কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / প্রথম সংখ্যা / ১৪০

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

প্রণব চক্রবর্তী

 

সমকালীন ছোটগল্প


চুলকুনি বুড়ো ও পাড়াবৌদির অন্ধকার

পাড়াবৌদি ডেকেছিলো তাকে। রাতের আঁধারে 'যখন গিয়েছে ডুবে পূর্ণিমার চাঁদ'! পাড়াবৌদি ডেকেছিলো। গিয়েছিলো তাঁবু। হাতে করে মালসায় মোড়ের সত্যনারাণের প্রসাদ যাতে কেউ অহেতুক প্রশ্ন না বাড়ায়। কথামতো দরজায় তিন টোকা, খুলে গেলো চিচিং ফাঁক। তাঁবু ভেবেছিলো আজ কিছু এলেবেলে ঘটবে। ভেতরে ঢুকতেই কপালে প্রথম আঘাত, ফুরুৎ চামচিকে মশা খাচ্ছে ঘুরে ঘুরে, লাথি মেরে চলে গেলো। ঘরে খুব টিমটিমে আলো। বৌদি আটা ডলছিলো মেঝেতে ছড়িয়ে বসে। দরজায় ডাঁশা মেরে আবার এসে ছড়িয়ে বসলো।

-- আঃ, বাম্পার হবে।

-- কি হবে রে?   তাঁবুর দিকে চোখ কটমটিয়ে, আটা মাখা থামিয়ে দিয়ে বৌদি জিজ্ঞেস করলো।

-- লটারি। বাম্পার খেলার কেটেছি একটা। তোমার ঘরে ঢুকতেই চামচিকে লাথি মারলো। তাই ভাবছি কোটি টাকার প্রাইজটা এবার পেয়ে যাবো।

-- আমায় কি দিবি?

-- সত্যনারাণের পেসাদটা আপাতত নাও, পরে ভেবে বলব।

-- হাড়ে হারামি। একবার বলতেও পারলি না প্রাণখুলে, তুমি যা চাও সব দেবো।

-- কেন বলবো, এত দিন ধরে ঘুরতে ঘুরতে কেলসে মেরে যাচ্ছি, তুমি কিছু দিয়েছো আমাকে?

-- ওরে লেলু রে, খালি হাতে ঘুরলেই সব দিয়ে দেয়া যায়! মুনিস গিরি করতেও মগজ লাগে, তোর আছে সে সব!

-- আমার নেই! দেখবা!

-- কি আর দেখাবি, আগে বাম্পার পেয়ে আয়, তারপর দেখাস। যাই হোক, শোন তোকে ডেকেছি কাল আমার সঙ্গে যেতে হবে।

-- কোথায়?

-- বেশি হ্যাজাস না। যেতে বলেছি, যাবি। সকাল আটটায় চলে আসবি।

-- আরে কোথায় যেতে হবে বলবে তো!

-- মুততে যাবো, আমায় নিয়ে যাবি।

-- ধ্যাৎ, তুমি না!

-- কি? বল, আমি না কি?

-- তুমি খুব প্যাঁচালো মাল।

-- আরে ক্যাওড়া, ভোটকেষ্টরা আমায় একটা কাগজ দিয়ে গিয়ে বলেছে কাল গিয়ে লাইন না মারলে ভোটের নাম কেটে দেবে। তাই যেতে হবে। তুই আমার সাথে যাবি, বেচাল কিছু দেখলে হাত-পা চালিয়ে দিবি। আমিও মুতে দিয়ে চলে আসব।

-- তাই নাকি, তোমাকেও নোটিস মেরেছে!

-- এতদিন ভোট মারাচ্ছি, কতবার তো নিজেরটা দিয়েও আরও দুয়েকটা দিয়ে এলাম, কেউ কিছু জানতে চায়নি, এবার নাকি এক চুলকুনি বুড়ো দিল্লি থেকে এসে সবাইকে ধরে খামচে বেড়াচ্ছে। নাম না তুললে, ওর ধুড়ো ভেঙে দিয়ে আসবো। কি কোরে দিল্লি ফেরে দেখবো।

-- তা তোমায় কি কাগজ নিয়ে যেতে বললো?

-- লম্বা একটা লিস্টি ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। আমি কি পড়তে জানি, বললো যা যা কার্ডফার্ড, বাড়ির দলিলফলিল আছে সব নিয়ে যেতে।

-- সেগুলো সব নিয়ে যাবা। বাড়ির দলিল তো তোমার আছেই।

-- এই হারামি, আমার কাছে সেগুলো আছে তোকে কে বললো? আমাকে ছেড়ে ওই নাপতানিকে নিয়ে ভেগে পড়ার আগে, ওই হারামিটা তো কাগজপত্র সবকিছু নিয়ে ভেগেছে। শুধু আমার ভোট কার্ড, আধার কার্ড আর রেশন কার্ডটা রেখে গেছে।

-- তাতেই হবে, চলো আমিও যাবো তোমার সাথে। জানো বৌদি, তোমার কথা ভাবলে না রাতে আমার ঘুম আসে না। কি কষ্ট তোমার। কি করে তুমি একা একা রাত কাটাও, আমাকে একবার ডাক দিলেই পারো।

-- এই কুত্তা, তোকে ডাকবো কেন রে? দুক্কু মারাচ্ছো, পকেটে পয়সা আছে? দাঁত ক্যালানে।

-- তুমি না মেজাজ খারাপ করে দাও। তোমাকে নিয়ে একটু ভাবতে চাইছি আর আমাকে খিস্তী করছো?

-- বেশি ত্যাড়াব্যাঁকা কথা বললে প্যান্ট খুলে নিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেবো। এখন যা, কাল সকালে আয়, আমার কাজটা করে দিতে পারলে, তখন দেখবো কি করা যায়। নাম কেটে দিলে তো সরকারের টাকাপয়সা, রেশন টেশন কিছুই পাবো না। খুব চিন্তা হচ্ছে রে!

-- কোন চিন্তা কোরো না, আমি তো যাচ্ছি, একটা ব্যবস্থা ঠিক করে দেবো। আরে আমাদের বল্টুদা আছে না, ওর হয়েই তো আমরা লড়ে যাচ্ছি, বল্টুদাকে বলেকয়ে সব ঠিক করে দেব।

-- দেখা যাবে তোর ক্ষ্যামতা।

-- প্রসাদটা নাও, একেবারে সত্যনারাণ।

-- ওখানে রেখে যা। আমি নিয়ে নেবো।

তাঁবু ফিরে আসতে আসতে ভাবে এবার একটা সুযোগ এসেছে, যে ভাবেই হোক বৌদির নামটা তুলে দিতে হবে। বৌদি তো বললোই এ কাজটা করে দিতে পারলে, সেও করতে দেবে। সে ঘুরতে ঘুরতে বুল্টিদার বাড়ির কাছাকাছি চলে আসে। মনে হলো বুল্টিদাকে কেসটা একবার জানিয়েই দিয়ে যায়। বাড়ির পাশে তার পার্টির অফিসটায় ঢুকে দেখলো বুল্টিদা কিছু কাগজপত্র নিয়ে গভীরভাবে কিছু ভাবছে, আর এলাকার মার্কামারা সব লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘরটার চারদিকে নানা বিষয় নিয়ে কথাবার্তা বলছে। বুল্টিদার একেবারে কাছে গিয়ে তাঁবু বললো, দাদা, একটা খুব সমস্যা হয়েছে। বুল্টিদা কাগজ থেকে মুখ তুলে তাঁবুকে দেখে বললো--

-- ও, তাঁবু! তোর আবার সমস্যা হলো?

-- সমস্যাটা ঠিক আমার নয়, আমাদের এলাকার পাঁচ নম্বর বুথের সেই খচাদার বৌ, খচাদা তো জানোই আরেকটা মেয়েছেলে পটিয়ে ভেগে গিয়েছে। তো খচাদার সেই প্রথম পক্ষের বৌকে নোটিশ পাঠিয়ে কাল দেখা করতে বলেছে।

-- তো যাবে, হেয়ারিঙে গিয়ে যা কাগজপত্র আছে দেখাবে, এতে সমস্যা কি আছে?

-- খচাদা যাবার আগে সব কাগজপত্র নিয়ে চলে গিয়েছে। বৌদির কাছে শুধু দু-একটা কার্ড পড়ে আছে।

-- তাতে তো হবে না, আরও কিছু তো লাগবে। জন্ম সার্টিফিকেট, স্কুলের সার্টিফিকেট এসব যে কোনো একটা হলেই হবে।

-- ধুর, কিছুই নেই সে সব। নাম কাটা গেলে সরকারের টাকা পয়সা না পেলে তো না খেয়ে তো মারা যাবে। একটা কিছু তোমায় করতেই হবে।

-- ঠিক আছে, নিয়ে আয় তো, বলেকয়ে দেখবো কিছু করা যায় কিনা! একটা কথা বৌটাকে শিখিয়ে দিস, যখনই কাগজপত্র কিছু চাইবে, তখনই যেন হাউমাউ করে চীৎকার করে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। তখন আমরাও বলেকয়ে দেখবো।

কথাটা তাঁবুর মাথায় খচাৎ করে ঢুকে গেলো। বুল্টিদা দারুণ বলেছে। ইচ্ছে হলো ছুটে গিয়ে বৌদিকে কথাটা এখনই বলে আসবে, কিন্তু থেমে গেলো। বৌদির কাছে আবার গেলে মালটা কেলিয়ে দিতে পারে। খুব খতরনক মহিলা। কিন্তু তাঁবুর আর থেমে থাকা সহ্য হচ্ছে না। যেভাবে ছড়িয়ে বসে আটা ছেঁচছিলো, ভাবতেই নীচফিচ কেমন খলবল করে উঠলো। একটা সুযোগ পাওয়া গেছে, কিছুতেই ছাড়া যাবে না। যেভাবেই হোক বৌদির একটা ব্যবস্থা কাল করতেই হবে। নিজে মুখে বলেছে, কাজ হলে তবেই ঝ্যাকাস। তাঁবু বুঝলো রাতের ঘুম আজ বৌদি চাটবে। কোন কথা না ভেবে সোজা বাড়ি গিয়ে, টিনের বাক্স থেকে ওয়ান সাটারটা বার করে তাতে তাবিজ ভরে একেবারে রেডি করে রাখলো। কাল যদি বোঝে বৌদির নাম ওরা কাটবেই, সোজা ঘরে ঢুকে যে-মাকড়াই টেবিলে বসে থাকুক, সোজা কানকোতে ঠেকিয়ে ঘোড়া দাবিয়ে দেবো।

অতঃপর, ঘরে যা পাওয়া গেলো, খেয়ে টেয়ে জামাপ্যান্ট না খুলেই বন্দুকটা বালিশের তলায় নিয়ে আলো নিভিয়ে সে ঘুমিয়ে পড়লো, কাল সকালে উঠতে হবে।

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন