ধৈর্যের অভাব ছিল স্পষ্ট। সে অনেক কিছু জেনেছে, অনেক কিছু শিখেছে, তবু মনের শান্তি কখনও অর্জন করতে পারেনি। লাবণ্যের মুখে সে যে শান্তির ছাপ দেখেছিল, তা হৃদয়ের আবেগজাত তৃপ্তি থেকে আসা নয় সে শান্তি জন্ম নিয়েছে গভীর, স্থির এবং অচঞ্চল চিন্তাশক্তির ভেতর থেকে।
উপন্যাসের শেষে যেন বিরহের গান
বেজে ওঠে। কিন্তু এই বিষণ্ণতার মধ্যে লুকিয়ে থাকে লাজুক ভ্রমর আর আলতা মাখানো নূপুর।
‘শেষের কবিতা’ আসলে এমন এক প্রেমকথা যার কোনো শেষ নেই। যা পাঠকের মনে অনন্ত প্রশ্ন,
সম্ভাবনা ও দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন রেখে যায়। যা চৈত্রশেষে রাঙা ফুলের মতো জেগে ওঠে।
দরদি ভোরের মতো গভীর মুগ্ধতায় বেজে ওঠে রোদ-ছায়ার গান। এসো প্রেম, তোমাকে শাশ্বত
সন্ধ্যানুরাগে ভাসিয়ে দিই!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন