কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

শাহনাজ নাসরীন

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৫


কয়েকজন সাধারণ নারী

 

প্রকৃতিতে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে। বাড়ি থেকে বের হলে, কোথাও বেড়াতে গেলে হলুদ পোশাকের খোঁজ পড়ছে। নিশা, রেহনুমা, সামিনা, শোভা, অনিতা হলুদ শাড়ি পরে কানের পাশে ফুল গুঁজে পার্কের এদিক সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। প্রত্যেকেরই বয়স ত্রিশ পার হয়েছে। পুরুষরা বলবে মধ্যবয়সী। কিন্তু ওদের হাসিখুশি, আনন্দ কিশোরীর মতো। পার্কের পুরুষরা চোখ গোল করে কেউ বা কটমটিয়ে তাকাছে দেখে নিশা হাসতে হাসতে বলে, সবাই নিশ্চয় আমাদের আদেখলা বলছে।

শোভা বলে, আদেখলাই তো, এই জীবনে কখনো এমন হয়েছে আর? বিয়ের আগে কলেজ আর বাড়ির বাইরে স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারিনি। প্রতিবাদ করলেই মা বলতো যা করবে বিয়ের পর স্বামীর সাথে, আমাদের দায়িত্ব আছে, কোন একটা অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে গেলে বিয়ে দিতে পারবো না, সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না, আর আত্মীয়রা তো ছিঁড়ে খাবে। শোভা স্বগতোক্তি করে, বিয়ে তো হয়েছে এক সন্দেহবাতিক মোল্লার সাথে, জীবনটা ভাজা ভাজা হয়ে গেল। ভাগ্যিস তোমার সাথে পরিচয় হয়েছিল!

নিশা বলে, আমার বাড়ি তোমার বাড়ির মতো কনজারভেটিভ নয় অবশ্য, কিন্তু সমাজটা তো সত্যিই  মেয়েদের জন্য নিরাপদ নয়! তাই আমার বাবা মাও খুবই ভয়ে থাকতো। ইউনিভার্সিটিতে একটু দেরি  হলেই বাবা মেইনরোডে দাঁড়িয়ে থাকতো, কী হাস্যকর বলো? আমাকে ভোট দিতে দেয়নি জানো, বলে, যদি ভোটকেন্দ্রে গণ্ডগোল হয়  - বলে হাসে নিশা।

রেহনুমা ডাকে ওদের, এসো অনেক ক্লিকবাজি হয়েছে এবার চা খাই। নিশা সবসময় বেশি হাসে, হাসতে  হাসতে গড়িয়ে পড়ে বলে ক্লিকবাজি! হায় আল্লা, কী শব্দের কী ব্যবহার! এবার সবাই হাসতে থাকে।  হাসতে হাসতে শোভা নিশার আগের কথার রেশ ধরে বলে, এখন তো তুমি স্বাধীন, চলো এবার দল বেঁধে ভোট দিই আমরা। বসন্তে ভোট হবে এবার। হলুদ পরে ভোটকেন্দ্রে যাবো। বেশ একটা উৎসব হবে, বসন্তোৎসব-ভোট উৎসব, দারুণ না?

শোভা হৈচৈ করে ওঠে, আমার বর এখানের ভোটার না, গ্রামে থাকবে, এই সুযোগ কাজে লাগাতেই হবে!


সামিনার মনে পড়ে অনেক বছর আগে একবার ভোট দিয়েছিল। তখন উঠতি যৌবন, সব কিছুতেই আনন্দ। উৎসবের মতো করে ভোট দিয়েছিল। যদিও পাঁচবছর পর পর ভোট দেবার কথা এবং সে যাদেরকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল তারাই ক্ষমতায় ছিল, তবু তার আর ভোট দেয়া হয়নি। ভোট দিতে গিয়ে দেখেছে তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। খুব অপমান লেগেছিল। এরপর আর কখনো যেতে ইচ্ছেই হয়নি।

এখন তাদের চুলে রুপালি রেখা, চোখে ক্লান্তি। তবু পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশের তারা ক’জন রান্নাঘরের গরম, সন্তানের দায়িত্ব, স্বামীর বাক্যবাণ, সমাজের বাধা সব ডিঙিয়ে এখনও মাঝেমধ্যে এক হয়, দেশ নিয়ে আলোচনা করে। একজন বলে, ওরা জানে না রান্নাঘর শুধু পেটপুজার জন্য নয়, রান্নাঘর আমাদের আগুনও চেনায় । অশুভের বিপক্ষে দাঁড়াতেই হবে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় এবার তারা ভোট দেবে।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন