কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

অদিতি ফাল্গুনী

 

সমকালীন ছোটগল্প


রাষ্ট্র বনাম দত্তচৌধুরী

২৮ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১

‘বাবা - ঢাকা ল’ রিপোর্টের ভলিউমে আমাদের ফ্যামিলির নাম - বাবা, পড়তে গিয়ে খুব খারাপ লাগছে যে কেন এমন ‘স্টেট ভার্সাস দত্ত চৌধুরী’ নামে কেস উঠেছে? চোখে চশমা আর কোঁকড়া চুলে ভরা মাথার কিংশুক সকালবেলায় খাবারের প্লেট সামনে রেখে তার বাবাকে প্রশ্ন করলো।

‘ও কিছু না - বঙ্গীয় প্রজাসত্ব আইন বা ইস্টবেঙ্গল স্টেট টেন্যান্সি এ্যাক্ট - ইস্ট পাকিস্থান স্টেট টেন্যান্সি এ্যাক্টও বলা যায় - এই আইনে আমাদের যাদের যাদের জমিদারি ছিল, সেই জমিদারিগুলো বিলোপ যেহেতু রাষ্ট্রীয় আইনেই হয়েছে - আমাদের মামলা লড়তে হয়েছিল আর খোদ ইস্ট পাকিস্থান বা পাকিস্থান রাষ্ট্রের সাথেই’।

ললিতমোহন দত্ত চৌধুরী খাবার থেকে চোখ সরিয়ে ছেলের দিকে তাকালেন।

‘মামলায় আমরা তো হেরে গেছি - না বাবা?’

‘হ্যাঁ - পার্টিশনের পরে ১৯৪৮ সালে এই আইনের বিল হলো আর সংসদে পাশ হলো ১৯৫১ সালে। ষোল বছর লড়াই করার পর ১৯৬৭ সালে আমরা হেরে গেছি’।

‘কিন্ত পশ্চিম পাকিস্থানে জমিদারি তো এখনো আছে। সেখানে তো বাতিল হয়নি। আমাদের এখানেই হলো কেন?’

‘কিংশুক - তুমি যা বলছো তার অনেকটাই হয়তো ভিত্তি আছে। কিন্ত অন্যদিক থেকে দেখলে সেই ১৭৯৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে’র পর থেকে বাংলায় আমরা কিছু মানুষ অনেক জমির মালিক হয়েছি - যাকে বলে বিপুল ভূ-সম্পত্তি - বইয়ের ভাষায় - আমরাই শিক্ষিত হয়েছি, আমাদের ছেলেরাই বড় চাকরি পেয়েছে, আমাদেরই বড় বড় দালান-কোঠা ছিল, শিক্ষা-দীক্ষা, গান-বাজনা সব আমাদের হাতে ছিল। অনেকে জমিদারির টাকায় আবার বসে বসে খেয়েছে, প্রচুর অনর্থও করেছে। বুলবুলির লড়াই দিয়েছে, বিড়ালের বিয়ে, বাঈ নাচিয়েছে। আবার কেউ কেউ স্বদেশী আন্দোলনে নেমেছে। সব মিলিয়ে এখন গরীব চাষা-ভূষোরাও একটা সময় হিস্যা চাইলো - ভাগ চাইলো! হয়তো কে জানে ওরাই ঠিক?’

‘তুমিও তো স্বদেশীতে জেল খেটেছিলে?’

‘তা খেটেছি। তবে তোমার বড় জ্যাঠা মারা যাওয়ায় আর দুই কাকু দেশভাগের পর ভারত চলে যাওয়ায় এই জায়গা-জমি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রক্ষার মামলায় আমাকেই নামতে হয়েছিল’।

‘এখন আমাদের মোট কত জমি আছে বাবা?’

‘এই মোহনগঞ্জ-সুনামগঞ্জ-কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রায় বিশটির মত গ্রামের অসংখ্য মৌজা বা বলতে গেলে সমস্ত জমিই - ল্যান্ড রেকর্ডে তো এখনো আমাদের নামে। তা সব হারিয়ে এখনো শ’দুই বিঘার মত জমি আছে আমাদের’।

‘তাতে তুমি মামলায় হেরেও কেন মসজিদ-মাদ্রাসা সহ নানা জায়গায় আরো শ’তিনেক বিঘা জমি দান করলে, বাবা?’

‘ওসব জমি আমরা এমনিতেও রাখতে পারতাম না। আমাদের জমির দখল নিয়ে চার/পাঁচ পার্টির মারামারির চেয়ে একটা স্কুল বা হাসপাতালের কাজে দিলে তাও জমিটার একটা সত্যিকারের ভাল গতি হয়। এছাড়া আমি যেহেতু এখনো এদেশেই পড়ে আছি, সবার সাথে মিলে-মিশে থাকার ব্যপার আছে’।

‘কিন্তু পঁয়ষট্টির যুদ্ধের পর এই দুইশো বিঘা জমি নিয়েও তো আবার মামলা-মোকদ্দমা, তাই না বাবা? শত্রু সম্পত্তি আইনে?’

‘সেজন্যই তো তোকে ইংরেজিতে মাস্টার্স করার পর কলেজের চাকরিতে ঢুকতে না দিয়ে ঢাকায় ল পড়াচ্ছি। আমার তো অনেক বয়স হলো’।

বড় কাঁসার থালায় লুচি, ফুলকপি-আলুর তরকারি আর সামনে আর একটি ছোট কাঁসার বাটিতে পায়েস, একটি রূপোর রেকাবিতে কিছু ফল ও সন্দেশ যেন সামন্ত গরিমার লুপ্ত অবশেষ হিসেবে সামনে পড়ে থাকে। সেসব খাবারের কিছুই স্পর্শ না করে কিংশুক আবার মুখ খুললো, ‘আমি তোমার মত শান্ত মানুষ না, বাবা! আমার সবকিছু ভেঙ্গে-চুরে ফেলতে ইচ্ছা করে। তুমি দেখি এত সবের ভেতরেও সেতার বাজাও, ছবি আঁকো - কীভাবে পারো, বাবা?’

সৌদামিনী, ললিতমোহনের স্ত্রী, এসে তাড়া লাগালো, ‘কিশু বাবা - কিছুই তো খেলি না! আবার তো ঢাকায় গিয়ে সেই হল-হস্টেলের খাবার খাবি!’

‘আমার কিছু ভাল লাগে না, মা!’

‘অমন করলে চলে? ঠাকুর পরীক্ষা নেয়!’

‘ঠাকুর শুধু আমাদেরই পরীক্ষা নেয় কেন মা?’

‘কি জানি রে বাপ – মেয়েমানুষ - অত পড়া-শুনাও করি নাই!’

সৌদামিনী চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।

‘স্থির হও, কিংশুক। তোমার দুই দিদিরই বিয়ে দিয়ে দিয়েছি। তোমার দুই কাকা অন্তত: তেমন অমানুষ হয়নি যে নিজেদের ভাগের জমি আপন ভাইয়ের কাছে না দিয়ে, অন্যদের কাছে বিক্রি করে লম্বা শরিকী মামলায় আমাকে ফেলে গেছে! তুমি তো এখন একাই। এই দুইশো বিঘা জমি তোমার, আমাদের এই দরদালান-নাটমন্দির, কিছু পুকুর, ফলের বাগান - এছাড়া ইংরেজিতে তুমি মাস্টার্স। ল পড়ছো। আর কি লাগবে?’

‘সন্ধ্যায় আমার ল’ক্লাস আছে। আমি তবে এখনি রেল-স্টেশনে যাই?’

‘দুপুরের খাবারটা খাবি না, বাবা?’

‘না মা - ঢাকা যেতে যেতে বেলা পড়ে যাবে’।

‘ব্রজগোপাল কই? ওকে গাড়ি বার করতে বলো’।

ললিতমোহন দত্ত চৌধুরীদের জমিদারির প্রায় সব গেলেও একটি খুব ভাঙ্গা-চোরা নয় আবার খুব ঝকঝকে নয়, এমন একটি জিপগাড়ি এখনো আছে। সেই গাড়িতেই কিংশুককে উঠিয়ে, কী মনে করে ললিতমোহন নিজেও রেল-স্টেশন অবধি চললেন। পথে অবশ্য লোকে এখনো তাঁকে দেখলে ‘কর্তাবাবু সালাম’, ‘আদাব  কর্তাবাবু’ বলে। হয়তো মসজিদ-মাদ্রাসা সহ হাসপাতাল আর স্কুলে অনেক জমি স্বেচ্ছায় দান করেছেন বলে। সবাই জানে তিনি নিরিবিলি মানুষ। ছবি আঁকেন, ফুলের বাগান করেন, দামি বিলিতি ক্যামেরায় ছবি তোলেন আর সেতার বাজান। অথচ, তাঁরই পূর্বপুরুষ হিমাদ্রিশেখর দত্ত চৌধুরী - মাত্র দুই পুরুষ আগের কথা - তাঁর নামে নাকি বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত। তাঁর অত্যাচারের কথা চাপা ভয়ের সাথে এখনো এলাকার বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা স্মরণ করে! আবার এই বাড়িরই বড় ছেলে বা তাঁর বড়দা আন্দামানে জেল খেটে খেটে জেলের ভেতরেই মরেছেন। ললিতমোহন অবশ্য তাঁর বড়দার মাপের স্বদেশী ছিলেন না। তাঁকে ঐ ঢাকা জেল অবধি ভাত খেতে হয়েছে। দেশভাগের পর দুই ছোট ভাই দেশ ছাড়লে তাঁর ঘাড়েই বাকি বিষয়-সম্পত্তির দেখ-ভালের কাজ পড়েছে। তাঁর ছোট দুই ভাই কলকাতায় নাকি এক কামরার বাসায় থাকে। সেটা কীভাবে থাকে কে জানে? সাধ্যমতো এখনো তিনি তাঁদের টাকা পাঠান। পাঠাবেন না কেন? এই সম্পত্তিতে ওদেরও ভাগ আছে। তবে, এর বাইরে পৃথিবীর কোন কিছু নিয়েই এখন মাথায় তেমন হেল-দোল হয় না।

(২)

আজ ডাকে ললিতমোহনের কাছে একটি চিঠি এসেছে। আলম মিঞার চিঠি। শৈশবে তাঁদের পূর্বপুরুষেরই স্থাপিত ‘সারদা সুন্দরী অবৈতনিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এ আলম মিঞা তাঁর সাথে ক্লাস এইট অবধি পড়ে আর পড়েনি। ওর বাবা ললিতদের বাগানে মালীর কাজ করেছেন বহুদিন। গোলাপের নানা জাত চিনতেন। না, আলম মিঞারা ললিতদের সাথে কখনো কোন দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা অশান্তি করেনি। তবে আলম মিঞার যাকে বলে বাস্তব বুদ্ধি ছিল। দেশভাগের পরই বেশ অল্প বয়সেই সে ঢাকায় গিয়ে নানা ধরনের ব্যবসায় জড়িত হয়ে এখন ধানমন্ডিতে পাঁচহাজার টাকা ভাড়ার বাড়িতে থাকে। গাড়ি কিনেছে। তবে আলম মিঞা এখনো ললিতকে ‘বাবু‘ বলে ডেকে ওঠে প্রায়ই। ললিতই তখন উল্টো তাঁকে বলেন, ‘বাবু ডেকো না। আমরা না এক ক্লাসে পড়েছি?’ আলম মিঞার স্ত্রী জোবেদাকে সৌদামিনী এখন ভেতর ঘর পর্যন্ত নিয়ে  বসায়। সাদা বোরখা পরা জোবেদাকে হাত ধরেই অমায়িক ভাবে ভেতরে নিয়ে যায় জমিদার দত্তচৌধুরী বংশের গৃহবধূ সৌদামিনী। আলম মিঞা যদিও মুসলিম লীগার, শেখ সাহেব আর তার দল না - আলম মিঞা মনে-প্রাণে পাকিস্থানই চায় - তবু তার একটি চিঠি এলো ললিতের কাছে। ৩রা এপ্রিল।

‘প্রিয় ললিতমোহন দত্তচৌধুরী বাবু,

আমার সালাম/নমষ্কার জানিবেন।

আপনি জানেন কিনা জানি না গত ২৫শে মার্চ ঢাকার জগন্নাথ হলে সেনাবাহিনী অসংখ্য হিন্দু ছাত্র-শিক্ষক ও হলের কর্মচারীকে হত্যা করিয়াছে। তবে ভয় পাইবেন না। কিংশুককে আমি আগেই বিপদ অনুমান করিয়া, গাড়ি চালাইয়া আমার বাসায় আনিয়াছি। এখানে সে নিরাপদে থাকিবে। পরিস্থিতির উন্নতি হইলে, মাস খানেকের মধ্যে আমি তাহাকে সুন্দরগঞ্জ আপনার হাতে পৌঁছাইয়া দিয়া যাইব। আপাতত: সে আমার গৃহে আমার ছেলে-মেয়েদের সহিত দাবা, ক্যারাম খেলিয়া ও গল্প-গুজব করিয়া সুন্দর সময় কাটাইতেছে। তবে পাকবাহিনী আমাদের ঘরে সার্চ করিলে কিংশুক যেন বিপদে না পড়ে, সেজন্য তাহাকে সামান্য নামাজ-কালাম শিখাইতেছি। একটি মিথ্যা নামও রাখা হইয়াছে: ‘সাদিকুর রহমান’। গোলমাল কমিলে সে তাহার পূর্ব পরিচয়ে ফিরিয়া যাইতে পারিবে।

খোদা সহায় হউন’।

সৌদামিনীকে ডেকে চিঠিটি পড়ানোর পর কিছু না বলে চোখ মুছলেন শুধু। ললিতমোহন সেতার নিয়ে বসলেন। মন খারাপ হলেই তিনি সেতার নিয়ে বসেন। কী বাজাবেন আজ? রাগ বিলাসখানী টোড়ী?

(৩)

‘বাঁশিয়া বাজে মোহন শ্যাম কি

বিরাজ বনিতা সব দৌড় দৌড় ঘর বার ত্যাজি।

শ্রবণ সুখ দায়ী তনমন লুভায়ী

সব গোয়ালন কর শৃঙ্খার সাজি।‘

‘নমস্তে ললিতজি! ক্যায়সা হো আপ?’

রাগ বিলাসখানী টোড়ীতে আলাপ শেষ করে মাত্র যখন বন্দীশে ঢুকেছেন রবিবারের এই অবেলায় - মধ্যাহ্ন শেষ হয়ে অপরাহ্ন ‘আসি আসি’ করছে - ললিতমোহনের এই ‘দরবার খানা’-য় যখন তখন ঢোকার একমাত্র অধিকারী ও  উত্তর ভারত থেকে একপুরুষ আগেই রেল-স্টেশনে কাজ করতে আসা ও দেশভাগের পর  আর দেশে ফিরতে না পারা জমশেদ আলী ফতেহপুরী কড়িকাঠের ওপাশ থেকে সম্ভাষণ জানালেন। জমশেদ আলী ফতেহপুরীকে দেখলে হুট করে ললিতমোহনের ভাই মনে হতে পারে। তেমনি দীর্ঘকায় ও গৌরবর্ণ। ললিতের ছেলে কিংশুক লম্বা হলেও কলকাতা থেকে গত পূজায় তার ছোট দুই ভাইয়ের ছেলেরা এসেছিল কেমন খাটো খাটো। দত্তচৌধুরী পরিবারের কোন সন্তান দেখতে এত বেঁটে, এত কৃশকায় হতে পারে তাঁর ধারণা ছিল না। সৌদামিনীর দুই বোনের মেয়ে বাড়িতে ছিল তখন। তাদের একজনের তখন কোন এক ‘রহমান’ আর এক জনের কোন এক ‘কর্মকার’ যুবকের সাথে প্রেম চলছিল। মা তাই মাসী বাড়িতে পাঠিয়েছিলেন যদি এদের কলকাতা থেকে আসা বর্ণ হিন্দু কোন পরিবারে বিয়ে দেয়া যায়! কিন্ত দুই মেয়েই দেখে সরাসরি নাকচ করেছে। তাদের ‘রহমান’ ও ‘কর্মকার’ প্রেমিকেরা নাকি এই ‘দত্তচৌধুরী’ ছেলেদের চেয়ে দেখতে অনেক টল ও গুডলুকিং।

‘এখানে তো তোমরা এখনো ভাল খাওয়া-দাওয়া করো। পার্টিশনের পর ওখানে অত স্ট্রাগল - ওদের ভাল দুধটা, মাছটা খেতে দিতে পারিনি’। ছেলেদের বাবারা বলেছিলেন।

যাহোক, এই গোটা সুন্দরগঞ্জ তল্লাটে জমশেদ আলী ফতেহপুরীকে দেখলেই কেবল রুচি-শিক্ষা-আভিজাত্যে-চেহারায় অনেকটা আপন সহোদরের মত মনে হয় ললিতমোহনের।

‘উ পার্টিশন কী বাদ মে বঙ্গাল সে কাস্ট হিন্দু আর ইউপি কো শরিফ মুসলমান - দুনো কি তকদির বরবাদ হো গ্যয়ি! ইয়ে বঙ্গাল মুলক মে শরিফ মুসলিম কিতনা ঘর পে থা? উ তো সব আপ লোগকো জুতিয়া কো তল মে থাকতি হ্যায় - অর ইউপি মে ভি ও হিন্দুলোগো মে সব বিলকুল হামারা শরিফ মুসলিম কো জুতিয়া কো তল মে থাকতি হ্যায়। অর লেকিন হিস্ট্রি কো আয়রণি দেখিয়ে ললিতজি!’

উচ্চাঙ্গসঙ্গীত, কাবাব, পোলাও, গোলাপ, মদ, ক্যামেরা, গাড়ি ও চিত্রকর্মের সমঝদার ফতেহপুরী

ললিতমোহনদের এই ত্রিতল অট্টালিকার ‘দরবার হল’-এ বসে দিনের পর দিন বেগম আখতার বা ফৈয়াজ আলী খাঁর ঠুমরির সাথে সাথে মাথা নেড়ে ললিতমোহনের সেতার বাদন শুনেছেন দিনের পর দিন।

‘হ্যাঁ- সেটা সত্যি। এটাই হয়তো বৃটিশের পলিসি বা নীতিও ছিল। উত্তর ভারতে সব সাধারণ পেশাজীবী তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুর সাথে সংখ্যালঘু মুসলিমদের জমি-জমা দিয়ে জমিদারি বানানো আর বাংলায় সংখ্যাগুরু, দরিদ্র মুসলিমের সাথে মাইনরিটি হিন্দুকে অধিকাংশ জমিদারি দেয়া। ফলে অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে ধর্মীয় বিভেদ মিলে বিশাল ককটেল। তাই বাংলার বিত্তশালী হিন্দু এক ধাক্কায় নি:স্ব হয়ে গেল আর একইভাবে উত্তর ভারতের খান্দানি মুসলিমও’।

জমশেদ আলী ফতেহপুরীর বাবা উত্তর ভারত থেকে রেলওয়ের চাকরিতে জীবনের প্রথম কিছু বছর বিহারে কাটিয়ে তারপর ময়মনসিংহের এই সুন্দরগঞ্জে পোস্টিং পান দেশভাগের আগে আগে। তারপরই দেশভাগ। অন্য ভাইরা ইউপি থেকে জায়গা-জমি সব বেচে করাচীতে ‘মোহাজের’। জমশেদ আলীর তাই এই শ্যামল ভূ-খন্ডেই থাকা হলো। এমনকি সংস্কৃত শব্দ ভরা বাংলা বুঝতেও তাই তাঁর সমস্যা হয় না। তাঁর স্ত্রী-ও মুসলিম বাঙ্গালিনী।

‘লেকিন বঙ্গাল কা মুসলিমকো ক্লাসিক টেস্ট হোতি আভি দূর অস্ত হ্যায়! ইউপিকো হিন্দু ভি’।

জমশেদ আলীর ছুটির রবিবারগুলো প্রায়ই তাই উস্তাদ আমির খাঁ কি উস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ-র গায়কির তূল্য-মূল্য, লাখনৌয়ের সেই হিরন্ময়ী গায়িকা-নর্তকীপ্ঞ্জু, কাশ্মিরী পোলাওয়ের রেসিপি, হলিউডের গ্রেটা গার্বো বা অড্রে হেপবার্ন থেকে মুম্বাইয়ের মধুবালা-মীনাকুমারী-নার্গিস থেকে বাংলার সুচিত্রা সেন হয়ে গালিবের শের বা তুলসীদাস-কবীরের পংক্তি, মীরার ভজন পর্যন্ত এসে আলোচনা থামতো। বাংলার সংখ্যাগুরু মুসলিম বা উত্তর ভারতের সংখ্যাগুরু হিন্দুর তেমন ‘শরাফত’ নেই বলেই তাঁর দৃঢ় ধারণা। তবে এসব শৌখিন আলাপের ভেতর মাঝে মাঝে অনিবার্যভাবে না চাইতেও আয়ুব খান-ভুট্টো-শেখ মুজিব-ভাসানী-লারকানা-পিন্ডিছয় দফা না এসে পারতো না। দুই বন্ধুই তখন একটু গম্ভীর হয়ে যেতেন।

আজ কিন্তÍ জমশেদ আলী ফতেহপুরীকে দেখে হুট করে বুকে কেমন এক অনিশ্চিত ভয়ের ধাক্কা খেলেন ললিতমোহন। পঁচিশে মার্চের ব্ল্যাক আউট আর গোটা ঢাকা জুড়ে ক্র্যাক ডাউনের খবর সারা পৃথিবীর মানুষই গোপনে বেতারের মাধ্যমে জেনে গেছে। পুরনো ঢাকার হিন্দু এলাকাগুলোয় সমানে চলেছে ব্রাশ ফায়ার। আলম মিঞা তাঁর একমাত্র পুত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সে তো মুসলিম হলেও বাঙ্গালী। এই উর্দূভাষীর মনে কি আছে কে জানে?

না, আজ যেন আরো সতর্কভাবে রাজনীতির আলাপে গেলই না জমশেদ আলী ফতেহপুরী। কিন্ত এই তুমুল রক্তপাত ও হত্যাযজ্ঞের সময়ে, দুই কন্যাকে কলকাতায় বিয়ে দিয়ে ও একমাত্র পুত্র বন্ধুর বাড়িতে ভিন্ন  নাম-পরিচয়ের ছদ্মবেশে দিন পার করার সময়ে জমশেদ আলী ফতেহপুরীর সাথে না জমলো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের আলাপ, না দাবাখেলা। নিরুত্তাপ ও গুরুভার, বিরস ঘন্টাখানেকের আলাপ শেষে জমশেদ আলী ফতেহপুরী দুই পেগ মদ খেয়ে আপন ডেরায় ফিরে গেলেন।

(৪)

‘ডোন ডু ইট! ইউ আর মাই নিফিউ- খুররম- ডোন ডু ইট!  ললিত জি ইজ মাই ফ্রেন্ড। বেস্ট ফ্রেন্ড’।

‘চাচাজি- আপকো কোই ডর নেহি। বাট চাচাজি- উই হ্যাড হিউজ প্রপাটির্জ ইন ইউপি। হোয়াই মাই ফাদার হ্যাড টু ফ্লাই টু করাচী? ইনশাল্লাহ আই হ্যাভ বিন রিক্রুটেড ইন পাকিস্থান আর্মি এ্যান্ড আই হ্যাভ কাম হেয়ার- ইন ইস্ট পাকিস্থান টু সার্ভ মাই কান্ট্রি। ডু ইউ থিঙ্ক হিন্দুজ- ইন এনি কেস- ক্যান বি আওয়ার ফ্রেন্ডস?’

‘লেকিন ও ললিতমোহন জি তো মাই বুজম ফ্রেন্ড হ্যায়!’

‘চাচাজি- আপ ঘাবড়াও মাত। ইন পাকিস্থান আর্মি আই হ্যাড টু স্টাডি লটস অফ ওয়্যার লিটারেচার! হ্যাভ ইউ রেড দ্য মেমোয়র্স অফ আ জিউ মিউজিশিয়ান ইন সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়্যার?’

‘নেহি বেটা!’

‘আপ ঘাবড়াও মত আর হামকো তো আপ পহেলে উনকো পাশ লে যায়েঙ্গে!’

বিমূঢ় জমশেদ আলী ফতেহপুরী তার জিন্নাহ কোটের বোতামগুলো ক্লান্ত আঙুলে আঁটতে আঁটতে ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে বেড়িয়ে পড়েন। পৃথিবীটার এ কেমন হাল হলো? দোস্তি, রিসতা বলে কিছু থাকবে না? না হয় হলোই ললিতমোহন জি এক হিন্দু। হা- এ হিন্দু-মুসলমান টেনশনে দেশ দু‘টুকরো হয়েছে। ললিতমোহনজি’রা এপারে সব হারাচ্ছেন আর ওপারে ফতেহপুরীরা। এই তো গত রবিবার ললিতমোহনজির বাসায় যাবার পর সেই আগের আড্ডা কিছু জমলো না। আর এরই ভেতর তিনদিন আগে ঢাকায় পিন্ডি থেকে ফ্লাইটে নেমেই তাঁকে ল্যান্ড ফোনে ফোন দিয়েছে সেজ ভাইয়ার ছেলে খুররম। তাঁর এক পিতৃব্য এই গন্ডগ্রামে বাংলার এক জেলায় পড়ে আছে জেনে এখানেই তাকে একটি পুরো বাহিনীর দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। আর শেখ মুজিবের প্রধান ডানহাত যেহেতু হিন্দু আর ইস্ট পাকিস্থানে থেকে যাওয়া এখনো প্রায় ২০-৩০ শতাংশ হিন্দুরা, প্রতিটি এলাকায় মাইনরিটি এ্যাবোড সব তছনছ করা, ওদের সম্পত্তি আর আওরত সব লুট করা ছাড়াও সব রিজিওনের সব পাওয়ারফুল মাইনরিটিকে খুন করতে পারলে বাকিরাও ভাগবে। চাচাজি ইজ এ্যান ওল্ড ফুল। ঔর শাদি ভি করেছে এক মছলিখোর, কালা বাঙ্গালী বিবি। ও তো আধা-বঙ্গালী ঔর আধা-হিন্দু বন গেয়ি। কাজিনগুলা সব খাটো আর ডার্ক।

‘চাচাজি- চলিয়ে!’

উদ্ভ্রান্ত জমশেদ আলী ফতেহপুরী খুররমের সাথে পা বাড়িয়ে তার আর্মি জিপে ওঠেন। যদি শেখ মুজিব খারাপ লোকও হন, এই ইস্ট পাকিস্থানের মাটিও যদি দ্রুতই তাঁর জন্য অন্য দেশ হয়ে যায় ভারতের মতোই, তবু এর সাথে ললিতজির কী সম্পর্ক? ওনারও তো পার্টিশনের পর থেকে সব কিছু শুধু হারাচ্ছে।

‘সালাম ললিত জি!’

ফ্যাকাশে মুখ জমশেদ আলী ফতেহপুরীর সাথে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র খুররম রসুলজাদা জিপগাড়ি থেকে নামেন। পিছন পিছন কিছু পাঞ্জাবি সৈন্য ছাড়াও বাঙ্গালী রাজাকারদের একটি দল। ভাঙ্গা উর্দূতে তারা বোঝায় যে এই ললিত মোহনজিরা-ই এই গোটা তল্লাটের মালিক ছিলেন বা আজো এখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই মনে মনে তাঁকে বা তাঁদের মালিক মানে এবং পানির মত সহজ হৃদয় জমশেদ আলী ফতেহপুরী কেন যে তাঁকে ‘দোস্ত‘ ভাবে কে জানে?’

‘সালাম ললিতজি! মেরি আঙ্কল তো আপকো বহুত ফ্যান হ্যায়’।

‘সব উনকো মেহেরবানী’।

‘আরে বাহ - ইতনা পেইন্টিংস - স্টিল-লাইফ - মেরি চাচাজি হামকো কেহতা হ্যায় কি আপ এক বড়িয়া চিত্রকর হো!’

‘সাম সাম’।

‘হাম ভি কুছ কুছ আর্ট কা সমঝদার হ্যায়। ক্যান ইউ শো মি ইওর প্যালেস আ বিট?’

‘ওহ- শিওর। দৌ ইটস নো লঙ্গার আ প্যালেস!’

দত্তচৌধুরী ভবনের সামনের বিশাল গোলাপ বাগান, তিন তলার ‘দরবার হল’ যেখানে একসময় লক্ষৌ থেকে গায়িকা ও নর্তকীরা এসে ‘মেহফিল’ বসাতেন, শিকারের কক্ষে স্বর্গীয় পিতৃপুরুষদের ছবির পাশাপাশি শিকার করা বাঘের চামড়া বা হরিণের মাথা, প্রতিটি কক্ষের দেয়াল জুড়ে এত এত পেইন্টিংস সব দেখানো হলো খুররম রসুলজাদাকে। দেখা গেল খুররম ভাল চিত্র সমঝদার। সে দিব্যি মনে-মানে-শেজান-শাগাল নিয়ে আধাঘন্টা আলাপ করলো।

‘নাউ আই উইশ টু হেয়ার ইওর সেতার!’

হাঁফ ছাড়লেন জমশেদ ফহেতপুরী। তাদের বংশে এক দাদা খোদ তানসেন ঘরানার শিষ্য ছিলেন। সেই বংশের ছেলে খুররম কি আর ইতনা রইস আদমিকে খুন করবে? ঐ সেতারই শুনবে।

‘বজাইয়ে- ললিতমোহন জি- বজাইয়ে!’

একে একে বাজালেন তিনি সব। রাগ হংসধ্বনি, ভূপালী, দরবারী কানাড়া। কী চাচ্ছে এই ছেলে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এক পোলিশ ইহুদি পিয়ানোবাদক একটি ফাঁকা ঘরে পিয়ানো পেয়ে পিয়ানো বাজানোর  সময় এক জার্মান নাজি সৈন্য সেটা শুনে ফেলে। সে পিয়ানোতে মোহিত হয়ে ঐ ইহুদিকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্ত নাজিরা যখন হেরে গেল আর সোভিয়েত সৈন্য এলো অবরুদ্ধ ইহুদিদের মুক্ত করতে, ধরা পড়ার আগে সেই নাজি সৈন্য পিয়ানো বাদককে বলে যায় যে বেঁচে থাকলে পোলিশ বেতারে পিয়ানো বাদিয়ের বাদন সে আবার শুনবে। পিয়ানোবাদক প্রাণে বেঁচে গেলেও সেই নাজি সৈন্যকে বাকি জীবনটা সোভিয়েত কারাগারেই থেকে মরতে হয়েছিল। সেই স্মৃতিকথা পড়েছেন ললিতমোহন। জামশেদ ফতেহপুরীর ভাইপো খুররমও কি তাঁর সেতার শুনে তাঁকে বাঁচিয়ে দেবে!

‘ব্রিলিয়ান্ট। ইউ আর আ মাস্টার আর্টিস্ট!’ এটুকু বলে মুচকি হাসলো খুররম। তারপর খুব শান্তভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ‘লেটস গো আউটসাইড নাউ। ইন দ্য গার্ডেন! আই নিড টু টেক আ ওয়াক ইন ফ্রেশ ব্রিজ!’

যেন খুররমের কথায় মন্ত্র-বশীভূত দুই বৃদ্ধও উঠে দাঁড়ালেন।

‘চাচাজি - আপ ইধার মে বৈঠিয়ে! বিলকুল মুভ নেহি করিয়ে আপ!’

খুররম রসুলজাদার তর্জনীর ইঙ্গিতে জামশেদ আলী ফতেহপুরী কেমন নিথর হয়ে পুনরায় বসে পড়েন। ললিতমোহনকে নিয়ে বাড়ির সামনের গোলাপবাগান যেখানে শেষ হয়েছে, সেই পুকুর পাড়ের শান বাঁধানো বেদির কাছে নিয়ে আসলো খুররম রসুলজাদা। ললিতমোহনকে ঘিরে আছে আরো পাঁচ/ছ‘জন পাঞ্জাবি সৈন্য ও দশ/বারো জন বাঙ্গালী রাজাকারের একটি বৃত্ত।

‘মে বি ইউ আর আ ভেরি কালচারড এ্যান্ড এরুডিট পার্সন, বাট হোয়াই ইউ হিন্দুজ আর ট্রাইং টু ফুয়েল শেখ মুজিব এ্যান্ড ড্রেস্টয় আওয়ার চেরিশড পাকিস্থান? আই এ্যাম নট আ ফুল লাইক মাই আঙ্কল। ইন ওয়্যার এ্যান্ড লাভ - দেয়ার ক্যান্ট বি এনি এথিক্স। ইয়েস, আই রেড দ্যাট প্রিজন মেমোয়র্স বাই আ জ্যু মিউজিশিয়ান হুম আ জার্মান সোলজার সেইভড বাট আল্টিমেটলি দ্য নাজি সোলজার ডায়েড ইন প্রিজন। ইন ওয়্যার, ইউ কিল আর গেট কিলড। সো - আই ওন্ট ডু এনি মার্সি এ্যান্ড মেক এ্যানি ফল্ট’।

হাতের ইঙ্গিতে সঙ্গীদের একটু তফাতে সরতে বলে ললিতমোহনের বুক বরাবর রাইফেল তাক করে খুররম।

অনেকটা রক্ত ছিটকে আসে সান্ধ্য পূরবীর রক্তমাখা কান্নায়।

 

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন