একা থেকে আত্মচেতনায় উত্তরণ: একাকিত্ব থেকে আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে
যায় ‘Keep Breathing’...
যান্ত্রিক সভ্যতা যত এগিয়েছে সভ্য
মানুষ ততই কৃত্রিম হয়েছে। এখন তো আবার ক্ষেত্রে মেধার যুগ কৃত্রিম মেধার প্রযুক্তির
দাপটে ডিজিটালাইজড সভ্যতায় আমরা সকলেই কমবেশি আক্রান্ত ভারাক্রান্ত। এর মধ্যে প্রকৃতি
জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব। কোভিড বা অতি মহামারীর পরেও, প্রকৃতিকে ধ্বংস করার প্রবণতা
আজও আমাদের পিছু ছাড়েনি। ধীরে ধীরে আজ আমরা প্রকৃতি থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। একার
এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছি, যেখানে শুধুই আকাশচুম্বি অট্টালিকা, কংক্রিটের জঙ্গল আর
একাকীত্ব। যতই কৃত্রিম সভ্যতার দিকে এগোচ্ছে মানুষ, ততই বিলুপ্ত হচ্ছে বিশ্বাস, ভরসা,
ভালোবাসা প্রেম, বিরহ, বেদনা। প্রেম দিবসে প্রেম উদযাপনের বন্যা। মননে, হৃদযের জঙ্গলের
আকাশে ডানা মেলেছে প্রেম। অত্যাধুনিক পৃথিবী থেকে আরো একটু পিছিয়ে গেলে দেখব কত অগণন
মানুষ প্রজাতি ধর্মসম্প্রদায় উপসম্প্রদায় এই প্রকৃতিকে ঘিরে বসতি গড়ে তুলেছে। সংস্কৃতিকে
আপন করে নিয়েছে। নির্মাণ করেছে লোকসংস্কৃতি আর ভাবনার এক বিস্তৃত সাম্রাজ্য। প্রকৃতির
ভেতরেই আত্মগোপন করে আছে কত উপধর্ম। এইচ এইচ উইলসন যাদের ১০০ বছরেরও আগে বলেন
"মাইনর রিলিজিয়ান্স সেক্টস"। অক্ষয়কুমার দত্ত যাদের বলেছিলেন উপাসক সম্প্রদায়।
এই প্রকৃতিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে যাদের জীবন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপধ্যায়ের ‘আরণ্যক’এ যথার্থ বলেছিলেন এই প্রকৃতিকে নিয়ে..."প্রকৃতি
তার নিজের ভক্তদের যা দেন, তা অতি অমূল্য দান। অনেকদিন ধরিয়া প্রকৃতির সেবা না করিলে,
কিন্তু সে দান মেলে না।"...
এই প্রকৃতির অন্তরীক্ষে, গভীর জঙ্গলের
ভয়াবহতার মাঝে একদিন হারিয়ে গেছিল এক তরুণী। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে
সেই তরুণীর বেঁচে থাকার রুদ্ধশ্বাস ও নিদারুণ সাহসের গল্প ‘keep breathing’...
যেখানে প্রকৃতির গহীন অরণ্যে হারিয়ে যেতে যেতে সে উপলব্ধি করে চেনা-অচেনা মনোরাজ্যের গভীর অরণ্যে সেও একটু একটু করে একাকী হয়ে যাচ্ছে। যেখানে প্রকৃতির গভীরতা আর স্মৃতির গভীরতার অতলে সে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে। পৃথিবী থেকে জনহীন কোন অজানা গ্রহলোকে নির্বাসিত হওয়ার পর, নিস্তব্ধ অরণ্য রাতের গভীরতায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে সে। কখনোও বেঁচে থাকার অদম্য জেদ তাকে আবারও এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তরে নিয়ে যেতে চায়, শব্দহীন শব্দের দেশে। ধরা দেয় বৃষ্টির শব্দ, পাতা ঝরার শব্দ, ফুল ফোটার শব্দ। পতঙ্গের একঘেয়ে একটানা শব্দ তার কানে আসে। প্রকৃতির নির্জনতার নিবিড় পর্যবেক্ষণ তাকে ঘিরে ধরে।
'KEEP BREATHING’ এভাবেই নিয়ে
যায় স্মৃতির এক অজানা রহস্যে। চিত্র পরিচালক MARLINE GERO এবং BRENDAN GALL প্রকৃতি
আর মানুষের একাকীত্বের মনস্তাত্ত্বিক জটিল গহীন অরণ্যকে বাস্তব আর কল্পনার মেলবন্ধনে
বৈচিত্র্যময় ও রহস্যেঘেরা এক জগত তৈরি করেছেন। সেই জগতে প্রবেশ করে লিভ। ছেলেবেলায়
মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন, মা বাবার শীতল সম্পর্ক, সংশয়, ভয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই, প্রেমিকের
সঙ্গে ক্রমশ দ্বন্দ্বের সম্পর্কে জর্জরিত লিভ ক্রমশ একা হতে থাকে। সেই একাকীত্ব ফিরে
আসে রূঢ় প্রকৃতির মাঝে। বাস্তব যখন অশোভনীয় হয়ে যায়, মস্তিষ্ক বিকল্প বাস্তবতা
তৈরি করে নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য। অনন্ত যাত্রাপথে সে তখন নিজেই নিজের বন্ধু হয়ে
ওঠে। হয়ে ওঠে নিজের অভিভাবক। স্মৃতি হাতড়ে আবিষ্কার করতে থাকে এক অন্য আমিকে।
জঙ্গল এখানে আসলে মনেরই প্রতীক।
মন হচ্ছে এক অন্ধকার রহস্যে আবৃত জঙ্গল, যেখানে প্রতিনিয়ত আমরা নিজেদেরকে হারিয়ে
ফেলি। মানুষ একা হয়ে গেলে নিজের সাথে মুখোমুখি হতে বাধ্য। Keep breathing একটি অসাধারণ
মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা। মানসযাত্রার গল্প। একজন মানুষের নিজের ভেতরের ক্ষত থেকে বেরিয়ে
আসার চুপকথা।
ছবিতে অসাধারণ কাজ করেছেন অভিনেত্রী
MELLISA BARRERA … পুরো সিরিজ যেন একলাই বহন করে গেছেন তিনি। প্রতিদিনের অহরহ টানাপোড়েন,
চিরন্তন প্রেমের দ্বন্দ্ব সম্পর্কের জটিলতা বিভিন্ন অনুভূতি কী অসাধারণ ভাবে ব্যক্ত
করেছেন! এই সিরিজটি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় Robert Zemeckis পরিচালিত টম হ্যাঙ্কস
অভিনীত ‘CAST AWAY’ চলচ্চিত্র-এর কথা। একজন মানুষ নির্জন দ্বীপে কীভাবে একা হয়ে গিয়েছিলেন।
একাকীত্ব আর মানসিক লড়াই এখানে বড় বিষয়। যদিও সেখানে এডভেঞ্চার লুকিয়ে ছিল। মনে
পড়ে যায় JOE CARNAHAN পরিচালিত ‘THE GREY’ ছবি।
যান্ত্রিক সভ্যতার কোলাহল ছাপিয়ে
যখন মানুষ একা হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় প্রকৃত আত্মযাত্রা। অরণ্যের মতো মনেও থাকে
অসংখ্য অচেনা পথ। লিভ সেই পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে বুঝে যায়— বেঁচে থাকা মানে কেবল নিঃশ্বাস
নেওয়া নয়, নিজের ক্ষতকে স্বীকার করা, নিজেকে ক্ষমা করা। তাই ‘Keep Breathing’ শেষ
হয় না বেঁচে থাকার গল্পে; শেষ হয় আত্মচেতনায় উত্তরণের গল্পে। প্রকৃতির বিশালতায়
আমরা তুচ্ছ প্রকৃতির সাম্রাজ্য আমরা হারিয়ে ফেলি পথ আসলে প্রকৃতি এখানে প্রতীকী। মন
আর প্রকৃতির দুর্গম দুর্গ পথে আমরা সবাই একা। দার্শনিক কার্ল ইয়ং এর কথা দিয়ে শেষ
করি। তিনি মনে করেন, মানুষের মন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এর গভীরে আছে কালেক্টিভ আনকনসাস
অর্থাৎ সমষ্টিগত অবচেতন। যেখানে মানবজাতির আদিম স্মৃতির প্রতীক পুরাণে প্রকৃতির ছাপ
লুকিয়ে থাকে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন