কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

দেবাশিস ঘোষ

সমকালীন ছোটগল্প

 


মহাপ্রাণ

মহাপ্রাণ চেয়েছে বলে দেওয়া। মাছের ঝোল-ভাত। রায় দিয়েছিলেন যাদব ঘোষ মহাশয়, পরিচিতদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক যিনি, তিনিই। বয়স্ক ব্যক্তি, পুরুষ ও নারী মিলিয়ে, আরো কয়েকজন ছিলেন। ভিন্ন ভিন্ন যুক্তিতে ভিন্ন মত ছিল তাদের। এমনকি পিসিমা'রও ভিন্ন মত ছিল, কিন্তু পিসেমশাইয়ের মধ্যে নাকি কেমন একটা দ্বিধাগ্রস্তভাব দেখা গিয়েছিল। আমি দেখিনি, যারা দেখেছে তাদের মুখে বলে শুনেছি। আমার মা তখন সদ্য বিয়ে হয়ে এসেছেন। আর কোথাও শ্বশুরবাড়ি জাতীয় কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বলে ননদ ননদাইয়ের বাড়িটাকেই সাময়িক শ্বশুরবাড়ি হিসেবে কাজ চালিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, অর্থাৎ বাপের বাড়ি থেকে এনে সোজা সেখানে তোলা হয়েছিল। মা তাই দেখেতে পেয়েছিলেন পিসেমশাইয়ের মনের সেই টানাপোড়েন। পিসিমা'র মতে মত দিতে পারছেন না, অথচ নিজের মতটাও জানাতে পারছেন না। বললেন, "একটু ভেবে দেখি"। সামনে তখন বাইরের লোক তথা গুরুজন যারা ছিলেন তাঁদের প্রায় সকলেই মৌনতায় সম্মতি জানিয়ে বিদায় নেওয়ার পথ ধরেছিলেন। ব্যতিক্রম কেবল একজন, যাদব ঘোষ মশাই, এতক্ষণ যিনি কেবলই উসখুস করছিলেন, বললেন, "সময় যে বয়ে যাচ্ছে, আর কত ভাববে নির্মল?" পিসেমশাই নাকি বলেছিলেন, "উনি যদি শ্যামার পিসিমা না হয়ে আমার পিসিমা হতেন, তাহলে এত ভাবনা ছিল না কাকাবাবু। কিন্তু উনি যে শ্যামার পিসি, আমার পিসিশাশুড়ি মাত্র। ভাগ্যের দোষে আমাদের কাছে তাঁকে থাকতে হয়েছিল বলে আজ আমার মতামতের প্রশ্ন আসছে। নইলে কি আজ আমায় মাথা ঘামাতে হত এ নিয়ে? শ্বশুর শাশুড়ি কেউ আজ বেঁচে নেই। ধরে নিতে পারি আমার উপর বিধবা বোনের ভার দিয়েই নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পেরেছেন তাঁরা। শালাদের সাথে যে আলোচনা করব তারও উপায় নেই। বড়টা নিরুদ্দেশ, বাপ মায়ের মুখেও জল দিতে পারেনি। ছোটটা বিয়ে করে বৌ এনে তুলেছে বটে, কিন্তু নাবালক বই তো নয়। কিছু জিজ্ঞেস করলে সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়, বলে 'সে আপনি যা ভাল বুঝবেন করবেন'। তাই সময় না নিয়ে পারছি না। বিষয়টা তো খুব সহজ নয় ঠিক করা যে কোনটা কে আগে স্থান দেব, মনের ধর্মকে না সমাজের ধর্মকে"। শুনে গুরুজন স্থানীয় লোকেরা বললেন, "বেশ, তাহলে সেটাই করো যেটা ভাল মনে কর, তবে ডাক্তার যখন জবাব দিয়ে গেছে তখন ধরে নিতে পারো যে সময় আর বিশেষ নেই"। চিন্তিত মুখে সম্মতিবাচক মাথা নাড়লেন পিসেমশাই, শ্রীযুক্ত বাবু নির্মল সরকার মহাশয়। সবাই বিদায় নিলেন।

সারা সন্ধ্যা কারো সাথে আর কথা বলেননি পিসেমশাই। হেঁসেল থেকে ভেসে আসা পিসিমা'র বা তাঁর কাছে বেড়াতে আসা প্রতিবেশীদের নানারকম মন্তব্য কানে আসলেও চুপ করে থাকলেন। বিষয়টা নিয়ে যে পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে গেছে, মরার সময় কিনা বুড়ি মুখে মাছভাতের কথা আনল? ছ্যা ছ্যা ছ্যা, হরিনামের বদলে মাছের নাম মুখে? বিধবা মেয়েছেলে কিনা মাছ খাবে? সব কথা যে পিসেমশাই নিজের কানে শুনেছেন, তা নয়। শুনেছেন পিসিমা'র মুখে। বলা বাহুল্য যে বিবরণ দেওয়ার সময় নিজের সৃজনশীলতা অব্যবহৃত রাখেননি পিসিমা। পিসেমশাই তাঁকে থামিয়েও দেননি বা নিজেও কিছু বলেননি।

যা বলার, বললেন সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে। অবশ্য অত তাড়াতাড়ি হয়ত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না, যদি না কানে যেত যে আগের রাতে মুখে ভাত তোলেননি পিসিশাশুড়ি। কিন্তু ঘোরের মধ্যে মাছের ঝোল ভাতের কথা গত রাতেও একবার উচ্চারণ করেছেন। শুনেই ছুটে গিয়েছিলেন মৃত্যুপথযাত্রীর ঘরে। সময় শেষ হয়ে গেল নাকি? তাই কি খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল? নাকি মাছভাতের কথা এখনো মনে আছে তার, তাই প্রত্যাখান করেছেন খাবার। সে যাইহোক, আর দেরী করা চলে না, লোক ডেকে, হাতে পয়সা দিয়ে বাজারে পাঠালেন মাছ আনতে। বললেন অন্তত দু তিন রকমের হয় যেন, অল্প অল্প করে। তার মধ্যে যেন জিয়ল মাছ থাকে কয়েকটা, কই বা মাগুর। মাছ এলে পিসেমশাই বললেন ভাল করে রান্না করতে, দু এক পদ বেশ তেল মশলা দিয়ে আর কয়েক পদ বিনা মশলার ঝোল, যেটা মুখে রোচে সেইটাই খাবেন, সবই যেন দেওয়া হয়। পিসিমা বললেন, "আমি পারব না। এ অন্যায় আমার দ্বারা সম্ভব নয়"। পিসেমশাই বললেন, "থাক তবে, তোমার রেঁধে কাজ নেই। দেখছি কাকে দিয়ে করানো যায়"। কিন্তু সহজ হল না সমাধান। পিসিমা'র জবাবের মতই জবাব দিল সকলে। বলল, ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার তাদের, এ পাপ তারা করতে পারবে না। শেষে কোনো বিপদ আপদ হয়ে গেলে কে ঠেকাবে!

পিসেমশাই পড়লেন বিপদে। উপায় দেখতে পেলেন একটাই। মা তখন নতুন বৌ, নেহাতই বালিকা, তাকে বললে সে 'না' করতে পারবে না। একবার খোঁজও করেছিলেন তার, কিন্তু পিসিমাই জবাব দিয়ে দিয়েছেন তার হয়ে। বলেছেন, "আমার হেঁসেলে আমি করতে দেব না। তাছাড়া ও আমার ভাইয়ের বৌ, তার অনুমতি ছাড়া এ কাজ তাকে দিয়ে করালে অধর্ম হবে না?" পিসেমশাই করুণ সুরে বলেছিলেন, "পাপ হলে আমার হবে, রান্না যে করবে তার পাপ হবে কেন?" সে কথায় ভ্রুক্ষেপ করল না কেউ। পিসেমশাই লোক ডেকে উঠোনে উনুন বানাতে বললেন। বললেন, "আমি নিজেই রাঁধব"। বানানো হল উনুন, কিন্তু উনুন ধরাতে গিয়ে যেরকম বিপন্ন হলেন তাতে নিজেরই সন্দেহ হল তিনি রেঁধে উঠতে পারবেন কিনা। রান্না রুগী মানুষের জন্য, সুতরাং তা বিশেষভাবে করতে হয়। দ্বিতীয়ত যথাসময়ে শেষ করতে না পারলে খেতে দেওয়ার সময় পেরিয়ে যাবে।

বিপদতারণ হয়ে এলেন পিসেমশাইয়ের দাদার শাশুড়ি। তাঁর দাদার বাড়ি পাশেই, একেবারে পাশের জমিতেই। বিধবা শাশুড়ি তাঁর অন্য আরেক জামাইয়ের কাছে না থেকে এখানেই থাকেন, বড় জামাইয়ের সাথে। এখানে তাঁর ছোঁয়া ছুৎ, বাছবিচার নিয়ে থাকতে কোনো অসুবিধা হয় না। জামাই বরং সহায়তাই করে এবং বড় ভক্তি ভরে 'মা' বলে ডাকে। ঐ ডাক ফেলে কোথাও আর যেতে চান না তিনি। দাদার দেখাদেখি পিসেমশাইও তাকে মা বলে ডাকেন। এদিন তিনি যখন আপন মনে বিরক্তি প্রকাশ করতে করতে উঠোন ডিঙিয়ে এলেন, তখন আর কে বুঝতে পেরেছিল যে বিপদতারণ হয়ে এলেন তিনি। "পাশে আছি, তবু খোঁজও নিলো না কেউ বেঁচে আছি না মরে গেছি। ধর্তব্যের মধ্যে ধরে না কেউ"। পিসেমশাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তাঁকে আসতে দেখে। তাঁর নিয়ম কানুনের কঠোরতা আর নিষ্ঠার কথা অজানা ছিল না পিসেমশাইয়ের। বুঝলেন লড়াইটা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তাঁকে মানেন, শ্রদ্ধা করেন, সুতরাং তাঁর উপর জোর খাটাবেন কেমন করে? কিন্তু গজর গজর করতে এসে পিসেমশাইকে হুকুম দিলেন, "সরো এখান থেকে। বাপু ঐ মিথ্যে মিথ্যে আর মা বলে ডেকো না। কথাটা লোকের মুখে আমায় শুনতে হল? সরো, আমি রাঁধব, এখনো মরে যাইনি আমি"। পিসেমশাই অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি রাঁধবেন?"

--- হ্যাঁ, আমিই রাঁধব। ছোঁয়া ছুৎ বিচার বাপু আমার আছে, তাই স্নান করে এসেছি, পুজোর ভোগ রাঁধবার সময় যেমন করি।

--- সব আমিষ তো?

--- হ্যাঁ, শুনেই তো এলাম। যে ভোগে ঠাকুর সন্তুষ্ট, সেইটাই রাঁধব, তার আবার আমিষ নিরামিষ কী? দিদি মাছ খেতে চেয়েছে মুখ ফুটে; এখন তার আর চেতনা কৈ? তো তাঁর মুখ দিয়ে কে তাঁর ইচ্ছে জানিয়ে দিল তা জানব কেমন করে? ঠাকুর চাইলে তা আর আমিষ ও থাকে না, নিরামিষ ও থাকে না। তোমায় অত ভাবতে হবে না, তুমি যাও। কাউকে বলো পাশে থেকে একটু গুছিয়ে দিতে।

--- মা, আমিই থাকি না। আপনার আশীর্বাদটুকু আমায় নিতে দিন। কেউ যে আমার পাশে থাকবে তা ভাবতে পারিনি। সবাই কত কথা বলল বিধবা পিসি শাশুড়ির জন্য মাছভাতের ব্যবস্থা করছি।

--- বিধবা আর কোথায় তিনি? স্বামী মারা গেলে যে স্ত্রী বিধবা হয় তা সত্যি। কিন্তু ততদিনই তিনি বিধবা যতদিন পর্যন্ত মৃত স্বামীর কথা মনে থাকে। সে চেতনা চলে গেলে তিনি আর বিধবা থাকেন কেমন করে?  তাই তাঁকে মাছ দেওয়ায় কোনো দোষ নেই।

মায়োই-মা রান্না করে দিলেন, কিন্তু খাওয়াবে কে? পিসেমশাই পিসিমা'র দিকে তাকালেন। বললেন, "গুরুজন যখন বিধান দিয়েছেন, তখন আর দোষ কোথায়?" পিসিমা বললেন, "আমায় ক্ষমা করবেন মা। এটা নিয়ে যদি সবাই একজোট হয়ে লড়াই করত, তাহলে সাথে থাকতাম। আর পাঁচজনকে নিয়েই তো থাকতে হয় আমাদের, সকলের থেকে আলাদা হয়ে যাই কেমন করে? নিদেনপক্ষে এটাও যদি জানতাম যে জ্ঞানত পিসিমা'র ও এই মত ছিল, তাহলেও না হয় হত। নিয়ম মেনে চলেছেন সেই ছোট্টবেলা থেকে, কতই বা বয়েস তখন পিসেমশাই যখন গত হলেন, সেই তখন থেকে নিয়ম মানছেন। এখন তার জ্ঞান নেই, এই অবস্থায় মুখে কী একটা কথা উচ্চারণ করেছেন, তার জন্যেই তাকে পাপের ভাগী করে তুলব? ও আমি পারব না মা"। তখন সেখানে লোকজন জুটেছিল আরো অনেক, এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ড হচ্ছে শুনে এসেছিল। তারাও সকলে সমর্থন করেছিল পিসিমা'র কথায়।

নতুন বৌ হিসেবে সকলের সামনে আসেনি আমার মা, কিন্তু আড়াল থেকে সব দেখছিল আর শুনছিল। বাবা থাকলে হয়ত জিজ্ঞেস করে কর্তব্য স্থির করতে পারত। এখন কি তার ননদের পাশে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে সমর্থন জানানো উচিত? নাকি এখানে ননদাইয়ের কথায় 'হ্যাঁ' করবে? তারপর আবার ভাবল বড়দের কথার মধ্যে ঢুকে পড়া কি ঠিক হবে? মা দেখল পিসেমশাইয়ের দাদার শাশুড়ি কোনো মতে উঠে দাঁড়ালেন। কোমরটা সোজা করার চেষ্টায় দেহটা পিছন দিকে বাঁকাবার চেষ্টা করলেন। হল না, কোনোদিনই হয় না, তবু চেষ্টা করেন। তখন আরো বিশেষ করে করতে হল, যুদ্ধ ঘোষণা করার দরকার হল বলে। বললেন, "বেশ, সে পাপ না হয় আমিই করব, কিন্তু তোমরা নাহয় কষ্ট করে একটু সাক্ষী থেকো তার, বিশেষ করে রোজ যে খাওয়াও সে। অন্য কারো হাতে যদি না খায়, তাই বলছি"।

রুগীর ঘরে গেল দুই তিনজন। তিনি ঘুমোচ্ছিলেন, ডাক শুনে চোখ মেলে তাকালেন। মায়োই-মা ভিজে গামছা দিয়ে হাত পা মুখ ভাল করে মুছিয়ে দিলেন। তারপর মিষ্টি করে বললেন, "দিদি, আজ আমি খাইয়ে দেব, মাছের ঝোল আর ভাত। মাছ আমি নিজে রেঁধেছি। খাওয়া যাচ্ছে কিনা বোলো"। প্রথমে ডালসেদ্ধ আর আলুসেদ্ধমাখা ভাত অল্প অল্প করে তুলে দিলেন। আস্তে আস্তে খেয়ে নিলেন সবটুকু। এইবার এলো সেই পাপের মুহূর্ত, মাছভাত দেওয়া হবে তাঁর মুখে। মায়োই-মা আরেকবার শুনিয়ে দিলেন, "দিদি, এবার মাছ দিচ্ছি"। রোগিণী চোখের দিকে তাকাল শুধু, আপত্তি বা সম্মতি কোনোটাই স্পষ্ট করে জানাতে পারল না। তবু প্রকারন্তরে তা সম্মতি বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, কেননা চোখেমুখে প্রসন্নতা প্রচ্ছন্ন হতে দেখা গেল বলে মনে হল। কাঁটা বেছে খানিকটা মাছ টিপে টিপে নরম করে অল্প একটু ভাত সমেত তুলে দেওয়া হল তাঁর মুখে। অমনি ঘটল সেই কাণ্ড, থু থু করে রোগিণী মুখ থেকে সবটুকু বের করে দিল। মুখে একটু জল দেওয়া হলে সেটুকুও থু থু করে ফেলে দিল রোগিণী। তারপর হুরুস হুরুস করে বমি। অনভ্যস্ত শরীর বোধহয় নতুন খাবার গ্রহণ করতে পারল না, কিন্তু একটু শান্ত হওয়ার পর রোগিণী আবার বলল, "মাছভাত খাব"। মহাপ্রাণ চেয়েছে বলেই মাছভাত দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আরেকবার দেওয়ার ভরসা পেলেন না মায়োই-মা।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন