সাহিত্যসেবক জলধর সেনের কলমে বিধৃত শিশুসাহিত্য
সমগ্র
বিশ্বের সাহিত্যধারার অন্যতম জনপ্রিয় একটি শাখা শিশু ও কিশোর সাহিত্য। যার প্রকৃত কালনির্দিষ্ট
জন্মপরিচয় কিংবা উৎসমুখের সন্ধান অজ্ঞাত। মনে করা হয় সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই লোকসাহিত্যের
মারফত মুখে মুখে রচিত বিভিন্ন কথা-কাহিনির মাধ্যমে শিশু সাহিত্যের উন্মেষ ঘটে।
শিশুদের
আনন্দদান শিশু সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্যরূপে বিবেচিত হয়। তবে কেবল নিখুঁত আনন্দরস
নয় বরং, তার মাধ্যমে শিশুদের মন ও মননের বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন
করে সাহিত্যের এই শাখাটি। ছড়া-কবিতা-গল্প সকলকিছুর মাধ্যমে দেশ-কাল-সমাজ এবং সংস্কৃতির
সঙ্গে রচয়িতা ক্ষুদে পাঠকদের পরিচয় করান। তার মাধ্যমে তিনি ভবিষত্যের একজন সুনাগরিক
এবং সুসামাজিক নাগরিক গড়ে তোলার প্রয়াসে অবদান রেখে যান। গবেষকদের মতানুসারে, “স্বপ্নকল্পনায়
গড়া, আবেগে উচ্ছ্বসিত, নবপ্রাণের আনন্দে চঞ্চল,
এই শিশুর নিভৃত মর্মকোষে যে রহস্য লুকানো রহিয়াছে তাহা এক অপরিচিত মহাদেশের মতই বিরাট
ও বিচিত্র। সেই মহাদেশের আবিষ্কার সহজ কাজ
নয়; তাহার মানস আকাশে কল্পনার যে ইন্দ্রধনু ফুটিতেছে এবং মিলাইতেছে তাহাকে তুলির রেখায়
জাগাইয়া তোলা শক্তিমান শিল্পী ব্যতীত অসম্ভব।” আসলে রূপকথা-উপকথা-শিকার অভিযানের চরিত্ররা
শিশুদের ‘বন্ধু’-র ভূমিকা পালন করে। তাদের জ্ঞানের পরিসীমাকে বিস্তৃত করে তুলতে সহযোগী
ভূমিকা পালন করে।
বাংলা
শিশুসাহিত্যের আঙিনায় প্রধানত সাহিত্য সেবক হিসাবে সমাদৃত জলধর সেন (১৮৬১-১৯৩৯)। তিনি
একাধারে স্বলিখিত গ্রন্থের পাশাপাশি প্রভূত উল্লেখযোগ্য পত্র-পত্রিকা যেমন ভারতবর্ষ,
বসুমতী ইত্যাদির সম্পাদনা করেছেন। অথচ নিভৃতচারী এই কথাকারের শিশুসাহিত্যের বিপুল ভাণ্ডার
উপেক্ষিত হয়েই থেকে গিয়েছে।
প্রথিতযশা
সাহিত্যিক জলধর সেন অবিভক্ত বাংলার নদীয়ার কুমারখালী গ্রামে, এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ
পরিবারে ১৩ই মার্চ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে(১ চৈত্র ১২৬৬ বঙ্গাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর
পিতার নাম হলধর সেন এবং মাতার নাম কালীকুমারী দাসী। হলধর সেন এবং কালীকুমারী দেবীর
তৃতীয় সন্তান শ্রীসেন। তাঁর রাশিগত নাম যোগেন্দ্রনাথ সেন হলেও কাঙাল হরিনাথের পরামর্শে
তিনি বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় পরিচিত ‘জলধর’
নামেই সমাদৃত; “তিনি তখনই না ভেবে চিনতে বলে বসলেন হরধর কাকার ছেলের নাম আবার কি হবে,
জলধর হবে।… নামের মিল রাখতে গিয়ে তিনি হলধররের পুত্রকে জলধর নাম দিয়েছিলেন এবং তারপর
আমার ছোটভাই জন্মগ্রহণ করলে তারও নামকরণ কাঙালই করেছিলেন শশধর। তারপর তখনই আমার কষ্টির
ডাকনামের যে জায়গাটা মধুসূদন আচার্য মহাশয় ফাঁক রেখেছিলেন; আমাদের বাড়িতে বসেই সেই
শূন্যস্থান পূর্ণ হল আমার এই নিরাকার নাম দিয়ে এবং আমার কষ্টিপত্র দেখেছি সে নামটা
কাঙাল হরিনাথের স্বহস্তে লিখিত।”
নিজ
জীবনীগ্রন্থে গল্পকার তাঁর বংশ পরিচয় প্রসঙ্গে বলেছেন; “আমার পিতামহের নাম গদাধর সেন।
আমরা দক্ষিণ রাঢ়ীয় কায়স্থ। আমার প্রপিতামহ কুমারখালীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেশম
কুঠির দেওয়ানির কাজ পেয়ে কুমারখালীতে গিয়েছিলেন। সেই থেকেই তারা সেখানকার স্থায়ী
অধিবাসী হয়ে পড়েন। তাদের আদি নিবাস ছিল চব্বিশ পরগণার বারাসাতের নিকট দেগঙ্গ গ্রামে।
তাই আমরা এখনো পরিচয় দিই আমরা দেগঙ্গের সেন - আমরা অনন্যের সন্তান।”
হলধর
সেন রামমোহন প্রামাণিকের কাপড়ের দোকানে অধস্তন কর্মী হিসাবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীকালে
রামমোহনবাবু বিলাতি কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। সেই সূত্রেই গল্পকারের পিতা বার্ষিক
১৮১ টাকা বেতন-ভুক্ত কর্মচারী হিসাবে কলকাতায় স্থিত হন। পরবর্তীকালে কলকাতায় বসন্ত
রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পুনরায় কুমারখালী গ্রামে ফিরে আসেন। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর
মৃত্যু হয়। তৎকালীন সময়ে তিনি লোকালয়ে ধার্মিক বলেও সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। গ্রামীণ দেবতা মদনমোহন দেবের
উৎসব-পূজা-অর্চনা-ব্রাহ্মণভোজন-বৈষ্ণবভোজন সহ সকল উৎসব মহা সমারোহে পালিত হত হলধর সেনের
তত্ত্বাবধানে।
জলধর
সেনের জন্মের পূর্ব থেকেই তাঁদের পরিবারের গৃহকর্ত্রী ছিলেন তাঁদের পিসিমা। তার দুই
পুত্র বঙ্কুবিহারী ব্রহ্ম এবং রাসবিহারী ব্রহ্ম তাঁদের পরিবারেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন।
হলধর সেন কলকাতায় কর্মরত অবস্থায় রাসবিহারীকে
প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর বঙ্কুবিহারী এবং রাসবিহারী
সমস্ত সম্পদ আত্মস্থ করেন। এ প্রসঙ্গে কৃষ্ণনাথ সেনের বক্তব্যটি উল্লেখযোগ্য: “কাকার
অন্ত্যেষ্টি-ক্রিয়া শেষ করে এসে সেই রাত্রিতে
আমাদের পিসতুতো দুই ভাই একটা ঘরের মধ্যে দোর দিয়ে অনেক কাগজপত্র পুড়িয়েছিলেন। আমার
ঘুম হচ্ছিল না। কাগজ পোড়ার গন্ধ পেয়ে উঠে
গিয়ে দোরের ফাঁক দিয়ে স্বচক্ষে দেখেছি, অনেক দলিলপত্র অনেক হিসেবের খাতা তারা পুড়িয়ে
ফেলেছিলেন।” ফলত পিতার মৃত্যুর পর কথাকারের পরিবার শুধু বৃত্তিহীন নয়, পথের ভিখারিতে
পরিণত হয়।
অতএব
শৈশব থেকেই অতি কষ্টে জীবন অতিবাহিত হয় জলধর সেনের। তাঁর পিতৃব্য রামতনু সেন একান্নবর্তী
পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জলধরের বিদ্যা-চর্চার হাতে খড়ি হয় হরিনাথ মজুমদার
বা কাঙাল হরিনাথের মাধ্যমে; “সেকালের পদ্ধতি অনুসারে নানান অনুষ্ঠান করে পুরোহিত মহাশয়
আমাদের হাতেখড়ি দেননি। শুনেছি অনুষ্ঠান সবই হয়েছিল পুরোহিত মশাই ও পূজোর্চনা করেছিলেন,
কিন্তু আমাদের হাতেখড়ি দিয়েছিলেন আমাদের পরম পূজনীয় পরমারাধ্য কাঙাল হরিনাথ।”
কাঙাল
হরিনাথ পরিচালিত কুমারখালীর বঙ্গবিদ্যালয় স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন শ্রীসেন। পরবর্তীকালে
তাঁরই সাহচর্যে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হন জলধর সেন। এপ্রসঙ্গে তার অভিমত; “আমার
বাংলা বিদ্যালয়ে বৎসরের ছ’মাসের শিক্ষার সংক্ষিপ্তসার এই যে আমি সে সময় দ্বিতীয়
শ্রেণীতে অধ্যায়ন করলেও, বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে শুধু বাংলা স্কুল কেন ইংরেজি স্কুলের
ছাত্রগণেরও অগ্রগণ্য ছিলাম। শুধু গোল বেঁধে ছিল ওই অংকশাস্ত্রে। অংক বিদ্যায় আমার
মত গাধা, গ্রামের স্কুলে কেন গ্রামের সীমানার মধ্যে ছিল কিনা সন্দেহ। ওই ক্ষেত্রতত্ত্ব
আর পাটিগণিত এই দুটো কিছুতেই আমার মাথার মধ্যে প্রবেশ করত না অথচ সে সময় সকলেই বলতেন
যে আমার দেহের গঠনের অনুপাতে মাথাটা খানিক নাকি বড় ছিল, সে মাথার ভেতর বোধহয় বাংলা
সাহিত্য সবখানে জায়গা জুড়ে বসেছিল।”
বাংলা
সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর সংযুক্তির সূত্রটি আজন্মকালীন। হিমালয় বিবরণীর বিস্তৃত বিবরণীর
জন্য তাঁর প্রখ্যাতি। অথচ কেবলমাত্র গল্প বা উপন্যাস কিংবা ভ্রমণ-পিপাসুরূপেই তিনি
সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হননি। জলধর সেন আদতে সাহিত্য-সেবক হিসাবে তাঁর জীবন উৎসর্গকৃত
করেছিলেন। নিজ গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি একাধারে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতিত্ব করেছেন।
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘বঙ্গবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘বসুমতী’ সহ ‘ধ্রুব’, ‘মুকুল’
ইত্যাদি পত্র-পত্রিকা। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে জলধর সেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘হিতবাদী’
পত্রিকা। ১৩২০ বঙ্গাব্দে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকা।
কালের নিরীখে তিনি রবীন্দ্রনাথের পূর্বজ। স্বভাবতই সাহিত্যক্ষেত্রে জলধর সেন তাঁর আগেই পদার্পণ করেন। সমকালীন সময়ে রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবত সহ অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনিকে উপলক্ষ করে একের পর এক শিশু উপযোগী গ্রন্থ রচিত হয়। জলধর সেনও সেই ধারায় ব্যতিক্রমী নন। তাঁর প্রথম শিশু-কিশোর বিষয়ক রচনা ‘সীতাদেবী’ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় পুরাণভিত্তিক রচনা ‘রামচন্দ্র’। তারপর F W Bain প্রণীত ‘In the God’s great hair’ অবলম্বনে ‘শিবসীমন্তিনী’ নামক একটি কিশোর গল্প রচনা করেন, যেটি ১৩৩০ বঙ্গাব্দে ‘খোকাখুকু’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। প্রাচ্য সাহিত্যে প্রভূত অবদান থাকা সত্ত্বেও অন্তরালেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন জলধর সেন। সাহিত্যে অবদানের স্মারকস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘রায়বাহাদুর’ উপাধিতে সম্মানিত করেন। অথচ তাঁর পরবর্তী অবনঠাকুর কিংবা মসুয়ার রায়চৌধুরী পরিবার সমাদৃত হলেও জলধর সেন বিস্মৃতপ্রায় হয়ে থেকে যান। তাঁর স্বভাববৈচিত্র্যের মধ্যেই এহেন নিভৃতচারী পদক্ষেপ লক্ষ করা যায়। প্রসঙ্গক্রমে খগেন্দ্রনাথ মিত্রের পর্যবেক্ষণটি উল্লেখ্য, “বর্ষার জলধরের মতই স্নিগ্ধ, কোমল, শান্ত, শ্যামল ছিল তাঁহার হৃদয়টি। তিনি সংসারের মধ্যে থাকিয়াও যেন এক সুন্দর জগতে বাস করিতেন। এই জগতের ধূলিমাটির স্পর্শ যেন তাঁহাকে আক্রমণ করিতে পারিত না। তাঁহাকে কখনও সাংসারিক সুখদুঃখের কথা কখনও শুনি নাই, পরচর্চায় তাঁহার উৎসাহ কখনও দেখি নাই।...পরিব্রাজক হইয়া হিমালয়ের শৃঙ্গে শৃঙ্গে ঘুরিয়াছিলেন, তাহারই ছোপ পড়িয়াছিল তাঁহার প্রাণে। জলধরবাবুর প্রাণ ছিল বড় সাদা, বড় উচ্চ।”
উনিশ
শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সাহিত্যক্ষেত্রে জলধর সেনের আগমন ঘটে। তাঁর শিক্ষাগুরু এবং দীক্ষাগুরু
কাঙ্গাল হরিনাথ বা হরিনাথ মজুমদারের সূত্র ধরেই ‘গ্রামবার্তা’ পত্রিকার মাধ্যমে জলধর
সেন প্রবেশ করেন। তিনি মূলত জনপ্রিয় হিমালয় ভ্রমণ কাহিনী রচয়িতা হিসেবে কর্মজীবনে
বিভিন্ন সাহিত্য পত্র-পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। ছোটোগল্পের ক্ষেত্রে তাঁর ১১ টি গল্পগ্রন্থের
উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও শিশু সাহিত্যে তাঁর অবদান বিস্তর। তার সাহিত্য রচনা মূল
কেন্দ্রে মূলত পল্লী জীবনের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
শ্রী
সেনের প্রথম গল্প সংকলন ‘কিশোর’ ১৩২১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। তিনি গ্রন্থটি উৎসর্গ
করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে। এই সংকলনে গল্পের সংখ্যা ১৩টি। এই সংকলনের প্রথম
গল্প ‘মায়ের বলি’ আদতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাবাহী। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষ
নিজ নিজ ঈশ্বরের সাধনায় ব্রতী হয়। আরাধ্যের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন নানান উপাচার। কিন্তু
গ্রামীণ জমিদারের ম্যানেজারের ষড়যন্ত্রের ফলে মিয়াজানের পালিত পোষ্যটি ‘পূজার বলি’
হিসাবে ঘোষিত হয়। গল্পের সমাপ্তিতে শিশু মিয়াজানের করুণ আর্তি এবং দেবীমূর্তির ‘স্নেহকরুণ
বেদনামাখা মিনতির ভাব’ জমিদারের মনকে প্রশমিত করে। তারপর থেকেই বন্ধ হয় পশু বলি। আবার
নীতিশিক্ষার গল্পস্বরূপ বলা যায় ‘ট্রামগাড়ী’ ও ‘আরে অর্থাৎ’ গল্পের কথা। স্কুলের পাঠ
সংক্রান্ত নিয়মের বেড়াজাল শিশু কিংবা কিশোরের মন-উপযোগী বিষয় নয়। তাদের মন সর্বতভাবেই
সব নিয়ম-বাধার গণ্ডি পেরিয়ে অসীমের কাছে অন্বেষণে আকর্ষিত হয়। অথচ প্রথাগত শিক্ষা জীবনে
এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। এই ঘটনার স্বাপেক্ষে শিক্ষার গুরুত্ব এবং তার উল্লেখযোগ্য
দিকগুলি কিশোরদের জন্য সুললিতভাবে আলোচিত হয়েছে ‘সরস্বতীর কৃপা’ নামক গল্পে।
জলধর
সেন প্রণীত দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘মায়ের পূজা’ প্রকাশিত হয় ১৩৩৪ বঙ্গাব্দে। ১০টি গল্প
এই সংকলনে স্থান পেয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতি অনুসারে শিশুকে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি হিসাবে
গণ্য করা হয়। অনাথ কিশোরী ‘গৌরী’ এই গল্পের মুখ্য চরিত্র। নবাবপুরের জমিদার হরগোবিন্দ
রায়ের বাড়িতে সাড়ম্বরে অন্নপূর্ণা পূজা পালিত হয়। পৌরাণিক মতানুসারে যেমন দেবী অন্নদান
করে স্বর্গবাসীর জঠর জ্বালা পরিতৃপ্ত করেন। বাস্তবেও ‘গৌরী’কেও তিনি একইভাবে সহায়তা
করেন। আশ্রয়হীন বালিকা জমিদার বাড়িতে আশ্রয় পায়। হরগোবিন্দ রায় মৃন্ময়ীকে শ্রদ্ধার্ঘ্য
জানান চিন্ময়ী ‘গৌরি’র জঠরাগ্নিকে নিবৃত্ত করে। দুরন্ত কালবৈশাখী শিশুকিশোদের কাছে
অন্যতম রোমাঞ্চকর বিষয়। সেই কাহিনি প্রতিবিম্বিত হয়েছে ‘কালবৈশাখী’ গল্পে। এহেন ঘটনার
পাশাপাশি বিজ্ঞানমূলক চিন্তা-চেতনার উল্লেখ পাওয়া যায় ‘কেন’ গল্পটিতে। রেল ইঞ্জিন আবিষ্কারক
জেমস্ ওয়াটের কাহিনি এই গল্পের মূল উপজীব্য বিষয়। গল্পকারের তৃতীয় এবং চতুর্থ গল্প
সংকলনটি যথাক্রমে ‘আইসক্রিম সন্দেশ’(১৩৪২) এবং ‘সন্দেশ’। যদিও চতুর্থ গ্রন্থটির প্রকাশকাল
অনুল্লিখিত। এছাড়াও সমকালীন সাময়িক পত্র-পত্রিকায় ‘ঠেকা শেখা’ কিংবা ‘মদনগোপাল’ বিষয়ক
গল্পগুলি প্রকাশিত হয়। যেখানে একাধারে ভ্রমণবৃত্তান্ত এবং শিশুদের মনের সারল্যগত সমীকরণ
প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ৪৩ টি গল্প চারটি গল্পসংকলনের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ সাময়িক
পত্রে প্রকাশিত ৩৪টি গল্প সেই সংকলনে অঙ্গীভূত হয়নি। এছাড়াও আরো বেশ কিছু গল্পগাথা
পাওয়া যায় গল্পকারের।
শিশু
সাহিত্যিক শ্রী সেনের কৈশোর জীবনের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় ‘ভবঘুরের কথা’ কৃষক গল্পে।
একটি শিশুর মাতৃ শ্রদ্ধা এবং মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসার পরিচয় এই গল্পে লক্ষ্য করা
যায়। মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য বৈশাখের রৌদ্রকীর্ণ পরিবেশে দশ ক্রোশ পথ পায়ে
হেঁটে অতিবাহিত করে কেন্দ্রীয় চরিত্রটি। আবার মা এবং সন্তানের সম্পর্কের অম্ল মধুর
চিত্র ‘শেষ দেখা’য় লক্ষ্য করা যায়। তাঁর শেষতম গল্প ‘অজ পাড়া গাঁ’। ভ্রমণপিপাসু
সাহিত্যিকের ভ্রমণ নির্ভর কাহিনির পরিচয় এই গল্পটিতে পাওয়া যায়। একজন ভোজন রসিক
অবস্থার পরিবর্তনের কারণে কিভাবে নানান লোভনীয় খাবার পরিত্যাগ করে ফিরে আসে এবং তার
মধ্যে জমে ওঠা আফসোস ও বিষাদের চিত্র এই গল্পটিতে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন গল্পকার।
এই
সকল কাহিনির মাধ্যমে জলধর সেন শিশু-কিশোরদের নীতিশিক্ষা, সুকুমার বৃত্তির সুষ্ঠ বিকাশ
সহ মনুষ্যত্ববোধ উদ্বোধিত করার প্রয়াসে অগ্রসর হয়েছিলেন। সমকালীন গ্রামীণ সমাজ-জীবনের
দুরবস্থার পাশাপাশি সম্প্রীতি ভাবাদর্শ আলোচিত হয়েছে তাঁর কলমে। আবার সমাজের প্রান্তিক
মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কাহিনিও সেখানে স্থান পেয়েছে। শিক্ষকসমাজের প্রতি
শ্রদ্ধা, একনিষ্ঠতার পাশাপাশি পারিবারিক জীবনের আদর্শের কথাও বিধৃত হয়েছে কাহিনি-কথায়।
বাংলার
এই বিপুল সাহিত্যশাখার নানাদিক প্রকোষ্ঠে অবাধে বিচরণ করেছেন জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্বেরা।
তাঁদের জ্ঞানের আলোক এবং অন্তরের সারল্য-সহানুভূতি এবং সর্বকনিষ্ঠ পাঠকদের চিত্তবিকাশের
স্বাক্ষর প্রতিনিয়তিই আমাদের সেইসকল বরেণ্য মানুষদের কথা স্মরণ করায়। সাহিত্যের চিত্তাকাশে
বহু সাহিত্যিক সমাদৃত হয়েছেন ছোটোগল্প কিংবা উপন্যাস অথবা সমধর্মী একটি নির্দিষ্ট প্রকরণের
মাধ্যমে। অথচ তাঁদের সময়কাল পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় তাঁরা সব্যসাচীর ন্যায় সাধনায়
রত ছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাঁর স্নিগ্ধতাপূর্ণ সাধনায় মুগ্ধ ছিলেন তিনিই উপেক্ষিত
বাংলা শিশু ও কিশোর সাহিত্যে, “...বাংলা সাহিত্য সমাজে আপন স্নিগ্ধ সহৃদয়তারগুণে বর্তমান
সাহিত্যসাধকদের হৃদয় জয় করিয়াছেন প্রবীণ সাহিত্যতীর্থপথিক শ্রীযুক্ত জলধর সেন।”

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন